বেলুচিস্তানের কোয়েটা শহরের উপকণ্ঠে হামলার পর ক্ষতিগ্রস্ত একটি ব্যাংকের দিকে তাকিয়ে আছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। আগের দিন বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদীরা ওই হামলা চালান। ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
বেলুচিস্তানের কোয়েটা শহরের উপকণ্ঠে হামলার পর ক্ষতিগ্রস্ত একটি ব্যাংকের দিকে তাকিয়ে আছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। আগের দিন বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদীরা ওই হামলা চালান। ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

বেলুচিস্তানে হামলা: চীন ও ট্রাম্পকে দেওয়া পাকিস্তানের প্রতিশ্রুতি কি ঝুঁকিতে

গত বছরের সেপ্টেম্বরে হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের সময় পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির একটি ব্রিফকেস খোলেন। পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ।

ব্রিফকেসের ভেতর ছিল চকচকে কিছু খনিজ সম্পদ। এটি ছিল ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে পাকিস্তানের একটি প্রস্তাবের অংশ—তারা মার্কিন বিনিয়োগের জন্য নিজেদের খনিজ সম্পদের দুয়ার খুলে দিতে চায়।

কিন্তু পাঁচ মাস পার হওয়ার আগেই সেই প্রতিশ্রুতিতে কালো মেঘের ছায়া দেখা দিয়েছে। পাকিস্তানের সবচেয়ে সমৃদ্ধ খনিজ ভান্ডারগুলো মূলত বেলুচিস্তানে। আয়তনের দিক থেকে এটি দেশটির বৃহত্তম, কিন্তু সবচেয়ে দরিদ্র প্রদেশ। এখানকার স্থানীয় জনগণের স্বার্থকে কেন্দ্রীয় সরকার অবজ্ঞা করছে—এমন ক্ষোভ থেকে সেখানে দীর্ঘদিন ধরে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন চলছে।

গত শনিবার বেলুচিস্তানজুড়ে সমন্বিত ‘সন্ত্রাসী’ হামলায় ৩১ বেসামরিক নাগরিক এবং ১৭ নিরাপত্তাকর্মী নিহত হন। পাল্টা হামলায় সামরিক বাহিনী ১৪৫ জন বিদ্রোহীকে হত্যার দাবি করেছে। এ সংঘাত পাকিস্তান ও সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জের কথা মনে করিয়ে দিল।

পাকিস্তান বেলুচিস্তানের সমৃদ্ধ খনিজ সম্পদের একাংশ তাদের ঘনিষ্ঠ মিত্র চীন এবং গত বছর স্বাক্ষরিত এক ঐতিহাসিক চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রকে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে বাড়তে থাকা সহিংসতা কোটি কোটি ডলারের এসব প্রকল্পকেই শুধু ঝুঁকিতে ফেলছে না; বরং দেশটির ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকেও হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

বেলুচিস্তান একই সঙ্গে পাকিস্তানে চীনা বিনিয়োগের প্রাণকেন্দ্র। ফলে শনিবারের এ হামলা ইসলামাবাদের জন্য অত্যন্ত স্পর্শকাতর হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বেলুচিস্তানে সাম্প্রতিক বিচ্ছিন্নতাবাদী হামলা পাকিস্তান, চীন এবং সম্ভাব্য মার্কিন বিনিয়োগকারীদের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। একযোগে প্রদেশটির অন্তত ১২টি স্থানে হামলার কয়েক ঘণ্টা পর পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি প্রতিবেশী ভারতকে দোষারোপ করেছেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নকভি বলেন, ‘এরা সাধারণ সন্ত্রাসী ছিল না। এ হামলার পেছনে ভারত রয়েছে। আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, ভারত এসব সন্ত্রাসীর সঙ্গে মিলে হামলার পরিকল্পনা করেছে।’

তবে ভারত এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতার দিকে মনোযোগ দিতে বলেছে।

বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি (বিএলএ) এ হামলার দায় স্বীকার করেছে। এটি একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন। বেলুচিস্তানের স্বাধীনতার দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র লড়াই চালিয়ে আসছে তারা। আরও কয়েকটি সশস্ত্র গোষ্ঠীও তাদের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে।

