মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু

বিবিসির বিশ্লেষণ

ট্রাম্প-নেতানিয়াহু চক্র নিজেদের মতো বদলাতে গিয়ে মধ্যপ্রাচ্যকে কি স্থায়ী সংকটে ঠেলে দিলেন

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ভেবেছিলেন, ইরানের বিরুদ্ধে তাঁদের বিজয় নিশ্চিত হলে মধ্যপ্রাচ্যকে তাঁরা নতুনভাবে গড়ে তুলতে পারবেন।

কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, অঞ্চলটি বদলাচ্ছে ঠিকই, তবে তাঁরা যেমনটা ভেবেছিলেন, সেভাবে নয়। ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানকে পরাজিত করা যায়নি। উল্টো এখন এক দীর্ঘস্থায়ী সংকটের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। সেখানে হয়তো থেমে থেমে সংঘাত চলতে থাকবে।

ইরানের শাসকগোষ্ঠী নিজেদের ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর ধারণার চেয়েও অনেক বেশি কঠিন প্রতিপক্ষ হিসেবে প্রমাণ করেছে। ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মূল্যায়ন ভুল ছিল। তাঁরা এখন পরিস্থিতির ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছেন।

এর মধ্যেই ইরান একটি মার্কিন অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ভূপাতিত করেছে। এটি আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে, ইরানের শাসকগোষ্ঠী এখনো যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষতি করতে সক্ষম। তারা এই যুদ্ধে নিজেদের অবস্থান শক্ত করে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসবে না। তাদের কাছে ‘বিজয়’ মানে টিকে থাকা এবং আরও শক্তিশালী প্রতিরোধ তৈরি করা। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণের স্বীকৃতি পাওয়া, যা বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ।

ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি হওয়ার আশা করেছিলেন। ভেবেছিলেন, এ চুক্তির মাধ্যমে ইরান আবার হরমুজ প্রণালি খুলে দেবে এবং বড় বড় বিষয় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি আলোচনার ভিত্তি তৈরি হবে। আর আলোচনায় প্রাধান্য পাবে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত এবং তাদের পারমাণবিক পরিকল্পনার মতো বিষয়গুলো।

ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের যুদ্ধবাজ প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু একটি পুরোনো শিক্ষা থেকে শিখছেন। তা হলো—যুদ্ধ শুরু করা যতটা সহজ, স্পষ্ট বিজয়ের মাধ্যমে তা শেষ করা ততটাই কঠিন।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তাঁরা যখন ইরানে আগ্রাসন শুরু করেন, তখন দুজনই আলাদা করে ভিডিও বার্তা দিয়েছিলেন। দুজনের কথাতেই বোঝা যাচ্ছিল, তাঁরা ইতিহাসে এক বড় পরিবর্তনের মুহূর্ত আসছে বলে ভেবেছিলেন। ১৯৭৯ সালে শাহকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর থেকে ইরান যে শাসনব্যবস্থায় পরিচালিত হচ্ছে, সেটি শেষ হয়ে যাবে।

ফ্লোরিডার মার-এ-লাগো রিসোর্টে ধারণ করা সে ভিডিও বার্তায় ট্রাম্প জানুয়ারিতে দেওয়া একটি প্রতিশ্রুতির কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। জানুয়ারিতে ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ চলার সময় তিনি বিক্ষোভকারীদের সে প্রতিশ্রুতিটি দিয়েছিলেন। বলেছিলেন—‘সহায়তা আসছে।’

ট্রাম্প ইরানে দ্রুত বিজয়ের আশা করেছিলেন। কারণ, ভেনেজুয়েলায় সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পেরে তিনি খোশমেজাজে ছিলেন। ভেনেজুয়েলায় মার্কিন বাহিনী দেশটির প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতাচ্যুত করে গ্রেপ্তার করেছে, তাঁকে ও তাঁর স্ত্রীকে নিউইয়র্কে তুলে নিয়ে গেছে এবং রাজধানী কারাকাসে যুক্তরাষ্ট্রপন্থী নতুন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে। ট্রাম্পের কাছে এটি ছিল সরকার পরিবর্তনের এক আদর্শ উদাহরণ।

আর ফেব্রুয়ারিতে দেওয়া ভিডিও বার্তায় ট্রাম্প বলেন, ‘আজ রাতে আমি ইরানের গর্বিত জনগণকে বলছি, আপনাদের স্বাধীনতার সময় এসে গেছে। নিরাপদ আশ্রয়ে থাকুন। ঘর থেকে বের হবেন না। বাইরের পরিস্থিতি খুব বিপজ্জনক। চারদিকে বোমা পড়ছে। আমরা শেষ করার পর আপনারা আপনাদের শাসনক্ষমতা দখল করবেন। সেটি আপনাদেরই হবে। এটা সম্ভবত বহু প্রজন্মের মধ্যে আপনাদের পাওয়া একমাত্র সুযোগ।’

