ব্রুকলিনের পরম স্মৃতি

মুক্তিযোদ্ধা সালেহ চৌধুরী ও লেখক বেলাল বেগের সঙ্গে লেখক
মুক্তিযোদ্ধা সালেহ চৌধুরী ও লেখক বেলাল বেগের সঙ্গে লেখক

নিউইয়র্ক নগরের পাঁচটি অঞ্চলের অন্যতম ব্রুকলিন বরো। ব্রুকলিন অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি অংশের অন্যতম ও সুপরিচিত একটি এলাকা ফ্ল্যাট বুশ। ১৬৫০–এর দশকে ডাচ অভিবাসীদের পদচারণায় শুরু এই এলাকার পুরোনো নাম ছিল কিংস কাউন্টি, যা এখন সবার কাছে ব্রুকলিন নামে পরিচিত। উনিশ শতকে এই অঞ্চলকে সরাসরি নিউ নেদারল্যান্ডস বলে অভিহিত করা হতো, যা একসময় বেশ জমজমাট ছিল ইউরোপীয় ঔপনিবেশিকতার দগদগে ক্ষত সংবলিত ইতিহাসের কালো অধ্যায় দাস ব্যবসার কারণে। এ নিয়ে ব্রিটিশ ও ডাচ দখলদারদের মধ্যে অনেক উত্তেজনাপূর্ণ ও বিদ্বেষের পারস্পরিক অবিশ্বাসের পরিবেশ ছিল খুবই স্বাভাবিক। তবে হাডসনের নিরন্তর বয়ে যাওয়া নীল জলে সব ধরনের হিংসা বিদ্বেষের অস্বস্তিকর দাগ অনেকটা মুছে রূপ নিয়েছে কমপক্ষে অর্ধশত দেশ থেকে আসা অভিবাসীদের স্থায়ী আবাসস্থলে।

২০১৭ সালের জুন মাসে দেশ থেকে আসা এক প্রিয়জনের ফোনে জানলাম, আমার একজন প্রিয় ব্যক্তিত্ব ও দেশ মাতৃকার জন্য জীবনবাজি রাখা এক অকুতোভয় মুক্তিসেনা আমেরিকায় আসছেন। জুনের রৌদ্রোজ্জ্বল দিনের শুরুতে পেলাম অনেক আকাঙ্ক্ষিত একটি ফোনকল। চির পরিচিত ভরাট গলায় আপন করে নেওয়া মায়ায় ভরা একটি আওয়াজ। ভাতিজা আমি চলে এসেছি তোমাদের নিউইয়র্ক শহরে। সেই ডাকটি ছিল ভাটি অঞ্চল চষে বেড়ানো অনন্য একজন মুক্তিযোদ্ধা সালেহ চৌধুরীর। আমাদের গর্ব, পুরো দেশের গর্ব। সাহসী সন্তান ভাটির শার্দুল প্রয়াত সালেহ চৌধুরীর। সুনামগঞ্জের উপজেলা দিরাইয়ের গর্চিয়া গ্রামের বনেদি জমিদার পরিবারের সন্তান তিনি। তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল সরাসরি  মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া। এই কৃতী সন্তান ১৯৭১ সালে টেকেরঘাট সাব-সেক্টরের অধীনস্থ দিরাই, শাল্লা, জগন্নাথপুরসহ ভাটি অঞ্চলে বেশ কিছু যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছেন। বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর গৌরবোজ্জ্বল অবদান ভোলার নয়।

’৭১ সালের শুরুর দিকে সুনামগঞ্জের সীমান্ত হয়ে ভারতের বালাটে পৌঁছান সালেহ চৌধুরী। এই অঞ্চল ছিল টেকেরঘাট সাব–সেক্টরের অধীনে। সে সময় মুক্তিযোদ্ধা সংগ্রহ কেন্দ্রের দায়িত্বে ছিলেন বর্তমান রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ। প্রথম সাক্ষাতে সালেহ চৌধুরী জানতে চাইলেন, তৎকালীন ন্যাপ নেতা বাবু সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের আবস্থান। সালেহ চৌধুরীর ভাষ্য মতে, বর্তমান  রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো জবাব না পেলেও পরে নাকি অনেক আন্তরিক সহযোগিতা পেয়েছিলেন। সপ্তাহকাল পর সাক্ষাৎ হলো বাবু সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের সঙ্গে। ১৯৭১ সালের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বললেন, সুনামগঞ্জের মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দানকারী কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তির নাম। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা প্রয়াত আবদুল জহুর, দেওয়ান ওবায়দুর রাজা, হুসেন বক্ত, মো. আবদুল বারীসহ আরও অনেক সহযোদ্ধার নাম। তখন আরও যে কয়েকজনের নাম বললেন তাদের মধ্যে কমরেড বরুণ রায়, আলতাফ উদ্দিন আহমদ ও নজির হুসেনও রয়েছেন। তরুণদের মধ্যে বেশি বললেন সাব্বির আহমদ মিনু ও বি এম খসরুর নাম।

