
অনিরুদ্ধ আলম সমকালীন বাংলা কথাসাহিত্য-ভুবনে একটি আলোচিত ও উজ্জ্বল নাম। বাংলা গদ্য ও কাব্য-সাহিত্যধারায় তাঁর অনন্য লিখনশৈলীতে তিনি পরিচয় দিয়েছেন সমৃদ্ধ ও সহজবোধ্য এক-নান্দনিকতার। বাংলা শব্দের ঐশ্বর্যঋদ্ধ তাঁর বহুমাত্রিক সাহিত্য-সৃষ্টি সমকালীন বাংলা সাহিত্যে একজন শক্তিশালী কবি, চিন্তাবিদ ও লেখকের স্থানটিতে তাঁকে অবধারিতভাবে অধিষ্ঠিত করেছে। সাহিত্যের বিভিন্ন মাত্রায় ও ধারায় তিনি সাবলীল ভাষ্যে ও সাচ্ছন্দে অসাধারণ ছন্দময় গতিতে লিখে চলেছেন। তাঁর লেখক জীবনের সুদীর্ঘ পরিক্রমায় কবিতা, ছড়া, নাটিকা, ছোট গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, সায়েন্স ফিকশন, কিশোর রচনা, পরিবেশ-উন্নয়ন, সাহিত্যিক-মনীষীদের জীবনালেখ্য, মুক্তিযুদ্ধ ইত্যাদি বিবিধ বিষয়ে নানা চমৎকার সব গ্রন্থের রচয়িতা তিনি।
এ পর্যন্ত অনিরুদ্ধ আলমের রচিত ও সম্পাদিত ৪০টির বেশি বই প্রকাশিত হয়েছে দেশের বিভিন্ন স্বনামধন্য প্রকাশনা সংস্থা থেকে। অধিকাংশ বই যথেষ্ট পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে। মৌলিক রচনার পাশাপাশি তাঁর সম্পদনার কাজগুলো মননশীল পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হয়েছে। গত আগস্ট মাসে অনন্যা প্রকাশনী থেকে অনিরুদ্ধ আলমের দুটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। এর একটি হলো ‘সোনালি নৈঃশব্দ্যের হরিণাবলি’। এতে মোট সর্বাধিক চার পঙ্ক্তির ৩৪২টি অণু কবিতা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। বইটিতে লেখক চেষ্টা করেছেন মোটামুটি ছন্দের বৈচিত্র্য বজায় রাখতে। এতে ৭-মাত্রাবৃত্তের ১৩৯টি, ৬-মাত্রাবৃত্তের ১১৫টি, ৫-মাত্রাবৃত্তের ৭৭টি, ৪-মাত্রাবৃত্তের একটি, স্বরবৃত্তের একটি এবং অক্ষরবৃত্তের নয়টি অণু কবিতা রয়েছে। এত বেশি সংখ্যক অণু কবিতা নিয়ে প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ বাংলা সাহিত্যে বিরল। বইটির প্রচ্ছদ করেছেন প্রচ্ছদশিল্পী ধ্রুব এষ।
অন্য কবিতার বইটি হলো ‘প্রেম কি কেবলই পাখিপ্রবণ’। এটিরও প্রচ্ছদ করেছেন ধ্রুব এষ। এতে মোট ৩৯টি কবিতা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে সর্বাধিক ৫-মাত্রাবৃত্তের ২০টি এবং সর্বনিম্ন অক্ষরবৃত্তের একটি কবিতা রয়েছে। ১২২ পঙ্ক্তির দীর্ঘতম কবিতাটির নাম ‘ও নদী! ও মেঘ! ও পাখি!’; ৫-মাত্রাবৃত্তে লেখা। এটি খুব সম্ভবত এক পর্বের পাঁচ-মাত্রাবৃত্তে লেখা বাংলা সাহিত্যের দীর্ঘতম কবিতাগুলোর একটি। এ ছাড়া ৪-মাত্রাবৃত্তের ৩টি, ৬-মাত্রাবৃত্তের ৮টি এবং ৭-মাত্রাবৃত্তের ৭টি কবিতা এতে স্থান পেয়েছে।
