ইসরায়েল–অধিকৃত পশ্চিম তীরের সা-নুর বসতি আবার চালুর দিনে একটি ভবনের ছাদে ইসরায়েলি পতাকা ওড়াচ্ছেন অবৈধ বসতি স্থাপনকারীরা। ২০০৫ সালে ইসরায়েলের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অ্যারিয়েল শ্যারনের নেওয়া পরিকল্পনা অনুযায়ী যে ১৯টি বসতি খালি করা হয়েছিল, এটি তার একটি। ১৯ এপ্রিল, ২০২৬
ইসরায়েল–অধিকৃত পশ্চিম তীরের সা-নুর বসতি আবার চালুর দিনে একটি ভবনের ছাদে ইসরায়েলি পতাকা ওড়াচ্ছেন অবৈধ বসতি স্থাপনকারীরা। ২০০৫ সালে ইসরায়েলের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অ্যারিয়েল শ্যারনের নেওয়া পরিকল্পনা অনুযায়ী যে ১৯টি বসতি খালি করা হয়েছিল, এটি তার একটি। ১৯ এপ্রিল, ২০২৬

ইসরায়েলি বসতির পণ্যে ব্রিটেনের নিষেধাজ্ঞা—ফিলিস্তিন সংকট সমাধানে কতটা প্রতীকী, কতটা কার্যকর

অধিকৃত পশ্চিম তীরের অবৈধ ইসরায়েলি ইহুদি বসতি থেকে উৎপাদিত পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে যুক্তরাজ্য। ৮ সেপ্টেম্বর দেশটির পার্লামেন্টে ঘোষিত এ সিদ্ধান্তকে ফিলিস্তিন-ইসরায়েল ইস্যুতে লন্ডনের সবচেয়ে কঠোর পদক্ষেপগুলোর একটি বলে বর্ণনা করা হচ্ছে।

পার্লামেন্টে ভাষণ দিতে গিয়ে যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড অভিযোগ করেন, পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী তথাকথিত সেটলার সন্ত্রাসীরা ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে জাতিগত নিধন চালাচ্ছে।

পশ্চিম তীরের এসব বসতিকে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী দীর্ঘদিন ধরেই অবৈধ বলে মনে করে যুক্তরাজ্য, আর এবারের ঘোষণায় সেই অবস্থানকে সরকারি নীতির পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

এ ঘোষণাকে যুক্তরাজ্যের ইসরায়েল-নীতির সামগ্রিক পুনর্বিন্যাস বলে বর্ণনা করেছেন মিলিব্যান্ড নিজেই।

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী পদে গত জুলাইয়ে দায়িত্ব নেওয়া অ্যান্ডি বার্নহ্যাম বলেছেন, ‘অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোই ব্রিটেনের ঐতিহ্য, আর নিজেদের ঘরবাড়ি থেকে জোরপূর্বক উচ্ছেদের শিকার মানুষের পাশে দাঁড়ানো যুক্তরাজ্যের দায়িত্ব’—মার্কিন সাময়িকী ফরচুন এমনটাই জানিয়েছে।

নিষেধাজ্ঞায় ঠিক কী থাকছে

যুক্তরাজ্য সরকার মূলত পাঁচটি পদক্ষেপের কথা জানিয়েছে। প্রথমত, পশ্চিম তীরের অবৈধ বসতিতে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধ করা হচ্ছে।

দ্বিতীয়ত, বসতি কার্যক্রম থেকে মুনাফা অর্জনকারী বা তাতে সহায়তাকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করতে নতুন সক্ষমতা তৈরি করা হচ্ছে, যার আওতায় আর্থিক, নির্মাণ, অবকাঠামো ও রিয়েল এস্টেট-সংশ্লিষ্ট সেবাও আসবে।

যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, কানাডা, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড, নরওয়ে, পোল্যান্ড, পর্তুগাল, স্পেন ও সুইডেন—মোট ১২টি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এক যৌথ বিবৃতিতে জানান, পশ্চিম তীরের পরিস্থিতি দ্রুত অবনতিশীল, আর ফিলিস্তিন সংকটের দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধান রক্ষায় জাতীয় বা ইউরোপীয় পর্যায়ে (ইসরায়েলি অবৈধ বসতির বিরুদ্ধে) বাণিজ্য বিধিনিষেধ আরোপের সময় এসেছে।

তৃতীয়ত, অবৈধ বসতি এলাকার জমি বা সম্পত্তির বিজ্ঞাপন প্রচার নিষিদ্ধ করা হচ্ছে।

চতুর্থত, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন লঙ্ঘনের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে যুক্তরাজ্যের বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞা কাঠামো আরও কঠোর করা হচ্ছে।

পঞ্চমত, ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলায় উসকানি বা সহায়তাকারী কয়েকজন উগ্রপন্থী বসতকারীর ওপর সরাসরি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হচ্ছে।

যুক্তরাজ্যের নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়বে ইসরায়েলি বসতির প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য, বসতি এলাকার আঙুরখেতে উৎপাদিত মদ ও ডেড সির (মৃত সাগর বলে পরিচিত) তীর থেকে সংগৃহীত খনিজ দিয়ে তৈরি প্রসাধনসামগ্রী।

এ নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি ইসরায়েলের কাছে অস্ত্র রপ্তানির ক্ষেত্রেও নতুন কড়াকড়ি আরোপের কথা জানিয়েছেন মিলিব্যান্ড; যদিও এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু তিনি জানাননি।

লন্ডনের ডাউনিং স্ট্রিটে মন্ত্রিসভার বৈঠকে যোগ দিতে আসছেন যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড। অ্যান্ডি বার্নহ্যাম দেশটির প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরদিন। ২১ জুলাই, ২০২৬

এক টেবিলে ১২ দেশ

যুক্তরাজ্যের এ পদক্ষেপ একক কোনো উদ্যোগ নয়। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, কানাডা, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড, নরওয়ে, পোল্যান্ড, পর্তুগাল, স্পেন ও সুইডেন—মোট ১২টি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা এক যৌথ বিবৃতিতে জানান, পশ্চিম তীরের পরিস্থিতি দ্রুত অবনতিশীল, আর ফিলিস্তিন সংকটের দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধান রক্ষায় জাতীয় বা ইউরোপীয় পর্যায়ে (ইসরায়েলি অবৈধ বসতির বিরুদ্ধে) বাণিজ্য বিধিনিষেধ আরোপের সময় এসেছে।

অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোই ব্রিটেনের ঐতিহ্য, আর নিজেদের ঘরবাড়ি থেকে জোরপূর্বক উচ্ছেদের শিকার লোকজনের পাশে দাঁড়ানো যুক্তরাজ্যের দায়িত্ব।
—অ্যান্ডি বার্নহ্যাম, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী

বিবৃতিতে দেশগুলো ইসরায়েলের প্রতি বসতি সম্প্রসারণ ও প্রশাসনিক ক্ষমতা বিস্তার বন্ধ করা, বসত স্থাপনকারীদের সহিংসতার ঘটনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং ইসরায়েলি বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের আহ্বান জানায়।

এর বাইরে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ ও কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি পৃথক একটি বিবৃতিতে জানান, অবৈধ বসতি থেকে পণ্য আমদানি বন্ধ এবং বসতি নির্মাণে জড়িত বা তা থেকে মুনাফা অর্জনকারীদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা গ্রহণের পদক্ষেপ তাঁরা নেবেন।

বিবৃতিতে বলা হয়, এক বছর আগে তাঁরা ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন, আর দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধান রক্ষায় এখনই আরও পদক্ষেপ নেওয়ার সময় এসেছে।

ব্রিটিশ পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ হাউস অব কমন্সে নিজের প্রথম ‘প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্বে’ অংশ নিতে ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিট ছাড়ছেন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। লন্ডন, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ইউরোপজুড়ে চাপ বাড়ছে