বিশ্লেষকেরা মনে করেন, বেলুচিস্তানের দীর্ঘদিনের সংঘাত এবং স্থানীয় অসন্তোষ এ সহিংস পরিস্থিতির মূল কারণ। এই সংকট সমাধানে ইসলামাবাদকে আরও গভীর মনোনিবেশ করতে হবে; যদি তারা বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে চায়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করা এক ভিডিওতে বিএলএ নেতা বশির জেব বলেন, এ হামলাগুলো ছিল তাদের গোষ্ঠীর ‘হেরোফ ২.০’ অভিযানের অংশ। ২০২৪ সালের আগস্টে চালানো একই ধরনের একটি সমন্বিত হামলার ধারাবাহিকতায় এটি চালানো হয়েছে।

এরা (বেলুচিস্তানের হামলাকারীরা) সাধারণ সন্ত্রাসী ছিল না। এ হামলার পেছনে ভারত রয়েছে। আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, ভারত এসব সন্ত্রাসীর সঙ্গে মিলে হামলার পরিকল্পনা করেছে
মহসিন নকভি, পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

গত রোববার ভারত পাকিস্তানের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। ভারতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এটি পাকিস্তানের নিজস্ব ‘অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতা’ থেকে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি সরিয়ে নেওয়ার একটি অপচেষ্টামাত্র।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘প্রতিটি সহিংস ঘটনার পর এভাবে অসার দাবি না করে বরং সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের জনগণের দীর্ঘদিনের দাবিগুলো পূরণের দিকে মনোযোগ দেওয়া পাকিস্তানের জন্য মঙ্গলজনক হবে।’

এই কাদা-ছোড়াছুড়ির মধ্যে বিশ্লেষকেরা বলছেন, বেলুচিস্তানে পাকিস্তানের সংকটের মূল আরও গভীরে প্রোথিত। প্রদেশটিতে বিনিয়োগের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও চীনকে আকৃষ্ট করতে চাইলে এসব মৌলিক সমস্যা উপেক্ষা করে ইসলামাবাদ খুব একটা সুবিধা করতে পারবে না।

অস্থিরতার মূলে কী

২০২৩ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, পাকিস্তানের ২৪ কোটি মানুষের মধ্যে প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখের বাস বেলুচিস্তানে। বিশাল প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও এটি দেশটির সবচেয়ে দরিদ্র প্রদেশ।

এ প্রদেশে তেল, কয়লা, সোনা, তামা ও গ্যাসের বড় মজুত রয়েছে; যা কেন্দ্রীয় সরকারের জন্য বিপুল রাজস্ব তৈরি করে।

পাকিস্তান এ সম্পদের একাংশ তাদের ঘনিষ্ঠ মিত্র চীন এবং গত বছর স্বাক্ষরিত এক ঐতিহাসিক চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রকে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে বাড়তে থাকা সহিংসতা কোটি কোটি ডলারের এসব প্রকল্পকেই শুধু ঝুঁকিতে ফেলছে না; বরং দেশটির ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকেও হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

সহিংস হামলার পর মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত যানবাহনের যন্ত্রাংশ কুড়াচ্ছে মানুষ। কোয়েটা, বেলুচিস্তান, ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

১৯৪৮ সালে দেশভাগের পরপরই পাকিস্তান বেলুচিস্তানকে অন্তর্ভুক্ত করে নেয়। তখন থেকেই প্রদেশটিতে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন চলে আসছে।

সে সময় থেকে এ প্রদেশে অন্তত পাঁচটি বড় বিদ্রোহের ঘটনা ঘটেছে। আন্দোলনের বর্তমান ধাপটি শুরু হয় ২০০০ সালের শুরুর দিকে। তখন স্থানীয় সম্পদের ওপর নিজেদের কর্তৃত্বের দাবি থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন ধীরে ধীরে পূর্ণ স্বাধীনতার দাবিতে রূপ নেয়।

সরকার এর জবাবে কঠোর নিরাপত্তা অভিযানের পথ বেছে নেয়। মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোর অভিযোগ, বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর সঙ্গে জড়িত থাকা বা সহমর্মী হওয়ার সন্দেহে কর্তৃপক্ষ হাজার হাজার জাতিগত বেলুচকে হত্যা ও গুম করেছে।

