
প্রথম আলো উত্তর আমেরিকা টিম মিশিগান যাচ্ছে, এমন একটা কথা এক মাস ধরেই চলছিল। এই ঘোষণা দিয়েছিলেন প্রথম আলোর উত্তর আমেরিকার আবাসিক সম্পাদক ইব্রাহীম চৌধুরী।
এই ঘোষণাই কাফি। তারপর কীভাবে কীভাবে যে সব আয়োজন, প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায় এবং তা বাস্তবায়িত হয় তা জাদু বিদ্যাকেও হার মানায়। জুলাই মাসজুড়ে আলোচনা, পর্যালোচনা, চলতে লাগল মিশিগান ট্যুরকে কেন্দ্র করে। শেষ পর্যন্ত এই ট্যুরে টিকে রইলাম, তাঁরা হলাম—আমি নিজে, ইব্রাহীম চৌধুরী, ভায়লা সালিনা লিজা, মাহবুবু রহমান, মোহাম্মদ মনজুরুল হক ও আবদুল মালিক জুয়েল। আরও অনেকেই যাব যাব করেও সময় এবং নানা ঝুট ঝামেলায় ম্যানেজ করতে পারলেন না।
এদিকে মিশিগান থেকে ফারজানা চৌধুরী পাপড়ি অনবরত পূর্ব প্রস্তুতির আপডেট দিয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁর আয়োজন, নিমন্ত্রিত অতিথিদের তালিকা, পরিচয়, কোথায় কোথায় আমরা ঘুরে দেখব, কে কোথায় থাকব, কী দিয়ে আপ্যায়ন করা হবে—এই সব ফিরিস্তি শুনে মুখস্থ হয়ে যাচ্ছিল প্রায়।
মনজুরুল হকের তত্ত্বাবধানে স্পিরিট এয়ারলাইনসে পাঁচজনের জন্য টিকিট বুক করা হয়েছিল। যাত্রার দিন নির্ধারণ হয়েছিল শনিবার, ৩১ আগস্ট। ভোরে ফ্লাইট হওয়ার কারণে সবার রাতের ঘুমের মোটামুটি বারোটা বাজল। ভোর চারটার দিকে রহমান মাহবুব ও ইব্রাহীম চৌধুরীকে একডাকে সজাগ করতে পারলেও লিজাকে কমপক্ষে ১০টা কল দিতে হয়েছে।
একে একে সবাই লাগার্ডিয়া এয়ারপোর্টে স্পিরিট এয়ারলাইনসের গেটে জড়ো হলাম। মাত্র দেড় ঘণ্টার টানা ফ্লাইট। খুব অল্প সময়ের উড়ে চলা। দেখতে না দেখতেই বুক ট্যুরের মতো মহান মিশন নিয়ে অবতরণ করলাম মিশিগানের ডেট্রয়েট ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে। অবতরণ করেই খবর পেলাম পাপড়ি ও ইকবাল ফেরদৌস দুজন দুই গাড়ি নিয়ে এয়ারপোর্টের পথে। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে দলের সবাই দুই গাড়িতে ভাগ হয়ে রওনা হলাম ওয়ারেন সিটির পথে। গন্তব্য পাপড়ির বাসা।
পাপড়ির বাসায় পৌঁছে রীতিমতো হতবাক। খাবার টেবিলের আয়োজন দেখে সবার আক্কেলগুড়ুম। এলাহী কাণ্ড! সাকল্যে ১০ জন মানুষের জন্য পাপড়ি ৫০ জনের পরিমাণ রান্না করে রেখেছে। টেবিলভর্তি খাবার। খাওয়া শেষে কিছুক্ষণের জন্য সবাই রেস্ট করে বিকেলে বেরিয়ে পড়লাম শহর দেখতে। অনেকের মতে গত দশকের বিধ্বস্ত নগরীগুলো যেন এখন প্রাণ ফিরে পেয়েছে। অনেক স্বদেশি পরিবারের সঙ্গে দেখা হলো। অস্থির নগরীগুলো থেকে প্রতিদিনই স্বদেশিদের স্থানান্তর ঘটছে। মানুষ বসতি গড়ছে নিরিবিলি, শান্ত, নিরাপদ জনপদে।
কথায় বলে, রাত যত গভীর হয়, তত লাস্যময়ী হয়ে ওঠে। তেমনি এক নিশি আড্ডার আয়োজন ছিল আমাদের কমরেডের একজন চিরকুমার সতীর্থের ডেরায়। তিনি স্বহস্তে মাটন কষা আর লাল আটার রুটির নৈশভোজের আয়োজন করেছিলেন আপ্যায়নের জন্য। খেতে খেতে আড্ডা জমে উঠল। গল্পে নস্টালজিয়া এসে ভর করল। এসব এলোমেলো গল্পে আমাদের সবারই ফেলে আসা দিন, পুরোনো দিনের অনেক মুখ, অনেক নাম এল। একপর্যায়ে আবিষ্কার হলো স্বয়ং গৃহকর্তা নাকি আমার পূর্বপরিচিত। কিন্তু কোথায় পরিচয় হয়েছিল, তা তিনি মনে করতে পারছিলেন না। আমার কলকাতার বন্ধু ‘গার্গী’র নাম করতেই অনেকগুলো রহস্যের দ্বার উন্মোচন হলো।
এক সময় আড্ডা শেষ হলো। অদ্ভুত এক মিশ্র অনুভূতি নিয়ে রাতে পাপড়ির বাসায় ফিরে এলাম। সত্যি! পৃথিবী আসলেই গোলাকার! আসলেই তেমন বড় নয়!
