
পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশ কয়েক দশক ধরে সহিংসতার মধ্যে দিয়ে গেলেও রাজধানী পেশোয়ার বেশির ভাগ সময় রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীলই ছিল।
এ থেকে বোঝা যায় যে ইসলামাবাদ ও পেশোয়ারের মধ্যে সামান্য হলেও একধরনের বোঝাপড়া ছিল। তবে গতকাল রোববার প্রদেশটিতে জরুরি অবস্থা ও গভর্নরের শাসন জারি হওয়ার পর এ পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে গেছে। খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের ক্ষমতায় রয়েছে ইমরান খানের পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) সরকার।
আগের দিন গত শনিবার দিবাগত রাতে পেশোয়ারে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নেমেছিল। পুরো শহরের রাস্তাঘাট পানিতে ডুবে গিয়েছিল। তবে গতকাল সকাল ছিল উষ্ণ ও রৌদ্রোজ্জ্বল। তারপরও দিনের শুরুতেই শহরজুড়ে একধরনের চাপা আতঙ্কের আবহ ছিল।
সকাল থেকেই বোঝা যাচ্ছিল যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক নেই। মুঠোফোনে কোনো সিগন্যাল নেই, আসন্ন বিপদের ইঙ্গিত ছিল স্পষ্ট।
যদিও মাত্র কয়েক দিন আগেই পিটিআইয়ের লংমার্চের কারণে প্রায় ৪৮ ঘণ্টা পেশোয়ারে মুঠোফোনের সেবা বন্ধ ছিল।
পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পিটিআই প্রতিষ্ঠাতা ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে ৪ অক্টোবর থেকে এ লংমার্চ শুরু হয়েছে। লংমার্চের গন্তব্য রাজধানী ইসলামাবাদ, যদিও বিক্ষোভ মিছিল এখনো প্রদেশের সীমানা অতিক্রম করেনি।
ইমরানের মুক্তিসহ বিভিন্ন দাবিদাওয়া নিয়ে পিটিআই ও পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের মুখোমুখি অবস্থানের মধ্যে গতকাল রোববার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ সরকার খাইবার পাখতুনখাওয়ায় জরুরি অবস্থা এবং গভর্নরের শাসন জারির ঘোষণা দেয়। সংবিধানের নিরাপত্তাসংক্রান্ত দুটি অনুচ্ছেদের আওতায় এ জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে।
এর ফলে পিটিআই পরিচালিত প্রাদেশিক সরকারের সব কার্যক্রম কার্যত স্থগিত হয়ে গেছে।
যদিও আসন্ন বিপদের আশঙ্কায় গতকাল সকাল থেকেই পেশোয়ার থমথমে ছিল। পাকিস্তানের প্রভাবশালী ইংরেজি দৈনিক ডনের এক প্রতিনিধি গতকাল সকাল থেকে শহরের বিভিন্ন এলাকার পরিস্থিতি ঘুরে দেখেন।
ওই প্রতিনিধি বলেন, বাইরে বেরিয়ে দেখা গেল, শহরের বিআরটি বাসস্টেশনগুলো বন্ধ। সাধারণত ভোরেই এসব বাস চলাচল শুরু করে। ফিরদৌস চকে শিপিং কনটেইনার রেখে জিটি রোডও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
ওই এলাকায় বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। জিটি রোড দিয়ে শুধু পথচারীদের চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। হাসপাতাল রোড থেকে ফিরদৌস চক পর্যন্ত জিটি রোডের বন্ধ দোকানগুলোর সামনে অনেক পুলিশ সদস্য বসে ছিলেন। জায়গাটি মালিক সাদ শহিদ চক নামেও পরিচিত।
বালা হিসার দুর্গের ফটকও বন্ধ ছিল। সেখানে একদল পুলিশ সদস্য ফুটপাতে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। সেখানে ফ্রন্টিয়ার কোরস নর্থের সদর দপ্তর।
ইমরানের মুক্তিসহ বিভিন্ন দাবিদাওয়া নিয়ে পিটিআই ও পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের মুখোমুখি অবস্থানের মধ্যে গতকাল রোববার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ সরকার খাইবার পাখতুনখাওয়ায় জরুরি অবস্থা এবং গভর্নরের শাসন জারির ঘোষণা দেয়। সংবিধানের নিরাপত্তাসংক্রান্ত দুটি অনুচ্ছেদের আওতায় এ জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে।
