ট্রাম্পের বিরাগভাজন এলিজাবেথ চেনি দলের নেতৃত্ব হারাচ্ছেন

যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান দলের অন্যতম শীর্ষ নেতা এলিজাবেথ চেনি
ছবি: এএফপি

যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান দলের অন্যতম শীর্ষ নেতা ও ওয়াইওমিং থেকে প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য এলিজাবেথ চেনি নেতৃত্ব হারাচ্ছেন। রিপাবলিকান কনফারেন্স চেয়ারপারসন এলিজাবেথ চেনি প্রতিনিধি পরিষদে দলের তৃতীয় উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা। তিনি সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনির মেয়ে।

সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মিথ্যাচারকে প্রত্যাখ্যান করায় চেনির ওপর খেপে আছেন ট্রাম্প ও অনেক রিপাবলিকান নেতা। ওই পদ থেকে চেনিকে সরিয়ে ট্রাম্পের আস্থাভাজন কংগ্রেস সদস্য এলিস স্টেফানিককে স্থলাভিষিক্ত করার সব আয়োজন সম্পন্ন করা নিয়ে আসা হয়েছে।

বর্তমান রিপাবলিকান দলের ওপর সাবেক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একচেটিয়া প্রভাব প্রতিষ্ঠিত করেছেন। রক্ষণশীলতা উসকে দিয়ে রিপাবলিকান দলকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে একদম ডান রক্ষণশীলতার দিকে। যারা নিজেদের রক্ষণশীল অবস্থান বজায় রেখেও ভারসাম্যের রাজনীতি করে যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রকে সমৃদ্ধ করে আসছিলেন, তাঁদের এখন দুর্দিন চলছে।

কংগ্রেসের রিপাবলিকান দলীয় সংখ্যালঘু নেতা কেভিন ম্যাককার্থি আনুষ্ঠানিকভাবে কংগ্রেস সদস্য এলিস স্টেফানিককে এলিজাবেথ চেনির স্থলাভিষিক্ত করার ঘোষণা দিয়েছেন। এলিস স্টেফানিক ট্রাম্পের শুধু একজন সমর্থকই নন, ২০২০ সালের নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে বলে ট্রাম্পের ভিত্তিহীন অভিযোগের তিনি একজন সরব প্রবক্তাও বটে।

এলিস স্টেফানিক

নিউইয়র্ক থেকে নির্বাচিত এলিস স্টেফানিককে এ পদের জন্য সমর্থন করেন কিনা—ফক্স নিউজের মারিয়া বার্টিরমোর এমন প্রশ্নের জবাবে কেভিন ম্যাককার্থি বলেন, ‘হ্যাঁ, আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে এবং তা শুরু করতে হবে নেতৃত্ব পর্যায় থেকে। আর সে জন্যই আমরা এই পদের জন্য ভোটাভুটি করব।’

ডোনাল্ড ট্রাম্প আগেই দলের নেতৃত্ব থেকে এলিজাবেথ চেনিকে বাদ দেওয়ার জন্য বলেছিলেন। এ নিয়ে তিনি তাঁর সমর্থক আইনপ্রণেতাদের চাপ দিয়ে আসছিলেন। নিউইয়র্কের মতো ডেমোক্র্যাট প্রধান রাজ্য থেকে নির্বাচিত এলিস স্টেফানিকের প্রশংসা করে ট্রাম্প বলেছেন, এমন নেতৃত্বই সবুজ রঙের রাজনৈতিক মাঠকে লাল রঙের মাঠে রূপান্তরের ক্ষমতা রাখে। তিনি এলিস স্টেফানিকের প্রতি তাঁর প্রকাশ্য সমর্থন ঘোষণা করেছেন।

এলিজাবেথ চেনি তাঁর পদে বহাল থাকছেন, নাকি বহিষ্কৃত হচ্ছেন—এই প্রশ্নের উত্তর অনেকটাই নির্ণয় করবে ট্রাম্প পরবর্তী রিপাবলিকান দল কোন দিকে মোড় নিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের রক্ষণশীলতাকেই ধারণ করেন এলিজাবেথ চেনি। তাঁকে পদে বহাল রাখার মাধ্যমে দলটি তার মূল ঐতিহ্যে ফিরে যাবে, নাকি ট্রাম্পের পদাঙ্ক অনুসরণ করবে—এ নিয়ে মার্কিন রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।

কংগ্রেসের রিপাবলিকান দলীয় নেতা কেভিন ম্যাককার্থি

ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময়েই কংগ্রেসে আসন হারিয়েছে রিপাবলিকান দল, সিনেটেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে এবং হোয়াইট হাউসের ক্ষমতাও হারিয়েছে। এখন ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়ার পর ডোনাল্ড ট্রাম্পই রিপাবলিকান দলের মূল নেতা হিসেবে আবির্ভাব করেছেন। দলের মধ্যে ৮০ শতাংশ সমর্থন এখন ট্রাম্পের প্রতি। ২০২২ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের সংখ্যাগরিষ্ঠতা রিপাবলিকান দলের নিশ্চিত করার জন্য ট্রাম্পের কাছেই এখন ধরনা দিতে হচ্ছে অন্যদের।