পৃথিবীর মোটর গাড়ির রাজধানী হিসেবে খ্যাত রাজ্যটির নাম মিশিগান। গ্রেট লেক মিশিগানের জলে সমৃদ্ধ মিশিগান স্টেট। নিউইয়র্কের পর সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশি অধ্যুষিত স্টেট হচ্ছে মিশিগান। নিউইয়র্ক নগরের পর যে নামটি বাংলাদেশিদের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয়, তা হলো মিশিগানের ডেট্রয়েট। বর্তমানে প্রায় ৭৫ হাজার বাংলাদেশির বসবাস এখানে। ২০২০ সালে করোনা মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়লে নিউইয়র্ক, টেক্সাস, ক্যালিফোর্নিয়াসহ বিভিন্ন রাজ্য থেকে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি মিশিগানে মাইগ্রেশন করা শুরু করেছে।
মিশিগানের ডেট্রয়েট, হ্যামট্রামাক, ওয়ারেন, স্টার্লিং হাইটস, ট্রয়, রচেস্টার, রচেস্টার হিলস, ফারমিংটন, ফারমিংটন হিলস, নোভাই, নর্থভিল, কেন্টন, ডিয়ারবর্ন হাইটস, টেলর, সাউথ গেট, এন আরবার, ফ্লিন্ট, ল্যান্সিং, শাগিনাও, গ্র্যান্ড রাপিড ও বে-সিটির প্রায় সব শহরেই রয়েছে বাংলাদেশি কমিউনিটি। উত্তর মিশিগান একটি জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র। এখানে কয়েকটি ছোট ও মধ্যম আকারের শহর, জাতীয় বন, হ্রদ, নদী এবং গ্রেট লেকের বড় অংশ রয়েছে। মার্কিন কথাসাহিত্যিক আর্নেস্ট হেমিংওয়ের শৈশব কেটেছিল মিশিগানে।
ওয়ারেন ও হ্যামট্রামিক সিটি ঘুরলে চোখে পড়ে দেশি খাবারের রেস্টুরেন্ট, গ্রোসারি, মসজিদ, মন্দির ও ড্রাইভিং স্কুল। এখানে একটি রাস্তার নামকরণ করা হয়েছে ‘বাংলাদেশ অ্যাভিনিউ’ নামে। মিশিগানের গভর্নর রিক স্নাইডার এই শহরকে বাংলা টাউন হিসেবে ঘোষণা করেছেন। বাঙালিদের জন্য এ শহরে নির্বাচনের ব্যালট পেপারও বাংলায় করা হয়েছে। এখানকার বাংলাদেশিরা প্রধানত ব্যবসায়ী। এ ছাড়া একটা বড় অংশ গাড়ির যন্ত্রাংশ নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে কর্মরত।
পরদিন ১ আগস্ট ঘুম থেকে উঠেই মেসেঞ্জারে রহমান মাহবুবের নোট পেলাম। দাঁতের ব্যথা সহ্য করতে না পেরে তিনি ভোরের ফ্লাইট ধরে নিউইয়র্কে ফিরে গেছেন।
মহামারির সময়কার লকডাউন, আইসোলেশন নামক নতুন নতুন শব্দের সঙ্গে পরিচিত হওয়া, ভয়াবহ হিম-শীতল দিন পাড়ি দেওয়া, আমরা একদল লেখক, সাংবাদিক নিউইয়র্কের মৃত্যুকূপ থেকে বের হয়ে অনেক দিন পর অন্য স্টেটে পা রেখেছি। যোগ দিয়েছি ওয়ারেন সিটির বিসমিল্লাহ রেস্টুরেন্টে করা এক আয়োজনে। আয়োজন করা হয়েছে প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার পক্ষ থেকেই। মিশিগানের বিভিন্ন সিটির, কমিউনিটির বিভিন্ন পেশার মানুষের উপস্থিতিতে প্রাণবন্ত এক মিলন মেলায় পরিণত হয় এই আয়োজন।
