
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য সামরিক সংঘাত এড়াতে একটি সমঝোতা এখন হাতের নাগালে বলে দাবি করেছে ইরান। জেনেভায় দুই দেশের মধ্যে নির্ধারিত আলোচনার ঠিক দুই দিন আগে এই বার্তা দিল তেহরান। গত মঙ্গলবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে লেখেন, ‘পারস্পরিক উদ্বেগ নিরসন ও স্বার্থ রক্ষার জন্য একটি অভূতপূর্ব চুক্তিতে পৌঁছানোর ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি হয়েছে।’
আরাগচি তাঁর পোস্টে জোর দিয়ে বলেন, একটি চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব। তবে সে জন্য কূটনীতিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, ইরান কোনো অবস্থাতে পরমাণু অস্ত্র তৈরি করবে না। তবে শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহারের অধিকার থেকে তেহরান পিছপা হবে না। সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ইরান যেকোনো কিছু করতে প্রস্তুত বলেও তিনি হুঁশিয়ারি দেন।
আগামীকাল বৃহস্পতিবার সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে তৃতীয় দফার আলোচনা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। চলতি মাসের শুরুতে পুনরায় শুরু হওয়া এই আলোচনা ঘিরে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের হুমকি ও রণসজ্জা
এমন এক সময়ে এবারের আলোচনা হচ্ছে, যখন মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি ব্যাপকভাবে বাড়ানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন, চুক্তিতে পৌঁছানো না গেলে ইরানের ওপর হামলা চালানো হবে। এরই মধ্যে আরব সাগরে বিমানবাহী রণতরি ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’ মোতায়েন করা হয়েছে। তা ছাড়া আরেকটি রণতরি ‘ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড’ বর্তমানে গ্রিসের ক্রিট দ্বীপের মার্কিন ঘাঁটিতে অবস্থান করছে, যা যেকোনো সময় ইরানের উপকূলের দিকে রওনা হতে পারে।
বর্তমান উত্তেজনার শুরু থেকে তেহরান বলছে, যেকোনো হামলার দাঁতভাঙা জবাব দেওয়া হবে। গত সোমবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সতর্ক করে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সীমিত আকারের হামলাকেও ‘আগ্রাসন’ হিসেবে গণ্য করা হবে।
অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ ও সরকারের ‘রেড লাইন’
একদিকে আন্তর্জাতিক চাপ, অন্যদিকে দেশের ভেতরে ছাত্র বিক্ষোভ ইরান সরকারকে বেশ অস্বস্তিতে ফেলেছে। গতকাল মঙ্গলবার নিয়ে টানা চতুর্থ দিনের মতো তেহরানের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে বিক্ষোভকারী দুই পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি চলছে। এমনকি গত সোমবার শিক্ষার্থীরা দেশটির জাতীয় পতাকায় আগুন ধরিয়ে দিয়েছেন বলেও খবর পাওয়া গেছে।
শিক্ষার্থীদের চলমান বিক্ষোভের বিষয়ে প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ইরান সরকারের মুখপাত্র ফাতেমা মোহাজেরানি। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ করার অধিকার থাকলেও তাঁদের ‘রেড লাইন’ বা চরম সীমারেখা বুঝতে হবে। জাতীয় পতাকাকে তিনি সেই সীমারেখা হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, প্রচণ্ড রাগের মাথায়ও এই পবিত্র প্রতীকের অবমাননা করা যাবে না।
গত বছরের ডিসেম্বরে অর্থনৈতিক সংকটের জেরে ইরানে বিক্ষোভ শুরু হয়। তা দ্রুত সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। কয়েকটি মানবাধিকার সংস্থার দাবি, সরকারি দমন-পীড়নে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা ‘এইচআরএএনএ’ সাত হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যুর তথ্য সংগ্রহ করার কথা জানিয়েছে। ইরান সরকার তিন হাজার মানুষের মৃত্যুর কথা স্বীকার করলেও এর জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে দায়ী করেছে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে গত বছর পরমাণু চুক্তি নিয়ে পাঁচ দফা আলোচনা হয়েছিল। তবে গত বছরের জুনে ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে ১২ দিনের যুদ্ধের কারণে সেই প্রক্রিয়া ভেস্তে যায়। বৃহস্পতিবার জেনেভার বৈঠকে দুই বৈরী দেশ কোনো চূড়ান্ত সমাধানে পৌঁছাতে পারে কি না, সেদিকে সবার নজর।