বিক্ষোভ চলাকালে একটি সড়ক অবরোধের দৃশ্য। ইরানের রাজধানী তেহরানে, ৯ জানুয়ারি ২০২৬
বিক্ষোভ চলাকালে একটি সড়ক অবরোধের দৃশ্য। ইরানের রাজধানী তেহরানে, ৯ জানুয়ারি ২০২৬

ইরানে আহত বিক্ষোভকারীরা কেন হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নিতে চান না

ইরানে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া তারা (ছদ্মনাম) নামের এক বিক্ষোভকারী বলছিলেন, ‘মানুষ আমাদের সাহায্য করল, গাড়িতে তুলে দিল...আমি শুধু বলছিলাম, আমাদের হাসপাতালে নেবেন না।’

ইরানের ইস্পাহান শহরে বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন তারা (ছদ্মনাম) ও তাঁর বন্ধু। এ সময় মোটরসাইকেলে করে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা এসে বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে চিৎকার করতে শুরু করেন।

তারা বলেন, ‘আমার বন্ধু নিরাপত্তা বাহিনীর এক সশস্ত্র সদস্যকে বলেছিল, “আমাদের গুলি করবেন না।” কিন্তু তখনই ওই সদস্য আমাদের দিকে কয়েকটি গুলি ছোড়েন। আমরা মাটিতে লুটিয়ে পড়ি। আমাদের জামাকাপড় রক্তে ভেসে যায়।’

এরপর তারা ও তাঁর বন্ধুকে অপরিচিত এক ব্যক্তির গাড়িতে তোলায় হয়। তারা বলেন, গ্রেপ্তার হওয়ার ঝুঁকি থাকায় তাঁরা হাসপাতালে যেতে ভয় পাচ্ছিলেন। তিনি আরও বলেন, ‘সব অলিগলি নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যে ভরা ছিল। এক দম্পতি নিজেদের বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমরা সেখানে গিয়ে তাঁদের কাছে আশ্রয় চাই।’

ইরানে ছড়িয়ে পড়া সরকারবিরোধী বিক্ষোভের মধ্যে সরকার ইন্টারনেট সংযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। বেশির ভাগ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের ওপর সংবাদ সংগ্রহে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এ কারণে নিরাপত্তা বাহিনীর দমন–পীড়নে হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

তারা বলেন, ওই রাতে তিনি ও তাঁর বন্ধু সেই দম্পতির বাড়িতে ছিলেন। ভোরে তাঁরা পরিচিত এক চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সক্ষম হন। চিকিৎসক তাঁদের পায়ের বুলেটের ক্ষত পরিষ্কার করে দেন।

তারা আরও বলেন, পরে এক সার্জন বাড়ি গিয়ে তাঁদের শরীর থেকে কিছু বুলেটের ক্ষুদ্রাংশ বের করতে সক্ষম হন। কিন্তু সতর্ক করে বলেন, ‘সব বের করা সম্ভব নয়। এগুলো তোমাদের শরীরের ভেতরেই থেকে যাবে।’

নিরাপত্তার স্বার্থে এই প্রতিবেদনের সব নাম পরিবর্তন করা হয়েছে।

ইরানে ছড়িয়ে পড়া সরকারবিরোধী বিক্ষোভের মধ্যে সরকার ইন্টারনেট সংযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। বেশির ভাগ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের ওপর সংবাদ সংগ্রহে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এ কারণে নিরাপত্তা বাহিনীর দমন–পীড়নে হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট নিউজ এজেন্সি (এইচআরএএনএ) দাবি করেছে, বিক্ষোভে এ পর্যন্ত ৬ হাজার ৩০১ জনের মৃত্যুর খবর তারা নিশ্চিত হয়েছে। এর মধ্যে ৫ হাজার ৯২৫ জন বিক্ষোভকারী, ১১২ জন শিশু এবং ৫০ জন সাধারণ পথচারী। এ ছাড়া নিরাপত্তা বাহিনীর ২১৪ জন সদস্য নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। সংস্থাটি আরও ১৭ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যুর খবর খতিয়ে দেখছে।

বিক্ষোভের সময় ইরানের রাজধানী তেহরানের বেহেস্তি মসজিদের সামনে পুড়িয়ে ফেলা একটি মোটরসাইকেল

তবে ইরান সরকার তিন হাজারের কিছু বেশি মানুষ নিহত হওয়ার কথা নিশ্চিত করেছে।

এইচআরএএনএর তথ্যমতে, এ আন্দোলনে অন্তত ১১ হাজার বিক্ষোভকারী গুরুতর আহত হয়েছেন।

আহত ব্যক্তিদের কয়েকজন বিবিসিকে বলেছেন, গ্রেপ্তার হওয়ার ভয়ে তাঁরা হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যাচ্ছেন না। ফলে তাঁরা এমন কিছু চিকিৎসক, নার্স ও স্বেচ্ছাসেবকদের ওপর ভরসা করছেন, যাঁরা নিজেদের ঝুঁকি সত্ত্বেও গোপনে বাড়ি বাড়ি গিয়ে চিকিৎসা দিচ্ছেন।

স্বাস্থ্যকর্মীরাও বিবিসিকে বলেছেন, হাসপাতালগুলোতে নিরাপত্তা বাহিনীর কড়া উপস্থিতি রয়েছে। আহত বিক্ষোভকারীদের শনাক্ত করতে তাঁরা সার্বক্ষণিক রোগীদের নথিপত্র পরীক্ষা করছেন।

তেহরানের নিমা (ছদ্মনাম) নামের এক সার্জন বলেন, ৮ জানুয়ারি কর্মস্থলে যাওয়ার সময় তিনি পথে অনেক তরুণকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। ওই দিন বিক্ষোভ দমনে মারমুখী অবস্থান নিয়েছিল নিরাপত্তা বাহিনী।

নিমা বিবিসিকে বলেন, পুলিশের তল্লাশিতে পড়ার ভয়ে তিনি একজনকে তাঁর গাড়ির ডিকিতে লুকিয়ে হাসপাতালে নিয়ে যান। তিনি আরও বলেন, ‘প্রায় ৯৬ ঘণ্টা না ঘুমিয়ে, এমনকি একমুহূর্তের জন্য চোখ বন্ধ না করে আমরা একটানা অস্ত্রোপচার করেছি। কিন্তু কেউ কোনো অভিযোগ করিনি।’

নিমা আরও বলেন, ‘আমাদের সব পোশাক আর হাসপাতালের গাউন রক্তে ভিজে একাকার হয়ে গিয়েছিল।’

এই সার্জন বলেন, তাঁর হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া অনেক তরুণের শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ও হাত-পায়ে গুলির গভীর ক্ষত ছিল। অনেকের জখম এতটাই গুরুতর ছিল যে শেষ পর্যন্ত তাঁদের হাত-পা কেটে ফেলতে হয়েছে, যা তাঁদের স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্বের দিকে ঠেলে দিয়েছে।

তবে ইরানি কর্তৃপক্ষ এই দমন-পীড়নের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হোসেন শোকরির দাবি, মানুষ সরকারি হাসপাতালের ওপর আস্থাশীল এবং হাজার হাজার মানুষ চিকিৎসা নিচ্ছেন। সরকারি হিসাবে নিহতের সংখ্যা প্রায় ৩ হাজার ১০০ জন। তাঁদের বড় অংশই নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য।

হোসেন শোকরি আরও বলেন, ‘সৌভাগ্যবশত, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও হাসপাতালের ওপর মানুষের আস্থা আছে। চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতে আহত ব্যক্তিরা নিরপেক্ষভাবে সেবা পাচ্ছেন—এমন আত্মবিশ্বাস থেকেই গত ছয় দিনে প্রায় তিন হাজার মানুষ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেছেন। তাঁরা আগে বাড়িতেই নিজেদের চিকিৎসা করছিলেন।’