নেদারল্যান্ডস, আয়ারল্যান্ড, বেলজিয়াম, স্পেন ও নরওয়ে ইতিমধ্যে ইসরায়েলি বসতির পণ্য নিষিদ্ধ করেছে বা নিষিদ্ধ করার প্রক্রিয়ায় রয়েছে।

ফ্রান্স চাইছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নজুড়েই অনুরূপ বিধিনিষেধ কার্যকর হোক, যদিও জোটভুক্ত ২৭ দেশের মধ্যে এ নিয়ে ঐকমত্য তৈরি এখনো অনেক দূরের পথ।

ফিলিস্তিন যুক্তরাজ্যের পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছে। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের কার্যালয় থেকে দেওয়া বিবৃতিতে এ উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবিক পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অনুরূপ ব্যবস্থা দ্রুত কার্যকর করার আহ্বান জানানো হয়।

গত ডিসেম্বরে ইসরায়েলের নতুন ১৯টি বসতির অনুমোদনের বিরুদ্ধে যুক্তরাজ্য, কানাডা, জার্মানি, ফ্রান্সসহ ১৪টি দেশ যৌথ বিবৃতিতে নিন্দা জানিয়েছিল।

তবে সে সময় নিন্দা জানানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল পশ্চিমা দেশগুলোর প্রতিক্রিয়া। এবারই প্রথম নিন্দার গণ্ডি পেরিয়ে সরাসরি বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার পথে হাঁটল তাদের একাংশ।

কেন এখন এ সিদ্ধান্ত

গত আগস্টে ইসরায়েল বিতর্কিত ‘ই–১’ বসতি প্রকল্পের আওতায় ১ হাজার ২৩৪টি আবাসন ইউনিটের জন্য দরপত্র আহ্বান করে। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমের বসতিগুলোর সঙ্গে পশ্চিম তীরের ‘মাআলে আদুমিম’ বসতি জোটের সংযোগ ঘটবে। ফলে পশ্চিম তীর কার্যত দুভাগে বিভক্ত হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন পর্যবেক্ষকেরা।

২০২৫ সালের আগস্টে ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ এ প্রকল্পের ঘোষণা দেন।

পাশাপাশি সাম্প্রতিক মাসগুলোয় বসতি স্থাপনকারীদের হাতে ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী তথাকথিত সেটলার সন্ত্রাসীরা ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে জাতিগত নিধন চালাচ্ছে।

জাতিসংঘের মানবাধিকার-বিষয়ক হাইকমিশন বলছে, গত ১১ থেকে ২৪ আগস্টের মধ্যে বসতি স্থাপনকারীদের চালানো অন্তত ৮০টি হামলায় লোকজন হতাহত অথবা সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে।

এসব ঘটনার কিছু নিয়ে খোদ ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবিও সমালোচনা করতে বাধ্য হয়েছেন।

উল্লেখ্য, প্রায় এক বছর আগে সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের আমলে যুক্তরাজ্য ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল, ইসরায়েলে অস্ত্র রপ্তানির লাইসেন্স স্থগিত করেছিল এবং দেশটির সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনাও বন্ধ রেখেছিল।

ইসরায়েল–অধিকৃত পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনি গ্রাম তুরমুস আইয়ার কাছে গড়ে তোলা একটি নতুন ইসরায়েলি বসতি। ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

ব্রিটেনের ঐতিহাসিক দায়

ফিলিস্তিন প্রশ্নে যুক্তরাজ্যের ভূমিকা নতুন নয়। ১৯১৭ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের ঘোষিত বেলফোর ঘোষণাপত্রের মধ্য দিয়েই ফিলিস্তিনের ভূখণ্ডে ইহুদি রাষ্ট্র গঠনের পথ খোলে, আর পরবর্তী কয়েক দশকে ব্রিটিশ ম্যান্ডেটের অধীনই ইহুদি অভিবাসন ও বসতি স্থাপনের ভিত তৈরি হয়।