গত একুশে বইমেলায় অনিরুদ্ধ আলমের দুটি কবিতার বই প্রকাশিত হয়। এর একটি কিশোর কবিতার বই। দুটি বই-ই সম্পাদনা করেছেন বিশিষ্ট অধ্যাপক, গবেষক ও লেখক হায়াৎ মামুদ। বই দুটি হলো ‘ভালবাসা প্রিয়তমাসু’ (প্রকাশক শিখা প্রকাশনী) এবং ‘অনেকটা পথ হাঁটতে হবে ঘুমিয়ে পড়ার আগে’ (প্রকাশক আরো প্রকাশনী)। ‘ভালবাসা প্রিয়তমাসু’ কাব্যগ্রন্থের ভূমিকায় অনিরুদ্ধ আলমের কবিতা সম্পর্কে বলতে গিয়ে হায়াৎ মামুদ বলেন, ‘খুবই লক্ষ করার বিষয়, তিনি আজকালকার ধাঁচে ‘গদ্যকবিতা’ লেখার চলতি বাজার ধরতে চাননি। তাঁর কবিতায় মূলত নিসর্গ-প্রেম ঘুরে–ফিরে প্রাধান্য পেয়েছে। এর মধ্য দিয়েই তিনি আমাদের জীবনের রূঢ় বাস্তবতার প্রেম ও অপ্রেমকে তুলে ধরার প্রয়াস খুঁজেছেন। অনাবশ্যকভাবে বা জোর করে কিছু দুর্বোধ্য উপমা-রূপক ব্যবহার করে কবিতার বিষয়বস্তুকে তিনি ভারাক্রান্ত করেননি। বরং অনুপ্রাসের ব্যঞ্জনায় পাঠককে বাড়তি কিছু ভালো লাগা উপহার দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। আশা করি, অনিরুদ্ধ আলমের অণু কবিতাগুলো পাঠকের কাছে সমাদর লাভ করবে। তাঁর রচনার আমি একজন উৎসাহী পড়ুয়া।’
বাংলা গদ্যের ২০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ২০০০ সালে একুশে বইমেলায় সময় প্রকাশন থেকে অনিরুদ্ধ আলমের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ‘দু শ বছরের সেরা বাংলা কিশোর গল্প’ শীর্ষক গল্প সংকলন। বইটিতে চোখ বুলালে দু শ বছর ধরে বাংলা গদ্যের গঠন, চলন, প্রবণতা ও বিষয় বৈচিত্র্যের ক্রমবিকাশ সম্পর্কে সহজেই ধারণা হয়। ১৮০০ সালে একজন ইংরেজ পণ্ডিত ও শিক্ষানুরাগী উইলিয়াম কেরির হাত ধরে বাংলা গদ্যের যাত্রা শুরু হয়। বইটিতে তাঁর লেখাসহ বর্তমানের কনিষ্ঠতম লেখকের গল্প স্থান পেয়েছে। বাংলা গদ্যের বিশিষ্ট নির্ণয়পূর্বক একটি চমৎকার তথ্যসমৃদ্ধ ভূমিকা লিখেছেন হায়াৎ মামুদ। প্রচ্ছদ ও অলংকরণ করেছেন ধ্রুব এষ।
২০০২ সালে অনিরুদ্ধ আলমের সম্পাদনায় জনপ্রিয় শিশু সাহিত্যিক আলী ইমামের ৫০টি গল্প নিয়ে প্রকাশিত হয় ‘গল্প ৫০’ শীর্ষক গল্পগ্রন্থ। প্রকাশ করে অনন্যা প্রকাশনী। একই বছরে শিখা প্রকাশনী থেকে আলী ইমাম ও অনিরুদ্ধ আলমের যৌথ সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় সায়েন্স ফিকশন সংকলন ‘বাছাই সায়েন্স ফিকশন’। তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য প্রকাশিত গ্রন্থ হচ্ছে—‘দূরের ডাক’ (ছড়া কবিতা), ‘সকলের জন্য পরিবেশ পরিবেশের জন্য সকলে’ (ছড়া নাটিকা), পিঁপড়ে (সায়েন্স ফিকশন উপন্যাস), ২৩০২ সালের ১ জানুয়ারি (ছোটগল্প), তোমাদের জন্য বাংলা বানান (বাংলা বানান বিষয়ক প্রবন্ধ), ২৪ অক্টোবর ১৯৭১ (উপন্যাসিকা), সত্যজিতের সত্য গল্প (প্রবন্ধ) ইত্যাদি।