পরদিন সকালে নেতানিয়াহু তেল আবিবের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের উঁচু ভবনের ছাদে দাঁড়িয়ে তাঁর বক্তব্য রেকর্ড করেন। ট্রাম্পের মতো তিনিও এমনভাবে কথা বলছিলেন, যেন বিজয় নিশ্চিত।

নেতানিয়াহু বলেন, ‘এই জোটবদ্ধ শক্তি আমাদের সেই কাজটি করার সুযোগ দিয়েছে, যা আমি ৪০ বছর ধরে করতে চেয়েছি। তা হলো—সন্ত্রাসী শাসনব্যবস্থাকে কঠোরভাবে আঘাত করা। এটাই আমি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, আর এটাই আমরা করব।’

নিজের পুরো রাজনৈতিক জীবনে নেতানিয়াহু বলে এসেছেন, ফিলিস্তিনিরা বা দেশটির আরব প্রতিবেশীরা ইসরায়েলের জন্য প্রকৃত হুমকি নয়; বরং ইরানই তাদের জন্য আসল হুমকি। উগ্র ইহুদিবাদী নেতানিয়াহু এর আগে একাধিক মার্কিন প্রেসিডেন্টকে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপে যুক্ত করার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু সফল হননি। কিন্তু ট্রাম্প তাঁর ফাঁদে পড়ে গেলেন।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর দুই বছরের বেশি সময় ধরে নেতানিয়াহু ইসরায়েলিদের বলে আসছিলেন, তাঁদের সামরিক শক্তি শত্রুদের পরাজিত করবে এবং দেশকে আরও সমৃদ্ধ ও নিরাপদ ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাবে। যুদ্ধবাজ নেতানিয়াহু কূটনীতিকে নয়, সামরিক শক্তি প্রয়োগকেই সমাধানের পথ বলে বিবেচনা করেছিলেন।

নেতানিয়াহুর মধ্যে তখন এমন আত্মবিশ্বাস দেখা যাচ্ছিল, যেন তাঁর বহু প্রতীক্ষিত মুহূর্ত এসে গেছে। কিন্তু গত সোমবার ট্রাম্প তাঁকে বৈরুতে হামলার পরিকল্পনা বাতিল করতে বলায় নেতানিয়াহুকে আর তেমন দেখাচ্ছিল না। ইসরায়েলের খ্যাতনামা কলাম লেখক বেন ক্যাসপিটের দৃষ্টিতে ওই সময় ক্যামেরার সামনে আসা নেতানিয়াহুকে দেখতে ‘চুপসে যাওয়া বেলুনের’ মতো লাগছিল।

ট্রাম্প ইরানে দ্রুত বিজয়ের আশা করেছিলেন। কারণ, ভেনেজুয়েলায় সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পেরে তিনি খোশমেজাজে ছিলেন। ভেনেজুয়েলায় মার্কিন বাহিনী দেশটির প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতাচ্যুত করে গ্রেপ্তার করেছে, তাঁকে ও তাঁর স্ত্রীকে নিউইয়র্কে তুলে নিয়ে গেছে এবং রাজধানী কারাকাসে যুক্তরাষ্ট্রপন্থী নতুন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে।

ট্রাম্পের কাছে ভেনেজুয়েলার ঘটনা ছিল সরকার পরিবর্তনের এক আদর্শ উদাহরণ। তিনি মনে করেছিলেন, এটি ইরাক ও আফগানিস্তানে তাঁর পূর্বসূরিদের চালানো দীর্ঘ যুদ্ধের চেয়ে অনেক ভালো পথ। তাঁর ধারণা ছিল, ভেনেজুয়েলার পর ইরানের ক্ষেত্রেও একই পরিস্থিতি হবে।

কিন্তু এখন ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু দুজনেই হয়তো ভাবছেন, তাঁদের হিসাব–নিকাশে ভুলটা কোথায় হলো? যুক্তরাষ্ট্রের আছে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী। আর মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক শক্তি হলো ইসরায়েল।

ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু হয়তো মনে করেছিলেন, তেহরানের সরকার দুর্বল হয়ে পড়েছে। কারণ, নিষেধাজ্ঞা, কথিত দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে দেশটি গভীর অর্থনৈতিক সংকটে ছিল। গাজায় ইরানের মিত্র হামাস এবং লেবাননে হিজবুল্লাহর ওপর হামলা চালাচ্ছিল ইসরায়েল। তেহরানের আরেক গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হিসেবে পরিচিত সিরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদও ক্ষমতাচ্যুত হয়ে মস্কোতে পালিয়ে গিয়েছিলেন। গত জানুয়ারিতে ইরান সরকারকে তাদের নিজেদের বিরুদ্ধে হওয়া বিশাল বিক্ষোভ কঠোরভাবে দমন করতে হয়েছে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর দুই বছরের বেশি সময় ধরে নেতানিয়াহু ইসরায়েলিদের বলে আসছিলেন, তাঁদের সামরিক শক্তি শত্রুদের পরাজিত করবে এবং দেশকে আরও সমৃদ্ধ ও নিরাপদ ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাবে। তিনি শক্তি প্রয়োগকেই সমাধানের পথ বলে বিবেচনা করেছিলেন, কূটনীতিকে নয়।

