দেশের রাজনীতি নিয়ে বিদেশে সংঘর্ষে জড়াচ্ছেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা-কর্মীরা। বিশেষ করে দুই বড় দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতা-কর্মীরা। দেশের রাজনৈতিক সহিংসতা প্রবাসে ছড়িয়ে পড়ায় বিব্রত হচ্ছেন সাধারণ প্রবাসীরা। প্রবাসে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর এই হানাহানির অবসান কবে ঘটবে, এ উত্তর কারও জানা নেই।
দুই বড় দলের নেতাদের নিজেদের বিরোধ আর দ্বন্দ্ব রূপ নিচ্ছে প্রকাশ্য সহিংসতায়। নিউইয়র্কের মতো গুরুত্বপূর্ণ নগরে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ঘটছে হাতাহাতি। চেয়ার-ছোড়াছুড়ি থেকে খিস্তিখেউর, শেষ পর্যন্ত পুলিশের হস্তক্ষেপ—সবই আছে। আর এ সংঘাত চলছে উত্তপ্ত ড্রয়িংরুম থেকে প্রবাসীবহুল এলাকার রেস্তোরাঁ পর্যন্ত। রাজপথে দিনদুপুরে বা মধ্যরাতে ঘটছে নানা অপ্রীতিকর ঘটনা।
সর্বশেষ গত সোমবার যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবসের আলোচনা সভায় দুপক্ষের সংঘর্ষ হয়েছে। নিউইয়র্ক পুলিশের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়েছে। আওয়ামী লীগের বিবদমান গোষ্ঠীগুলো আলোচনা সভার নামে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়লে বাংলাদেশি-অধ্যুষিত জ্যাকসন হাইটস এলাকায় ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে নিউইয়র্ক পুলিশের বিপুলসংখ্যক সদস্য অন্তত ২০টি গাড়ি নিয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। সভাস্থল মেজবান রেস্তোরাঁ থেকে নেতা-কর্মীদের একে একে বের করে দেয় পুলিশ।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মেজবান রেস্তোরাঁয় পূর্বনির্ধারিত মুজিবনগর দিবসের আলোচনা সভা শুরু করেন যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সভাপতি ড. সিদ্দিকুর রহমান। সভা চলাকালে সিদ্দিকুর রহমান কর্তৃক বহিষ্কৃত সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদুর রহমান তাঁর সমর্থকদের নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করেন। সভায় সাজ্জাদুর বলেন, ‘আমি বিনয়ের সঙ্গে জানতে চাই, যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সভা অসাংগঠনিকভাবে হচ্ছে, আমাকে কেন জানানো হয় নাই?’ এ কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে সিদ্দিকুর রহমান চিৎকার করে বলেন, ‘সাজ্জাদ, আপনাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।’ উত্তরে সাজ্জাদুর রহমান বলতে থাকেন, ‘জয় মামার চিঠি দিয়ে যে তিনজনকে আপনি বহিষ্কারের কথা বলছেন, তাঁদের দুজনকে নিয়ে আপনি সভা করতেছেন। আপনি বলেছেন, আমার বিষয়ে আপনি দেখবেন। আপনি এভাবে অসাংগঠনিক কাজ করতে পারেন না।’ এ সময় উত্তেজিত সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগ আমার কথায় চলবে, আপনি সভা থেকে বেরিয়ে যান।’ সঙ্গে সঙ্গে দুপক্ষের মধ্যে গালাগালি, চেয়ার-ছোড়াছুড়ি শুরু হয়।
পরিস্থিতি প্রতিকূলে দেখে সিদ্দিকুর রহমান দ্রুত সভাস্থল থেকে বেরিয়ে যান। এ সময় সভাস্থল সাজ্জাদুর রহমান গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে চলে যায় এবং হট্টগোল চলতে থাকে। সভাস্থল থেকে বের হওয়ার পরপরই সিদ্দিকুর রহমান পুলিশ ডাকেন। প্রত্যক্ষদর্শীরাও ৯১১ নম্বরে কল করলে চারদিক থেকে সাইরেন বাজিয়ে অন্তত ২০ গাড়ি পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে উপস্থিত হয়। এ সময় পুরো এলাকায় ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। মেজবান রেস্তোরাঁর আশপাশের সড়ক মুহূর্তের মধ্যে খালি হয়ে যায়।
সিদ্দিকুর রহমান দলের দপ্তর সম্পাদক মোহাম্মদ আলী সিদ্দিকী ও আইন সম্পাদক শাহ বখতিয়ারকে দেখিয়ে তাঁদের গ্রেপ্তার করার জন্য পুলিশের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এ সময় অন্য পক্ষ থেকে পুলিশকে পাল্টা বক্তব্য প্রদান করলে পুলিশ ঘটনাস্থল ত্যাগে সবাইকে নির্দেশ দেয়। আধঘণ্টা পর পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলে সিদ্দিকুর রহমান আবার আলোচনা সভা শুরু করেন। এ সময় সাজ্জাদ গ্রুপের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করা হয়। ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবসের অনুষ্ঠান বানচালের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন সিদ্দিকুর রহমান। যুবলীগের দুই গ্রুপের মধ্যে দ্বিতীয় দফা সংঘর্ষ শুরু হলে তারেক ও সবুজ নামের দুজন যুবলীগ সংগঠক আহত হন। রাতভর জ্যাকসন হাইটস এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করে।
