মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু

১৫ দফা গাজা পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করে কেন ট্রাম্পকে খেপিয়ে তুলছেন নেতানিয়াহু

জটিল কোনো ইস্যুতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে যুদ্ধবাজ ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বরাবরই জল ঘোলা করতে কিংবা সময়ক্ষেপণ করতে পছন্দ করেন। আর কখনো সুস্পষ্ট কোনো অবস্থান নিতে বাধ্য হলেও সেখানে খানিকটা ধোঁয়াশা রাখার চেষ্টা করেন তিনি। উদ্দেশ্য একটাই—ভবিষ্যতে পরিস্থিতি বেগতিক হলে যেন কৌশলে সটকে পড়ার পথ খোলা থাকে। তবে এবার আর সেই সুযোগ নেই। গাজা যুদ্ধবিরতি চুক্তি এগিয়ে নিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তৈরি করা রোডম্যাপের ক্ষেত্রে নেতানিয়াহুর সেই পুরোনো কৌশল খাটছে না।

গতকাল রোববার সাপ্তাহিক মন্ত্রিসভা বৈঠকের শুরুতে দেওয়া বক্তব্যে নেতানিয়াহু বলেন, ‘আমি বিষয়টি একেবারে পরিষ্কার করে বলতে চাই, ইসরায়েল কোনোভাবেই ওই ১৫ দফা পরিকল্পনাটি গ্রহণ করছে না।’

শুধু একবারই নয়, নিজের এ অবস্থানের কথা নেতানিয়াহু টানা দুবার জোর দিয়ে বলেন।

উগ্র ইহুদিবাদী নেতানিয়াহু আরও বলেন, ‘আমি অনেককে বলতে শুনেছি, “আপনি তো পরিষ্কার করে কিছু বলেননি।” তাই আমি আবারও বলছি, ইসরায়েল কোনোভাবেই ওই ১৫ দফা পরিকল্পনা গ্রহণ করছে না।’

ব্যস, খেলা ঘুরে গেল।

নেতানিয়াহুর এ অবস্থান অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। কারণ, এতে ট্রাম্প তাঁর ওপর ব্যাপক ক্ষুব্ধ হতে পারেন।

ইরান নীতিতে বড়সড় ধাক্কা খাওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট এখন যেকোনো মূল্যে একটি রাজনৈতিক জয় পেতে মরিয়া। সেই তাড়না থেকেই দিন দশেক আগে তিনি নতুন করে গাজা ইস্যুতে মনোযোগ দেন। ট্রাম্প ঘোষণা করেন, তাঁর গঠিত বোর্ড অব পিস বা শান্তি পর্ষদ হামাসকে সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণের লক্ষ্যে একটি ঐতিহাসিক চুক্তিতে পৌঁছেছে।

এরপরই এই পর্ষদের প্রধান দূত নিকোলাই ম্লাদেনভ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) বিষয়টি আরও খোলাসা করেন। তিনি বলেন, হামাসের অস্ত্র সমর্পণ এবং ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার—দুটি প্রক্রিয়াই ধাপে ধাপে ও একসঙ্গে চলতে হবে। এর অর্থ হলো, হামাস যেভাবে নিজেদের অস্ত্র জমা দেবে, ঠিক সেই অনুপাতে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীও (আইডিএফ) গাজার ভেতরের বিভিন্ন অবস্থান থেকে পর্যায়ক্রমে তাদের সেনা সরিয়ে নেবে।

নেতানিয়াহুকে এই শান্তিপ্রক্রিয়ায় শামিল করার ব্যাপারে সামান্যতম যে আশার আলোটুকু টিমটিম করে জ্বলছিল, তা এখন পুরোপুরি নিভে গেছে।

ইরান নীতিতে বড়সড় ধাক্কা খাওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট এখন যেকোনো মূল্যে একটি রাজনৈতিক জয় পেতে মরিয়া। সেই তাড়না থেকেই দিন দশেক আগে তিনি নতুন করে গাজা ইস্যুতে মনোযোগ দেন। ট্রাম্প ঘোষণা করেন, তাঁর গঠিত শান্তি পর্ষদ বা বোর্ড অব পিস হামাসকে সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণের লক্ষ্যে একটি ঐতিহাসিক চুক্তিতে পৌঁছেছে।

গতকাল রোববার ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী সাফ জানিয়ে দেন, হামাস সম্পূর্ণ নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত আইডিএফ এক চুলও সেনা প্রত্যাহার করবে না। তিনি বলেন, ‘হামাসের নিরস্ত্রীকরণ বলতে আমি তাদের ভারী অস্ত্র, হালকা অস্ত্রসহ সব ধরনের অস্ত্রের কথাই বোঝাচ্ছি। আমরা এখানে প্রকৃত নিরস্ত্রীকরণ দেখতে চাই, কাগজে-কলমে কোনো ভুয়া নিরস্ত্রীকরণ নয়।’

