যুক্তরাষ্ট্রের ২০ বছরের আফগান যুদ্ধের সমাপ্তি

৩১ আগস্টের সময়সীমার মধ্যেই আফগানিস্তান ত্যাগ করেছে মার্কিন বাহিনী
ছবি: এএফপি

শেষ মার্কিন সামরিক বিমান আফগানিস্তানের কাবুল বিমানবন্দর ত্যাগ করেছে। এর মধ্য দিয়ে আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের ২০ বছরের যুদ্ধের অবসান ঘটেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের অধিনায়ক জেনারেল ফ্রাঙ্ক ম্যাকেঞ্জির বরাত দিয়ে মার্কিন সংবাদমাধ্যমে এ তথ্য জানানো হয়।

জেনারেল ম্যাকেঞ্জি জানিয়েছেন, কাবুলের স্থানীয় সময় ৩০ আগস্ট দিবাগত রাত ১২টার কিছু আগে শেষ মার্কিন সামরিক বিমান সি-১৭ কাবুলের হামিদ কারজাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ত্যাগ করে। তখন যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলীয় সময় ছিল সোমবার বেলা ৩টা ২৯ মিনিট।

জেনারেল ম্যাকেঞ্জি বলেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, ৩১ আগস্টের সময়সীমার মধ্যেই আফগানিস্তানের আকাশসীমা ছেড়ে দিয়েছে মার্কিন বাহিনী।

জেনারেল ম্যাকেঞ্জি আফগানিস্তানে মার্কিন সামরিক মিশন অবসানের ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, কাবুল থেকে সব মার্কিন সেনা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

সামরিক ব্যবস্থাপনায় আফগানিস্তান থেকে লোকজন সরিয়ে নেওয়ার মার্কিন মিশনের সমাপ্তি ঘোষণা করা হলেও দেশটিতে কিছু আমেরিকান এখনো আটকে আছেন বলে জানান জেনারেল ম্যাকেঞ্জি। এ ছাড়া দেশত্যাগ করতে ইচ্ছুক, এমন সব আফগান নাগরিককেও নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি বলে জানান তিনি।

এখন কূটনৈতিক মিশনের মাধ্যমে বাকি লোক আফগানিস্তান থেকে সরিয়ে নেওয়া হবে বলে জানান জেনারেল ম্যাকেঞ্জি। এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। কাবুল ত্যাগ করা শেষ মার্কিন সামরিক বিমানে কতজন আরোহী ছিলেন, সে সম্পর্কেও কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।

জেনারেল ম্যাকেঞ্জি মার্কিন সাংবাদিকদের নিশ্চিত করেছেন যে কাবুলের মাটিতে শেষ পর্যন্ত দাঁড়ানো ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ৮২তম সামরিক এয়ারবর্নের অধিনায়ক জেনারেল ক্রিস্টোফার ডোনাহিউ ও আফগানিস্তানে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত রস উইলসন। উভয়ই কাবুল ত্যাগ করা শেষ মার্কিন সামরিক বিমানে রয়েছেন।

আফগানিস্তানে ঠিক কতজন মার্কিন নাগরিক এখনো আটকা পড়ে আছেন, এর কোনো হিসাব দেওয়া হয়নি। তবে এই সংখ্যা হাজারো হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এসব লোকজন নিরাপদে কাবুল বিমানবন্দর পর্যন্ত পৌঁছাতে না পারার কারণে তাঁদের এ দফা সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি।

একইভাবে ২০ বছর ধরে নানাভাবে মার্কিন বাহিনীকে সাহায্য করা সব আফগান নাগরিককে নিরাপদে কাবুল থেকে সরানো সম্ভব হয়নি। তাঁদের সংখ্যা কয়েক হাজার। তাঁরা তালেবানের হাত থেকে বাঁচার জন্য দেশত্যাগে মরিয়া।

জেনারেল ম্যাকেঞ্জি জানিয়েছেন, আফগানিস্তান থেকে বাকি লোকজনকে কূটনৈতিক মিশনের মাধ্যমে সরিয়ে নেওয়ার পথ উন্মুক্ত রয়েছে।

