
সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে এনআরবি সিআইপি আয়োজিত দুই দিনব্যাপী গ্লোবাল বিজনেস সামিটে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে প্রবাসীদের দেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানানো হয়েছে।
গত ২৯ সেপ্টেম্বর সকালে শুরু হওয়া দুই দিনব্যাপী বিজনেস সামিটে বাংলাদেশ সরকারের দুই মন্ত্রী প্রবাসীদের দেশে বিনিয়োগের এই আহ্বান জানিয়েছেন।
বিজনেস সামিট উদ্বোধন করেন প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী ইমরান আহমদ। তিনি বলেন, দেশে বিনিয়োগের যে সুযোগ এখন বিরাজমান তা দ্রুত কঠিন হয়ে উঠতে পারে। যেসব সুযোগ দেওয়া হলে বিনিয়োগ নিশ্চিত হয়, সেসব সুযোগ এর মধ্যেই দেওয়া আছে। আরও কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকলে প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের তা উপস্থাপনের জন্য আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
মন্ত্রী ইমরান আহমদ বলেন, প্রবাসীরা দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করতে বিশেষ ভূমিকা পালন করছে। ২৪ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স তাঁরা মহামারির সময়ে ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে বাংলাদেশে পাঠিয়েছেন। যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে রেকর্ড উচ্চতায় উন্নীত করতে সাহায্য করেছে।
দেশের বিনিয়োগ ও রেমিট্যান্স বৃদ্ধির ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, ২০২১ কোভিড অর্থবছরে বৈদেশিক বাণিজ্য ছিল ৯৭ বিলিয়ন ডলার। ২০২১-২২ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ২ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রতি বছর বাংলাদেশ সরকার শীর্ষ রেমিট্যান্স প্রেরকদের সম্মানিত করে থাকে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের অবদানের স্বীকৃতির বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, সাধারণ প্রবাসীদের মধ্যেও দীর্ঘ সময় বিদেশে থেকে যারা দেশকে সমৃদ্ধ করছেন, তাঁদের বিশেষ মর্যাদা প্রদানের চিন্তা করছে সরকার।
উদ্বোধনী অধিবেশনে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেন, বঙ্গবন্ধু যে বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই স্বপ্নের বাংলাদেশ এখন তাঁর কন্যা শেখ হাসিনার মাধ্যমে বাস্তবায়িত হচ্ছে। তিনি বলেন, একজন মুক্তিযোদ্ধা, একজন ব্যবসায়ী ও রাজনীতিক হিসেবে তিনি দেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকে কাছে থেকে দেখেছেন। বৈরী সময় অতিক্রম করে দেশ এখন উন্নয়নের মহাসড়কে। এ মহাসড়কে যোগ দেওয়ার জন্য তিনি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়া অনাবাসী বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের প্রতি আহ্বান জানান।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১০ লাখের বেশি প্রবাসী বাংলাদেশি রয়েছেন। দেশটি মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ১ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী আরও বলেন, গত এক দশকে বাংলাদেশ বিশ্বের দ্রুততম ক্রমবর্ধমান অর্থনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এগিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে জাতিসংঘের স্বল্পোন্নত দেশগুলোর (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশ ২০২৬ সালে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। মন্ত্রী বলেন, সরকারের বিনিয়োগবান্ধব নীতি, অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি কৌশল ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্ব বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করছে। এগুলো আমাদের সাফল্যের রহস্য।