গতকাল বিকেল পর্যন্ত ট্রাম্প অবশ্য এ বিষয়ে নিজের অবস্থান নিয়ে প্রকাশ্যে বিস্তারিত কিছু বলেননি। তবে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনের একটি বক্তব্য শেয়ার করেন। সেখানে হিলারি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের গাজা পরিকল্পনার প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন।

গতকাল সন্ধ্যায় ইসরায়েলের চ্যানেল ১২-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ম্লাদেনভ ইঙ্গিত দিয়েছেন, ধাপে ধাপে নিরস্ত্রীকরণের পরিকল্পনাই হয়তো এখনো বহাল আছে। তবে একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেছেন, প্রথম পদক্ষেপটি হামাসকেই নিতে হবে।

ম্লাদেনভ বলেন, মাঠে বাস্তব পদক্ষেপের সত্যতা নিশ্চিত হওয়ার আগে কাউকেই কিছু করতে হবে না, বিশেষ করে ইসরায়েলকে তো নয়ই। যদি অস্ত্র নিষ্ক্রিয়করণের বিষয়টি নিশ্চিত করা যায়—অর্থাৎ, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কাছ থেকে অস্ত্র কেড়ে নিয়ে তা গুদামজাত করা হয় এবং শেষ পর্যন্ত অকেজো করে দেওয়া হয়, কেবল তখনই ইসরায়েল গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহার করবে।

ভোটারদের উদ্দেশে নেতানিয়াহুর বার্তা

এই পুরো প্রক্রিয়ায় অবশ্য সন্দেহের কারণও কম নেই। ইসরায়েল ও হামাস—দুই পক্ষেরই স্বার্থ হলো, কোনো সমঝোতা ব্যর্থ হলে তার দায় যেন অন্য পক্ষের ঘাড়ে চাপানো যায়।

তাই নেতানিয়াহুর বক্তব্যের জবাবে হামাস বেশ সংযত ও মাপা প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। তারা বলেছে, এখনো সেই রোডম্যাপের প্রতি তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। পাশাপাশি ‘শান্তি পর্ষদ’ নেতানিয়াহুর ওপর পরিকল্পনাটি মেনে চলার জন্য চাপ দেবে বলেও আশা প্রকাশ করছে হামাস।

তবে হামাস আদৌ সব অস্ত্র ছেড়ে দেবে কি না, তা নিয়েও অনেকে সন্দিহান। কারণ, এসব অস্ত্রই ফিলিস্তিনি প্রতিরোধে হামাসের নেতৃত্বের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতীক। গাজার ভেতরে কোনো অস্থিরতা দেখা দিলে সংগঠনটির টিকে থাকারও অন্যতম নিশ্চয়তা এগুলো। প্রায় ২০ বছর ধরে গাজা শাসন করতে গিয়ে হামাস অনেক শত্রুও তৈরি করেছে।

তবে হামাসের উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ থাকলেও ম্লাদেনভ অস্ত্র জমা দেওয়ার বিষয়টি ঠিকভাবে যাচাই করতে পারবেন কি না কিংবা নেতানিয়াহু আদৌ সেনা প্রত্যাহারের নির্দেশ দেবেন কি না—এসব প্রশ্নের বাইরে আরও একটি বিষয় সামনে এসেছে। নেতানিয়াহু কেন এত প্রকাশ্যে ট্রাম্পকে চ্যালেঞ্জ করলেন?

নিজেকে কৌশলের ওস্তাদ হিসেবে দেখাতে পছন্দ করা নেতানিয়াহু কি বিষয়টি একটু বেশি কৌশলে সামলাতে পারতেন না?

তবে হামাস আদৌ সব অস্ত্র ছেড়ে দেবে কি না, তা নিয়েও অনেকে সন্দিহান। কারণ, এসব অস্ত্রই ফিলিস্তিনি প্রতিরোধে হামাসের নেতৃত্বের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতীক। গাজার ভেতরে কোনো অস্থিরতা দেখা দিলে সংগঠনটির টিকে থাকারও অন্যতম নিশ্চয়তা এগুলো। প্রায় ২০ বছর ধরে গাজা শাসন করতে গিয়ে হামাস অনেক শত্রুও তৈরি করেছে।

এর কারণ সম্ভবত ইসরায়েলের আসন্ন সাধারণ নির্বাচন। নির্বাচন হতে আর ১২ সপ্তাহের কম সময় বাকি। আর জনমত জরিপ বলছে, নেতানিয়াহু এখন বেশ কঠিন অবস্থায় আছেন।

তাই এবার আর রাখঢাক না রেখে সরাসরি ভোটারদের উদ্দেশে কথা বলার সময় হয়েছে নেতানিয়াহুর।