সেই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট মাথায় রেখেই ফিলিস্তিনপন্থী অধিকারকর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাজ্যের কাছে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকার দাবি জানিয়ে আসছিলেন।

এবারের নিষেধাজ্ঞাকে তাই অনেকে সেই পুরোনো দায় স্বীকারের দেরিতে হলেও একটি স্বীকৃতি হিসেবে দেখছেন, যদিও বাস্তবে তা কতটা কার্যকর হবে, সে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

ইসরায়েলের তাৎক্ষণিক পাল্টা পদক্ষেপ

ইসরায়েল যুক্তরাজ্যের সাম্প্রতিকতম নিষেধাজ্ঞার ঘোষণায় তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। এ ঘোষণার পরপরই জেরুজালেমে অবস্থিত ব্রিটিশ কনস্যুলেট বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানায় ইসরায়েলি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

জেরেমি করবিন, ডায়ান অ্যাবটসহ ১২ জন ব্রিটিশ পার্লামেন্ট সদস্যের ইসরায়েলে প্রবেশও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ ছাড়া দক্ষিণ ইসরায়েলের কিরিয়াত গাটে অবস্থিত আন্তর্জাতিক গাজা সহায়তা কেন্দ্র থেকে যুক্তরাজ্যের প্রতিনিধিদের প্রত্যাহার ও ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের নিরাপত্তা বাহিনীতে ব্রিটিশ প্রশিক্ষণ বন্ধেরও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিডিওন সার যুক্তরাজ্যকে অভিযুক্ত করে বলেন, ইসরায়েলের আসন্ন নির্বাচন ও ইহুদি নববর্ষের ঠিক আগে এ ঘোষণা দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের একধরনের চেষ্টা।

এ ছাড়া ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূতকে বহিষ্কারের দাবি তোলেন এবং জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন–গভির পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জে আর্জেন্টিনার সার্বভৌমত্বকে স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানান।

উত্তর গাজা থেকে পালিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে দক্ষিণ গাজার দিকে হেঁটে যাচ্ছেন বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিরা। মধ্য গাজা উপত্যকা, ৯ নভেম্বর, ২০২৩

ওয়াশিংটন ও যুক্তরাজ্যের ভেতরের প্রতিক্রিয়া

ইসরায়েলি বসতির পণ্যে নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার আগে গত সোমবার প্রধানমন্ত্রী বার্নহাম মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনালাপে ফিলিস্তিন সংকটের দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধানের গুরুত্ব তুলে ধরেন; যদিও ট্রাম্প নিজে এখনো এই নিষেধাজ্ঞা নিয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি।

তবে ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি কড়া ভাষায় যুক্তরাজ্যের এ পদক্ষেপের সমালোচনা করেছেন। এটিকে ইহুদিবিদ্বেষ ও ইহুদি জনগোষ্ঠীর প্রতি বৈষম্য বলে আখ্যায়িত করেছেন তিনি।

যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরেও এ সিদ্ধান্ত নিয়ে মতবিরোধ স্পষ্ট। দেশটির প্রধান রাবি এফ্রেইম মিরভিসের সমালোচনার জবাবে মিলিব্যান্ড বলেছেন, ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়ায় তিনি দুঃখিত হলেও নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্তকে সঠিক বলেই মনে করেন তিনি।

এর আগে মিরভিস এ সিদ্ধান্তকে ব্রিটিশ ইহুদিদের জন্য একটি ‘অন্ধকার দিন’ উল্লেখ করে সতর্ক করেন, এতে হাজারো ফিলিস্তিনি শ্রমিকের জীবিকাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

অন্যদিকে বিরোধী কনজারভেটিভ পার্টির পররাষ্ট্রবিষয়ক ছায়া মন্ত্রী বা মুখপাত্র টম টুগেনধাট সতর্ক করেছেন, ইসরায়েলকে একঘরে করার এ চেষ্টা ব্রিটেনের অভ্যন্তরে সাম্প্রদায়িক বিভাজন ও ইহুদিবিরোধী সহিংসতা বাড়িয়ে তুলতে পারে।

ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির ১৪০ জনের বেশি আইনপ্রণেতা দীর্ঘদিন ধরেই ওই সব বসতি থেকে আমদানি বন্ধের দাবি জানিয়ে আসছিলেন, যা সরকারের ওপর এ পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য চাপ তৈরি করেছিল।

ফিলিস্তিনিদের স্বাগত জানানো

ফিলিস্তিন যুক্তরাজ্যের পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছে। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের কার্যালয় থেকে দেওয়া বিবৃতিতে এ উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবিক পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অনুরূপ ব্যবস্থা দ্রুত কার্যকর করার আহ্বান জানানো হয়।

লন্ডনে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের রাষ্ট্রদূত হুসাম জোমলট এ সিদ্ধান্তকে একটি মোড় ঘোরানো পদক্ষেপ বলে অভিহিত করে ইসরায়েলে বিরুদ্ধে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞাসহ আরও ব্যাপক পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।

প্যালেস্টাইন ন্যাশনাল লিবারেশন মুভমেন্ট-ফাতাহর একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এ পদক্ষেপকে দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধানের পক্ষে কাজ করা লোকজনের জন্য এক বিজয় বলে বর্ণনা করেছেন।

ইসরায়েলি হামলায় বিধ্বস্ত একটি বাড়ির ধ্বংসস্তূপের পাশ দিয়ে সন্তানকে কোলে নিয়ে যাচ্ছেন এক ফিলিস্তিনি নারী। দক্ষিণ গাজার খান ইউনিস, ৪ নভেম্বর, ২০২৪

সংখ্যাগত দিক থেকে এ নিষেধাজ্ঞা কতটা সামান্য

নিষেধাজ্ঞাটির প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে খোদ পরিসংখ্যানেই। ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের বার্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৬০০ কোটি পাউন্ড। এর মধ্যে যুক্তরাজ্যের রপ্তানি ৩৫০ কোটি ও আমদানি ২৫০ কোটি পাউন্ডের মতো।

অথচ চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত সর্বশেষ চার প্রান্তিকে ফিলিস্তিন থেকে যুক্তরাজ্যের রেকর্ড করা মোট বাণিজ্য ছিল মাত্র চার কোটি পাউন্ডের। এর মধ্যে সরাসরি পণ্য আমদানির পরিমাণ ছিল মাত্র ৬০ লাখ পাউন্ড, অর্থাৎ যুক্তরাজ্য-ইসরায়েল মোট বাণিজ্যের মাত্র শূন্য দশমিক ১ শতাংশ।

যুক্তরাজ্যের সরকারি বাণিজ্যিক পরিসংখ্যানে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে পার্থক্য করা হলেও পশ্চিম তীরে বসবাসকারী প্রায় সাড়ে সাত লাখ ইসরায়েলি বসতকারীর উৎপাদিত পণ্য এবং সেখানকার ফিলিস্তিনিদের নিজস্ব উৎপাদিত পণ্যের মধ্যে আলাদা কোনো হিসাব রাখা হয় না।

ফলে এ সামান্য অঙ্কের পণ্যের মধ্যে ঠিক কতটা প্রকৃতপক্ষে বসতি থেকে আসে, তা ব্রিটিশ সরকারও নিশ্চিতভাবে জানাতে পারেনি।

লেবেল বদলে পণ্য পাচারের ফাঁকফোকর

বসতির পণ্য শনাক্ত করার পথে বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে সরবরাহ-শৃঙ্খলের অস্বচ্ছতা।

