ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই

ইরান যুদ্ধ বন্ধের আলোচনায় ‘অযৌক্তিক’ দাবি জানাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র: তেহরান

যুদ্ধ বন্ধের আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র ‘অযৌক্তিক’ ও ‘একতরফা’ দাবি জানাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে ইরান। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এ অভিযোগ করেন।

যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে সর্বশেষ প্রস্তাব দিয়েছে ইরান। গতকাল রোববার পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে দেওয়া এ পাল্টাপ্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পৌঁছেছে। ইরানের জবাব প্রসঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ‘তাদের শর্তগুলো আমার পছন্দ হয়নি—এটি একবারেই অগ্রহণযোগ্য।’

সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে ইরানি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বক্তৃতা করেন। তিনি দাবি করেন, সংঘাত বন্ধ এবং হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করতে ইরানের প্রস্তাবগুলো ছিল বৈধ ও উদার।

এই পরিপ্রেক্ষিতে আজ সোমবার সাপ্তাহিক সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন প্রস্তাবের ইরানের জবাব বা পাল্টাপ্রস্তাবসহ নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেন দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই।

বাঘাই বলেন, ‘আমরা কোনো বাড়তি সুবিধা চাইনি। আমাদের দাবি ন্যায্য। আমরা যুদ্ধ বন্ধ, মার্কিন অবরোধ ও জলদস্যুতার অবসান এবং অন্যায়ভাবে আটকে রাখা (ইরানের) সম্পদের মুক্তি চেয়েছি।’

আমরা কোনো বাড়তি সুবিধা চাইনি। আমাদের দাবি ন্যায্য। আমরা যুদ্ধ বন্ধ, মার্কিন অবরোধ ও জলদস্যুতার অবসান এবং অন্যায়ভাবে আটকে রাখা (ইরানের) সম্পদের মুক্তি চেয়েছি।
ইসমাইল বাঘাই, মুখপাত্র, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়

বাঘাই আরও বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদ চলাচল এবং লেবাননসহ পুরো অঞ্চলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই ইরানের লক্ষ্য। (ইরানের জবাব) আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য একটি দায়িত্বশীল ও উদার প্রস্তাব।’

ইরানের জবাবের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে রোববার ট্রাম্প নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে একটি পোস্ট দিয়েছেন। এতে তিনি লিখেছেন, ইরানের পাল্টাপ্রস্তাব তিনি প্রত্যাখ্যান করবেন। তবে সেই প্রস্তাবের বিস্তারিত কিছু তিনি জানাননি।

ট্রাম্প পোস্টে লিখেছেন, ‘আমি ইরানের তথাকথিত প্রতিনিধিদের কাছ থেকে আসা জবাব পড়েছি। আমার পছন্দ হয়নি—এটি সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।’

যুদ্ধবিরতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান এ পর্যন্ত একাধিকবার পাল্টাপাল্টি প্রস্তাব বিনিময় করেছে। কিন্তু তারা একমত হতে পারছে না।

সোমবারের খবরটি বেশ নেতিবাচক। কারণ, দুই পক্ষ ক্রমাগত তাদের সর্বোচ্চ দাবিতে অটল থাকতে চাইছে।
আন্দ্রেয়া ডেসি, বিশেষজ্ঞ, আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অব রোম

এ অচলাবস্থা প্রসঙ্গে আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অব রোমের আন্দ্রেয়া ডেসি বলেন, দুপক্ষই যার যার অবস্থানে অনড় রয়েছে।

আন্দ্রেয়া বলেন, সোমবারের খবরটি বেশ নেতিবাচক। কারণ, দুপক্ষ ক্রমাগত তাদের সর্বোচ্চ দাবিতে অটল থাকতে চাইছে।

এই বিশ্লেষক আরও বলেন, এই অচলাবস্থার ফলে বিশ্ব অর্থনীতি, পারস্য উপসাগরসহ মধ্যপ্রাচ্যের সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