ইসরায়েলের কোনো প্রধানমন্ত্রীই এককভাবে সরকার চালাতে পারেন না। কয়েকটি দলের সমন্বয়ে তাঁকে সরকার গঠন করতে হয়। নেতানিয়াহু অবশ্য অন্যদের মতো নির্বাচনের পর জোট গঠনের অপেক্ষায় থাকতে চান না; বরং নির্বাচন হওয়ার আগেই পরবর্তী সরকারে কারা তাঁর সঙ্গে থাকবে, সেই হিসাব কষে রাখতে পছন্দ করেন।

ভোট গণনা শেষে ক্ষমতায় থাকতে হলে এবারও নেতানিয়াহুকে কট্টর ডানপন্থী মিত্রদের সমর্থন পেতে হবে। তাই গাজা রোডম্যাপের প্রকাশ্য সমালোচনা এবং এর বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার জন্য তাঁদের চাপ নেতানিয়াহুকে অস্বস্তিতে ফেলেছে।

পাশাপাশি গাজায় আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী মোতায়েনের বিষয়ে ইসরায়েলি মন্ত্রিসভার আগের সিদ্ধান্তও বাতিলের দাবি উঠেছে। ওই বাহিনীর কাজ হওয়ার কথা ছিল গাজার একটি ছোট এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে নিরাপত্তা পরিস্থিতি দেখভাল করা।

গতকাল ইসরায়েলি আর্মি রেডিও জানায়, নেতানিয়াহু নীরবে ওই এলাকায় পুনর্গঠনকাজ শুরুর অনুমতি দিয়েছিলেন। বিষয়টি তাঁর জন্য আরও দুর্বলতার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছিল।

তবে নেতানিয়াহুর অবস্থানকে শুধু কট্টর ডানপন্থীদের খুশি করার চেষ্টা হিসেবে দেখলে ভুল হবে।

ইসরায়েলের বেশির ভাগ ভোটার এখনো ট্রাম্পের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব রাখেন। কিন্তু তাঁদের বড় একটি অংশ মনে করেন, গাজায় ইসরায়েল কী করবে, সে বিষয়ে ট্রাম্প যদি ইসরায়েলের স্বাধীনতা কোনোভাবে সীমিত করতে চান, তাহলে তিনি বড় ভুল করছেন।

নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীদের ম্লাদেনভের এই যুক্তি গ্রহণ করার সম্ভাবনাও কম। গতকাল টেলিভিশনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ম্লাদেনভ ইসরায়েলের নিজেদের স্বার্থের কথাই সামনে আনার চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, শান্তি পর্ষদের পরিকল্পনা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলেই ২০২৩ সালে গাজার কাছাকাছি বসবাসকারী ইসরায়েলি জনগোষ্ঠীর ওপর চালানো বড় হামলার মতো ঘটনা আর কখনো ঘটবে না—এমন নিশ্চয়তা পাওয়া যাবে।

ইসরায়েলের কোনো প্রধানমন্ত্রীই এককভাবে সরকার চালাতে পারেন না। কয়েকটি দলের সমন্বয়ে তাঁকে সরকার গঠন করতে হয়। নেতানিয়াহু অবশ্য অন্যদের মতো নির্বাচনের পর জোট গঠনের অপেক্ষায় থাকতে চান না; বরং নির্বাচন হওয়ার আগেই পরবর্তী সরকারে কারা তাঁর সঙ্গে থাকবে, সেই হিসাব কষে রাখতে পছন্দ করেন।

ম্লাদেনভ বলেন, ‘আমরা যদি এসব বিষয় নিয়ে তর্কবিতর্ক করতে থাকি এবং সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিতে থাকি, তবে আমি নিশ্চিত, এর একমাত্র বিকল্প হবে হামাসের আবার অস্ত্র সংগ্রহ করা। এতে আরেকটি ৭ অক্টোবরের হামলার ঝুঁকি আরও বৃদ্ধি পাবে।’

সত্যি বলতে, গাদি আইজেনকট, নাফতালি বেনেট কিংবা ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী হতে চাওয়া অন্য অনেক রাজনীতিক এ অবস্থান নিয়ে খুব বেশি ভোট পাবেন—এমনটা বিশ্বাস করা কঠিন।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি পর্ষদের এক কর্মকর্তা সাম্প্রতিক দিনগুলোতে গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর সংযত আচরণ এবং হামলার লক্ষ্য নির্ধারণের নীতিতে পরিবর্তনের বিষয়টি সামনে আনার চেষ্টা করেছেন। ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা পর্দার আড়ালে সহযোগিতা দেখতে পাচ্ছি।’

গাজার ২০ লাখ মানুষের জন্য অবশ্য এটি মোটেও স্বাচ্ছন্দ্যের নয়। কারণ, তাঁরা এখনো পুরো আলোচনার বাইরে। নিজেদের ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নির্ধারণে তাঁদের ভূমিকা প্রায় নেই বললেই চলে।