
নেপালের পর্যটন খাত গত বছরের সেপ্টেম্বরে যখন মূল মৌসুমে প্রবেশ করছিল, তখনই ‘জেন-জি’ প্রজন্মের দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন পুরো খাতকে হঠাৎ স্থবির করে দেয়।
কয়েক বছরের টানা ধাক্কার পর এ রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়। এর আগে নেপালে আঘাত হেনেছিল বিধ্বংসী বন্যা। দুটি বড় বিমান দুর্ঘটনা আকাশপথের নিরাপত্তা নিয়েও নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছিল। আর কোভিড-১৯ মহামারি আন্তর্জাতিক পর্যটনকে পুরোপুরি থামিয়ে দিয়েছিল।
সবচেয়ে নাজুক এমন এক সময়েই নেপালে আঘাত হানল আরেকটি নতুন বিপর্যয়।
গত বুধবার নেপালের রাসুয়া জেলায় ঘটে যাওয়া বিধ্বংসী পাহাড়ি ঢল পর্যটন খাত ঘুরে দাঁড়ানোর আশাকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। বিশেষ করে লাভজনক কৈলাস মানস সরোবর তীর্থযাত্রার বাজারে বড় ধাক্কা লেগেছে। তীর্থযাত্রীদের নেপাল থেকে তিব্বত যাওয়ার অন্যতম প্রধান প্রবেশপথ ‘রাসুয়াগড়ি-তিমুরে’এলাকায় এ দুর্যোগ আঘাত হেনেছে।
আমাদের পর্যটন খাত মূলত পাহাড়ের ওপর নির্ভরশীল। পাহাড়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ঝুঁকিগুলো সঠিকভাবে নিরূপণ করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে দুর্যোগ এড়ানো যায়।বিজয় কুমার সিং, নেপালের পরিবেশবিশেষজ্ঞ
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এ ঘটনা নেপালের পর্যটননির্ভর অর্থনীতির সামনে এক গভীর প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশটির পাহাড়গুলো কি দিন দিন পর্যটকদের জন্য আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে?
গত বুধবারের দুর্যোগের সম্পূর্ণ ক্ষয়ক্ষতির হিসাব নির্ণয়ের কাজ এখনো চলছে। তবে হিমবাহের বিস্ফোরণ (হিমবাহের বরফগলা পানি হঠাৎ নিচে ধেয়ে আসা) এবং জলবায়ুজনিত দুর্যোগ যে হিমালয় অঞ্চলের জনবসতি, অবকাঠামো ও পর্যটকদের জন্য কতটা মারাত্মক হতে পারে, এ ধ্বংসযজ্ঞ তা আবারও স্পষ্ট করে দিয়েছে।
পরিবেশবিশেষজ্ঞ বিজয় কুমার সিং বলেন, ‘আমাদের পর্যটন খাত মূলত পাহাড়ের ওপর নির্ভরশীল। পাহাড়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ঝুঁকিগুলো সঠিকভাবে নিরূপণ করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে দুর্যোগ এড়ানো যায়।’
জলবায়ু–সম্পর্কিত দুর্যোগের ঝুঁকি নেপালের পক্ষে উপেক্ষা করা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে কাঠমান্ডু উপত্যকায় হওয়া ভয়াবহ বন্যা ছিল নেপালের ইতিহাসের অন্যতম মারাত্মক নগর-বন্যা। বিভিন্ন মূল্যায়নে দেখা যায়, গত চার দশকের মধ্যে নেপালে ওই সময় সবচেয়ে ভারী বৃষ্টি হয়। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। বন্যায় ২৪৯ জন প্রাণ হারান, আহত হন ১৭৭ এবং বাস্তুচ্যুত হয় ১০ হাজারের বেশি পরিবার।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এ ঘটনা নেপালের পর্যটননির্ভর অর্থনীতির সামনে এক গভীর প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশটির পাহাড়গুলো কি দিন দিন পর্যটকদের জন্য আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে?