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা হয়। এর জেরে যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে হামলা চালায়। হামলার মাধ্যমে আফগানিস্তানের তখনকার তালেবান সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। তৎকালীন তালেবান সরকারের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে জঙ্গি সংগঠন আল-কায়েদা যুক্তরাষ্ট্রে হামলা চালিয়েছিল। পরে আল-কায়েদার প্রতিষ্ঠাতা ওসামা বিন লাদেনকে হত্যা করে যুক্তরাষ্ট্র।

২০ বছরের আফগান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় আড়াই হাজার সেনা প্রাণ হারান। আহত ২০ হাজারের বেশি। সবশেষ গত বৃহস্পতিবার কাবুল ত্যাগ করার প্রাক্কালে জঙ্গি হামলায় ১৩ মার্কিন সেনা নিহত হন। এ ঘটনা আমেরিকানদের বিমর্ষ তোলে।

যুক্তরাষ্ট্র সম্মানজনকভাবে আফগানিস্তান ত্যাগ করতে পারেনি বলে সমালোচনা আছে। আফগানিস্তান ত্যাগ করার আগেই ১৫ আগস্ট দেশটি তালেবানের দখলে চলে যায়। দুই সপ্তাহের বেশি সময় তালেবানের সঙ্গে সমঝোতা করেই মার্কিন বাহিনী কাবুল বিমানবন্দরে অবস্থান করে লোকজনকে নিরাপদে সরিয়ে নিচ্ছিল।

জেনারেল ম্যাকেঞ্জির বরাত দিয়ে মার্কিন সংবাদমাধ্যম জানায়, শেষ ফ্লাইট পর্যন্ত কাবুল থেকে ১ লাখ ২৩ হাজারের বেশি মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এই লোকজনের মধ্যে মার্কিন সামরিক-বেসামরিক নাগরিক, তৃতীয় দেশের লোকজন ও আফগানরা রয়েছেন।

কাবুল ত্যাগের আগে যুদ্ধসরঞ্জাম বিনষ্ট করেছে মার্কিন বাহিনী

৩০ আগস্ট কাবুল ত্যাগের ঠিক আগমুহূর্ত পর্যন্ত মার্কিন বাহিনীর যুদ্ধসরঞ্জাম বিমানবন্দর এলাকায় প্রস্তুত ছিল। কাবুল ত্যাগের আগে এসব যুদ্ধসরঞ্জাম বিনষ্ট করা হয়েছে। এসব যুদ্ধসরঞ্জাম আর কখনো ব্যবহার করা যাবে না বলে জানিয়েছেন জেনারেল ম্যাকেঞ্জি।

কাবুল ত্যাগ করার আগে ৭৩টি এয়ারক্র্যাফট, ২৭টি সাঁজোয়া যানসহ বেশ কিছু যুদ্ধসরঞ্জাম চিরতরে ব্যবহারের অনুপযোগী করা হয়েছে বলে জেনারেল ম্যাকেঞ্জি জানিয়েছেন।

আফগানিস্তানে মার্কিন বাহিনীর অনেক আধুনিক যুদ্ধসরঞ্জাম ইতিমধ্যে তালেবানের হাতে চলে গেছে। এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে। এমনকি সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ নিয়ে বর্তমান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের পদত্যাগও দাবি করেছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘতম এই যুদ্ধের অবসানের ঘোষণায় যুদ্ধবিরোধী মার্কিন লোকজনের মধ্যে স্বস্তি দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রধান গণমাধ্যম এই যুদ্ধের ‘অর্জন’ বিশ্লেষণ করছে।

২০ বছর আগে যে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ, সে যুদ্ধের সমাপ্তি টানলেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট বাইডেন। অবশ্য যুদ্ধের সমাপ্তি টানতে গিয়ে বাইডেন সমালোচিত হচ্ছেন। বিশেষ করে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পরিকল্পনা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে না পারার জন্য তাঁকে দায়ী করা হচ্ছে।