গত বছরের মার্চে বিএলএ যোদ্ধারা তাঁদের অন্যতম দুঃসাহসিক হামলাটি চালান। সে সময় কোয়েটা থেকে উত্তর–পশ্চিমাঞ্চলীয় খাইবার পাখতুনখাওয়াগামী যাত্রীবাহী ট্রেন জাফর এক্সপ্রেস ছিনতাইয়ের চেষ্টা করেন তাঁরা। এক দিনের বেশি সময় ধরে চলা অভিযানের পর ৩০০ জনের বেশি যাত্রীকে উদ্ধার করা হয়। ওই অভিযানে অন্তত ৩৩ জন যোদ্ধা নিহত হয়েছিলেন।

বেলুচিস্তানসহ দেশজুড়ে বাড়তে থাকা সহিংসতার অংশ ছিল এ ঘটনা। পাকিস্তান ইনস্টিটিউট ফর পিস স্টাডিজের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে এ প্রদেশে অন্তত ২৫৪টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এটি আগের বছরের তুলনায় ২৬ শতাংশ বেশি। এসব হামলায় ৪০০ জনের বেশি প্রাণ হারিয়েছেন।

সহিংসতার এ সর্বশেষ ঢেউ এমন এক সময়ে এল; যার মাত্র কয়েক দিন আগেই চীনা কোম্পানিগুলো আকৃষ্ট করতে খনিজ সম্মেলন আয়োজন করেছিল পাকিস্তান।

গাদার সমুদ্রবন্দরের উন্নয়নসহ এ প্রদেশে ইতিমধ্যে বিপুল বিনিয়োগ করেছে চীন। এটি পাকিস্তানের একমাত্র গভীর সমুদ্রবন্দর। ৬০ বিলিয়ন (৬ হাজার কোটি) ডলারের চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরের (সিপিইসি) প্রধান কেন্দ্র এ বন্দর; যার লক্ষ্য হলো দক্ষিণ-পশ্চিম চীনকে আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করা।

অন্যদিকে গত সেপ্টেম্বরে পাকিস্তানের খনিজ সম্পদ উত্তোলনে বিনিয়োগের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের খনি কোম্পানি ‘ইউএসএসএম’ ৫০০ মিলিয়ন (৫০ কোটি) ডলারের একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে।

ভাড়াটে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো ‘ডেথ স্কোয়াড’ বলে পরিচিত। বেলুচ ভিন্নমতাবলম্বীদের গণহত্যা, বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম, নির্যাতন ও অন্যান্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য এই ভাড়াটে বাহিনীগুলোকে দায়ী করা হয়।

বেলুচিস্তান নিয়ে কাজ করা বার্লিনভিত্তিক গবেষক সাহের বালুচ বলেন, এ প্রদেশের রাজনৈতিক অসন্তোষের সমাধান না করে শুধু সম্পদের ওপর গুরুত্ব দিয়ে বৈশ্বিক অংশীদারদের ডাকার মধ্যে একটি ‘মৌলিক বৈপরীত্য’ রয়েছে।

সাহের বালুচ আল-জাজিরাকে বলেন, ‘বেলুচিস্তানের অস্থিরতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর মূলে রয়েছে সম্পদের মালিকানা, রাজনৈতিক বঞ্চনা ও সামরিকীকরণের মতো দীর্ঘদিনের ক্ষোভ।’

সাহের আরও বলেন, যত দিন এ সহিংসতা চলবে, বড় ধরনের খনিজ উত্তোলন প্রকল্পগুলো উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ও অতিমাত্রায় সামরিক নজরদারির মধ্যে থাকবে। ফলে এগুলো শুধু চীনের মতো রাষ্ট্রীয় সমর্থন পাওয়া বিনিয়োগকারীদের জন্য উপযোগী হবে, বাজারের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা পশ্চিমা বিনিয়োগকারীদের হবে না। এমনকি সিপিইসির আওতায় থাকা চীনা প্রকল্পগুলোও বারবার হামলার শিকার হচ্ছে। ফলে সীমিত কিছু অবকাঠামোর সুরক্ষায় পাকিস্তানকে হাজার হাজার সেনা মোতায়েন করতে হচ্ছে।

সিঙ্গাপুরের এস রাজারত্নম স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের রিসার্চ ফেলো আবদুল বাসিত ভিন্নমত পোষণ করেন। তাঁর মতে, প্রধান বিনিয়োগকারী দেশ চীন এবং সম্ভাব্য বিনিয়োগকারী যুক্তরাষ্ট্র এ ঝুঁকি সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন।