দুটি বড় বিমান দুর্ঘটনাও নেপালের পর্যটন খাতকে মারাত্মকভাবে নাড়া দিয়েছে।
২০২৩ সালের জানুয়ারিতে পোখারায় অবতরণের সময় ইয়েতি এয়ারলাইনসের একটি এটিআর-৭২ বিমান বিধ্বস্ত হয়। এ ঘটনায় ৬৮ জন যাত্রী ও ৪ ক্রুর সবাই নিহত হন। এরপর ২০২৪ সালের জুলাইয়ে কাঠমান্ডু বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়নের পরপরই শৌর্য এয়ারলাইনসের একটি বোম্বার্ডিয়ার সিআরজে-২০০ উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হয়ে ১৮ জন নিহত হন।
কোভিড-১৯ মহামারির নজিরবিহীন ধাক্কার রেশ কাটতে না কাটতেই এসব দুর্যোগ দেখা দেয়। মহামারি নেপালের পর্যটনকে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় ঠেলে দিয়েছিল।
এ খাত যখনই একটু ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছিল, তখনই রাজনৈতিক অস্থিরতা শুরু হয়।
এখন রাসুয়ার দুর্যোগ আরেক দফা অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এ বিপর্যয় সরাসরি নেপালের পাহাড়ি পরিবেশের নাজুক অবস্থার সঙ্গে জড়িত।
বিশেষজ্ঞরা নেপালের ৪২টি হিমবাহ হ্রদকে অত্যন্ত বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। হিমালয়ের তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং দ্রুত বরফ গলার কারণে এগুলো যেকোনো সময় ফেটে পড়তে পারে। এসব হ্রদের বেশির ভাগই বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন এলাকা এভারেস্ট অঞ্চলে।
বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে হিমবাহ দ্রুত গলছে এবং হিমালয়ের হ্রদগুলোর আয়তন বাড়ছে। হ্রদগুলো বড় হতে থাকায় এদের দুর্বল প্রাকৃতিক বাঁধগুলো ভেঙে পড়তে পারে। ফলে বিপুল পরিমাণ পানি ও পাথর-কাদা নিচের দিকে নেমে আসতে পারে। এর পরিণতি হতে পারে অত্যন্ত মারাত্মক। এতে ভেসে যেতে পারে লোকালয়, রাস্তাঘাট, সেতু, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ও পর্যটন অবকাঠামো।
বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলছেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে হিমবাহ দ্রুত গলছে এবং হিমালয়ের হ্রদগুলোর আয়তন বাড়ছে। হ্রদগুলো বড় হতে থাকায় এদের দুর্বল প্রাকৃতিক বাঁধগুলো ভেঙে পড়তে পারে। ফলে বিপুল পরিমাণ পানি ও পাথর-কাদা নিচের দিকে নেমে আসতে পারে। এর পরিণতি হতে পারে অত্যন্ত মারাত্মক। এতে ভেসে যেতে পারে লোকালয়, রাস্তাঘাট, সেতু, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ও পর্যটন অবকাঠামো।
বৈশ্বিক কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণে নেপালের অবদান শূন্য দশমিক ১ শতাংশেরও কম। তা সত্ত্বেও নাজুক পাহাড়ি প্রতিবেশ ব্যবস্থার কারণে দেশটি জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে।
পরিবেশবিশেষজ্ঞ বিজয় কুমার সিং বলেন, ‘উচ্চ জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর সহায়তার জন্য আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল থেকে অর্থ পাওয়ার ক্ষেত্রে এ দুর্যোগ একটি জোরাল প্রমাণ হিসেবে কাজ করবে। এ তহবিল নেপালের পর্যটনকে টেকসই করতে পারে। তা না হলে এমন ঘটনা বারবার ঘটবে এবং মানুষ মরতেই থাকবে।’
বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক বারবার সতর্ক করে বলেছে, তীব্র জলবায়ু ঝুঁকি নেপালের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম বড় বাধা। কারণ, বিশেষ করে পর্যটন ও কৃষিতে এই ঝুঁকির মারাত্মক প্রভাব পড়ছে।