অনিরুদ্ধ আলমের লেখক জীবনের সূচনা অল্প বয়সে, ১৯৮৫ সালে। এই বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি রফিকুল হক দাদুভাই সম্পাদিত ‘দৈনিক জনতা’ পত্রিকার চাঁদের হাট শিশুসাহিত্যের পাতায় ‘রাজা ও পাখি’ শীর্ষক ছোটগল্প প্রকাশের মাধ্যমে পত্রপত্রিকায় তাঁর লেখালেখির যাত্রা শুরু হয়। দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই সম্পাদিত ‘কচিকাঁচার আসর’ এবং দৈনিক বাংলায় সুসাহিত্যিক আফলাতুন সম্পাদিত ‘সাত ভাই চম্পা’ শিশুসাহিত্যের পাতায় নিয়মিত লিখতেন। লেখালেখির পাশাপাশি তিনি নানা শিশুসাহিত্য বিষয়ক সংগঠনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন।
লেখায় শব্দবন্ধন ও বাক্য চয়নের অনবদ্য প্রাঞ্জল প্রকাশ এবং কবিতায় গভীর জীবনবোধ সমৃদ্ধ জিজ্ঞাসা অনিরুদ্ধ আলমের সাহিত্যকর্মকে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করেছে। একই সঙ্গে কাব্যপ্রভায় ফুটে উঠেছে মানবপ্রেম, প্রকৃতি ও নৈসর্গিক রূপের অনুপম মেলবন্ধন। শব্দ বিন্যাসের সুনিপুণ দক্ষতা দিয়ে ও সুতীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতার আওতায় থেকে তিনি সৃষ্টি করেছেন সহস্রাধিক অণু কবিতা। প্রকৃতির কোল থেকে উপমা-অনুষঙ্গ সংগ্রহ করে কবিতায় সাবলীল-সুন্দর শব্দ বন্ধনের মাধ্যমে তা গেঁথে দিয়েছেন অবলীলায়। দুর্বোধ্য শব্দ চয়নের ক্ষেত্রে তিনি খুব একটা আগ্রহী নন।
শিক্ষাগত জীবনে বাংলা সাহিত্য, ইংরেজি সাহিত্য ও কম্পিউটারপ্রযুক্তি বিষয়ে অনিরুদ্ধ আলম দেশে-বিদেশে অধ্যয়ন করেছেন। বর্তমানে তিনি কানাডার টরন্টোতে স্ত্রী সানজিদা ও একমাত্র পুত্র পূর্ণকে নিয়ে বসবাস করেন। প্রবাসী এই কবি-ব্যক্তিত্ব অমায়িক, আত্মপ্রচারবিমুখ ও বিনম্র। কানাডার পত্রপত্রিকাগুলোতে তাঁর সরব উপস্থিতি দেখা যায়। পেশাগত জীবনে তিনি একজন ফ্রিল্যান্স উন্নয়ন কর্মসূচি কনসালট্যান্ট ও উন্নয়ন-যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ। কানাডার প্রবাসজীবনের ভিন্ন বাস্তবতার পরিমণ্ডলে অবস্থান করে তিনি নিয়মিতভাবে বজায় রেখেছেন বাংলা সাহিত্যচর্চা। বাংলা ভাষা সাহিত্যের প্রতি অপরিসীম ভালোবাসা ও বাঙালি ঐতিহ্য সংরক্ষণের মানবিক দায়বদ্ধতা থেকে নিয়মিত নিভৃতে একাগ্রচিত্তে কাজ করে যাওয়া এই প্রতিভাধর সাহিত্যিক ব্যক্তিত্বের আগামীর সফল পথচলায় আমার বিনম্র শ্রদ্ধা ও অফুরান শুভ কামনা।