
করোনাভাইরাস মহামারি সারা বিশ্বকে থমকে দিয়েছে বললেও কম বলা হবে। শুধু স্বাস্থ্য খাত নয়, এমন কোনো খাত নেই যার ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি। মহামারিতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির দিকে তাকালেই বিষয়টি বোঝা যায়। এই প্রেক্ষাপটে করোনার টিকা বিরাট আশা নিয়ে হাজির হয়েছে। গোটা বিশ্বের জন্য যা আশার, তা এই টিকা প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বড় আয়েরও সম্ভাবনা। শুধু করোনার টিকা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের দুই প্রতিষ্ঠান ফাইজার ও মর্ডার্না শুধু আগামী বছরেই ৩ হাজার ২০০ কোটি ডলার আয় করবে বলে জানানো হয়েছে ওয়াল স্ট্রিটের এক বিশ্লেষণে। তবে প্রশ্ন উঠেছে এই ক্রান্তিকালে প্রাণ বাঁচানো টিকা নিয়ে এত আয় করার নৈতিক ভিত্তি নিয়েও।
ওই বিশ্লেষণের বরাত দিয়ে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, করোনার টিকা থেকে শুধু আগামী বছরই ফাইজার ও মর্ডার্না ৩ হাজার ২০০ কোটি ডলার আয় করবে। এ ক্ষেত্রে এমন একটি মহামারি মোকাবিলায় অবদান রাখার কারণে এই দুই প্রতিষ্ঠানের হওয়া সুনাম ও এর অর্থমূল্যকে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। এ ক্ষেত্রে অনুপাত বিবেচনায় সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে মর্ডার্না। এই মহামারির আগে এই প্রতিষ্ঠানটির দিকে নজর খুব কমই ছিল। কিন্তু এখন করোনা টিকা তৈরির মধ্য দিয়ে এটি সামনের সারিতে চলে এসেছে। ১৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠেয় পরামর্শক সভায় এর টিকা অনুমোদন পেলে প্রতিষ্ঠানটি সব দিক থেকেই অনেক এগিয়ে যাবে।
মার্কিন বহুজাতিক বিনিয়োগ ব্যাংক মরগ্যান স্ট্যানলির তথ্যমতে, করোনা টিকা থেকে আগামী বছর ১ হাজার ৯০০ কোটি ডলার আয়ের প্রাক্কলন করেছে ফাইজার। ২০২০ সালে এই খাত থেকে প্রতিষ্ঠানটির সম্ভাব্য আয় ধরা হয়েছে ৯৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার।
অবশ্য ফাইজারের এই আয় করোনা টিকা তৈরিতে তাদের অংশীদার জার্মান প্রতিষ্ঠান বায়োএনটেকের সঙ্গে ভাগ হবে।
যুক্তরাষ্ট্রে এরই মধ্যে ফাইজারের টিকা জরুরি ব্যবহারের অনুমোদন পেয়েছে। মার্কিন ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) ও সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) এরই মধ্যে অনুমোদন দিয়েছে। আজ রোববার এই টিকা যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছানোর কাজ এরই মধ্যে শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। সব ঠিক থাকলে আগামীকাল সোমবার থেকে দেশটিতে করোনা টিকার প্রয়োগ শুরু হওয়ার কথা।
এর আগে যুক্তরাজ্যে প্রতিষ্ঠানটির তৈরি টাকার প্রয়োগ শুরু হয়। মেক্সিকোসহ আরও কয়েকটি দেশ এই টিকার জরুরি প্রয়োগের অনুমোদন এরই মধ্যে দিয়েছে। সব মিলিয়ে এই টিকা ফাইজারের জন্য এক বিরাট ব্যবসায়িক সম্ভাবনা নিয়ে এসেছে।
মরগ্যান স্ট্যানলির করা প্রাক্কলন অনুযায়ী, করোনা টিকা থেকে আগামী বছর ১ হাজার ৯০০ কোটি ডলার আয়ের প্রাক্কলন করেছে ফাইজার। ২০২২ ও ২০২৩ সাল এই টিকা থেকেই ফাইজার আয় করবে আরও ৯৩০ কোটি ডলার। ২০২০ সালে এই টিকা খাত থেকে প্রতিষ্ঠানটির সম্ভাব্য আয় ধরা হয়েছে ৯৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার।