বেলুচিস্তানজুড়ে গত শনিবার সমন্বিত ‘সন্ত্রাসী’ হামলায় ৩১ বেসামরিক নাগরিক এবং ১৭ নিরাপত্তাকর্মী নিহত হন। পাল্টা হামলায় সামরিক বাহিনী ১৪৫ জন বিদ্রোহীকে হত্যার দাবি করেছে।

বাসিত আল-জাজিরাকে বলেন, ‘পাকিস্তানে চীনের সিপিইসি বিনিয়োগ রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র গত বছরের সেপ্টেম্বরে খনিজ চুক্তি সই করেছে; যা ২০২৪ সালের আগস্টের সমন্বিত হামলার (হেরোফ ১.০ অভিযান) এক বছর পরের ঘটনা। তাই তারা দুপক্ষই জানে, এখানে ঝুঁকির মাত্রা কেমন।’

এ গবেষক আরও বলেন, ‘অবশ্যই এ ধরনের হামলা বিনিয়োগকারীদের আত্মবিশ্বাস নাড়িয়ে দেয়। কিন্তু এগুলো যেহেতু সরকারি পর্যায়ের চুক্তি ও কৌশলগত বিনিয়োগের অংশ; তাই যুক্তরাষ্ট্র বা চীন সহজে বিনিয়োগ প্রত্যাহার করবে না।’

বাড়ছে অর্থনৈতিক ঝুঁকি

পাকিস্তানের ধুঁকতে থাকা অর্থনীতি কয়েক বছর ধরে টানা চাপের মুখে রয়েছে। ২০২৩ সালের গ্রীষ্মে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকে শেষ মুহূর্তের বেলআউট বা জরুরি ঋণসহায়তা পেয়ে কোনোমতে দেউলিয়া হওয়া থেকে রক্ষা পায় দেশটি।

এর পর থেকে আইএমএফের সর্বশেষ কর্মসূচির আওতায় কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরে পেয়েছে পাকিস্তান। এ নিয়ে ২৫ বারের মতো সংস্থাটির দ্বারস্থ হয়ে ৭০০ কোটি ডলারের তহবিল নিশ্চিত করেছে ইসলামাবাদ।

পাকিস্তানের বেলুচিস্তানে হামলাস্থল পরিদর্শন করছেন নিরাপত্তাকর্মীরা। ৩১ জানুয়ারি ২০২৬, কোয়েটা

পাকিস্তানকে একটি আকর্ষণীয় বিনিয়োগ গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরতে সরকারি নানা প্রচেষ্টা সত্ত্বেও বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের (এফডিআই) চিত্র এখনো হতাশাজনক।

গত মাসে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রকাশিত তথ্যে দেখা গেছে, গত জুলাই থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে বিনিয়োগে বড় ধরনের ধস নেমেছে। স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ অর্থবছরের প্রথমার্ধে দেশটি মাত্র ৮০ কোটি ৮০ লাখ ডলারের এফডিআই পেয়েছে। অথচ আগের বছরের একই সময়ে এই বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ১৪২ কোটি ৫০ লাখ ডলার।

ইসলামাবাদভিত্তিক সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক ইমতিয়াজ গুল বলেন, বেলুচিস্তানসহ অন্যান্য স্থানে সহিংসতার এই উল্লম্ফন বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করছে।

ইমতিয়াজ গুল আল-জাজিরাকে বলেন, ‘অত্যন্ত অস্থির কোনো পরিস্থিতিতে কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের দেশি বা বিদেশি বিনিয়োগকারী অর্থ বিনিয়োগের ঝুঁকি নেবেন না।’ তিনি আরও বলেন, এ সংকটের মূলে রয়েছে খোদ ওই প্রদেশেরই সমস্যা এবং ইসলামাবাদের ভুল দৃষ্টিভঙ্গি।

এ ছাড়া বেলুচিস্তানের সঙ্গে ইরানের সিস্তান-বেলুচিস্তান প্রদেশের দীর্ঘ ও অরক্ষিত সীমান্ত রয়েছে। বিনিয়োগকারীদের কাছে অঞ্চলটি ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার পেছনে এটি (ইরানের সঙ্গে সীমান্ত) একটি বড় কারণ।