নিউইয়র্কে আসার পরদিন সালেহ চৌধুরী চলে গেলেন তাঁর এক সময়ের সহপাঠী ও বন্ধু নিউইয়র্কের সর্বপ্রিয় বেলাল বেগের বাসায়। বেলাল ভাইয়ের বর্ণনায়, বাসায় ঢুকতে না–ঢুকতেই একটি কাগজের টুকরায় লেখা আমার ফোন নম্বর এগিয়ে দিয়ে বললেন, দোস্ত আমার ভাতিজা রূপুকে বলো তোমার এখানে চলে আসতে। ব্রুকলিন থেকে আমার আবাসস্থল জ্যামাইকার দূরত্ব তিনি কোনো অবস্থায় আমলে না নিয়ে শুধু বললেন, চলে এসো বেলাল বেগের বাসায়। তুমি আসলে পরে লাঞ্চ শুরু করব। ২০১০ সাল থেকে নিউইয়র্কে বসবাস করে এই প্রথমবারের মতো যাত্রা শুরু হলো নিউইয়র্কের অন্যতম অঞ্চল ব্রুকলিনের মিশ্র অভিবাসীর বসত এলাকা ফ্ল্যাট বুশে।

বেলাল ভাইয়ের দেওয়া ঠিকানা ধরে দুটো ট্রেন বদল করে ঝক ঝকে সুন্দর এক মনোরম গ্রীষ্মের দুপুরে হাজির হলাম তাঁর বাসায়। ভেতরে ঢুকতেই সহাস্যে হাওরের মতো বিশাল  আকারের বুক নিয়ে দীর্ঘদেহী অদম্য সাহসী সন্তান সালেহ চৌধুরী স্নেহের ডাকে উচ্চারণ করলেন, আয়রে বাবা বুকে আয়। তোদের দেখলে মনে হয়, আমি ভাটির দেশের হাওরের পাড়ের সরল সহজ সন্তানদের মাঝে পরিবেষ্টিত। মুখের দিকে তাকাতেই চোখে পড়ল অকৃত্রিম হাসি মাখা মুখে সাদা রঙ নেওয়া বাহারী গোঁফ।  আমার বাবারও ছিল এ রকমটা। চাচা জড়িয়ে ধরার সঙ্গে সঙ্গে বুকে কান লাগিয়ে শুনতে চাইলাম, মুক্ত সত্তার আর স্বাধীনতার জন্য বাজি রাখা যোদ্ধার হৃদয়ে কি আজও বাজে—‘আমি টাকঢুম টাকঢুম বাজাই বাংলাদেশের ঢোল, সব ভুলে যাই তাও ভুলি না বাংলা মায়ের বোল। বাংলা মায়ের বোল।’ বেশ খানিকক্ষণ বুকে মাথা লাগিয়ে ছিলাম বলে, জিজ্ঞেস করলেন কি শুনছিস বেটা?

আমার বুকে কান লাগিয়ে উত্তরে বললাম, ‘চেষ্টা করছি শুনতে নলুয়ার হাওর, চামটি হাওর ও শনির হাওরে বহমান বর্ষার প্রমত্তা ঢেউয়ের আওয়াজ, যে সব হাওরে একাত্তরে চষে বেড়িয়েছেন পাক বাহিনীর খোঁজে।’

মুক্তিযুদ্ধের সময়ে সশস্ত্র অবস্থায় একবার এলেন নিজ গ্রামের বাড়ি গর্চিয়াতে। শুনলেন সদ্যোজাত সন্তানের জন্মের খবর। শুনে পাছে সন্তানের মায়ায় যদি আটকে পড়েন, তাই ভেতর বাড়িতে আর গেলেন না। সেই কিছুই না পাওয়ার আশায় মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়া হাওর–শার্দুলের সামনে দাঁড়িয়ে রইলাম চুপচাপ।

নিউইয়র্ক সাংস্কৃতিক জগতে নিরলস বিচরণকারী মানবতাবাদী সমাজ সচেতন তরুণ হৃদয়ের অধিকারী বেলাল ভাইয়ের উদ্দেশ্যে আমাকে দেখিয়ে বললেন, ‘বন্ধু এইটা আমার ভাতিজা। নিজ সন্তানের আদরে রাখবা ওরে।’ তারপর কী হাসি। নির্মল হৃদয় খোলা সেই হাসি আমার কানে আজও বাজে। বললাম, ‘আপনাকে নিয়ে আমরা বসতে চাই নিউইয়র্কের সব স্তরের সাংস্কৃতিক কর্মীসহ মুক্ত চিন্তার মানুষদের নিয়ে।’ সে অনুরোধ জানাতে তিনি বললেন, আগে ডাক্তার দেখিয়ে নিই। এরপর সবাইকে নিয়ে বসব। ডাক্তার দেখানোর পর রিপোর্ট পেয়েই বুঝে নিলেন, তিনি আর বেশি দিন ইহজগতে নেই। সন্তানকে তাড়া দিয়ে চলে গেলেন প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশে, যে দেশের জন্য লড়াই করেছিলেন ভাটি বাংলার বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাংবাদিক চিন্তাশীল লেখক সালেহ চৌধুরী। প্রিয় বন্ধু বেলাল বেগের ভাষায়, লাহোরে ১৯৬১ সাল থেকে আমার ঘনিষ্ঠতম বন্ধুদের একজন সালেহ চৌধুরী, তাঁরই পরম স্নেহের হ‌ুমায়ূন আহমদের মতো সজ্ঞানে সকৌতুকে সবার সঙ্গে হ্যান্ডশেক করে মৃত্যুর হাত ধরে চলে গেলেন; একবারও পেছনে ফিরে না তাকিয়ে। বীরেরা এভাবেই বুঝি চলে যান। দেশের এই সূর্য সন্তানের জন্য আমাদের অকৃত্রিম শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা। সেই সঙ্গে ব্রুকলিন অঞ্চল আমার জীবনে জড়িয়ে গেল পরম পাওয়া আর পিতৃতুল্য একজন মহান বীরের সঙ্গে শেষ বারের মতো সাক্ষাতের অনন্য এক স্মৃতি নিয়ে।