সিএনএন জানায়, করোনা টিকার প্রয়োগ শুধু আগামী বছরই হবে না। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে এই টিকা পৌঁছাবে, যাতে আরও সময় লাগবে। মরগ্যান স্ট্যানলির করা প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২২ ও ২০২৩ সাল এই টিকা থেকেই ফাইজার আয় করবে আরও ৯৩০ কোটি ডলার।
টিকা তৈরির ঘোষণার মধ্য দিয়েই পুঁজিবাজারে ফাইজারের শেয়ারের দাম বেড়েছে। চলতি বছরেই প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারদর ১২ শতাংশ বেড়েছে। এসঅ্যান্ডপি সূচকে এই বৃদ্ধির হার ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ। বড় প্রতিষ্ঠান না হলে এই বৃদ্ধির হার আরও অনেক বেশি হতো নিশ্চিতভাবেই। তাদের অংশীদার বায়োএনটেকের দিকে তাকালেই বিষয়টি বোঝা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারদর এরই মধ্যে ৩০০ শতাংশ বেড়েছে। প্রতিষ্ঠানটির অর্থমূল্য দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার কোটি ডলারে।
সিএনএন জানায়, সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী বছর শুধু করোনা টিকা থেকে ফাইজার বিপুল আয় করবে। গত বছর সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া নিউমোনিয়া টিকা থেকে প্রতিষ্ঠানটির আয় ছিল ৫৮০ কোটি ডলার।
এবার তাকানো যাক মর্ডার্নার দিকে। মরগ্যান স্ট্যানলির তথ্যমতে, গত বছর প্রতিষ্ঠানটি আয় করেছিল ৬ কোটি ডলার। কিন্তু করোনা টিকার অনুমোদনের আবেদন করার মধ্য দিয়েই এটি ৬ হাজার ২০০ কোটি ডলারের প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এর শেয়ারের দাম চলতি বছর ৭০০ শতাংশ বেড়েছে।
আরেক মার্কিন বহুজাতিক বিনিয়োগ ব্যাংক ও বাজার বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান গোল্ডম্যান স্যাকস জানাচ্ছে, শুধু আগামী বছরই মর্ডার্না করোনা টিকা থেকে ১ হাজার ৩২০ কোটি ডলার আয় করবে। আর মরগ্যান স্ট্যানলি বলছে, প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারদরের গতিপথ দেখে মনে হচ্ছে বিনিয়োগকারীরা আশা করছেন ২০২২ ও ২০২৩ সালে প্রতিষ্ঠানটি এক থেকে দেড় হাজার কোটি ডলার শুধু করোনা টিকা থেকেই আয় করবে।
মর্ডার্না গত বছর আয় করেছিল ৬ কোটি ডলার। কিন্তু করোনা টিকার অনুমোদনের আবেদন করার মধ্য দিয়েই এটি ৬ হাজার ২০০ কোটি ডলারের প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এর শেয়ারের দাম চলতি বছর ৭০০ শতাংশ বেড়েছে। শুধু আগামী বছরই করোনা টিকা থেকে ১ হাজার ৩২০ কোটি ডলার আয় করবে প্রতিষ্ঠানটি
কথা হলো মর্ডার্নার দিকে এত বিনিয়োগকারীর আগ্রহ কেন? উত্তর পেতে হলে মর্ডার্নার তেলি টিকাটির দিকে তাকাতে হবে। মর্ডার্নার টিকাটি মূলত এমআরএনএ-ভিত্তিক। জৈবপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একই ভিত্তিতে তৈরি আরও ওষুধ ও টিকা মর্ডার্না আগেই বাজারে এনেছিল। কিন্তু তা তেমন নজর কাড়তে পারেনি। এখন করোনা টিকা তৈরিতে তাদের সাফল্য বিগত সাফল্যগুলোকে সামনে নিয়ে আসছে। মানুষ আস্থা পাচ্ছে।
এ বিষয়ে মরগ্যান স্ট্যানলির বিশ্লেষক ম্যাথিউ হ্যারিসন সিএনএনকে বলেন, ‘মর্ডার্নার করোনাভাইরাসের টিকা এই বার্তা দিচ্ছে যে, তাদের এই প্রযুক্তি নিরাপদ ও কার্যকর। ফলে তাদের তৈরি অন্য ওষুধ ও টিকার ওপরও মানুষের আস্থা তৈরি হচ্ছে। আর এই আস্থার কারণেই বিনিয়োগকারীরা প্রতিষ্ঠানটির প্রতি বাড়তি মনোযোগ দিচ্ছেন।’
