
অর্থনৈতিক সংকট ও মুদ্রার দ্রুত অবমূল্যায়নের প্রতিবাদে ইরানে আবারও বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। গতকাল বুধবার বিক্ষোভকারীরা দেশটির একটি সরকারি ভবনে জোর করে ঢোকার চেষ্টা করেন।
গতকাল ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, একটি সংঘবদ্ধ ‘দাঙ্গাবাজ’ গোষ্ঠী ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় ফারস প্রদেশের ফাসা শহরে স্থানীয় সরকারের একটি ভবনে ঢোকার চেষ্টা করে।
টেলিভিশনে সম্প্রচারিত ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, একদল মানুষ ভবনটির ফটক ভেঙে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করছেন।
রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘নিরাপত্তা বাহিনীর হস্তক্ষেপে তাঁদের হামলা ব্যর্থ হয়। এই দাঙ্গাকারীদের নেতৃত্বে থাকা ২৮ বছর বয়সী এক নারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’
রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘নিরাপত্তা বাহিনীর হস্তক্ষেপে তাঁদের হামলা ব্যর্থ হয়। এই দাঙ্গাবাজদের নেতৃত্বে থাকা ২৮ বছর বয়সী এক নারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’
আধা সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম স্থানীয় এক কর্মকর্তার বরাতে বলেছে, ঘটনার সময় নিরাপত্তা বাহিনীর তিন সদস্য আহত হন এবং চারজন ‘হামলাকারী’–কে আটক করা হয়েছে।
ডলারের বিপরীতে ইরানি রিয়ালের রেকর্ড দরপতন, সঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের নিয়ন্ত্রণহীন ঊর্ধ্বগতি দেশটির অর্থনৈতিক সংকট আরও তীব্র করে তুলেছে। প্রতিবাদে গত রোববার তেহরানে দোকানিরা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ শুরু করেন। বুধবার পর্যন্ত টানা চতুর্থ দিন ওই বিক্ষোভ চলছে।
তেহরান ছাড়া আরও কয়েকটি শহরে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। মঙ্গলবার তেহরানে শিক্ষার্থীরাও রাস্তায় নামেন।
ইরানের সরকারি সংবাদ সংস্থা আইআরএনএর প্রতিবেদনে বলা হয়, ইস্পাহান, ইয়াজদ ও জানজান শহরে বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে।
গতকাল তেহরানে ব্যবসায়ীদের এক ফোরামে বক্তব্য দেওয়ার সময় প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ইরানে এ অস্থিরতার পেছনে বিদেশি হস্তক্ষেপ থাকতে পারে বলে ইঙ্গিত দেন।
প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান বলেন, ‘আমরা এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি, যেখানে দেশের শত্রুরা বাইরে থেকে চাপ প্রয়োগের প্রয়াস চালাচ্ছে এবং দুর্ভাগ্যজনকভাবে দেশের ভেতর থেকেও। সমন্বয় ও সহায়তার পরিবর্তে কখনো কখনো কিছু অবস্থান ও কর্মকাণ্ড দেশকে দুর্বল করে ও ক্ষতি ডেকে আনে।’
ইরান সরকার বলেছে, বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে কথা বলা এবং তাদের উদ্বেগ শোনার জন্য একটি সংলাপের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
তবে ইরানের প্রসিকিউটর জেনারেল হুমকির সুরে বলেছেন, মুদ্রার দরপতন এবং দেশের অর্থনীতির সংকটময় পরিস্থিতির সুযোগে কেউ যদি দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করে, তবে তা প্রতিরোধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
গতকাল ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত মন্তব্যে মোহাম্মদ মোভাহেদি-আজাদ বলেছেন, ‘শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ বৈধ, তবে নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টির চেষ্টা করলে কঠোর পদক্ষেপের মুখে পড়তে হবে।’
