
যুক্তরাষ্ট্রের গুপ্তচরেরা মাসের পর মাস ধরে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোর প্রতিটি পদক্ষেপের ওপর নজর রেখেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা বলেন, এ কাজে যুক্ত ছিল ছোট্ট একটা দল, যার মধ্যে ভেনেজুয়েলার সরকারে থাকা একটি সূত্রও সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিল, যাদের কাজ ছিল মাদুরো কোথায় ঘুমান, কী খান, কী পরেন, রোজ কী কী কাজ করেন—এসব কিছু নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণ করা।
এরপর ডিসেম্বরের শুরুতে ‘অপারেশন অ্যাবসোলিউট রিসোলভ’ নামে এক মিশনের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়।
এটি ছিল বহু মাস ধরে করা সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম পরিকল্পনা আর অনুশীলনের (রিহার্সাল) ফল, যাতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল মার্কিন সেনাবাহিনীর এলিট শাখা ডেলটা ফোর্সকে। অভিজাত এ বাহিনীর সদস্যরা মাদুরোর প্রাসাদের সমান আকারের একটি মডেল বানিয়ে অনুশীলন করেছেন।
এ পরিকল্পনা, যাকে বলা হচ্ছে স্নায়ুযুদ্ধের পর লাতিন আমেরিকায় সবচেয়ে বড় মার্কিন সামরিক অভিযান, তা ছিল চূড়ান্ত গোপনীয়।
মার্কিন কংগ্রেসকে এ পরিকল্পনার বিন্দুবিসর্গ জানানো হয়নি, ভেনেজুয়েলায় হামলার আগে কোনো আলোচনাও হয়নি।
পরিকল্পনার খুঁটিনাটি নিখুঁত পর্যালোচনার পর শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের অপেক্ষা করতে হচ্ছিল অভিযান শুরুর সর্বোত্তম পরিস্থিতির জন্য।
শনিবার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তাঁরা আচমকা হামলা চালিয়ে ভেনেজুয়েলাকে বিস্মিত করে দেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন।
চার দিন আগে যখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিযানের অনুমোদন দিয়েছিলেন, ভালো আবহাওয়া থাকবে, এমন সময়ে অভিযানের জন্য অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেন কর্মকর্তারা।
যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা জেনারেল ড্যান কেইন শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, বড়দিন এবং নতুন বছরের পুরো সপ্তাহজুড়ে মার্কিন সেনাবাহিনীর সদস্যরা প্রস্তুত ছিলেন, ধৈর্য ধরেছেন সঠিক সময়ের জন্য এবং অভিযান শুরু করতে প্রেসিডেন্টের নির্দেশের জন্য অপেক্ষা করেছেন।
শেষ পর্যন্ত শুক্রবার রাত ১০টা ৪৬ মিনিটে প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে অভিযান শুরুর নির্দেশ আসে।
‘আমরা এটা করতে যাচ্ছিলাম চার দিন আগে, তিন দিন আগে, দুই দিন আগে—তারপর হঠাৎ করেই সবকিছু (পরিকল্পনার সঙ্গে) মিলে গেল এবং আমরা সঙ্গে সঙ্গে বললাম, শুরু’—ভেনেজুয়েলায় মধ্যরাতে অভিযান চালানোর পর শনিবার এক টেলিভিশন অনুষ্ঠানে ট্রাম্প নিজেই এ কথা বলেন।
ট্রাম্পের নির্দেশ এসেছিল এমন সময়, যখন কারাকাসে মধ্যরাত শুরু হয়েছে। ফলে মার্কিন সেনাবাহিনী অভিযানের বড় অংশটি রাতের অন্ধকারেই চালাতে পেরেছে।
ভেনেজুয়েলার জল, স্থল আর আকাশসীমায় ২ ঘণ্টা ২৪ মিনিটের সেই ক্ষিপ্র অভিযান ওয়াশিংটন ও বিশ্বের বহু মানুষকেই চমকে দিয়েছে।
অভিযানের মাত্রা এবং নির্ভুল নিশানা—এটি ছিল কার্যত নজিরবিহীন।
অভিযানের সময় ট্রাম্প ওয়াশিংটনের সিচুয়েশন রুম থেকে তা দেখেননি। বরং তিনি ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের পাম বিচে মার-এ-লাগো ক্লাবে বসে সিআইএ পরিচালক জন র্যাডক্লিফ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে পাশে বসিয়ে নিজের উপদেষ্টাদের সঙ্গে নিয়ে অপারেশনের লাইভ স্ট্রিম দেখেছেন।
