মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প

বিশ্লেষণ

ট্রাম্পের ‘শান্তি পর্ষদে’ যোগ দিতে মিত্রদের অনীহা কেন

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শান্তি পর্ষদ (বোর্ড অব পিস) থেকে দূরে থাকছে গুরুত্বপূর্ণ মিত্রদেশগুলো। তাঁর ঘনিষ্ঠ বিশ্বনেতা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ—কেউই এতে খুব একটা উৎসাহ দেখাচ্ছেন না।

গত বছর জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের এক প্রস্তাবের মাধ্যমে এই পর্ষদ গঠিত হয়েছিল, যার মূল লক্ষ্য ছিল গাজা শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন। কিন্তু ধীরে ধীরে এটি ট্রাম্পের ব্যক্তিগত খামখেয়ালির কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে বলেই মনে করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে মার্কিন প্রেসিডেন্ট যখন তখন অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার সুযোগ পেয়ে যেতে পারেন।

চলতি মাসের শেষ দিকে ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন এই শান্তি পর্ষদের প্রথম বৈঠক হবে। এতে বিশ্বের প্রভাবশালী পশ্চিমা দেশগুলোর অধিকাংশই অংশ নিচ্ছে না। ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাজ্য ও কানাডার মতো যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্ররাও এই বোর্ড থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

মূলত এই শান্তি পর্ষদের যে সনদ তৈরি করা হয়েছে, সেটিই দেশগুলোকে পিছু হটতে বাধ্য করেছে। সেই সনদে ট্রাম্পকে একাধারে বিচারক, জুরি, দণ্ডদানকারী, অর্থ নিয়ন্ত্রক এমনকি গ্রাফিক ডিজাইনার হিসেবেও অভিহিত করা হয়েছে—অর্থাৎ তিনি যা চাইবেন, তা-ই করতে পারবেন।

গত জানুয়ারিতে এই পর্ষদ সম্পর্কে এক বক্তৃতায় ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘বিশ্বের ইতিহাসে অন্যতম প্রভাবশালী সংস্থায় পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এই বোর্ডের।’

পর্ষদে কারা থাকছে

গত নভেম্বরে পর্ষদ গঠনের পর ডোনাল্ড ট্রাম্প এতে যোগ দিতে প্রায় ৬০টি দেশকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। তবে এখন পর্যন্ত আলবেনিয়া, আর্জেন্টিনা, আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, বাহরাইন, বেলারুশ, বুলগেরিয়া, মিসর, হাঙ্গেরি, ইন্দোনেশিয়া, ইসরায়েল, জর্ডান, কাজাখস্তান, কসোভো, মঙ্গোলিয়া, মরক্কো, পাকিস্তান, প্যারাগুয়ে, কাতার, সৌদি আরব, তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, উজবেকিস্তান ও ভিয়েতনাম এতে আগ্রহ দেখিয়েছে। তবে পর্ষদে যোগ দেওয়া দেশগুলোর মধ্যে গণতান্ত্রিক দেশ খুব কম।

জাতিসংঘের প্রতিদ্বন্দ্বী

গত বছর ট্রাম্পের ২০ দফার গাজা শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন থেকে এ শান্তি পর্ষদের পরিকল্পনা করা হয়। তবে ট্রাম্পের লক্ষ্য এখন কেবল গাজা পরিস্থিতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। প্রকৃতপক্ষে এই পর্ষদের সনদে এর লক্ষ্য ও সাংগঠনিক কাঠামো বর্ণনা করা হয়েছে—সেখানে ‘গাজা’ শব্দটির একবারও উল্লেখ নেই।

জাতিসংঘের আগের ঘোষণার সঙ্গে পর্ষদের সনদে মিল নেই। সম্ভবত জাতিসংঘ এমন কোনো শান্তি সংস্থার কথা কল্পনাও করেনি, যার আজীবন চেয়ারম্যান থাকবেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

বোর্ডের সনদে বলা হয়েছে, চেয়ারম্যানের পদ কেবল তখনই শূন্য হবে যদি তিনি নিজে পদত্যাগ করেন কিংবা বোর্ড তাঁকে সর্বসম্মতিক্রমে ‘অযোগ্য’ ঘোষণা করে। যেকোনো সংস্থায় ট্রাম্প নিজের আধিপত্য বিস্তার করতে চাইবেন, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। তবে বিশ্বনেতাদের চমকে দিয়েছে অন্য একটি বিষয়—জাতিসংঘের সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে তিনি যেভাবে এই ‘শান্তি পর্ষদকে’ দাঁড় করাচ্ছেন।

মিত্রদের অনীহার কারণ

পর্ষদের সদস্য হতে হলে যেকোনো দেশকে গুনতে হবে ১০০ কোটি ডলার। সনদে বলা হয়েছে, এই সংস্থা ‘সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করবে’। একে জাতিসংঘের প্রতি প্রকাশ্য কটাক্ষ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। ইতিমধ্যেই অনেক দেশ এর বিরুদ্ধে মুখ খুলেছে। ফ্রান্স এই সংস্থায় যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। ফরাসি কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, এটি জাতিসংঘের কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটাবে।

পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে ট্রাম্পের খামখেয়ালি আচরণ ও আবেগপ্রবণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ইতিহাস বেশ পুরোনো। কানাডার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বে তিনি দুই দেশের সংযোগকারী সেতু বন্ধের হুমকি দিয়েছেন। এমন একজনের হাতে বিশ্বশান্তির চাবিকাঠি ছেড়ে দেওয়া কি ঠিক হবে? এমন প্রশ্নে দ্বিধায় পড়ে গেছেন ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্ররাও।