২০২৩ সালের জানুয়ারিতে পোখারায় অবতরণের সময় ইয়েতি এয়ারলাইনসের একটি এটিআর-৭২ বিমান বিধ্বস্ত হয়। এ ঘটনায় ৬৮ জন যাত্রী ও ৪ ক্রুর সবাই নিহত হন। এরপর ২০২৪ সালের জুলাইয়ে কাঠমান্ডু বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়নের পরপরই শৌর্য এয়ারলাইনসের একটি বোম্বার্ডিয়ার সিআরজে-২০০ উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হয়ে ১৮ জন নিহত হন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন নেপালের সবচেয়ে বড় পর্যটন সম্পদ—পাহাড় ও পর্বতের ঝুঁকির ধরন পুরোপুরি বদলে দিচ্ছে।
সাবেক পরিবেশমন্ত্রী গণেশ শাহ বলেন, পাহাড়ি পর্যটনকে রক্ষা এবং দুর্যোগ প্রস্তুতি জোরদার করতে নেপালকে আরও নিখুঁত প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করতে হবে।
গণেশ শাহ বলেন, ‘সারা বিশ্বের নতুন প্রজন্ম রোমাঞ্চকর ভ্রমণ ভালোবাসে। ভবিষ্যতে তাদের কাছে নেপাল বড় একটি আকর্ষণ হতে পারে। তাই অন্তত পাহাড়ি অঞ্চলের জন্য স্যাটেলাইট যোগাযোগব্যবস্থা থাকা দরকার, যা দ্রুত উদ্ধার তৎপরতায় সাহায্য করবে।’
পর্যটন খাতকে টেকসই করতে নেপালের আরও উন্নত ও নিখুঁত প্রযুক্তি প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন গণেশ শাহ।
রসুয়ার এ দুর্যোগ পাহাড়ি পর্যটনে নেপালের আন্তর্জাতিক গুরুত্বকেও সামনে এনেছে।
গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত নেপাল পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, তিব্বতগামী ৬৪৪ জন কৈলাস মানস সরোবরের তীর্থযাত্রী নিখোঁজ ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ১২৭ জন নেপালি। নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে সবচেয়ে বড় দলটি ভারতীয়দের, ১৭৮ জন। এ ছাড়া ৫৫ জন মার্কিন, ৫৩ ইউক্রেনীয়, ৫১ মালয়েশীয়, ৩৫ অস্ট্রেলীয় ও ৩৩ জন ব্রিটিশ নাগরিক রয়েছেন।
সব বিপদের মধ্যেও একটা আশার দিক হলো, নেপালের সংকট কাটিয়ে দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোর অসাধারণ ক্ষমতা রয়েছে।দীপক রাজ যোশী, নেপালের ট্যুরিজম বোর্ডের সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা
এ পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে দেয়, তিব্বত যাওয়ার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক পর্যটকেরা কতটা নেপালের রুটের ওপর নির্ভর করেন।
ট্যুর অপারেটররা জানান, এ বছর কৈলাস মানস সরোবরযাত্রার চাহিদা ছিল অনেক বেশি। ৪০ হাজারের বেশি মানুষের চাহিদা থাকলেও চীন সরকার নেপাল হয়ে যাওয়া ভারতীয় তীর্থযাত্রীর সংখ্যা সর্বোচ্চ ২৪ হাজারে বেঁধে দেয়।
গত মে মাসের মাঝামাঝি আনুষ্ঠানিকভাবে তীর্থযাত্রা শুরু হয়। এতে হিলসা, সিমিকোট এবং নেপালগঞ্জের মতো প্রধান ট্রানজিট পয়েন্টগুলো পর্যটকদের পদচারণে মুখর হয়ে ওঠে।
টাচ কৈলাস ট্রাভেল অ্যান্ড ট্রেকসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বসু কুমার অধিকারী জানান, তিব্বতি পঞ্জিকা অনুযায়ী ‘ইয়ার অব দ্য হর্স’ শুরু হওয়ায় তীর্থযাত্রার চাহিদা ব্যাপক বেড়েছে। ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ এ বর্ষ শুরু হয়েছে।
তিব্বতি জ্যোতিষ ও ধর্মীয় বিশ্বাস অনুসারে, ‘ইয়ার অব দ্য হর্স’ তীর্থযাত্রার জন্য অত্যন্ত শুভ। ভক্তদের বিশ্বাস, এ বছর কৈলাস পর্বতের চারপাশের ৫২ কিলোমিটার এলাকা একবার প্রদক্ষিণ করলে সাধারণ বছরের ১২ বা ১৩ বার প্রদক্ষিণের সমান পুণ্য মেলে।
তিন দিনব্যাপী এ কৈলাস কোরা বা পরিক্রমায় তীর্থযাত্রীদের পৃথিবীর অন্যতম দুর্গম ও উঁচু পাহাড়ি পথ পাড়ি দিতে হয়।
কূটনৈতিক উত্তেজনার কারণে পাঁচ বছর বন্ধ থাকার পর বেইজিং ও নয়াদিল্লির সমঝোতায় গত বছর ভারতীয়দের জন্য এ যাত্রা আবার শুরু হয়েছে।