গত জুনে প্রকাশিত গ্লোবাল ইকো লিটিগেশন সেন্টারের ‘ইমপোর্টিং অকুপেশন’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে ইউরোপে রপ্তানি হওয়া ইসরায়েলি তাজা কৃষিপণ্যের চালান পরীক্ষা করে দেখা গেছে, বসতি থেকে উৎপাদিত পণ্য নিয়মিতভাবে সরবরাহ-শৃঙ্খলের ভেতর লুকিয়ে পাঠানো হচ্ছে।

প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে পরীক্ষিত চালানের প্রায় প্রতি ছয়টির একটিতেই বসতি-উৎসের পণ্য পাওয়া গেছে, যেগুলো নথিপত্রে ইসরায়েলি পণ্য হিসেবে দেখানো হয়েছে।

যুক্তরাজ্যের শুল্ক কর্তৃপক্ষ অবশ্য ইসরায়েল-যুক্তরাজ্য বাণিজ্যচুক্তির আওতায় শুল্কসুবিধা পেতে হলে পণ্যের উৎস হিসেবে নির্দিষ্ট পোস্টকোড ও এলাকার নাম উল্লেখ বাধ্যতামূলক করেছে। আর ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ওয়াই৮৬৪ নামের একটি শুল্ক-দলিল কোডও যুক্ত করা হয়েছে, যাতে আমদানিকারককে ঘোষণা দিতে হয়, পণ্যটি ১৯৬৭ সালের পর ইসরায়েলি প্রশাসনের আওতায় আসা এলাকা থেকে আসেনি।

তবে আল–জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে গ্লোবাল ইকোর আইনি পরিচালক জেস স্টোবার বলেছেন, আগের ব্যবস্থায় শুল্ক পরিশোধ করলেই বসতির পণ্য বিক্রির অনুমতি পাওয়া যেত। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার আওতায় এখন পণ্য সীমান্তেই আটকে দেওয়া এবং জরিমানার মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় সরবরাহ–শৃঙ্খলের প্রতিটি ধাপে উৎস যাচাইয়ে আরও সতর্ক হওয়ার তাগিদ তৈরি হবে।

ইসরায়েল–অধিকৃত পশ্চিম তীরের তুলকারেমের নূর শামস শরণার্থীশিবিরে ইসরায়েলি অভিযানের পর ক্ষতিগ্রস্ত একটি ভবন দেখছেন ফিলিস্তিনি বাসিন্দারা। ২১ এপ্রিল, ২০২৪

যুক্তরাজ্যের নিজস্ব চুক্তিই কি প্রশ্নের মুখে

নিষেধাজ্ঞার সবচেয়ে স্পর্শকাতর দিক বসতি কার্যক্রম থেকে মুনাফা অর্জনকারী কোম্পানিকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনার প্রতিশ্রুতি, যা যুক্তরাজ্য সরকারের নিজস্ব ক্রয়নীতির সঙ্গেও সাংঘর্ষিক হতে পারে।

আল–জাজিরার একটি অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ইসরায়েলি অবৈধ বসতির সঙ্গে যুক্ত ১৭টি কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্তরাজ্য সরকারের সরকারি খাতের প্রায় ২১০ কোটি পাউন্ডের চুক্তি রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অঙ্কের প্রায় ১৭০ কোটি পাউন্ড যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান মটোরোলা সলিউশনসের ব্রিটিশ সহযোগী প্রতিষ্ঠান এয়ারওয়েভ সলিউশনসের সঙ্গে, যারা ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড ও ওয়েলসের পুলিশ, দমকল ও অ্যাম্বুলেন্স সেবার নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থা পরিচালনা করে।

যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে এই একটি চুক্তির মূল্যই প্রায় ১৫৬ কোটি পাউন্ড। এ ছাড়া জার্মানির হাইডেলবার্গ ম্যাটেরিয়ালস, ফ্রান্সের এজিস, স্পেনের রেল প্রস্তুতকারক সিএএফ ও চীনের ফোসুন গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোও এ তালিকায় রয়েছে।