গবেষক সাহের বালুচ বলেন, ‘টানা হামলাগুলো এটিই প্রমাণ করে যে কড়া পাহারার মধ্যে থাকা প্রকল্পগুলোও নিরাপদ নয়। স্থানীয়দের সম্মতি না থাকায় এখানে পাল্টা আঘাতের আশঙ্কা সব সময়ই বেশি থাকে।’

বাহ্যিক বনাম অভ্যন্তরীণ ইস্যু

গত বছরের মার্চে জাফর এক্সপ্রেস ট্রেনে হামলার এক মাস পরই ভারত-শাসিত কাশ্মীরের পেহেলগামে একটি বড় সন্ত্রাসী হামলা হয়। এতে অন্তত ২৬ জন নিহত হন। এসব ঘটনা মে মাসে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে চার দিনের এক সামরিক সংঘাতের জন্ম দেয়। ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা এবং আন্তসীমান্ত গোলাবর্ষণে ভয়াবহ আকার ধারণ করে সংঘাত।

পাকিস্তান বারবার ভারতের বিরুদ্ধে বেলুচ বিদ্রোহীদের প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেওয়ার অভিযোগ তুলে আসছে। জাফর এক্সপ্রেস হামলার পর পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোকে ‘ফিতনা আল-হিন্দুস্তান’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে; যা মূলত ভারতীয় সংশ্লিষ্টতার ইঙ্গিত দেয়।

প্রতিটি সহিংস ঘটনার পর এভাবে অসার দাবি না করে বরং সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের জনগণের দীর্ঘদিনের দাবিগুলো পূরণের দিকে মনোযোগ দেওয়া পাকিস্তানের জন্য মঙ্গলজনক হবে
রণধীর জয়সোয়াল, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র

তবে বিশ্লেষক বাসিত মনে করেন, এ ধরনের দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ থাকা জরুরি। তিনি বলেন, ‘এ হামলাগুলো প্রকাশ্যে হয়েছে এবং স্থানীয়রাই তা করেছেন। এটি গোয়েন্দা সংস্থা ও স্থানীয় নিরাপত্তাব্যবস্থার সরাসরি ব্যর্থতা; যদিও নিরাপত্তা বাহিনী দ্রুত পাল্টা ব্যবস্থা নিয়েছে ও নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করেছে। তবে প্রশ্ন হলো, শহরের প্রধান এলাকাগুলোতে এ ধরনের হামলা কেন সংঘটিত হতে পারল?’

গবেষক সাহের বালুচের মতে, ইসলামাবাদের ভারতের দিকে আঙুল তোলার বিষয়টি একটি পরিচিত কৌশল। এটি হয়তো সাময়িকভাবে কূটনৈতিক ঢাল হিসেবে কাজ করে। কিন্তু গভীরতর সমস্যা সমাধানে খুব একটা কাজে আসে না।

এই গবেষক বলেন, ‘পাকিস্তান বেলুচিস্তান ইস্যুকে রাজনৈতিক সংকটের বদলে নিরাপত্তা সমস্যা হিসেবে উপস্থাপন করতে চায়; যাতে আন্তর্জাতিক সহানুভূতি পাওয়া যায় ও অভ্যন্তরীণ সমালোচনা এড়ানো যায়। তবে এ কৌশলেরও সীমাবদ্ধতা আছে। এখন সবাই জানেন যে বেলুচিস্তানের অস্থিরতার প্রধান কারণ অভ্যন্তরীণ, যেমন গুম হওয়া, রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের অভাব ও অর্থনৈতিক বঞ্চনা।’

ইমতিয়াজ গুল বলেন, স্থানীয় ক্ষোভই মূল কারণ হলেও দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা বহিরাগত শক্তির স্বার্থও হাসিল করতে পারে। তাঁর মতে, এ অঞ্চলে চীনের প্রভাব সীমিত রাখতে পারলে ভারতের লাভ। তিনি বলেন, ‘বহিরাগত কোনো উদ্দেশ্য থাকলেও আমি অবাক হব না। হয়তো সে কারণেই বেলুচিস্তানকে অশান্ত রাখতে সহিংসতা ও উগ্রবাদে অর্থ ঢালা হচ্ছে।’

আবদুল বাসিত বলেন, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্টতা ইতিমধ্যে এ সংঘাতকে একটি আন্তর্জাতিক মাত্রা দিয়েছে।