
বেশ কিছুদিন ধরেই লক্ষ্য করছি আমার কিছু ফেসবুক বন্ধু তাঁদের ব্যক্তিগত তথ্য নিজেদের টাইমলাইনে অবলীলায় তুলে দিচ্ছেন। তাঁদের মধ্যে ন্যূনতম সচেতনতা নেই যে, তাঁর এই তথ্যগুলো একান্তই তাঁর এবং এগুলোর মধ্য দিয়েই তাঁকে শনাক্ত করা সম্ভব। এ তথ্যগুলোর মাধ্যমে তাঁর সোশ্যাল অ্যাকাউন্ট, ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টসহ ব্যক্তির গোপন সবকিছুই হ্যাক করা সম্ভব। কোনো টেলিভিশন মিডিয়া বা পত্রপত্রিকাও এ ব্যাপারে সরকারের সচেতনতামূলক কোনো বিজ্ঞাপন নেই। ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার ক্ষেত্রে সরকারেরও নেই কোনো উদ্যোগ। এ তথ্য সুরক্ষায় বাংলাদেশ সরকারের কোনো আইন এবং সে আইনে শাস্তির বিধান রয়েছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না।
বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেটের বিস্তারের ফলে অত্যাধুনিক কম্পিউটার নেটওয়ার্ক সৃষ্টি হওয়ার মাধ্যমে বর্তমান বিশ্বে এমন এক পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যেখানে বিপুল পরিমাণ ব্যক্তিগত তথ্য নিমেষেই আদান-প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে। উন্নত তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ফলে সমাজে গণসম্প্রচারের মধ্য দিয়ে ব্যক্তিগত তথ্যের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত ও সুরক্ষা অতি জরুরি।
ব্যক্তিগত তথ্য দু রকমের হয়। এক ধরনের ব্যক্তিগত তথ্য রয়েছে, যা দিয়ে একজন ব্যক্তিকে সরাসরি শনাক্ত বা চিহ্নিত করা যায়। যেমন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কোনো ব্যক্তির নাম, জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) নম্বর, মা ও বাবার নাম, জন্ম তারিখ বা যেকোনো বায়োমেট্রিক রেকর্ড যেমন আঙুলের ছাপ ইত্যাদি। উপরিউক্ত এই তথ্যগুলো একজন ব্যক্তিকে সরাসরি চিহ্নিত বা শনাক্ত করতে সক্ষম। আরেক ধরনের তথ্য রয়েছে, যেগুলো লিংকেবল বা লিংকযোগ্য। একটি তথ্যের সঙ্গে আরেকটি সংযুক্ত করে কাউকে শনাক্ত করা যায় এসব তথ্যের মাধ্যমে। এই তথ্যগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ড্রাইভিং লাইসেন্স, মেডিকেল তথ্য, ফিন্যান্সিয়াল তথ্য, ক্রেডিট কার্ড, চাকরির তথ্য, শিক্ষাসংক্রান্ত তথ্য ইত্যাদি। এই তথ্যগুলো একটির সঙ্গে আরেকটি জুড়ে একজন মানুষকে শনাক্ত বা চিহ্নিত করা সম্ভব। একজন ব্যক্তির জন্য এই তথ্যগুলো খুবই গোপনীয় এবং একান্ত ব্যক্তিগত। এই তথ্যগুলো জনসম্মুখে প্রচার খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। এগুলোর জন্য ইন্টারনেটে হ্যাকাররা বসে থাকে এবং সুযোগ পেলেই তারা এই তথ্যগুলোর মাধ্যমে ব্যক্তির যেকোনো কিছু হ্যাক করতে পারে।
উন্নত বিশ্বে ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষায় কঠোর আইন এবং সে আইনের প্রয়োগ রয়েছে। রয়েছে যথাযথ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা। বিশেষ করে সরকারি কর্মকাণ্ডে ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবস্থাপনায় রয়েছে বিশেষ উদ্যোগ। ব্যক্তিগত তথ্য কে ব্যবহার করতে পারবে, কীভাবে ব্যবহার করতে হবে এবং সঠিকভাবে ব্যবহার না করলে তার শাস্তি কী হবে ইত্যাদি নীতিমালা কঠোরভাবে অনুসৃত হয় এবং নিয়মিত মনিটর করা হয়।