তেলের মূল্যবৃদ্ধি

ট্রাম্পের পোস্টের পর বিশ্বে জ্বালানির বাজারে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। আজ সোমবার সকালে এশিয়ার বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানির (ব্রেন্ট ক্রুড) দাম ৪ দশমিক ৬৫ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেলের দাম ৯৯ দশমিক ৯৫ ডলারে পৌঁছেছে।

যুদ্ধবিরতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান এ পর্যন্ত একাধিকবার পাল্টাপাল্টি প্রস্তাব বিনিময় করেছে। কিন্তু তারা একমত হতে পারছে না।

যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের মানদণ্ড ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) তেলের দামও চার শতাংশের বেশি বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৫ দশমিক ৫ ডলারে পৌঁছেছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল যৌথভাবে আগ্রাসন শুরু করে। এর কয়েক দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ ও ট্যাংকার চলাচল প্রায় বন্ধ করে দেয় ইরান। পরবর্তী সময়ে ইরানের বন্দরে নৌ অবরোধ আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। এতে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটিতে জ্বালানি তেল, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), সার ইত্যাদির মতো কার্গো জাহাজ ও ট্যাংকারের চলাচল প্রায় শূন্যের কোটায় চলে আসে।

আজ সংবাদ সম্মেলনে হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল নিরাপদ করতে ইউরোপীয় দেশগুলোর যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর পরিকল্পনা নিয়েও কথা বলেন বাঘাই।

ইরানের রাজধানী তেহরানে যুক্তরাষ্ট্র-বিরোধী একটি বিলবোর্ডের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন এক নারী। বিলবোর্ডটিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও হরমুজ প্রণালিতে চিত্রায়িত করা হয়েছে। ১১ মে ২০২৬

ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ ও যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ৫০টির বেশি দেশ নিয়ে একটি জোট গঠনের চেষ্টা করছেন। তাঁরা বলছেন, যুদ্ধপরবর্তী সময়ে হরমুজে নৌযোগাযোগ আবার চালু করতে তাঁরা কাজ করবেন।

আজ সকালে এশিয়ার বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানির (ব্রেন্ট ক্রুড) দাম ৪ দশমিক ৬৫ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেলের দাম ৯৯ দশমিক ৯৫ ডলারে পৌঁছেছে।

বাঘাই বলেন, ইরান ইউরোপীয় দেশগুলোকে স্পষ্ট করে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ঔদ্ধত্যের কাছে তাদের নতি স্বীকার করা উচিত নয়।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এ মুখপাত্র আরও বলেন, ‘তাদের (ইউরোপীয় দেশগুলো) এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া উচিত নয়, যা তাদের স্বার্থ নষ্ট করবে। আমি আগেও বলেছি, এই যুদ্ধ কেবল অনৈতিকই নয়, অবৈধও।’

বাঘাই বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলই ইরানে আগ্রাসন শুরু করেছে। তাই ইউরোপীয় দেশগুলোকে তাদের ফাঁদে পা দেওয়া উচিত হবে না।’

যুক্তরাজ্যের সরকারের তথ্যমতে, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক নৌযান চলাচল স্বাভাবিক করার পরিকল্পনা নিয়ে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স আগামীকাল মঙ্গলবার বিভিন্ন দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের নিয়ে একটি বৈঠকের আয়োজন করবে।

এর আগে গত এপ্রিলে লন্ডনে বিভিন্ন দেশের সামরিক পরিকল্পনাকারীদের নিয়ে দুই দিনব্যাপী একটি ভার্চ্যুয়াল বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে বাঘাই বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি বা পারস্য উপসাগরে যেকোনো ধরনের হস্তক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে।...এতে তেলের দাম আরও বেড়ে যাবে। আমরা আশা করি, বিশ্বের (শক্তিশালী) দেশগুলো দায়িত্বশীল আচরণ করবে।’