গ্রীষ্মের পড়ন্ত বিকেলে ইব্রাহীম চৌধুরীর স্বভাবসুলভ চমৎকার উপস্থাপনায় প্রাঞ্জল হয়ে উঠেছে অনুষ্ঠানটি। এর পেছনে মিশিগান প্রথম আলো পরিবারের সদস্য ফারজানা চৌধুরী পাপড়ির কর্মতৎপরতা ছিল উল্লেখযোগ্য। সভায় পরিচিত হই হ্যামট্রামাক সিটি মেয়র কারেন মেজেস্কির সঙ্গে। খুবই ‘ডাউন টু আর্থ’ একজন মানুষ। পাশাপাশি বসে এমন ভাবে গল্প করলেন, ডিনার খেলেন, সেলফি তুললেন—তাতে একবারের জন্যও মনে হয়নি আমাদের মধ্যে ভাষা, সংস্কৃতি বা জাতিগত পার্থক্য রয়েছে।
আড্ডায় যোগ দেন আসন্ন নির্বাচনে মেয়র পদপ্রার্থী কামাল রহমান, যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম বাংলাদেশি জনপ্রতিনিধি সাহাব আহমদ ও পাঠাগারপ্রেমী চিকিৎসক দেবাশীষ মৃধা। বিল মায়ার একজন আমেরিকান। যিনি মিশিগানের ডেট্রয়েট-হামট্রামাক শহরের সীমানায় ৩১০৫ কার্পেন্টার অ্যাভিনিউয়ে অবস্থিত ব্রিজ একাডেমি মাধ্যমিক স্কুলের বিশাল দেয়ালে বাংলাদেশের ঐতিহ্য, জাতীয় প্রতীক এবং ভাষা আন্দোলন নিয়ে ম্যুরাল স্থাপনের অন্যতম কারিগর। এই মহান চিত্রকর্মটি তৈরির উদ্যোগ নিয়েছিলেন অন্য দেশের, অন্য ভাষার, অন্য জাতির এই মহৎ মানুষটি। কী নেই সেই ম্যুরালে? ঠাঁই পেয়েছে আমাদের জাতীয় ফুল শাপলা, শাপলা চুলে গোঁজা হাসি মুখের এক গ্রাম্য কিশোরী, রয়েল বেঙ্গল টাইগার, জাতীয় পতাকা, শহীদ মিনার। পুরো দেয়াল জুড়ে যেন ফুটে উঠেছে একখণ্ড বাংলাদেশ।
হেলাল উদ্দিন রানা এক সময়ের তুখোড় সাংবাদিক। রেডিও, টিভির সফল গীতিকার। ইকবাল ভাইয়ের বাসার রোববার মধ্যরাতের আড্ডায় আমরা গলা মিলিয়ে গান করেছি, কবিতা পড়েছি। মানিক থেকে আল মাহমুদ, মির্জা গালিব থেকে মৌসুমি ভৌমিক, সেলিনা আজাদ, নচিকেতা, আবদুল জব্বার, বশির আহমেদ একে একে সবার হাতড়ে বেড়ানো পুরোনো স্মৃতি। শেষে হেলাল উদ্দীন রানার লেখা অটোগ্রাফসহ ছড়ার বই ‘ইয়া বড় গোল্লা’। ইকবাল ফেরদৌস, রকেট, পার্থ সারথী দেব, হেলাল উদ্দীন রানা, পাপড়ি আপনাদের কথা খুব মনে পড়বে। বহুদিন মনে থাকবে আপনাদের কথা।
রোববার শেষরাতে এয়ারপোর্টের পথে ডেট্রয়টের মহাসড়কে ৮০ মাইল বেগে ছুটে চলা হেলাল উদ্দীন রানার গাড়ি। আমার সামনেই বসা নির্ঘুম গাড়ির চালক। গাড়ির কাচের জানালা দিয়ে চোখে পড়ছিল আকাশের এক কোণে ছুটন্ত রুপালী চাঁদের দিকে। আর কী কখনো দেখা হবে এঁদের সঙ্গে?
মনের গহনে, গলার কাছে জমে উঠেছিল শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং কৃতজ্ঞতার জলীয় বাষ্প! বিদায় মিশিগান। সবাই ভালো থাকুন। সবার জন্য ভালোবাসা!