সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন অ্যাপের প্রতীক। ৯ ডিসেম্বর ২০২৫
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন অ্যাপের প্রতীক। ৯ ডিসেম্বর ২০২৫

সামাজিক মাধ্যমের কোম্পানিগুলোর ওপর আরও কঠোর নজরদারি চান ৬১ শতাংশ মার্কিনি

  • ১৬ বছরের কম বয়সী ব্যবহারকারীদের বয়স যাচাই বাধ্যতামূলক করার আইনের পক্ষে ৬৬ শতাংশ।

  • সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কোম্পানিগুলোর ওপর আরও কঠোর নজরদারি চান ৬১ শতাংশ।

  • ৮৫ শতাংশ মনে করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শিশুদের জন্য আসক্তিকর হতে পারে।

কম বয়সী শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে দূরে রাখতে বয়স যাচাইয়ের প্রযুক্তি থাকাসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কোম্পানিগুলো কীভাবে ব্যবসা পরিচালনা করবে, সে বিষয়ে সরকারের আরও বিধিনিষেধ আরোপের পক্ষে অধিকাংশ মার্কিন নাগরিক।

রয়টার্স/ইপসোসের এক জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে। ছয় দিন ধরে পরিচালিত জরিপটি ৩ আগস্ট শেষ হয়েছে। অনলাইনে পরিচালিত এ জরিপে যুক্তরাষ্ট্রের ৪ হাজার ৫০৫ জন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি অংশ নেন। জরিপের ফলাফলের ভুলের সীমা ২ শতাংশ পয়েন্ট।

এমন এক সময় জরিপটির ফল প্রকাশিত হলো, যখন মেটা ও গুগলের ইউটিউবের মতো প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো তরুণ ব্যবহারকারীদের নিয়ে তাদের কর্মকাণ্ডের কারণে আইনি চাপের মুখে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের কৌঁসুলিদের অভিযোগ, মেটার বিভিন্ন পণ্য এমনভাবে তৈরি করা হচ্ছে, যাতে তরুণেরা আসক্ত হয়ে পড়ে। এ অভিযোগ নিয়ে আগামী বুধবার বিচার শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।

‘কাউকে না কাউকে তো এটা করতেই হবে।...এটা কি সরকারের কাজ? এটা সরকারের কাজ হোক—তা আমি চাই না। তবে আমার মনে হয়, হয়তো হওয়া উচিত।’
জেমস বসারডেট, মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার

ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের মূল কোম্পানি মেটা এ ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। কোম্পানিটি বলেছে, অঙ্গরাজ্যগুলো মামলায় জয়ী হলে তাদের সর্বোচ্চ ১ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার (১ লাখ ৪০ হাজার কোটি ডলার) জরিমানা গুনতে হতে পারে।

এদিকে নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের একটি আদালত গত বৃহস্পতিবার মেটাকে কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্য তহবিলে ৫৬ কোটি ৭০ লাখ ডলার দিতে নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে তরুণ ব্যবহারকারীদের জন্য প্ল্যাটফর্মগুলোর কার্যক্রমে পরিবর্তন আনতে বলেছেন। শিশুদের সুস্থতার ক্ষতির জন্য মেটাকে দায়ী করে আদালত এ আদেশ দেন।

তরুণদের ওপর ক্ষতিকর প্রভাবের কারণে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে আইনপ্রণেতাদের কাছ থেকেও প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো ক্রমবর্ধমান জবাবদিহির মুখে পড়ছে। ১২টির বেশি অঙ্গরাজ্য অপ্রাপ্তবয়স্কদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে আইন পাস করেছে। অনলাইনে তাদের নিরাপত্তা জোরদারের জন্য এসব আইন প্রয়োজন বলে অঙ্গরাজ্যগুলো জানিয়েছে।

ছবি: এআই দিয়ে তৈরি করা

তবে মেটা, টিকটক ও স্ন্যাপের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম জায়ান্টগুলোর সমর্থনপুষ্ট বাণিজ্যিক সংগঠন ‘নেটচয়েস’ ব্যবহারকারীদের বয়স যাচাই বাধ্যতামূলক করার আইন ঠেকাতে আদালতে গেছে। তাদের যুক্তি, এ ধরনের আইন বাক্স্বাধীনতার সুরক্ষা লঙ্ঘন করে।

রয়টার্স/ইপসোসের জরিপে অংশ নেওয়া ৬১ শতাংশ মানুষ বলেছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানিগুলোর ওপর আরও কঠোর নজরদারি করা প্রয়োজন। এর মধ্যে ডেমোক্র্যাটদের ৭১ শতাংশ এবং রিপাবলিকানদের ৬২ শতাংশ এ মত দিয়েছেন। স্বতন্ত্র ভোটারদের মধ্যে এ সমর্থন কম ছিল। তাঁদের অনেকে বলেছেন, বিষয়টি নিয়ে তাঁরা এখনো নিশ্চিত নন।

জরিপে আরও দেখা গেছে, ৬৬ শতাংশ মানুষ এমন আইনের পক্ষে, যাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানিগুলোকে ১৬ বছরের কম বয়সী শিশুদের প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ ঠেকাতে বয়স যাচাইয়ের প্রযুক্তি ব্যবহারে বাধ্য করা হবে। রিপাবলিকানদের মধ্যে এ প্রস্তাবের সমর্থন সবচেয়ে বেশি—৭৪ শতাংশ। ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে তা ৬৯ শতাংশ।
‘কাউকে না কাউকে তো এটা করতেই হবে’

নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের একটি স্থানীয় আদালত গত বৃহস্পতিবার মেটাকে কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্য তহবিলে ৫৬ কোটি ৭০ লাখ ডলার দিতে নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে তরুণ ব্যবহারকারীদের জন্য প্ল্যাটফর্মগুলোর কার্যক্রমে পরিবর্তন আনতে বলেছেন।

টেনেসি অঙ্গরাজ্যের ৬০ বছর বয়সী মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার জেমস বসারডেট ২০২৪ সালের নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছেন। তিনি জানান, মার্কিন নাগরিকদের জীবনে সরকারের ভূমিকা কম থাকুক—এটাই তাঁর সাধারণ অবস্থান। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কোম্পানিগুলোর ওপর কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে তাঁর অবস্থান ভিন্ন।

শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপ প্রসঙ্গে জেমস বসারডেট বলেন, ‘কাউকে না কাউকে তো এটা করতেই হবে।... এটা কি সরকারের কাজ? এটা সরকারের কাজ হোক—তা আমি চাই না। তবে আমার মনে হয়, হয়তো হওয়া উচিত।’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিশুদের সুরক্ষার লক্ষ্যে এখন পর্যন্ত মার্কিন কংগ্রেস কোনো আইন পাস করেনি।

নিয়ন্ত্রণের ধরনটা কেমন হবে, তা আমি জানি না। তবে মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকারের কিছু একটা করা দরকার।
ক্রিস্টোফার চেন, ওয়াশিংটন ডিসির বাসিন্দা

রয়টার্স/ইপসোসের জরিপে দেখা গেছে, ৮৫ শতাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শিশুদের জন্য আসক্তিকর হতে পারে। প্রায় একই সংখ্যক মানুষ মনে করেন, এর ব্যবহার শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

ওয়াশিংটন ডিসির ৩৪ বছর বয়সী বাসিন্দা ক্রিস্টোফার চেন বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানিগুলো কিশোরদের ওপর মাত্রাতিরিক্ত প্রভাব বিস্তার করছে। এসব অ্যাপে ব্যবহারকারীরা কী দেখবেন, তার ওপর কোম্পানিগুলোর অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।

চেন বলেন, ‘নিয়ন্ত্রণের ধরনটা কেমন হবে, তা আমি জানি না। তবে মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকারের কিছু একটা করা দরকার।’ ২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পের ডেমোক্র্যাট প্রতিদ্বন্দ্বী কমলা হ্যারিসকে ভোট দিয়েছিলেন চেন।

৫২ শতাংশ মানুষ বলেছেন, তাঁরা প্রতিদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করেন। আর ৪৩ শতাংশ বলেছেন, বিষয়টি এমন নয়।

৭৩ বছর বয়সী পলা ডিক বলেন, অনুপযুক্ত কনটেন্ট থেকে শিশুদের দূরে রাখতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানিগুলো আরও ভালো কাজ করতে পারে। শিশুরা যেসব অ্যাপ ব্যবহার করে, সেগুলোর ওপর সরকারের আরও বেশি নজরদারি থাকা উচিত।

পলা ডিক জানান, তিনি যখন তাঁর নাতি-নাতনিদের দেখাশোনা করেন, তখন তাঁদের ইউটিউব ব্যবহার করতে দেন না। কিন্তু তাঁরা কোনো না কোনোভাবে সেটি ব্যবহারের উপায় বের করে নেয়। কানসাসের বাসিন্দা ডিক ২০২৪ সালে ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছেন।
পলা ডিক বলেন, তাদের মা–বাবা মোবাইল ফোনে যে ব্লক দিয়েছে, তা এড়িয়ে যাওয়ার উপায় তারা বের করে ফেলে। এ ব্যাপারে তারা বেশ বুদ্ধিমান।

ব্যবহারকারীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পছন্দ করেন

তবে মার্কিন নাগরিকদের অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বেশ পছন্দ করেন। জরিপে অংশ নেওয়া ৭০ শতাংশ মানুষ বলেছেন, এসব প্ল্যাটফর্মে সময় কাটিয়ে তাঁরা আনন্দ পান। অন্যদিকে এর কারণে মানসিক চাপ অনুভব করেন বলে জানিয়েছেন ৩৫ শতাংশ মানুষ।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে তাঁরা বাড়াবাড়ি করছেন কি না, এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ৫২ শতাংশ মানুষ বলেছেন, তাঁরা প্রতিদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করেন। আর ৪৩ শতাংশ বলেছেন, বিষয়টি এমন নয়।