কথা হলো করোনার কারণে প্রতিষ্ঠানগুলোর আয়ে এই যে উল্লম্ফন, তা তারা কত দিন ধরে রাখতে পারবে? বাজার বিশ্লেষকেরা বলছেন, বিষয়টি নির্ভর করছে করোনামুক্ত থাকতে তাদের তৈরি টিকার ওপর মানুষকে কত দিন নির্ভর করতে হয় তার ওপর। এ ক্ষেত্রে যে প্রশ্নগুলো গুরুত্বপূর্ণ তা হলো—শরীরে এই টিকা কত দিন কার্যকর থাকবে? এর কার্যকারিতা ধরে রাখতে কত দিন পরপর এর বুস্টার নিতে হবে? আপাতত যে তথ্য মিলছে, তাতে অন্তত কয়েক বছর প্রতিষ্ঠানগুলো এই টিকা থেকে তাদের আয় অব্যাহত রাখতে পারবে।
এ ক্ষেত্রে অবধারিত যে প্রশ্নটি সামনে চলে আসে, তা হলো এমন ক্রান্তিকালে জীবন বাঁচানো ওষুধ থেকে এমন বিপুল আয় করাটা কতটা নৈতিক? যে মহামারিতে শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই এখন পর্যন্ত প্রায় ৩ লাখ মানুষ মারা গেছে, সেই মহামারির টিকা থেকে আয় করা নিয়ে প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই উঠছে। এই প্রশ্ন এই মুহূর্তে আরও জোরালোভাবে উঠছে কারণ, এরই মধ্যে করোনা টিকা নিয়ে কাজ করা জনসন অ্যান্ড জনসন ও অ্যাস্ট্রাজেনেকা প্রতিষ্ঠান দুটি এ থেকে মুনাফা করবে না বলে জানিয়েছে। তারা মহামারির সময়ে তাদের এই উদ্যোগকে অলাভজনক হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে আগেই।
এ বিষয়ে মার্কিন প্রগতিশীল সংগঠন অ্যাকাউন্টেবলের মুখপাত্র এলি জুপনিক সিএনএনকে বলেন, ‘এমন একটি পরিস্থিতিতে কোভিড-১৯ টিকা বিক্রি থেকে প্রতিষ্ঠানের মুনাফার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়াটা ফাইজার ও মর্ডার্নার মতো ওষুধ কোম্পানির জন্য কোনোভাবেই ঠিক নয়। এটি পুরোপুরি ভুল। কারণ, এই টিকা উৎপাদনের পেছনে মার্কিন জনগণের করের টাকার বড় ধরনের ভর্তুকি রয়েছে।’
এই বিতর্কের বিষয়ে ফাইজার ও মর্ডার্নার পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য চেয়েও পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে সিএনএন।
তবে এর আগে এ বিষয়ে দেওয়া এক বিবৃতিতে ফাইজার জানিয়েছিল, কোভিড-১৯ টিকা তৈরি ও এর উৎপাদনের যাবতীয় খরচ ফাইজার নিজে বহন করছে। শত শত কোটি ডলার তারা এ ক্ষেত্রে বিরাট ঝুঁকি নিয়ে বিনিয়োগ করেছে।
তবে এই ঝুঁকির বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। কারণ মার্কিন ফেডারেল সরকারের গৃহীত উদ্যোগ অপারেশন ওয়ার্প স্পিড থেকে তারা সরাসরি কোনো বিনিয়োগ না নিলেও ফেডারেল সরকার তাদের থেকে প্রথম ১০ কোটি ডোজ টিকা ১৯৫ কোটি ডলারে কেনার অঙ্গীকার করে রেখেছে। তবে এ ক্ষেত্রে এফডিএ অনুমোদন পাওয়ার শর্ত ছিল, যা এরই মধ্যে ফাইজার পেয়ে গেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শুরুতেই নিজেদের তৈরি টিকা সরবরাহের দারুণ সুযোগটি তারা পেয়ে গেছে।
আর মর্ডার্না তাদের গবেষণা ধাপেই মার্কিন সরকারি তহবিল থেকে ৯৫ কোটি ৫০ লাখ ডলারের অনুদান পেয়েছে। এ ছাড়া গত মে মাসে তারা পুঁজিবাজার থেকেও ১৩০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ সংগ্রহ করে। ফলে দুটি প্রতিষ্ঠানেরই টিকা থেকে হওয়া সম্ভাব্য আয় এবং এর নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।