এলিজাবেথ চেনির সমালোচকেরা বলছেন, ২০২২ এর মধ্যবর্তী নির্বাচনের পূর্বে দলের ভেতরে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে নেতৃত্ব পরিবর্তনের এই পদক্ষেপটি নেওয়া দরকার। যদিও রিপাবলিকান দলের অনেকেই নীরবে এ বিষয়ে একমত যে, প্রেসিডেন্ট বাইডেন বৈধভাবেই নির্বাচিত হয়েছেন এবং ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটল হিলের সহিংস হামলা সংঘটিত হওয়ার পেছনে ট্রাম্পের উসকানি রয়েছে। তারপরও মিথ্যাচার এবং চরমপন্থা থেকে দলকে শুদ্ধিকরণের পরিবর্তে এখন প্রেসিডেন্ট বাইডেনের কর্মসূচির বিরোধিতা করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া বেশি জরুরি বলে মনে করছেন দলটির নেতারা।

কংগ্রেসের সংখ্যালঘু নেতা কেভিন ম্যাককার্থি গোপনে এলিস স্টেফানিকে সমর্থন দিয়ে আসছিলেন। এলিজাবেথ চেনির চেয়ে স্টেফানিক কম রক্ষণশীল হয়েও কেভিন ম্যাককার্থির সমর্থন পাওয়ার কারণ একটিই। আর তা হচ্ছে স্টেফানিক ট্রাম্পের ভক্ত। হাউস রিপাবলিকানদের দ্বিতীয় উচ্চপদস্থ নেতা লুইজিয়ানার প্রতিনিধি স্টিভ স্কালিসও এলিস স্টেফানিককে সমর্থন জানাচ্ছেন।

দলে এখন ট্রাম্পবিরোধী এবং ট্রাম্পপন্থী উভয় শিবিরকে স্বাগত জানাতে হবে। মতামত জরিপ দেখুন, একটি বিরাট অংশ এলিজাবেথ চেনির সঙ্গে রয়েছে। ২০২২ ও ২০২৪ এর নির্বাচনে জয়ী হতে হলে, সবাইকে এক সঙ্গে নিয়ে চলার বিকল্প নেই
বিল কাসেডি, লুইজিয়ানার রিপাবলিকান সিনেটর

রক্ষণশীল রিপাবলিকান স্টাডি কমিটির চেয়ারম্যান, ইন্ডিয়ানা থেকে নির্বাচিত কংগ্রেসম্যান জিম ব্যাংকস। যিনি এলিজাবেথ চেনির সঙ্গে মিলে আফগানিস্তানে সৈন্য প্রত্যাহারের বিরুদ্ধে কংগ্রেসে সোচ্চার ছিলেন। তিনিও ৯ মে ফক্স নিউজ সানডেতে এলিজাবেথ চেনির বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। সাংবাদিক ক্রিস ওয়ালেসকে জিম ব্যাংকস বলেন, ‘এ মুহূর্তে এটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, চেনি আর আমাদের কনফারেন্সের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিনিধিত্ব করেন না।’

ক্যাপিটল হিলে সহিংস হামলায় উসকানি দেওয়ার অভিযোগে গত ফেব্রুয়ারি মাসে ট্রাম্প অভিশংসন মামলার মুখোমুখি হন। এলিজাবেথ চেনি রিপাবলিকান সদস্য হয়েও অভিশংসনের পক্ষে ভোট দেন। এতে কংগ্রেসের কয়েকজন রিপাবলিকান সদস্য ক্ষুব্ধ হয়ে তখনই চেনিকে তাঁর দলীয় পদ থেকে বহিষ্কারের চেষ্টা করেছিলেন। এলিজাবেথ চেনি তখন সংখ্যালঘু নেতা কেভিন ম্যাককার্থির সমর্থন পেয়েছিলেন। দলীয় ককাসের ১৪৫ ভোট তাঁর পক্ষে এবং মাত্র ৬১ ভোট বিপক্ষে পড়েছিল।

অ্যাডাম কিনজিঙ্গার

এখন অবস্থা ভিন্ন। এরপরও এলিজাবেথ চেনির প্রতি বেশ কিছু রিপাবলিকানদের প্রকাশ্য সমর্থন রয়েছে। লুইজিয়ানার সিনেটর বিল কাসেডি নিজেও ট্রাম্পের দ্বিতীয় অভিশংসনের পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন। তিনি দলের জন্য ‘বৃহৎ ছাতা’ পন্থা অবলম্বনের পক্ষে। কাসেডি বলেন, দলে এখন ট্রাম্পবিরোধী এবং ট্রাম্পপন্থী উভয় শিবিরকে স্বাগত জানাতে হবে।

৯ মে এনবিসির মিট দ্য প্রেস অনুষ্ঠানে কাসেডি বলেন, ‘মতামত জরিপ দেখুন, একটি বিরাট অংশ এলিজাবেথ চেনির সঙ্গে রয়েছে। ২০২২ ও ২০২৪ এর নির্বাচনে জয়ী হতে হলে, সবাইকে এক সঙ্গে নিয়ে চলার বিকল্প নেই।’

ইলিনয়ের অ্যাডাম কিনজিঙ্গার যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেসের আরেক রিপাবলিকান সদস্য। তিনি কেভিন ম্যাককার্থির বিষয়ে বলেন, ক্যাপিটল হিল হামলার দায় ট্রাম্প এড়াতে পারেন না বলে আগে বললেও, ম্যাককার্থি পরে অন্যদের এ বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে বারণ করেন। কিনজিঙ্গার আরও বলেন, ‘আমি রক্ষণশীল। দলের আদর্শ রক্ষার্থে আমি লড়াই করে যাব। দলের প্রাথমিক বাছাই পর্বে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। শুধু নেতারাই নয়, কংগ্রেসের প্রত্যেক সদস্য, প্রতিটি রাজ্যের দলীয় সদস্যরা এবং সাধারণ সমর্থকেরা রায় দেবেন, আমরা কোনটা নিয়ে দাঁড়াতে চাই। মিথ্যার পক্ষে নাকি সত্যের পক্ষে?’