গ্লোবাল ইকোর জেস স্টোবার বলেন, আন্তর্জাতিক আদালতের ২০২৪ সালের জুলাইয়ের পরামর্শমূলক মতামতের সঙ্গে সংগতি রেখে যুক্তরাজ্য যদি সত্যিই বাণিজ্য ও নিষেধাজ্ঞা নীতি ঢেলে সাজাতে চায়, তবে নিজস্ব ক্রয়চুক্তিগুলোও একই মানদণ্ডে পরীক্ষা করা উচিত। যুক্তরাজ্য সরকার অবশ্য এ পর্যন্ত এসব প্রশ্নের সরাসরি জবাব দেয়নি বলে জানিয়েছে আল–জাজিরা।

বিশ্লেষকদের সংশয়

বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করছেন, এ নিষেধাজ্ঞা ফিলিস্তিনিদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষায় বাস্তব কোনো পরিবর্তন আনতে পারবে কি না, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।

আল–জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কিংস কলেজ লন্ডনের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষক তাহানি মুস্তাফা এ পদক্ষেপকে মৃদু বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনায় এর তেমন কোনো প্রভাব পড়বে না।

একই প্রতিষ্ঠানের আরেক বিশ্লেষক আন্দ্রেয়াস ক্রিগের মতে, পশ্চিম তীরে গভীরভাবে প্রোথিত বসতিগুলো থেকে ইসরায়েলের সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের সম্ভাবনা ক্ষীণ। ফলে ভবিষ্যতে ভূমি বিনিময়ের মাধ্যমেই শুধু ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অখণ্ডতা নিশ্চিত করা সম্ভব হতে পারে।

ইসরায়েল–অধিকৃত পশ্চিম তীরের হেবরনের কাছে ইসরায়েলি বাহিনীর উপস্থিতিতে বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে একটি ফিলিস্তিনি বাড়ি। ১১ জুলাই, ২০২৪

১৯৯৩ সালে অসলো চুক্তির পর থেকে এ পর্যন্ত পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেম মিলিয়ে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীর সংখ্যা প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার থেকে বেড়ে সাড়ে ৭ লাখে পৌঁছেছে।

ফরচুন সাময়িকীর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞার অর্থনৈতিক প্রভাব সীমিতই থাকবে; কারণ, বসতিগুলো মূলত সামান্য পরিমাণ কৃষিপণ্য রপ্তানি করে। তবে গাজা যুদ্ধের পর ক্রমে একঘরে হয়ে পড়া ইসরায়েলের কাছে এটি তার ঘনিষ্ঠ মিত্রদের অসন্তোষেরই এক প্রতীকী বার্তা বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।

পিবিএস নিউজের প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, ইসরায়েলে নির্বাচনের আগে এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা উল্টো নেতানিয়াহুর প্রতি সহানুভূতি বাড়িয়ে দিতে পারে অথবা ব্রিটিশ ইহুদিদের ওপর হামলার শঙ্কাও তৈরি করতে পারে।

ইসরায়েলে আগামী ২৭ অক্টোবর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। তবে শীর্ষ প্রার্থীদের কেউই বসতি সম্প্রসারণ বা পশ্চিম তীরের সহিংসতা নিয়ে আলোচনা করছেন না। এতে যুক্তরাজ্যসহ পশ্চিমা দেশগুলোর এ পদক্ষেপ স্বল্প মেয়াদে ইসরায়েলি নীতিতে বড় কোনো পরিবর্তন আনবে কি না, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।

এরপরও ফিলিস্তিনি পক্ষ ও অধিকারকর্মীরা যুক্তরাজ্যের নেওয়া পদক্ষেপকে দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধান রক্ষার লড়াইয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকী পদক্ষেপ হিসেবেই দেখছেন।

{তথ্যসূত্র: আল–জাজিরা, এনবিসি নিউজ, এনপিআর, এবিসি নিউজ, পিবিএস নিউজ, দ্য জেরুজালেম পোস্ট, যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টের ওয়েবসাইট, দ্য কনভারসেশন ও ডেইলি মিরর}