
মনটা খারাপ হয়ে আছে একজন বড় মাপের মানুষের মৃত্যুতে। স্যাক্রেমেন্টোর আকাশও আজ মেঘলা, মনে হচ্ছে ‘কী গভীর দুঃখে মগ্ন সমস্ত আকাশ’। স্যার ফজলে হোসেন আবেদকে সালাম। পৃথিবীর দরিদ্র জনগণের জন্য তিনি যা করে গেছেন, তা অতুলনীয় ও অবিস্মরণীয়। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম একটি কবিতা লিখেছিলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যুতে। আজ সেটিই বারবার মনে পড়ছে—
তোমার গরবে গরব করেছি, ধরারে ভেবেছি সরা;
ভুলিয়া গিয়াছি ক্লৈব্য দীনতা উপবাস ক্ষুধা জরা।
মাথার ওপরে নিত্য জ্বলিতে তুমি সূর্যের মতো,
তোমারই গরবে ভাবিতে পারিনি: আমরা ভাগ্যাহত।
এত বড়, এত মহৎ বিশ্ববিজয়ী মহা-মানব
বাংলার দীন হীন আঙিনায় এত পরমোৎসব
স্বপ্নেও আর পাইব কি মোরা? তাই আজি অসহায়
বাংলার নরনারী, কবি-গুরু, সান্ত্বনা নাহি পায়।
শুনেছি ফজলে হোসেন আবেদ নাকি কবি হতে চেয়েছিলেন। তাই কবিতায় কবিতায় তাঁকে বিদায় জানানোই শোভা পায়। তিনি ‘কবি-গুরু’ নন ঠিকই, তবে তিনি ‘মানবদরদি-গুরু’ ঠিকই হয়ে উঠেছিলেন। কবি-গুরু রবীন্দ্রনাথ তাঁর কবিতায় বর্ণনা করে গেছেন ফজলে হোসেন আবেদের মতো মানুষদের—
‘যেথায় থাকে সবার অধম দীনের হতে দীন
সেইখানে যে চরণ তোমার রাজে
সবার পিছে, সবার নিচে,
সব-হারাদের মাঝে।’
স্যার ফজলে হোসেন আবেদ, তোমায় সালাম।
পরশু দিন টিভিতে স্যার ফজলে হোসেন আবেদের একটা পুরোনো ইন্টারভিউ দেখছিলাম। উপস্থাপক তাঁকে ইন্টারভিউয়ের শেষে একটি কবিতা আবৃত্তি করতে বলেছিলেন, তিনি বেছে নেন শেক্সপিয়ারের হ্যামলেট থেকে একটি কবিতাংশ। (আজকাল এ রকম মানুষ আর বলতে গেলে নেই, যারা অনায়াসে স্মৃতি থেকে শেক্সপিয়ার আবৃত্তি করতে পারেন। কি অসাধারণ!):
I have of late-but
wherefore I know not-lost all my mirth, forgone all
custom of exercises; and indeed it goes so heavily
with my disposition that this goodly frame, the
earth, seems to me a sterile promontory, this most
excellent canopy, the air, look you, this brave
o’erhanging firmament, this majestical roof fretted
with golden fire, why, it appears no other thing to
me than a foul and pestilent congregation of vapours.
What a piece of work is a man! how noble in reason!
how infinite in faculty! in form and moving how
express and admirable! in action how like an angel!
in apprehension how like a god! the beauty of the
world! the paragon of animals! And yet, to me,
what is this quintessence of dust? man delights not
me: no, nor woman neither, though by your smiling
you seem to say so. [Shakespeare: Hamlet]
স্যার ফজলে হোসেন আবেদের আবৃত্তি করা এই ইংরেজি কবিতাটির একটি ভাবানুবাদ করে নিতে পারি আমরা এভাবে—
সম্প্রতি, কেন জানি না
জীবনের সব আনন্দ হারিয়ে ফেলেছি;
পরিত্যাগ করেছি আচার অনুষ্ঠান।
আমার মনটা এমন বিষাদে ভারী হয়ে উঠেছে
যে গঠন সৌকর্যে অপূর্ব সুন্দর
এই পৃথিবীকে মনে হচ্ছে
যেন এক বন্ধ্যা প্রলয়ভূমি।
এই সুন্দর বায়ুমণ্ডল পরিবৃত
অনন্ত প্রসারিত উদার আকাশ,
এই স্বর্ণাভ অগ্নিখচিত মহিমান্বিত ছাদ
এর সবই আমার কাছে মনে হচ্ছে
আর কিছু নয়,
যেন নোংরা পুঁতিগন্ধময়
দূষিত বাষ্পের সমাহার।
কি সুন্দর সৃষ্টি এই মানুষ!
যুক্তিতে কি মহান!
দক্ষতায় কি সীমাহীন !
গঠনে এবং চলৎশক্তিতে কি বিস্ময়কর ও প্রশংসনীয়!
কাজকর্মে কেমন দেবদূতের মতো!
উপলব্ধি ও চেতনায় কেমন ঈশ্বরতুল্য!
সারা জগতের সৌন্দর্যসার!
জীবজগতের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি!
তবুও আমার কাছে
সেই মানুষকে মনে হয়
ধূলিকণার সমাহার ছাড়া এ আর কি!
মানুষ আমাকে আর আনন্দ দেয় না।
না, নারীও নয়।
যদিও তোমার স্মিতহাস্য দেখে
মনে হচ্ছে তুমি এতে আনন্দ পাও। [শেক্সপিয়ার: হ্যামলেট]
কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ লিখেছিলেন—‘যে কবিতা শুনতে জানে না, সে ভালোবেসে যুদ্ধে যেতে পারে না।’
স্যার ফজলে হোসেন আবেদ তোমায় সালাম। তুমি কবিতাকে ভালোবেসেছো সেই প্রথম কৈশোরেই। আর মানুষের প্রতি এক অসীম ভালোবাসায় তুমি যুদ্ধ করেছ দারিদ্র্য আর অজ্ঞানতার বিরুদ্ধে। সেই যুদ্ধে তুমি জয়ী, হে মহান বীর।
স্যার ফজলে হোসেন আবেদ, তোমায় সালাম। কবিতায় কবিতায় বিদায় তোমাকে, হে মানবদরদি–গুরু!