কূটনৈতিক কর্মকর্তাসহ দুই শতাধিক বিনিয়োগকারী এবং সারা বিশ্বের ব্যবসায়ী নেতারা বিজনেস সামিটে সমবেত হয়েছেন। এ সময় তাঁরা বিনিয়োগ ও রেমিট্যান্সের সুযোগ, উদ্ভাবন, ব্র্যান্ডিং, ডিজিটাল বাংলাদেশ এবং অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা নিয়ে আলোচনা করেন।
উদ্বোধনী বক্তব্যে এনআরবি সিআইপি অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট মাহতাবুর রহমান বলেন, বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে দুবাইয়ে সমবেত হওয়া উদ্যোক্তাদের সমাবেশ প্রমাণ করে বাংলাদেশ নিয়ে প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ রয়েছে। বর্তমান সরকারের বিনিয়োগ কর্মসূচিতে প্রবাসীদের আরও যুক্ত হয়ে বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
মাহতাবুর রহমান বলেন, ‘এনআরবিরা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় অবদানকারী। শুধু রেমিট্যান্স যোদ্ধা হিসেবেই নয়, বিনিয়োগকারী এবং বাংলাদেশি পণ্যের আমদানিকারক হিসেবেও তাঁদের অবদান রয়েছে। এনআরবিরা বাংলাদেশের রপ্তানি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করতে সাহায্য করছে। ভবিষ্যতেও এনআরবি সিআইপি অ্যাসোসিয়েশন দেশের অর্থনীতিকে আরও সমৃদ্ধ করতে বৃহত্তর ভূমিকা পালন করবে।
সামিটে দুবাই ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এই সামিট বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে দ্বিমুখী বিনিয়োগ এবং বাণিজ্য বৃদ্ধি করবে বলে আশা প্রকাশ করেন ব্যবসায়ীরা।
দিলারা আফরোজ খানের সঞ্চালনায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন—সাংবাদিক শ্যামল দত্ত, আতিকুর রহমান, আজিজ আহমেদ, ইয়াসীন চৌধুরী, মার্কিন স্টেট সিনেটর শেখ রহমান, গোলাম আলমগীর, শেখ শামসুদ্দিন আহমেদ, বি এম জামাল হোসেইন, রাষ্ট্রদূত আবু জাফর, সরকারের বাণিজ্যসচিব তপন কান্তি ঘোষ ও কাজী সরোয়ার হাবিব প্রমুখ।
প্রবাসী বাংলাদেশি উদ্যোক্তা-ব্যবসায়ীদের সমন্বয়ে আয়োজিত হয়েছে ‘দ্বিতীয় গ্লোবাল বিজনেস সামিট দুবাই-২০২১ ’। সামিটে বক্তারা বলেন, বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোগত উন্নতি দেখে বিশ্ববাসী এখন অবাক। পদ্মা সেতুর মতো বিশাল স্থাপনা, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও ঢাকায় এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েসহ বিভিন্ন প্রকল্প ও পরিকল্পনা দেখে বিশ্বের অনেকেই বিস্মিত।
এনআরবি সিআইপি অ্যাসোসিয়েশন ও বিজনেস আমেরিকা ম্যাগাজিনের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘দ্বিতীয় গ্লোবাল বিজনেস সামিট দুবাই-২০২১’ নিয়ে ইতিমধ্যে দেশে-বিদেশে বাংলাদেশি উদ্যোক্তা-ব্যবসায়ীদের মধ্যে সাড়া জাগিয়েছে।
দুবাই বিজনেস সামিটে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি লিডিং ম্যাগাজিন ‘বিজনেস আমেরিকা’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এই ম্যাগাজিনে বাংলাদেশি উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন উদ্যোগ এবং ব্যবসার চালচিত্র উপস্থাপন করা হচ্ছে।
উত্তর আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, পূর্ব-পশ্চিমের নানা দেশ থেকে আসা প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের উপস্থিতিতে দুবাই ক্রাউন প্লাজা হোটেলে এই সামিটের আয়োজন করা হয়। অন্যান্য দেশের মতো যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যসহ নিউইয়র্ক থেকে উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী, প্রবাসী সিআইপি, লেখক ও প্রবাসী সাংবাদিকদের মিলনমেলায় পরিণত হয় দুবাই বিজনেস সম্মেলন।
প্রথম দিনের অনুষ্ঠানমালায় বাংলাদেশে বিনিয়োগের সমস্যা, সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে সেমিনার ও আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রবাসী সিআইপিদের বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে বিশেষ অবদান রাখায় সম্মাননা প্রদান করা হয়।