বর্তমানে ইরানে মূল্যস্ফীতি প্রায় ৫০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। মুদ্রার অবমূল্যায়নের কারণে আমদানির খরচ বেড়ে গেছে, এতে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে গিয়ে নাগরিকদের ওপর চাপ আরও বেড়েছে।
কয়েক সপ্তাহ ধরে ইরানি রিয়ালের দ্রুত দরপতন হচ্ছে। এর কারণ, যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা মিত্ররা ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা ও কূটনৈতিক চাপ বাড়াচ্ছে। গত রোববার বিক্ষোভ শুরুর সময় মার্কিন ডলারের বিপরীতে রিয়ালের মান ছিল প্রায় ১৪ লাখ ২০ হাজার রিয়াল, এক বছর আগে যা প্রায় ৮ লাখ ২০ হাজার রিয়াল ছিল।
কয়েক দশক ধরে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গত বছর সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে জাতিসংঘ দেশটির ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করলে চাপ আরও বৃদ্ধি পায়। জাতিসংঘের এসব নিষেধাজ্ঞা ইরানের পারমাণবিক নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে সম্পর্কিত।
বর্তমানে ইরানে মূল্যস্ফীতি প্রায় ৫০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। মুদ্রার অবমূল্যায়নের কারণে আমদানির খরচ বেড়ে গেছে, এতে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে গিয়ে নাগরিকদের ওপর চাপ আরও বেড়েছে।
তেহরান থেকে আল–জাজিরার সংবাদদাতা তোহিদ আসাদি বলেন, সরকার বিক্ষোভ নিয়ে বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। একদিকে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান অনেকের অর্থনৈতিক দুর্দশার প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেছেন। গত সোমবারই তাঁর সরকার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধানকে পরিবর্তন করার পদক্ষেপ নিয়েছে।
অন্যদিকে প্রতিবেদক বলেছেন, বিক্ষোভকারীদের ‘উত্তেজনা বৃদ্ধির’ আশঙ্কা নিয়ে দেশের ভেতর গুরুতর উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপনসিবল স্টেটক্রাফটের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ত্রিতা পারসি বলেন, সরকার দেশের চলমান অর্থনৈতিক সংকট সমাধান করতে সক্ষম হবে—ইরানি জনগণের আর এমন বিশ্বাস নেই।
আল–জাজিরাকে ত্রিতা পারসি আরও বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট নিজেই প্রায় এক সপ্তাহ আগে প্রকাশ্যে বলেছেন, তিনি এসব সমস্যার সমাধানে কিছুই করতে পারছেন না। সরকারের সমস্যা সমাধানের ক্ষমতার ওপর জনগণের বিশ্বাসের অভাব অনেকটাই আসলে সরকারের এসব বক্তব্যের কারণে।’
ইরানের অর্থনৈতিক সমস্যা গুরুতর, তবে এটাই একমাত্র চ্যালেঞ্জ নয়। দেশটিতে ভয়াবহ জ্বালানিসংকট চলছে, তেহরানসহ অন্যান্য বড় শহরের জন্য পানি সরবরাহকারী বেশির ভাগ বাঁধও তীব্র পানির সংকটে রয়েছে। সেগুলোয় পানির স্তর প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে।
দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমগুলোয় বিক্ষোভসংক্রান্ত প্রতিবেদনে জোর দিয়ে বলা হচ্ছে, মূলত রিয়ালের অনিয়ন্ত্রিত অবমূল্যায়নের কারণে এটা হচ্ছে। ১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে দেশটির শাসনব্যবস্থা নিয়ে জনমনে যে বিস্তৃত অসন্তোষ তৈরি হয়েছে, সেটিকে খবরে কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে না।
এর আগে ২০২২ ও ২০২৩ সালে মাশা আমিনি নামের ২২ বছরের এক তরুণীর পুলিশি হেফাজতে মৃত্যু নিয়ে ইরানজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিল। সে সময় কয়েক শ মানুষ নিহত এবং ২০ হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।