এখান থেকে কয়েক পা দূরেই সুরি চক। কাছেই খাইবার পাখতুনখাওয়া (কেপি) প্রাদেশিক পরিষদ। এখান থেকে জিটি রোড ধরে যাওয়া যায় খাইবার রোডে। এ সড়কেই মূলত শহরের রেড জোনগুলো অবস্থিত।
খাইবার রোডের দিকে যাওয়ার সড়কটি কনটেইনার দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। যান চলাচল নিয়ন্ত্রণের জন্য স্থাপন করা গেটটিও বন্ধ ছিল। সুরি পুল চত্বরে বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্যকে ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়। নানা ধরনের ও নানা মতের বিক্ষোভকারীদের কাছে এ জায়গা সবচেয়ে পছন্দের সমাবেশস্থল।
কেন্দ্রীয় কারাগারের কাছে জাস্টিস রুস্তম কিয়ানি রোডের শেষ প্রান্তে, যেখান থেকে সড়কটি শের শাহ সুরি রোডের দিকে গেছে, সেখানে একটি পুরোনো সাঁজোয়া যান রাখা ছিল। সেখানে দুই পুলিশ সদস্য পথচারীদের আর সামনে না এগোতে বলছিলেন।
ডনের প্রতিনিধি পুলিশের সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে কয়েকজনের সঙ্গে সামনে এগিয়ে যান। কিন্তু এমপিএ হোস্টেলের ঠিক পাশে বিপুলসংখ্যক পুলিশ অবস্থান করছিল। পুলিশ সদস্যদের কয়েকজন চিৎকার করে তাঁদের ফিরে যেতে এবং শোবা বাজার হয়ে ঘুরে যেতে বলেন।
সাহিবজাদা আবদুল কাইয়ুম রোডে গভর্নরের বাসভবন। সেখানে নিরাপত্তাব্যবস্থা ছিল খুবই কড়া। গভর্নরের বাসভবনের দিকে যাওয়া প্রত্যেক ব্যক্তিকে পুলিশ সদস্যরা তল্লাশি করছিলেন। দূর থেকে গভর্নরের বাসভবনের বাইরে বিপুলসংখ্যক গাড়ি পার্ক করে রাখা দেখা গেছে।
শের শাহ সুরি রোডের সঙ্গে খাইবার বাজারের সংযোগকারী জেল পুলও বন্ধ ছিল। খাইবার পাখতুনখাওয়া সরকারের প্রাণকেন্দ্র সিভিল সেক্রেটারিয়েট ছিল পুরোপুরি জনশূন্য। শুধু ‘চিফ সেক্রেটারি’র কার্যালয়ের বাইরে কয়েকটি গাড়ি পার্ক করা ছিল।
সাহিবজাদা আবদুল কাইয়ুম রোডে গভর্নরের বাসভবন। সেখানে নিরাপত্তাব্যবস্থা ছিল খুবই কড়া। গভর্নরের বাসভবনের দিকে যাওয়া প্রত্যেক ব্যক্তিকে পুলিশ সদস্যরা তল্লাশি করছিলেন। দূর থেকে গভর্নরের বাসভবনের বাইরে বিপুলসংখ্যক গাড়ি পার্ক করে রাখা দেখা গেছে।
উল্টো দিক দিয়ে খাইবার রোডের দিকে হাঁটতে গিয়ে দেখা গেল, একটি সাঁজোয়া যান (এপিসি), কারাগারের একটি ভ্যান ও দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণকারী পুলিশ বহনকারী একটি ট্রাক মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবনের দিকে যাচ্ছে।
হেঁটে কয়েক মিনিটের দূরত্বে আর্মি স্টেডিয়ামের কাছে খাইবার রোডে একটি ব্যারিকেড দেখা গেল। সড়কটি পুলিশ বন্ধ করে রেখেছে। সেখান দিয়ে কাউকে যেতে দেওয়া হচ্ছিল না।
ইউনিভার্সিটি রোড ও এয়ারপোর্ট রোডকে সংযুক্ত করা খাইবার রোডের অংশে আমন চক খোলা ছিল, তবে যান চলাচল ছিল খুবই কম। আমন চকে বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য মোতায়েন ছিলেন।
স্টেডিয়াম চকেও কনটেইনার রাখা হয়েছিল। ফলে দুই দিকের গাড়ি এক লেনে চলাচল করছিল।
মূল রোডের সঙ্গে সদর রোডকে সংযুক্ত করা আরবাব রোডেও একটি কনটেইনার রাখা হয়েছিল। সেখানে প্রেজেন্টেশন কনভেন্ট স্কুলের বাইরে একটি গাছের নিচে কয়েকজন পুলিশ সদস্য অলসভাবে বসে ছিলেন।
বহু বছর ধরে পেশোয়ার থেকে বিক্ষোভ মিছিল ইসলামাবাদে যাওয়ার কারণে পাকিস্তানের রাজধানী কনটেইনার দিয়ে দুর্গের মতো করে ফেলতে হতো। কিন্তু এবার ইসলামাবাদই পেশোয়ারে কনটেইনার পাঠিয়েছে। এসব কনটেইনার আর কত দিন এখানে থাকবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়। গতকাল বিকেলে ইন্টারনেট সংযোগও বন্ধ হয়ে গেছে।