ভারত নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বিরোধপূর্ণ লিপুলেখ পাস এবং সিকিমের নাথু লা পাস দিয়ে এ যাত্রার আয়োজন করে। তবে প্রতিটি রুটে তারা বছরে তীর্থযাত্রীর সংখ্যা ৫০০ থেকে ১০০০-এ সীমাবদ্ধ রাখে।
ফলে বেশির ভাগ ভারতীয় তীর্থযাত্রী বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় নেপাল হয়ে ভ্রমণ করাকেই সুবিধাজনক মনে করেন।
নেপালের ট্রাভেল এজেন্সিগুলোর জন্য এ তীর্থযাত্রা অত্যন্ত লাভজনক একটি ব্যবসা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
১০ দিনের রাসুয়াগড়ি-কেরুং প্যাকেজে পর্যটকপ্রতি খরচ হয় প্রায় ১ হাজার ৭০০ মার্কিন ডলার।
ট্যুর অপারেটররা কৈলাস মানস সরোবরকে তাঁদের সবচেয়ে লাভজনক প্যাকেজ হিসেবে বিবেচনা করেন। বার্ষিক এ তীর্থযাত্রার মৌসুম হোটেল, এয়ারলাইন, রেস্তোরাঁ, গাইড ও কুলিদের ভালো উপার্জনের সুযোগ দেয়। একই সঙ্গে সরকারের রাজস্ব আয়ও বাড়ে।
মৌসুম চলার সময় নেপালগঞ্জের হোটেলগুলোয় বুকিং অনেক বেড়ে যায়। উদ্যোক্তারা জানান, ভারতীয় পর্যটক বেড়ে যাওয়ায় বাঁকে এবং উত্তরের সিমকোটের মতো এলাকায় আবাসন খাতে বিনিয়োগ বেড়েছে।
কিন্তু বুধবারের এ দুর্যোগ এমন সম্ভাবনাকে আকস্মিকভাবে উল্টে দিতে পারে। নেপাল ট্যুরিজম বোর্ডের সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা দীপক রাজ যোশী বলেন, ‘দুর্যোগের কারণে এই খাত ক্ষতির মুখে পড়বে। এর রেশ অন্তত ছয় থেকে সাত মাস স্থায়ী হতে পারে।’
এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘নেপালের বাকি অংশ নিরাপদ ও অক্ষত রয়েছে—বিশ্বের কাছে এ বার্তা পৌঁছে দিতে আমাদের একটি বিশেষ পর্যটন পুনরুদ্ধার টিম প্রয়োজন।’
সংকট কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে নেপালের পর্যটন খাত অতীতে বারবার প্রমাণ দিয়েছে।
তিন দশক আগে রাজনৈতিক অস্থিরতাই ছিল পর্যটন খাতে সম্ভবত সবচেয়ে বড় হুমকি। যোশী বলেন, ‘তিন দশক আগের দিকে তাকালে দেখা যায়, নেপালের পর্যটন সব সময়ই রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলায় জর্জরিত ছিল।’
বিশেষজ্ঞরা নেপালের ৪২টি হিমবাহ হ্রদকে অত্যন্ত বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। হিমালয়ের তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং দ্রুত বরফ গলার কারণে এগুলো যেকোনো সময় ফেটে পড়তে পারে। এসব হ্রদের বেশির ভাগই বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন এলাকা এভারেস্ট অঞ্চলে।
১৯৯৬ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত চলা মাওবাদী বিদ্রোহে ১৭ হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারান এবং সারা দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থমকে যায়। ১৯৯৯ সালে ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনসের বিমান ছিনতাই এবং ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর বৈশ্বিক ভ্রমণ কমে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়ে নেপালে। এ ছাড়া ২০০১ সালের রাজপরিবার হত্যাকাণ্ড রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাকে চরম রূপ দেয়।
২০০৬ সালের শান্তিচুক্তির পরও ঘন ঘন ধর্মঘট ও বন্ধ্ ব্যবসা-বাণিজ্যকে ব্যাহত করে, যা পর্যটক ও বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করেছিল।
এরপর শুরু হয় ভয়াবহ বিদ্যুৎ–সংকট। একটা সময় দিনে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের মুখে পড়তে হয়েছিল।
২০১৫ সালের ভূমিকম্প আরেকটি বড় আঘাত হয়ে আসে। এতে প্রায় ৯ হাজার মানুষ মারা যান এবং শত শত কোটি ডলারের ক্ষতি হয়। পর্যটন অবকাঠামো ও প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদগুলো মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কমে যায় বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা।
