
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত ৩ ফেব্রুয়ারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘোষণা দেন, ভারতের অধিকাংশ পণ্যের ওপর আরোপ করা ৫০ শতাংশ শুল্ক অবিলম্বে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাঁর এ ঘোষণায় ভারতীয় ব্যবসায়ীরা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেন।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে পোস্টে ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানান। পোস্টে তিনি লেখেন, ‘এ চমৎকার ঘোষণার জন্য ১৪০ কোটি ভারতীয় জনগণের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে অনেক ধন্যবাদ।’
কিন্তু ওয়াশিংটন থেকে এ সপ্তাহে আসা নতুন ঘোষণা মোদির আগের আনন্দে জল ঢেলে দিয়েছে। ভারতের ওপর আরোপ করা শুল্ক ৫০ থেকে কমিয়ে ১৮ শতাংশে এনেছে ওয়াশিংটন। এতে করে ভারতের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক এখন এশিয়ার অন্যান্য প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে এক কাতারে নেমে এসেছে। কিন্তু এ সুবিধার কারণে ভারতের বাণিজ্য ও বিদেশনীতি–সংক্রান্ত সম্ভাব্য খরচ বাড়ছে; যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে আগামী পাঁচ বছরে ৫০ হাজার কোটি ডলার সমমূল্যের পণ্য কিনতে সম্মত হয়েছে ভারত। ফলে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভারতের আমদানি প্রায় দ্বিগুণ বাড়বে। এটা নিয়ে ভারতে প্রশ্ন উঠেছে।
নয়াদিল্লি ও ওয়াশিংটন আগামী মার্চ মাসের কোনো এক সময় বাণিজ্য চুক্তিতে সই করবে।পীযূষ গোয়েল, ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী
ভারতের কৃষকদের আশঙ্কা, বিপুল পরিমাণে মার্কিন পণ্য আমদানি হলে তাঁদের জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচিত চুক্তিতে সই না করার দাবিতে তাঁরা ধর্মঘটের পরিকল্পনা করেছেন।
ভারতের পার্লামেন্টের বিরোধী দল অভিযোগ করেছে, চুক্তির শর্তগুলো দেশের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে একধরনের বড় আপোস। এতে গুরুত্বপূর্ণ বাজারগুলো অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়বে এবং ডিজিটাল বাণিজ্য নীতিমালার ওপর ভারতের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হবে। এদিকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মন্ত্রিসভার সদস্যরা চুক্তির নতুন শর্ত নিয়ে মৌলিক প্রশ্নের জবাব দিতে রাজি হননি।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের দুই নেতার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টের পর কয়েক দিন একধরনের উচ্ছ্বাস ও আশাবাদের জোয়ার দেখা গিয়েছিল। গত গ্রীষ্মে ট্রাম্প ভারতের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন। পরে রাশিয়া থেকে জ্বালানি তেল কেনার ‘শাস্তি’ হিসেবে তা দ্বিগুণ করা হয়। ফলে দুদেশের সম্পর্কে একধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়। কিন্তু ট্রাম্প ও মোদির সাম্প্রতিক পোস্টের পর সেই অচলাবস্থার অবসান হয়েছে বলে ধারণা করা হয়েছিল।
ভারতের কৃষকদের আশঙ্কা, বিপুল পরিমাণে মার্কিন পণ্য আমদানি হলে তাঁদের জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই তাঁরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই চুক্তিতে সই না করার দাবিতে ধর্মঘটের পরিকল্পনা করেছেন।
নতুন চুক্তির শর্ত ঘোষণার পর ভারতের শেয়ারবাজারের সূচক ৩ শতাংশ এবং ডলারের বিপরীতে রুপির মানও কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। ভারতের শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিগুলোর ইতিবাচক প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে সুর মিলিয়ে দেশটির মাহিন্দ্রা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অনীশ শাহ এক বিবৃতিতে লিখেছেন, ‘এ চুক্তি ভারতের প্রবৃদ্ধির আকাঙ্ক্ষায় এক অর্থবহ গতি যোগ করেছে।’
ভারতের প্রবৃদ্ধি আগে থেকে বেশ ভালো ছিল। অতিরিক্ত শুল্কের চাপে পড়ে গত কয়েক মাসে মোদি সরকার কর ব্যবস্থা ও শ্রম আইন সহজ করতে একগুচ্ছ সংস্কার পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করে। রেটিং সংস্থা ফিচ সলিউশনসের ইউনিট ‘বিএমআই’ পূর্বাভাস দিয়েছে, এসব উদ্যোগ ভারতকে ‘আরও একটি প্রান্তিকে দুর্দান্ত অর্থনৈতিক পারফরম্যান্সের দিকে ক্রমে এগিয়ে নিচ্ছে।’
গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতীয় মধ্যস্থতাকারীরা একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করেছেন। এতে দুপক্ষের অন্তর্বর্তী চুক্তির বিষয় নিশ্চিত করা হয়েছে। ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল জানিয়েছেন, তাঁর আশা নয়াদিল্লি ও ওয়াশিংটন আগামী মার্চ মাসের কোনো এক সময় প্রস্তাবিত বাণিজ্য চুক্তিতে সই করবে।
বিদেশ থেকে ডাল আমদানি করা আনন্দের বিষয় নয়; বরং লজ্জার।শিবরাজ সিং চৌহান, ভারতের কৃষিমন্ত্রী
যৌথ বিবৃতিতে রাশিয়ার নাম উল্লেখ করা হয়নি। ভারতকে রুশ অপরিশোধিত জ্বালানি তেল কেনা বন্ধ করতে হবে, এমন কোনো কথাও ছিল না। সবচেয়ে কাছাকাছি যে ইঙ্গিতটি পাওয়া যায় তা হলো, ‘অর্থনৈতিক নিরাপত্তায় সমন্বয়ের’ প্রতিশ্রুতি। পাশাপাশি বলা হয়, আগামী পাঁচ বছরে ভারত ৫০ হাজার কোটি ডলারের মার্কিন পণ্য কেনার যে অঙ্গীকার করেছে, তাতে জ্বালানি পণ্যও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
তবে হোয়াইট হাউসের ফ্যাক্ট শিটে বিষয়টি স্পষ্ট করে বলা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করার ব্যাপারে ভারতের অঙ্গীকারের স্বীকৃতি হিসেবে শাস্তিমূলক শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়েছে।
কিন্তু ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জ্বালানিমন্ত্রী এ–সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর দেননি।
২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেনে সামরিক অভিযান শুরু করার পর থেকে ভারত নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ প্রতিরক্ষা সম্পর্ক রয়েছে। পাশাপাশি সামরিক জোট এড়িয়ে চলার দীর্ঘদিনের একটি ঐতিহ্যও দেশটির রয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ঐতিহাসিক বাণিজ্য চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের কৃষক, শ্রমিক ও শিল্প খাতের জন্য স্পষ্ট বিজয়।
শুধু তেল কেনা-সংক্রান্ত বক্তব্যই ভারতীয়দের উদ্বিগ্ন করেনি। ওয়াশিংটন ও নয়াদিল্লির যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা কৃষিপণ্য এবং আরও কয়েকটি খাতে ভারত শুল্ক কমাবে। কৃষিপণ্যের মধ্যে ‘তাজা ও প্রক্রিয়াজাত ফল, সয়াবিন তেলও’ রয়েছে।
কিন্তু হোয়াইট হাউসের ফ্যাক্ট শিটে ফল ও সয়াবিন তেলের মাঝখানে চুপিসারে এক শব্দগুচ্ছ ঢোকানো হয়। তা হলো ‘নির্দিষ্ট কিছু ডাল’। ভারতের কাছে এই দুটি অতিরিক্ত শব্দের গুরুত্ব অনেক। এখানে ‘নির্দিষ্ট কিছু ডাল’ বলতে বিভিন্ন ধরনের শুকনো দানাশস্য বোঝানো হয়েছে; যা ডাল রান্নার মূল উপাদান ও দেশটির খাদ্যতালিকায় প্রোটিনের প্রধান উৎস।
সম্প্রতি ভারতের কৃষিমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহান বিভিন্ন ধরনের ডালে স্বনির্ভরতা নিয়ে একটি নতুন নীতি ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘বিদেশ থেকে ডাল আমদানি করা আনন্দের বিষয় নয়; বরং লজ্জার।’
চৌহান একই অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিকে সমর্থন করে বলেন, এটি এমন একটি চুক্তি; যা ভারতীয় কৃষকদের স্বার্থ সুরক্ষিত রাখবে।
নতুন চুক্তির শর্ত ঘোষণার পর ভারতের শেয়ারবাজারের সূচক ৩ শতাংশ ও ডলারের বিপরীতে রুপির মানও কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে।
গত বুধবার হোয়াইট হাউসের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ফ্যাক্ট শিটে পরিবর্তন দেখা গেছে। সেখান থেকে ‘নির্দিষ্ট কিছু ডাল’ শব্দগুচ্ছ সরিয়ে ফেলা হয়েছে। আরও কিছু বিষয় সম্পাদনা করা হয়েছে। আগের নথিতে বলা হয়েছিল, ভারত ৫০ হাজার কোটি ডলার সমমূল্যের মার্কিন পণ্য কেনার বিষয়ে ‘অঙ্গীকার করেছে’। পরে তা বদলে লেখা হয়েছে, ভারত তা কেনার ‘ইচ্ছা প্রকাশ করেছে’।
হোয়াইট হাউসের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ঐতিহাসিক বাণিজ্য চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের কৃষক, শ্রমিক ও শিল্প খাতের জন্য স্পষ্ট বিজয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা আশা করি, সব বাণিজ্য অংশীদার তাদের চুক্তির অঙ্গীকার রক্ষা করবে।’