মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প

এক্সপ্লেইনার

ইরানের পিক্যাক্স মাউন্টেন কী, কেন ডোনাল্ড ট্রাম্প এটি ‘গুঁড়িয়ে দিতে’ চান

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা ক্রমে তীব্র হচ্ছে। এ পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যকে নজিরবিহীন ও অনিশ্চিত অবস্থার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। ঠিক এমন এক সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ‘পিক্যাক্স মাউন্টেন’ বা পিক্যাক্স পর্বত নামে পরিচিত পরমাণু স্থাপনায় হামলা ও তা ধ্বংস করবেন বলে নতুন করে হুমকি দিয়েছেন।

‘দ্য হিউ হিউইট শো’-তে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বারবার সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হিসেবে পিক্যাক্স মাউন্টেনের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র সেখানে যেকোনো ধরনের কর্মকাণ্ডের ওপর কড়া নজর রাখছে।

ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা পিক্যাক্স মাউন্টেন গুঁড়িয়ে দিতে যাচ্ছি। ইরানিদের প্রস্তুত থাকতে বলো।’

গত বছরের জুনে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ফর্দো, নাতাঞ্জ ও ইসফাহানে হামলা চালানোর পর নতুন করে এ মন্তব্য করলেন ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, এগুলো ইরানের পরমাণু অস্ত্র কর্মসূচির অংশ।

তবে তেহরান বারবার এ দাবি অস্বীকার করে আসছে। তারা জোর দিয়ে বলেছে, তাদের পরমাণু কার্যক্রম সম্পূর্ণ বেসামরিক উদ্দেশ্যে।

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে এনবিসি নিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছরের জুনের হামলায় ইরানের তিনটি পরমাণু স্থাপনার মধ্যে একটি ব্যাপকভাবে ধ্বংস হয়েছে। বাকি দুটি তুলনামূলক কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ফর্দো স্থাপনায় হামলার কারণে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সক্ষমতা প্রায় দুই বছর পিছিয়ে গিয়ে থাকতে পারে।

আরও হামলার সতর্কবার্তা ট্রাম্পের

সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ওই স্থাপনার পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখছে।

ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা (পিক্যাক্স মাউন্টেন) খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করছি। আমরা সেখানে কোনো নড়াচড়া দেখছি না। তাদের পরমাণু কর্মসূচির পরিস্থিতি খুব একটা ভালো যাচ্ছে না। যখনই আমরা এ বিষয়ে কিছু শুনি, তখনই আমরা তা উড়িয়ে দিই। তাই তারা এ নিয়ে কথা বলতে পছন্দ করে না। তবে আমরা শিগগিরই পিক্যাক্সে হামলা চালাব।’

মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র রিয়েল-টাইমে (সরাসরি) ওই স্থাপনার প্রতিটি অংশ পর্যবেক্ষণ করতে সক্ষম।

ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা পিক্যাক্সের দিকে নজর রাখছি। কারণ, কেউ একজন বলেছে, সেখানে সামান্য নড়াচড়া দেখা গেছে। আমাদের কাছে এমন ক্যামেরা আছে, যা মহাকাশ থেকেও আপনার নাম ও ব্যাজ পড়ে ফেলতে পারে, পিক্যাক্সের প্রতিটি এলাকা দেখতে পারে। তারা যদি কোনো পদক্ষেপ নেয়, আমরা সঙ্গে সঙ্গে যাব এবং আমাদের যা করার তা-ই করব।’

ইরানের অবশিষ্ট পরমাণু অবকাঠামো ও আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) কর্মকর্তাদের সে স্থাপনায় প্রবেশের অনুমতি দেওয়া উচিত কি না, এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে ট্রাম্প আবারও জোর দিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ওই স্থাপনার ওপর কড়া নজর রাখছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘অবশ্যই। তারা এটি লুকিয়ে রাখতে পারবে না। কারণ, আমাদের চোখ আছে। এর ওপর আমাদের অনেক চোখ রয়েছে। তবে পিক্যাক্স হচ্ছে সদর দরজায় একদম সুন্দর, বড় ও মোক্ষম ঘা দেওয়ার মতো একটি সম্ভাব্য নিশানা।’

পিক্যাক্স মাউন্টেন কী

পিক্যাক্স মাউন্টেন ইরানের নাতাঞ্জ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রের কাছে অবস্থিত। এটি দেশটির সবচেয়ে সুরক্ষিত পরমাণু স্থাপনাগুলোর অন্যতম। গত বছরের জুনে মার্কিন হামলায় এটি ব্যাপকভাবে ধ্বংস হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।

এ স্থাপনায় পাহাড়ের গভীরে দুটি টানেল বা সুড়ঙ্গ রয়েছে, রয়েছে কমপ্লেক্স। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এগুলো মার্কিন অস্ত্রাগারের সবচেয়ে শক্তিশালী বাংকার ধ্বংসকারী বোমার নাগালেরও বাইরে।