এত কিছুর পরও পর্যটনশিল্প ঘুরে দাঁড়িয়েছে।
যোশী বলেন, সব বিপদের মধ্যেও আশার দিক হলো, ‘নেপালের সংকট কাটিয়ে দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোর অসাধারণ ক্ষমতা রয়েছে।’
কোভিড মহামারি সেই সহনশীলতাকে আবারও বড় পরীক্ষার মুখে ফেলে। প্রায় দুই বছর আন্তর্জাতিক পর্যটন পুরোপুরি বন্ধ ছিল। এর পর থেকে ধীরে ধীরে পর্যটক বাড়তে শুরু করে।
তবে বুধবারের দুর্যোগটি ভিন্ন প্রকৃতির। এটি এমন এক বিপদের দিকে ইঙ্গিত করছে, যা শুধু রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বা বিপণন প্রচারণার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব নয়।
নেপাল মাউন্টেনিয়ারিং অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক রাজেন্দ্র লামা বলেন, মহামারি কাটিয়ে পর্যটনশিল্প যখন মাত্রই ছন্দে ফিরছিল, তখন এ দুর্যোগ বড় আঘাত হয়ে এল।
ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম কাউন্সিলের হিসাব অনুযায়ী, নেপালের জিডিপিতে ভ্রমণ ও পর্যটনের অবদান ৬ দশমিক ৬ শতাংশ। দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষের আয়ের প্রধান উৎসও এটি, যেখানে বিকল্প আয়ের সুযোগ নেই বললেই চলে।
এ অতিনির্ভরশীলতাই পর্যটন খাতকে বিশেষ করে দুর্যোগের ঝুঁকিতে ফেলে দেয়।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ সড়ক, সেতু, বিমানবন্দর ও হোটেল ধ্বংস করে; পণ্য সরবরাহ বন্ধ করে দেয় এবং বুকিং বাতিলের মাধ্যমে কোনো এলাকার নিরাপত্তার সুনাম নষ্ট করে। তবে রাসুয়ার দুর্যোগ এ বার্তাই দিচ্ছে, পর্যটননীতি থেকে দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতিকে আর আলাদা করে দেখার কোনো সুযোগ নেই।
নেপালের জন্য চ্যালেঞ্জ এখন আর শুধু বেশি পর্যটক টানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। একটি চ্যালেঞ্জ হলো, যে পাহাড়গুলো পর্যটকদের আকর্ষণ করে, সেগুলো ভ্রমণের জন্য নিরাপদ রাখা।
এ জন্য আধুনিক আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা, মজবুত অবকাঠামো, নির্ভরযোগ্য যোগাযোগব্যবস্থা, স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণ এবং দুর্গম এলাকায় দ্রুত উদ্ধার তৎপরতার সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। একই সঙ্গে প্রধান পর্যটন গন্তব্যগুলোর চারপাশে হিমবাহ হ্রদসহ জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যান্য ঝুঁকিও নিখুঁতভাবে নিরূপণ করা প্রয়োজন।
নেপালের পর্যটনশিল্প অতীতে রাজনৈতিক অস্থিরতা, সহিংসতা, বিমান দুর্ঘটনা, ভূমিকম্প, মহামারি ও বিক্ষোভ মোকাবিলা করে টিকে থেকেছে।
কিন্তু হিমালয়ের উষ্ণতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে নেপাল এখন এমন এক যুগে প্রবেশ করছে, যেখানে খোদ প্রকৃতিই পর্যটনের সামনে সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
পরিবেশবিশেষজ্ঞ বিজয় কুমার সিং বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তন সবকিছুকে বদলে দিচ্ছে, আর নেপালের পক্ষে একে উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই।’
{সঙ্গম প্রসাই নেপালের দৈনিক ‘দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট’-এর বাণিজ্যবিষয়ক সম্পাদক। তিনি মূলত পর্যটন, কৃষি, পর্বতারোহণ, বিমান পরিবহন, অবকাঠামো এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক বিষয় নিয়ে কাজ করেন। প্রতিবেদনটি অনুবাদ করেছেন শেখ নিয়ামত উল্লাহ}