ওই দিনের ঘটনার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের জনসংযোগ-বিষয়ক সম্পাদক কাজী কয়েস প্রথম আলোকে বলেন, ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবসের আলোচনা সভা পণ্ড হওয়ার ঘটনা খুবই দুঃখজনক। যে নেতৃত্বের ব্যর্থতার কারণে এ লজ্জাজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তার দায়দায়িত্ব তাঁদেরই নিতে হবে।
দপ্তর সম্পাদক মোহাম্মদ আলী সিদ্দিকী জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নিজাম চৌধুরীর মধ্যে ব্যবসায়িক সম্পর্ক থাকা না-থাকার ওপর এখানকার অনেক সাংগঠনিক কাজ নির্ভর করে। এ চক্রের হাতে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগ বারবার লজ্জাজনক অবস্থার মধ্যে পড়েছে।
সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুর রহিম বাদশা বলেন, যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের মধ্যে ঘাপটি মেরে থাকা জামায়াত-বিএনপির সমর্থকেরা নানাভাবে দলকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করছে। কার্যকরী সদস্য হিন্দাল কাদির বাপ্পা বলেন, সিদ্দিকুর রহমান ও নিজাম চৌধুরী চক্রের হাতে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগ জিম্মি হয়ে পড়েছে। তাঁদের ব্যবসায়িক সম্পর্কটাই এখানে প্রাধান্য পাচ্ছে।
এ ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সভাপতি ড. সিদ্দিকুর রহমানের সঙ্গে প্রথম আলোর পক্ষ থেকে বেশ কয়েকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
সোমবারের সংঘর্ষের জের ধরে আওয়ামী লীগে উত্তেজনা বিরাজ করছে। দুপক্ষই পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি নিয়ে ব্যস্ত। চলছে বৈঠকি উত্তেজনা। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্রে দেশের বাইরে কোনো কমিটির কথা বলা নেই। যদিও গঠনতন্ত্রের ৬২ ধারায় বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য, আদর্শ এবং নীতিতে বিশ্বাস স্থাপন করে বিভিন্ন দেশে স্থায়ী বা অস্থায়ীভাবে বসবাসরত প্রবাসী বাঙালি জনগোষ্ঠী সংশ্লিষ্ট দেশের আইন অনুযায়ী সংগঠন করিতে পারিবে।’ এর জের ধরে কেবল নিউইয়র্কেই আওয়ামী লীগের ডজনখানেক কমিটি রয়েছে। এসব কমিটির মধ্যে কখনো ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে, কখনো পদ-পদবি নিয়ে বিরোধ আর সংঘাত লেগে আছে। যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব নিয়ে গত দুই বছরে বিরোধ অনেকটাই প্রকাশ্য। নাম প্রকাশ না করার শর্তে আওয়ামী লীগের একজন পুরোনো সংগঠক বলেছেন, বঙ্গবন্ধুর হাত ধরে শেখ ওয়াহিদরা যুক্তরাষ্ট্রে আওয়ামী লীগের সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন। সিলেট অঞ্চলের লোকজনের প্রাধান্য ছিল সব সময় যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগে। সাম্প্রতিক সময়ে এ আধিপত্যের অবসান ঘটেছে। যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের কমিটিতে সব সময় প্রেসিডেন্ট বা সেক্রেটারি পদে সিলেট অঞ্চল থেকে আসা লোকজনই ছিলেন। সবশেষ সাজ্জাদুর রহমানকে বহিষ্কার করায় সিলেট অঞ্চল থেকে আসা নেতা-কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা গেছে। সাবেক ছাত্রলীগ নেতাদের নামে আগামী রোববার জ্যাকসন হাইটসে সভা ডাকা হয়েছে। বর্তমান নেতৃত্বের বিরুদ্ধে এ সভা থেকে শক্ত অবস্থান নেওয়া হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে আওয়ামী লীগ ঘরানার লোকজনের মধ্যে বিরোধ থামছে না এবং আগামী দিনে আরও বাড়বে বলে অনেক নেতা-কর্মী মনে করেন।
এদিকে অন্যতম বড় রাজনৈতিক দল বিএনপির অবস্থাও একই। তাদের কমিটি করা নিয়ে এখানে কয়েক দফা সংঘর্ষ হয়েছে। গত বছর জুলাই মাসে সাবেক মন্ত্রী এহসানুল হক মিলনকে জ্যাকসন হাইটসে ধাওয়া দিলে তাঁকে সভাস্থল ত্যাগ করতে হয়। নিউইয়র্ক পুলিশের উপস্থিতিতে প্রকাশ্য রাজপথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছিলেন বিএনপির নেতা-কর্মীরা। বিএনপি ও তাদের অঙ্গসংগঠনের বিরোধ এমন পর্যায়ে, তারা এখন আর কোনো সভা-সমিতি ডাকতেও পারেন না।
প্রবাসে দেশের রাজনীতি ও সহিংসতা নিয়ে মন্তব্য চাওয়া হলে নিউইয়র্কে নাগরিক আন্দোলনের সংগঠক ফাহিম রেজা নূর বলেন, প্রবাসীরা যেখানেই থাকবেন, দেশের মঙ্গল কামনা করবেন। তিনি বলেন, যাঁরা দলীয় রাজনীতির নামে সহিংসতা করেন, কোন্দল-দলাদলি করেন, তাঁরা সব প্রবাসীকে বিব্রত করেন। প্রবাসীদের উচিত হবে দেশের ও প্রবাসের মূলধারার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকা।