স্যাটেলাইট চিত্রে খারগ দ্বীপে একটি তেলের টার্মিনাল দেখা যাচ্ছে। ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
স্যাটেলাইট চিত্রে খারগ দ্বীপে একটি তেলের টার্মিনাল দেখা যাচ্ছে। ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

পারস্য উপসাগরের ছোট্ট খারগ দ্বীপে কেন নজর পড়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ চলছে। এর মধ্যে ইরান উপকূলের কাছে অবস্থিত একটি ছোট দ্বীপের দিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের নজর পড়েছে।

এটি হলো খারগ দ্বীপ। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালির উত্তর-পশ্চিমে ৭ দশমিক ৭ বর্গমাইল এলাকাজুড়ে দ্বীপটি বিস্তৃত।

আকারে ছোট হলেও ইরানের অপরিশোধিত তেল রপ্তানির প্রায় ৯৪ শতাংশ এ দ্বীপ থেকে হয়। এর বড় অংশই যায় চীনে। ইরানের মূল তেল রপ্তানি টার্মিনালটির অবস্থানও এ দ্বীপে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের তথ্য বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনিক কর্মকর্তারা এই গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপটি দখলের বিষয়ে আলোচনা করেছেন।

ছোট এ দ্বীপ দখলে চলে গেলে ইরানের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং এর ধ্বংসাত্মক প্রভাব দীর্ঘদিন থেকে যেতে পারে।

ইউরোপের রয়েল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের জলবায়ু, জ্বালানি ও প্রতিরক্ষাবিষয়ক গবেষক পেট্রাস কাটিনাস বলেছেন, ‘দ্বীপটি দখলে চলে গেলে ইরানের তেল সরবরাহের মূল উৎসরেখা নষ্ট হয়ে যাবে। ইরানের শাসকগোষ্ঠীর কাছে এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়।’

কাটিনাস আরও বলেন, ‘এটা ঠিক, এখন হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ আছে। যেকোনোভাবেই হোক, তারা এখন তেল বিক্রি করতে পারছে না। তবে ভবিষ্যতের দিকে তাকালে দেখা যায়, এই দ্বীপ দখল করতে পারলে ইরানে সামরিক অভিযান শেষ হওয়ার পর যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক, আলোচনার সময় যুক্তরাষ্ট্র বড় ধরনের চাপ তৈরি করার সুযোগ পাবে।’

ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) হরমুজ প্রণালির ‘সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ নেওয়ার পর থেকে এ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এতে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে সারা বিশ্বের অর্থনীতির ওপর ধ্বংসাত্মক প্রভাব পড়তে পারে।

ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) হরমুজ প্রণালির ‘সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ নেওয়ার পর থেকে এ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এতে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে সারা বিশ্বের অর্থনীতির ওপর ধ্বংসাত্মক প্রভাব পড়তে পারে।

গত সোমবার তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। পরে তা কিছুটা কমে আসে। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী সতর্ক করে বলেছে, সংঘাত আরও বাড়লে তেলের দাম ২০০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।

ফুজাইরাহ শহরের উপকূলে হরমুজ প্রণালিতে একটি কার্গো জাহাজ দেখা যাচ্ছে। ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

ট্রাম্প ইরানে হামলা চালানোর আগে চলতি বছরের জানুয়ারিতে আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের জন্য একটি নিবন্ধ লিখেছিলেন পেন্টাগনের সাবেক কর্মকর্তা মাইকেল রুবিন। সেখানে তিনি বলেছিলেন, ‘যদি তিনি (ট্রাম্প) খারগ দ্বীপটি ধ্বংস না করে দখল করেন, তাহলে তিনি নিশ্চিত করতে পারবেন, ইরান সরকার আর কখনো তাদের আমলা ও সেনাদের বেতন দিতে পারবে না। এ ছাড়া ভবিষ্যতে শাসকগোষ্ঠীর পরিবর্তনের পর তিনি নিশ্চিত করতে পারবেন, নতুন ইরানি সরকার নিজেদের পুনর্গঠনের খরচ নিজেরাই মেটাতে পারবে।’

নিবন্ধে আরও বলা হয়, অবশ্যই, আইআরজিসি খারগ দ্বীপে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাতে পারে। কিন্তু এতে তারা বড় বিপদে পড়বে। শুধু যে ট্রাম্প প্রতিশোধ নেবেন তা নয়, এমনটা হলে কয়েক মাসের জন্য ইরানের তেল রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাবে। তারা বেতনও পরিশোধ করতে পারবে না।

অন্য বিশ্লেষকেরা বলছেন, খারগ দ্বীপকে দর-কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে। কারণ, ইরান সরকারের বাজেটের প্রায় ৪০ শতাংশ আসে তেল রপ্তানি থেকে।

অবশ্য দ্বীপটি দখল করা হলে মার্কিন ও ইসরায়েলি সেনারা আরও বেশি করে ইরানি বাহিনীর হামলার ঝুঁকিতে পড়বে।

‘দ্বীপটি দখলে চলে গেলে ইরানের তেল সরবরাহের মূল উৎসরেখা নষ্ট হয়ে যাবে। ইরানের শাসকগোষ্ঠীর কাছে এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়।’
পেট্রাস কাটিনাস, ইউরোপের রয়েল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের জলবায়ু, জ্বালানি ও প্রতিরক্ষাবিষয়ক গবেষক

তেলবিষয়ক বিশ্লেষক তামাস ভার্গা সিএনবিসিকে বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যদি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ কেন্দ্রটি দখল করার সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে তা হবে ইরানের শাসকগোষ্ঠীর জন্য এক গভীর ধাক্কা। কারণ, এতে তারা তাদের রাজস্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হারাবে। এ ধরনের পদক্ষেপ চলতি বছরের শুরুতে ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের কথাই মনে করিয়ে দেবে। তখন মার্কিন বাহিনী কার্যত সেখানকার তেল খাতের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল।

দ্বীপটিতে এর আগেও হামলা হয়েছিল। ১৯৮৪ সালে ইরান ও ইরাকের মধ্যে সংঘাত চলাকালে ইরাকি নেতা সাদ্দাম হোসেন এখানে হামলা চালান। এ হামলা দুই দেশের মধ্যে ট্যাংকার যুদ্ধের সূচনা করেছিল।

তবে এবারই প্রথম যে খারগ দ্বীপ ডোনাল্ড ট্রাম্পের নজরে এসেছে, তা নয়। প্রায় ৪০ বছর আগে নিজের বই ‘দ্য আর্ট অব দ্য ডিল’-এর ব্যবসায়িক প্রচার চালানোর সময় তিনি দ্য গার্ডিয়ানকে একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন। সেখানে তিনি দ্বীপটি নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন।

১৯৮৮ সালে ইরান-ইরাক যুদ্ধ চলাকালে দেওয়া ওই সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘তারা (ইরান) মানসিকভাবে আমাদের ওপর দমনপীড়ন চালাচ্ছে, আমাদের বোকা বানাচ্ছে। আমাদের কোনো সেনা বা জাহাজের দিকে একটি গুলি ছোড়া হলেই আমি খারগ দ্বীপের ওপর আক্রমণ করব। আমি সেখানে গিয়ে দ্বীপটি দখল করব।’