
বাংলায় ‘বাঁশ দেওয়ার’ অর্থ কাউকে বিপদে ফেলা, ক্ষতি করা, ঠকানো বা কোনো কাজে বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি করা। আজ কিন্তু বিশ্ব বাঁশ দিবস। ভাবছেন এ আবার কেমন দিবস? এটা কি অন্যকে বাঁশ দেওয়ার দিন? অথবা ভাবছেন রোজই তো কোনো না কোনোভাবে বাঁশ খাচ্ছি। আজ কি তবে নতুনভাবে বাঁশ খাওয়ার দিন?
আসলে ২০১০ সাল থেকে প্রতিবছর ১৮ সেপ্টেম্বর পালন করা হচ্ছে এই দিবস। বাংলায় বাঁশ দিবসের অর্থ নেতিবাচক হলেও চীনা সংস্কৃতিতে বাঁশ কেবল একটি গাছ বা উদ্ভিদ নয়। এটি ধৈর্য, শক্তি, ভদ্রতা এবং নৈতিকতার এক গভীর প্রতীক।
বাঁশ দিবসের সঙ্গে অবশ্য এর কোনোটাই যুক্ত নয়। এ হলো আমাদের খুব পরিচিত বাঁশ নিয়ে দিবস। গ্রামে গিয়ে যে বাঁশ আমরা দেখি পথের ধারে, জলের ধারে, ঝোপঝাড়ে। আর শহরে দেখি দোকানে, ভ্যানে। সারা বিশ্বে বাঁশ নিয়ে সচেতনতা তৈরিই এই দিবসের উদ্দেশ্য। সত্যিই তো কী হয় না বাঁশ দিয়ে। কুটিরশিল্প, নির্মাণকাজ, বাদ্যযন্ত্র এমনকি খাবার হিসেবেও বাঁশ কাজে লাগে।
বাঁশ বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন গ্রহণ করে এবং তার দেহে তা জমা রাখে। কিন্তু বাঁশ কেটে পুড়িয়ে ফেললে সেই কার্বন আবার বায়ুমণ্ডলে ফিরে যেতে পারে।সুমন দত্ত, গবেষক
‘ওয়ার্ল্ড ব্যাম্বু অর্গানাইজেশন (ডব্লিউবিও)’ বাঁশের উপকারিতা ভালোভাবে নজরে আনতেই দিবসটি পালন করছে। ২০২৬ সালের দিবসের বার্তায় ডব্লিউবিও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, পরিবেশ পুনরুদ্ধার ও টেকসই উন্নয়নের কৌশলগত সম্পদ হিসেবে বাঁশ বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে।
যেভাবে শুরু হলো দিবসটি
থাইল্যান্ডের ব্যাংককে ২০০৯ সালে অনুষ্ঠিত অষ্টম ওয়ার্ল্ড ব্যাম্বু কংগ্রেস (ডব্লিউবিসি) থেকে বিশ্ব বাঁশ দিবসের সূচনা হয়। ওই কংগ্রেসের আয়োজনে দেশটির রয়্যাল ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট সহায়তা করেছিল।
বিশ্বজুড়ে গবেষক, উদ্যোক্তা ও বিশেষজ্ঞদের প্রধান বৈশ্বিক সম্মেলনই হলো ডব্লিউবিসি। ক্যারিবীয় সাগরের যুক্তরাষ্ট্রের স্বশাসিত অঞ্চল পুয়ের্তো রিকোতে ১৯৮৪ সালে বাঁশ কংগ্রেসের প্রথম আসর বসেছিল।
থাইল্যান্ডের ব্যাংককে ২০০৯ সালে অনুষ্ঠিত অষ্টম বিশ্ব বাঁশ কংগ্রেস (ডব্লিউবিসি) থেকে বিশ্ব বাঁশ দিবসের সূচনা হয়।
জাপানের মিনামাতায় ১৯৯২ সালে অনুষ্ঠিত ডব্লিউবিসির তৃতীয় আসরে ইন্টারন্যাশনাল ব্যাম্বু অ্যাসোসিয়েশন (আইবিএ) প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০০৪ সালে ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ আসরে আইবিএকে ডব্লিউবিওতে রূপান্তর করা হয়। পরের বছর ২০০৫ সালে, ডব্লিউবিও আইনগতভাবে একটি সংগঠন হিসেবে যাত্রা শুরু করে।
বিশ্ব বাঁশ দিবস জাতিসংঘ ঘোষিত কোনো আন্তর্জাতিক দিবস নয়। এটি বিশ্ব বাঁশ সংস্থার উদ্যোগে পালিত একটি বৈশ্বিক সচেতনতামূলক দিবস। বিভিন্ন দেশে বাঁশ রোপণ, কর্মশালা, প্রদর্শনী, গবেষণা ও স্থানীয় পর্যায়ের নানা আয়োজনের মাধ্যমে দিনটি পালিত হয়।
২০২৬ সালে কী লক্ষ্য