জনগণের অর্থে পরিচালিত গণসম্প্রচার সংস্থা হিসেবে জাপান ব্রডকাস্টিং করপোরেশন (এনএইচকে) দর্শক-শ্রোতাদের ব্যক্তিগত তথ্যের গুরুত্ব সম্পর্কে অবহিত করার পাশাপাশি সবাইকে এ বিষয়ে সতর্ক হতে সচেতন করে তোলে। দর্শক-শ্রোতাদের ব্যক্তিগত তথ্যের যথাযথ ব্যবহার এনএইচকের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এনএইচকে ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইন (২০০৩ সালের ৫৭ নম্বর আইন) এবং ব্যক্তিগত তথ্য সংক্রান্ত অন্যান্য আইন ও বিধি মেনে চলতে এবং এনএইচকের নিজস্ব বিধি অনুযায়ী ব্যক্তিগত তথ্যের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই লক্ষ্যে এনএইচকে তাদের কর্মীদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেয়। এনএইচকের এই দৃষ্টান্ত বাংলাদেশ সরকারের অনুসরণ করা উচিত। একই সঙ্গে বাংলাদেশের গণমাধ্যমেও বিষয়টির গুরুত্ব তুলে ধরা জরুরি।
বাংলাদেশের সংবিধানের মৌলিক অধিকার অংশের ৪৩ (খ) অনুচ্ছেদে ‘আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসংগত বিধিনিষেধ সাপেক্ষে’ নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বা ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার জন্য সুনির্দিষ্ট আইন নেই। তবে আইনের চেয়েও জরুরি এ বিষয়ে জনসচেতনতা। কিন্তু সেটিও নেই। ফলে অনেক ক্ষেত্রে কেউ বুঝতেই পারছে না কখন কোথায় কেমন করে ব্যক্তিগত তথ্য চলে যাচ্ছে অন্যের হাতে বা হ্যাকারের হাতে। ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার জন্য আইন প্রণয়নের প্রয়োজন রয়েছে। তবে আইনের পাশাপাশি নৈতিকতার উন্নয়ন ও আইনের প্রয়োগ জরুরি।
পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই এই বিষয়ে আইন রয়েছে, রয়েছে আইনের প্রয়োগ। আমেরিকা, ইউরোপ, জাপান ও কোরিয়ায় এমন আইনের যথাযথ প্রয়োগের ফলে অনেক উপকৃত হয়েছে, যা বিশ্বব্যাপী ব্যাপক আলোচনা ও সচেতনতার জন্ম দিয়েছে। বাংলাদেশেও এই সচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি। দিন যত যাচ্ছে জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাস মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে সারা বিশ্বে। ধর্মীয় উন্মাদনা ছড়িয়ে হত্যায় লিপ্ত হচ্ছে কিছু গোষ্ঠী। সম্প্রতি বাংলাদেশের ভোলায় ঠিক এমন একটি ঘটনাই ঘটেছে, যেখানে চারজন নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন অনেকে। এ থেকে রক্ষার উপায় ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইন, আইনের প্রয়োগের পাশাপাশি নৈতিকতার উন্নয়নের মধ্যে রয়েছে। ব্যক্তিগত তথ্যের ক্ষেত্রে জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও নিয়মিত মনিটরিং জরুরি। তথ্যপ্রযুক্তি সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উন্নত হচ্ছে। আসছে নতুন নতুন প্রযুক্তি। এর সঙ্গে পাল্লা দিতে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলো হিমশিম খাচ্ছে। একদিকে এই প্রযুক্তির সীমাহীন সম্ভাবনা আমাদের আকৃষ্ট, অন্যদিকে এর ক্ষতিকর দিকগুলো আমাদের বিব্রত করছে। আমাদের দেশের ইন্টারনেট নিরাপত্তা নিয়ে উন্নত দেশগুলো সন্তুষ্ট নয়। ফলে এদিকে মনোযোগ দেওয়া দরকার। সরকার যত দ্রুত এ বিষয়গুলোর প্রতি নজর দেবে তত দ্রুতই হয়তো ভোলার মতো ঘটনা এড়ানো সম্ভব হবে।