শনিবার ট্রাম্প বলেন, ‘অভিযান দেখাটা ছিল এক অবিশ্বাস্য ব্যাপার। আপনি যদি দেখেন, কী ঘটছে, মানে আমি দেখছিলাম যেন-বা এটা একটা টেলিভিশন শো। আপনি যদি এর গতি আর সহিংসতা দেখতেন...দারুণ একটা ব্যাপার, ওরা (সামরিক বাহিনী) একটা অসাধারণ কাজ করেছে।’
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ওই অঞ্চলে হাজার হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন করা হয়েছে, সঙ্গে একটি বিমানবাহী রণতরী এবং কয়েক ডজন যুদ্ধজাহাজ যুক্ত করে সাম্প্রতিক কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় সামরিক প্রস্তুতি নিতে দেখা গেছে যুক্তরাষ্ট্রকে।
ট্রাম্প প্রশাসন বহুদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে যে মাদুরো সরকার যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধভাবে মাদক ও অপরাধ চক্রের সদস্য পাঠাচ্ছে।
গত কয়েক মাসের মধ্যে এ অঞ্চলে মাদক পরিবহনের অভিযোগে কয়েক ডজন ছোট নৌকায় হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
কিন্তু প্রাথমিকভাবে ‘অপারেশন অ্যাবসোলিউট রিসোলভ’-এর পরিকল্পনা ছিল আকাশপথেই অভিযান চালানো। মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সারা রাতে বোমারু বিমান, যুদ্ধবিমান, নজরদারি করার বিমানসহ দেড় শতাধিক উড়োজাহাজ মোতায়েন করা হয়েছিল অভিযানে।
ট্রাম্প ফক্স নিউজকে বলেন, ‘এটা খুব জটিল, খুবই জটিল, পুরো কৌশল, ল্যান্ডিং, বিমানসংখ্যা—সবকিছু মিলে। প্রতিটি সম্ভাব্য পরিস্থিতির জন্য আমরা একটি করে যুদ্ধবিমান প্রস্তুত রেখেছিলাম।’
রাত দুইটার দিকে কারাকাসে বিস্ফোরণের বিকট আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল এবং দূর থেকে শহরের ওপরে ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা যেতে থাকে।
সাংবাদিক আনা ভ্যানেসা হেরেরো বিবিসিকে বলেন, ‘আমি একটা বড় শব্দ শুনলাম, বিকট একটা আওয়াজ। বাড়ির সব কটা জানালা নাড়িয়ে দিয়েছিল। এরপরই দেখলাম, একটা ধোঁয়ার কুণ্ডলী জানালার সামনের পুরো অংশটা যেন ঢেকে দিল।
‘পুরো শহরে বিমান আর হেলিকপ্টার উড়ছিল তখন,’ বলেন তিনি।
এরপরই আকাশে অসংখ্য বিমান ওড়ার ছবি আর ভিডিও এবং বিস্ফোরণের পরের অবস্থাসংক্রান্ত ভিডিওতে ভরে যায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো।
এ রকম একটি ভিডিওতে দেখা যায়, বিস্ফোরণের ফলে সৃষ্ট ধোঁয়ার মধ্য দিয়ে কারাকাসের আকাশের অনেক নিচু সীমা দিয়ে হেলিকপ্টারের বহর উড়ে যাচ্ছে।
কারাকাসের প্রত্যক্ষদর্শী দ্যানিয়েলা বিবিসিকে বলেন, ‘বিস্ফোরণের শব্দে এবং বিমান চলার তুমুল যান্ত্রিক শব্দে রাত ১টা ৫৫ মিনিটে আমার ঘুম ভেঙে যায়। সবকিছু অন্ধকারের মধ্যে ঘটছিল, হঠাৎ ফ্লাশের মতো আলোর ঝলকানি উঠছিল, যখন কাছাকাছি কোথাও বিস্ফোরণ হচ্ছিল।
‘প্রতিবেশীরা সবাই বিল্ডিংয়ের গ্রুপ চ্যাটে একের পর এক মেসেজ করছিল, সবাই দ্বিধাগ্রস্ত, কেউ বুঝতে পারছে না কী হচ্ছে! বিস্ফোরণের শব্দে সবাই আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে’, বলেন তিনি।
ঠিক কোন স্থাপনাগুলোতে হামলা চালানো হয়েছে, সেটি চিহ্নিত করার জন্য বিবিসি ভেরিফাই কারাকাসের কাছাকাছি বিস্ফোরণ, আগুন ও ধোঁয়ার বেশ কিছু ভিডিও যাচাই করে দেখেছে।
এখন পর্যন্ত জেনেরালিসিমো ফ্রান্সিসকো ডে মিরান্ডা বিমানঘাঁটি, লা কারতোলা নামের একটি এয়ারফিল্ড এবং ক্যারিবীয় সাগরের সঙ্গে কারাকাসের প্রধান প্রণালি পোর্ট লা গুয়াইরাসহ মোট পাঁচটি জায়গার ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পেরেছে বিবিসি।
মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অভিযানের কয়েকটি লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ছিল ভেনেজুয়েলার আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং অন্যান্য সামরিক স্থাপনা।