বিশ্ব বাঁশ দিবসের এবারের বার্তা ব্যাম্বু বিয়ন্ড বর্ডারস (সীমানা ছাড়িয়ে বাঁশ)। শুধু বেশি করে বাঁশগাছ লাগানোই নয়, পরিবেশের স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শিল্পায়নে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। গ্রাম থেকে শহর, কৃষিজমি থেকে কারখানা, এমনকি আধুনিক স্থাপত্য পর্যন্ত বাঁশকে সম্পদ হিসেবে দেখানো হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশের অবক্ষয় ও টেকসই উন্নয়নের প্রশ্নে বাঁশ নতুন করে আলোচনায় আসছে। বাঁশের শিকড় মাটির নিচে ঘন জালের কাঠামো তৈরি করে। ২০২৪ সালে প্রকাশিত ‘মেরিটস অব ব্যাম্বু ইউটিলাইজেশন ইন আর্থ প্রিজারভেশন, ওয়াটার অ্যান্ড ওয়েস্টওয়াটার ট্রিটমেন্ট’ শিরোনামের এক গবেষণায় বলা হয়, এই আঁশযুক্ত জাল মাটির ক্ষয় কমাতে ও গুণমানের পতন ঠেকাতে সহায়তা করতে পারে। একই সঙ্গে শিকড়ের এই জাল দিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়ার সময় ক্ষতিকর উপাদান আটকে যেতে পারে। তবে বাঁশের প্রজাতি, পরিবেশ ও ব্যবস্থাপনার ধরন অনুযায়ী এর প্রভাব ভিন্ন হতে পারে।
অনেকে বেশি করে বাঁশ লাগিয়ে কার্বন সংরক্ষণ করার জন্য পরামর্শ দেন। তবে এ ক্ষেত্রে কিছুটা সতর্ক থাকার প্রয়োজন আছে। ২০২৫ সালে এনভায়রনমেন্টাল রিভিউজ সাময়িকীতে প্রকাশিত সুমন দত্ত ও তাঁর সহলেখকদের ‘ব্যাম্বু ফর গ্লোবাল সাসটেইনেবিলিটি: আ সিস্টেমেটিক রিভিউ অব ইটস এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড ইকোলজিক্যাল ইমপ্লিকেশনস, ক্লাইমেট অ্যাকশন, অ্যান্ড বায়োডাইভারসিটি কন্ট্রিবিউশনস’ শিরোনামের গবেষণা প্রতিবেদনে এ ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে। বলা হয়েছে, বাঁশ বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন নেয় এবং জমা রাখে। কিন্তু বাঁশ কেটে পুড়িয়ে ফেললে সেই কার্বন আবার বায়ুমণ্ডলে ফিরে যেতে পারে। ফলে বাঁশ জলবায়ুর জন্য কতটা উপকারী, তা শুধু কত বাঁশ লাগানো হলো তার ওপর নির্ভর করে না; বাঁশ কীভাবে উৎপাদন, সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাত ও ব্যবহার করা হচ্ছে সেটিও তদারক করা দরকার।
সুমন দত্ত ও তাঁর সহলেখকেরা জানান, জলবায়ু পরিবর্তনে কাজে লাগাতে বাঁশ নিয়ে আরও গবেষণা দরকার।
বাঁশের নতুন অর্থনীতি
বাঁশের অর্থনীতি কেবল কুটিরশিল্পে সীমাবদ্ধ নয়। ডব্লিউবিওর ২০২৬ সালের বার্তায় বাঁশের সম্ভাবনার ক্ষেত্র হিসেবে নির্মাণ, আসবাব, প্রকৌশলজাত পণ্য, বস্ত্র, কাগজ, খাদ্য ও জ্বালানির পাশাপাশি নতুন ধরনের জৈবভিত্তিক প্রযুক্তির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
বাঁশের কাঠামোগত ব্যবহার নিয়ে বর্তমানে বিশ্বজুড়ে গবেষণা ও পরীক্ষা চলছে। তবে দীর্ঘস্থায়ী ও নিরাপদ নির্মাণের জন্য বাঁশ শুকানো, সংরক্ষণ, সংযোগব্যবস্থা, অগ্নিনিরাপত্তা ও গুণগত মান নিশ্চিত করা জরুরি। এ জন্য প্রকৌশলগত উন্নয়ন ও মাননিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন।
বাংলাদেশেও বাঁশকে কাঠের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার নিয়ে কাজ হয়েছে। বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) ২০০৫–২০১৫ সালের একটি গবেষণায় বাঁশের কম্পোজিট দিয়ে আসবাব তৈরির প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা হয়। পরবর্তী সময়ে ২০১৫–২০২০ সালের গবেষণায় এই প্রযুক্তির নকশা উন্নয়ন ও প্রসারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
উৎপাদকেরা লাভবান হচ্ছেন কি