তেহরানের ফারাবি চক্ষু হাসপাতালের প্রধান চিকিৎসক ড. কাসেম ফাখরাই দেশটির আধা সরকারি সংবাদ সংস্থা ইসনাকে বলেন, ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত তাঁরা চোখের গুরুতর জখম নিয়ে আসা মোট ৭০০ রোগীর চিকিৎসা করেছেন, যাঁদের জরুরি অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন ছিল। এ ছাড়া প্রায় ২০০ রোগীকে অন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। তিনি জানান, এসব রোগীর প্রায় সবাই ৮ জানুয়ারির পর হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন।

তবে ইরানি কর্তৃপক্ষ এই দমন-পীড়নের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। সরকারি হিসাবে নিহতের সংখ্যা ৩ হাজার ১০০ বলা হলেও তাঁদের দাবি, নিহত ব্যক্তিদের বড় অংশই নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য।

তেহরানের এক স্বাস্থ্যকর্মী জানান, চিকিৎসকেরা রোগীর মেডিক্যাল রেকর্ডগুলোর আঘাতের কথা উল্লেখ না করার চেষ্টা করছেন। কারণ, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা প্রতিনিয়ত এসব নথিপত্র কড়া নজরদারিতে রাখছেন।

বিক্ষোভের সময় পায়ে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর নিজের ভাইকে নিয়ে হাসপাতালে গিয়েছিলেন সিনা (ছদ্মনাম)। সেই অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বিবিসিকে বলেন, ‘হাসপাতালটিকে দেখে মনে হচ্ছিল, ঠিক যেন কোনো যুদ্ধক্ষেত্র। সেখানে এত বেশি আহত মানুষ ছিল যে রোগীদের দেওয়ার মতো কোনো কম্বল বা চিকিৎসা সরঞ্জাম অবশিষ্ট ছিল না।’

মহাসড়কে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ চলাকালে ধোঁয়া উঠতে দেখা যাচ্ছে। ইরানের রাজাভি খোরাসান প্রদেশের মাশহাদের ভাকিলাবাদে, ১০ জানুয়ারি ২০২৬

সিনা জানান, স্বাস্থ্যবিমা ব্যবহারের সুবিধার জন্য নিজেদের আসল পরিচয়পত্র নম্বর দিতে বাধ্য হয়েছিলেন তাঁরা। এ নিয়ে চরম আতঙ্কে থাকা সিনা বলেন, ‘যেকোনো মুহূর্তে নিরাপত্তা বাহিনী আমাদের বাড়িতে হানা দিতে পারে।’

বড় শহরগুলোর তুলনায় ছোট শহরগুলোতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিবিসির কাছে আসা খবরে জানা গেছে, নিরাপত্তা বাহিনী হাসপাতাল থেকে রোগীদের তুলে নিয়ে যাচ্ছে। এরপর তাঁদের আর কোনো হদিস পাওয়া যাচ্ছে না।

মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো বলছে, যেসব চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী আহত বিক্ষোভকারীদের সেবা দিচ্ছেন, এখন তাঁদেরও লক্ষ্যবস্তু করছে নিরাপত্তা বাহিনী। নরওয়েভিত্তিক সংস্থা ইরান হিউম্যান রাইটস গত সপ্তাহে জানিয়েছে, অন্তত পাঁচজন চিকিৎসক ও একজন স্বেচ্ছাসেবী স্বাস্থ্যকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, ‘নিরাপত্তা সংস্থাগুলো মূলত সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত করতে এবং আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা ব্যাহত করতেই চিকিৎসকদের গ্রেপ্তার করছে এবং অস্থায়ী চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতে অভিযান চালাচ্ছে।’

চলতি সপ্তাহে উত্তরাঞ্চলীয় শহর কাজভিনের সার্জন ড. আলিরেজা গোলচিনির ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো জানিয়েছে, আহত বিক্ষোভকারীদের চিকিৎসা দেওয়ার অপরাধে নিরাপত্তা বাহিনী তাঁর বাড়িতে ঢুকে তাঁকে বেধড়ক মারধর করে তুলে নিয়ে যায়। তাঁর বিরুদ্ধে ‘খোদার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা’র অভিযোগ আনা হয়েছে। ইরানের আইন অনুযায়ী, এ ধরনের অপরাধের শাস্তি হতে পারে মৃত্যুদণ্ড।