অভিযানের সময় কারাকাসের বিদ্যুৎ–সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার পরামর্শও দিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, যদিও ঠিক কীভাবে, সেটি নির্দিষ্ট করেননি।
‘বিশেষ প্রক্রিয়ায় কারাকাসের বেশির ভাগ আলো নিভিয়ে রেখেছিলাম আমরা। ফলে অন্ধকার ছিল এবং এক প্রাণঘাতী রাত ছিল এটি’, বলেন ওই কর্মকর্তা।
কারাকাসের চারপাশে হামলা শুরুর পর, মার্কিন বাহিনী শহরের মধ্যে ঢুকে পড়ে।
বিবিসির যুক্তরাষ্ট্রের পার্টনার সিবিএসকে কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে, ওই বাহিনীর সঙ্গে ছিল সামরিক বাহিনীর এলিট ফোর্স ‘ডেলটা ফোর্স’, এটি মূলত মার্কিন বাহিনীর বিশেষ অভিযান পরিচালনার শীর্ষ বাহিনী।
তারা ছিল নানা রকম সর্বাধুনিক মারণাস্ত্রে সজ্জিত—সঙ্গে ছিল ব্লোটর্চ নামের একধরনের আগুনবাহী সিলিন্ডার, যদি মাদুরোর প্রাসাদে কঠোর নিরাপত্তা ঘেরাটোপের মধ্যে কোনো ধাতব দেয়াল বা দরজা কেটে ফেলতে হয়, তার প্রস্তুতি হিসেবে ওই অস্ত্র নেওয়া হয়।
জেনারেল কেইন জানিয়েছেন, স্থানীয় সময় রাত ২টা ১ মিনিটে অভিযান শুরুর কিছুক্ষণ পরই মাদুরোর অবস্থানে পৌঁছে যায় মার্কিন বাহিনী।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মাদুরোর সেফ হাউসকে কারাকাসের মাঝখানে এক ‘নিশ্ছিদ্র সামরিক দুর্গ’ বলে বর্ণনা করেন। ‘তারা যেন আমাদের জন্য তৈরি হয়েই ছিল। তারা জানত যে আমরা আসছি’, বলেন তিনি।
মার্কিন বাহিনী পৌঁছানোর পর তাদের সঙ্গে ভেনেজুয়েলার সেনাদের লড়াই হয় এবং একটি আমেরিকান হেলিকপ্টারেও হামলা চালানো হয়। যদিও তারপরও সেটি উড়তে পারছিল।
জেনারেল কেইন বলেন, মার্কিন বাহিনী এরপর মাদুরোর প্রাসাদ প্রাঙ্গণে নেমে তীব্রগতিতে, যথাযথভাবে এবং শৃঙ্খলার সঙ্গে এগিয়ে যায়।
এরপর তার প্রাসাদের ঢুকে পড়ে এবং এমন জায়গায় ঢুকে পড়ে, যা আসলে ভাঙা সম্ভব ছিল না। মানে সেখানে ছিল স্টিলের দরজা—যা কেবল এমন পরিস্থিতির জন্যই বসানো হয়েছিল, বলেন ট্রাম্প।
ওই অভিযানে মাদুরোর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকেও আটক করা হয়েছে, সেটি শুরুর পরপরই পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও দেশটির আইনপ্রণেতাদের এ পদক্ষেপ সম্পর্কে জানাতে শুরু করেন এবং এ সিদ্ধান্ত নিয়ে ইতিমধ্যেই কংগ্রেসের কয়েকজন সদস্য ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
সিনেটে ডেমোক্রেটিক পার্টির শীর্ষ নেতা চাক শুমার বলেন, ‘আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই, নিকোলা মাদুরো একজন অবৈধ স্বৈরশাসক। কিন্তু কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া এবং পরবর্তী সময়ে কী হবে, তার জন্য একটি বিশ্বাসযোগ্য পরিকল্পনা ছাড়াই সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া রীতিমতো বেপরোয়া পদক্ষেপ।’
ট্রাম্প বলেন, মাদুরোর বাড়ির প্রাঙ্গণে, অভিজাত ডেলটা ফোর্সের সেনারা যখন ঢুকছিলেন, তখন ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট একটি নিরাপদ কক্ষে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।
তিনি একটি নিরাপদ স্থানে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু সেটি নিরাপদ ছিল না। কারণ, ওই দরজা মাত্র ৪৭ সেকেন্ডের মধ্যে উড়িয়ে দেওয়া হতো, বলেন ট্রাম্প।
শনিবার স্থানীয় সময় ভোররাত ৪টা ২০ মিনিট নাগাদ মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে একটি হেলিকপ্টার ভেনেজুয়েলার ভূখণ্ড ত্যাগ করে। পরে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনেজুয়ালার প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে গ্রেপ্তারের খবর আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন।
* লেখক: গ্যারেথ ইভানস, ওয়াশিংটন