স্থানটি নাতাঞ্জ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রের দক্ষিণে অবস্থিত। এটি ইরানের বড় সুরক্ষিত সীমানার অংশ। এর মধ্যে আরেকটি ছোট সুড়ঙ্গ কমপ্লেক্সও রয়েছে। ইনস্টিটিউট ফর সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটির (আইএসআইএস) প্রতিবেদন অনুযায়ী, ছোট কমপ্লেক্সটি মূলত ২০০৭ সালে তৈরি করা হয়েছিল। পরে এটিকে আরও বড় ও মজবুত করা হয়। ২০২৫ সালের জুনের যুদ্ধের পরপরই এটি সিলগালা করে দেওয়া হয়।

ধারণা করা হয়, কমপ্লেক্সটি পাহাড়ের অন্তত ১০০ মিটার গভীরে অবস্থিত। পিক্যাক্স মাউন্টেন নিজেই সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১ হাজার ৬০৮ মিটার উঁচু। পূর্ব দিকের সুড়ঙ্গপথটি পাহাড়ের চূড়া থেকে প্রায় ১৪৫ মিটার নিচে এবং পশ্চিম দিকের প্রবেশপথটি প্রায় ১০০ মিটার নিচে অবস্থিত।

আইএসআইএসের মতে, প্রবেশপথ দুটির মধ্যে উচ্চতার প্রায় ৫০ মিটারের এই পার্থক্যের কারণে ধারণা করা হচ্ছে, ভূগর্ভস্থ স্থাপনাটি বহুতলবিশিষ্ট হতে পারে।

এই স্থানের পেছনের রহস্য কী

পিক্যাক্স মাউন্টেন তেহরানের দক্ষিণে অবস্থিত এবং এটি একটি অত্যন্ত সুরক্ষিত এলাকা। এর ভেতরে মাটির গভীরে দুটি সুড়ঙ্গ কমপ্লেক্স রয়েছে, যার কারণে এটিকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করা বেশ কঠিন।

মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিবেদনগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, বাংকার ধ্বংস করতে সক্ষম শক্তিশালী বোমাগুলোর হাত থেকে রক্ষার জন্য স্থাপনাটি পাহাড়ের অনেক গভীরে, শত শত মিটার শক্ত গ্রানাইট পাথরের নিচে খনন করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আল-মনিটর ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সন্দেহ, তেহরান একটি গোপন ও অঘোষিত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র তৈরি করতে চাইছে, যা তাদের পরমাণু কর্মসূচির জন্য ‘কৌশলগত সুরক্ষা’ হিসেবে কাজ করবে।

তবে ২০২০ সালে এই স্থানে নির্মাণকাজ শুরুর পর থেকেই তেহরান দাবি করে আসছে, স্থাপনাটি শুধু উন্নত সেন্ট্রিফিউজ তৈরি এবং তা সংযোজনের উদ্দেশ্যে তৈরি করা হচ্ছে।

ইরানের নাতাঞ্জের কাছে অবস্থিত নাতাঞ্জ পরমাণুকেন্দ্রের পিক্যাক্স মাউন্টেনের সুড়ঙ্গে ঢোকার পথ দেখা যাচ্ছে। ৩০ জুন ২০২৬ তোলা স্যাটেলাইট চিত্র

কেন স্থাপনাটি গুরুত্বপূর্ণ

পিক্যাক্স মাউন্টেনের দিকে মনোযোগ বাড়লেও বর্তমানে সহজলভ্য স্যাটেলাইট চিত্রগুলোর ওপর ভিত্তি করে স্থাপনাটি ঠিক কবে নাগাদ সম্পূর্ণ কার্যকর হতে পারে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

ইরান এখনো সেখানে বড় আকারের সেন্ট্রিফিউজ সংযোজন–সুবিধা স্থাপনের পরিকল্পনা করছে কি না, তা–ও জানা যায়নি। বিশেষ করে সেন্ট্রিফিউজ কর্মসূচি ও উৎপাদন সক্ষমতার ব্যাপক ক্ষতি হওয়ার পর, তাদের পরিকল্পনা কতটা এগোল, সেটা স্পষ্ট নয়।

তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ইরান যদি তার সেন্ট্রিফিউজ উৎপাদন নেটওয়ার্ক আবার পুনর্গঠন করে, তবে তারা পরমাণু অস্ত্র কর্মসূচিতে সহায়তা করতে পারে—এমন একটি ছোট সেন্ট্রিফিউজ সংযোজন স্থাপনা হিসেবে পিক্যাক্স মাউন্টেনকে ব্যবহার করতে পারে।

পাহাড়ের নিচের খালি জায়গাটি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার জন্য যথেষ্ট বড় বলেও মনে করা হয়, যা অস্ত্র তৈরির উপযোগী ইউরেনিয়াম উৎপাদন করতে সক্ষম।

বিশ্লেষকদের ধারণা, এই ভূগর্ভস্থ কমপ্লেক্সে সম্ভাব্য কিছু পরমাণু অস্ত্র তৈরির কার্যক্রম চালানো যেতে পারে, যার মধ্যে অস্ত্র তৈরির উপযোগী ইউরেনিয়াম ধাতু উৎপাদন এবং সেই উপাদানগুলোকে পরমাণু অস্ত্রের বিভিন্ন যন্ত্রাংশে সংযোজনের কাজ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।