ডব্লিউবিও বলছে, বাঁশের প্রতিটি পণ্যের পেছনে কৃষক, কারুশিল্পী, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী, উদ্যোক্তা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর শ্রম রয়েছে। তাই বাঁশভিত্তিক অর্থনীতিতে স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ ও ন্যায্য সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি।
ভিয়েতনামে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) একটি প্রকল্পে বাঁশচাষি নারীরা সমবায়ের মাধ্যমে উৎপাদন ব্যয় ভাগাভাগি, পণ্য বিক্রি ও প্রশিক্ষণের সুযোগ পেয়েছেন। সেখানে বাঁশ স্থানীয় মানুষের আয়ের উৎস হওয়ার পাশাপাশি ভূমি পুনরুদ্ধারেও ভূমিকা রাখছে।
এর মানে দাঁড়াচ্ছে, শুধু কত টন বাঁশ উৎপাদিত হবে, তার ওপর উদ্ভিদটির ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে না। কে বাঁশ উৎপাদন করবে, কে প্রক্রিয়াজাত করবে, কে পণ্য তৈরি করবে এবং এই পুরো প্রক্রিয়ায় কে কতটা লাভ বা সুবিধা পাবে, এসব প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
বাংলাদেশে বাঁশ
বাংলাদেশে বাঁশের ব্যবহার বহু পুরোনো। ঘরবাড়ি, বেড়া, সাঁকো, কৃষিকাজের সরঞ্জাম, মাছ ধরার উপকরণ, ঝুড়ি, কুলা, ডালা ও নানা কারুশিল্পে বাঁশের ব্যবহার রয়েছে। এই ঐতিহ্যকে আধুনিক প্রযুক্তি ও বাজারের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে বাঁশভিত্তিক অর্থনীতির নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউট বাঁশ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছে। সংস্থাটির নানা গবেষণায় দেশে বিভিন্ন প্রজাতির বাঁশ সংগ্রহ, সংরক্ষণ, চাষ ও ব্যবহার নিয়ে কাজ হয়েছে। চট্টগ্রামের ষোলশহরে বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই) ক্যাম্পাসে ৩৬ প্রজাতির বাঁশ সংরক্ষিত আছে।
বাংলাদেশে বাঁশের নতুন ব্যবহার নিয়েও গবেষণা হয়েছে। বাঁশের তৈরি কম্পোজিট বোর্ড ও আসবাবের ক্ষেত্রে বিএফআরআইয়ের গবেষণায় কাঠের বিকল্প তৈরির সম্ভাবনা দেখা গেছে।
তবে বাঁশ নিয়ে আশঙ্কাও আছে। ২০১৮ সালের হিউম্যানিটারিয়ান ব্যাম্বু প্রজেক্টের এক প্রতিবেদনে দেশে বাঁশের সরবরাহ কমে যাওয়ার সঙ্গে জমি পরিষ্কার, বাঁশের স্থানীয় মূল্য কমে যাওয়া, ব্যাপকভাবে ফুল ধরা রোগের মতো কারণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্মাণকাজসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাঁশের এখনো ভালো চাহিদা রয়েছে। এই দুই বিপরীতমুখী পরিস্থিতির কারণে, বাঁশের ব্যবহার বাড়াতে হলে শুধু বাজারের চাহিদা নয়, টেকসই উৎপাদন ও প্রজাতি সংরক্ষণেও গুরুত্ব দিতে হবে।
তাই আসুন বাঁশ দিবসে শিখি কীভাবে বাঁশ সংরক্ষণ করা যায়। বাঁশের টেকসই ব্যবহার করা যায়।
তথ্যসূত্র: ওয়ার্ল্ড ব্যাম্বু অর্গানাইজেশন (ডব্লিউবিও), ‘ওয়ার্ল্ড ব্যাম্বু ডে ২০২৬’; ওয়ার্ল্ডব্যাম্বুডটনেট; বাংলাদেশ ফরেস্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই), ‘অ্যানুয়াল রিসার্চ প্রগ্রেস ২০১৫–২০১৬’; ‘বাংলাদেশ জার্নাল অব ফরেস্ট সায়েন্স’, ‘ব্যাম্বু ম্যাট ওভারলেইড পার্টিকেলবোর্ড…’; এফএও, ‘ব্যাম্বু ফর গ্লোবাল সাসটেইনেবিলিটি…’, ২০২৫; ‘ব্যাম্বু-বেজড লাইভলিহুডস এমপাওয়ার ইন্ডিজেনাস উইমেন ইন ভিয়েতনাম’ ইত্যাদি অবলম্বনে।