তবে ট্রাম্প ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আইসিসির পরোয়ানাভুক্ত নেতানিয়াহু ইরানের শাসকগোষ্ঠীর টিকে থাকার শক্তি ও কৌশলকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে পারেননি। তাঁদের বিশ্বাস ছিল, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের খুন করলে শাসনব্যবস্থা ভেতর থেকেই ভেঙে পড়বে।

তাঁরা এমন একটি দেশের বিরুদ্ধে নিজেদের সামরিক শক্তির সক্ষমতা নিয়ে আত্মবিশ্বাসী ছিলেন, যেটি প্রায় ৫০ বছর ধরে বারবার হুমকির মুখে থেকেও টিকে আছে। এ দেশটি হামলা সহ্য করার মতো করে নিজেকে গড়ে তুলেছে এবং ধর্মীয় ও আদর্শিক বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে জাতীয় নিরাপত্তার একটি সুস্পষ্ট ধারণা তৈরি করেছে।

যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মিত্র হিসেবে পরিচিত উপসাগরীয় তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। এসব দেশ উপসাগরীয় অঞ্চলে স্থিতিশীলতার এক ‘অভয়ারণ্য‘ এবং শত শত কোটি ডলারের ব্যবসার কেন্দ্র হিসেবে নিজেদের ভাবমূর্তি গড়ে তুলেছিল। কিন্তু যুদ্ধের কারণে সম্ভাব্য বিনিয়োগকারী ও পর্যটকদের চোখে সেই স্বপ্ন এখন মরীচিকায় পরিণত হচ্ছে।

ইরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় নিহত পুরোনো নেতৃত্বের জায়গা নিয়েছে বর্তমান নেতৃত্ব। তাঁরা তাঁদের পূর্বসূরিদের মতোই মতাদর্শিক, কিন্তু তাঁদের চেয়ে অনেক বেশি ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত। তাঁরা মনে করেন, এটি অস্তিত্বের লড়াই, যেখানে শুধু কথার মাধ্যমে ভবিষ্যতের হামলা থামানো যাবে না। বরং তাঁরা দেখাতে চান, ইরানের ওপর আবার হামলা হলে তার মূল্য হবে খুবই চড়া।

একসময় বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত জলপথ হরমুজ প্রণালি ফেব্রুয়ারির পর থেকে কার্যত অচল হয়ে গেছে

এসব নেতার কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো লেবাননের যুদ্ধকে উপসাগরীয় অঞ্চলের সংঘাতের সঙ্গে যুক্ত করা। তাঁদের বার্তা হলো—লেবাননে ইসরায়েলের হামলা ও হিজবুল্লাহকে ধ্বংস করার চেষ্টা চলতে থাকলে কোনো ধরনের চুক্তি সম্ভব নয়। হিজবুল্লাহ হলো সে সশস্ত্র গোষ্ঠী, যেটিকে ইরান ১৯৮০-এর দশক থেকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নিজেদের অগ্রবর্তী প্রতিরক্ষাশক্তি হিসেবে গড়ে তুলেছে।

যুদ্ধবাজ ও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আইসিসির পরোয়ানাভুক্ত নেতানিয়াহু দুই ঘটনার মধ্যে সংযোগকে মানতে রাজি নন। গত সোমবার নেতানিয়াহু একে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য বলে উল্লেখ করেছেন।

কিন্তু ট্রাম্প যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করার বদলে দ্রুত শেষ করতে চান এবং নিজের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। এটা নেতানিয়াহুর ইচ্ছার বিপরীত। কারণ, তিনি চান তেহরানের ইসলামি শাসনব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে বলে ঘোষণা দিতে না পারা পর্যন্ত যুদ্ধ চলতে থাকুক।

নেতানিয়াহু বৈরুতে হামলা চালানোর পরিকল্পনা বাতিল করেছেন ঠিকই। তবে ইসরায়েলের নৃশংস সেনাবাহিনী (আইডিএফ) লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে বেপরোয়া হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।

গত মার্চে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দেওয়ার পর সতর্ক করে বলা হয়েছিল, জুনের মধ্যে এটি না খুললে বিশ্ব অর্থনীতিতে ভয়াবহ প্রভাব পড়বে। কিন্তু জুন মাসে এসেও হরমুজ প্রণালি বন্ধই আছে। বড় কোনো কূটনৈতিক অগ্রগতি ছাড়া এটি শিগগিরই খুলে যাবে—এমন সম্ভাবনাও খুব কম বলে মনে হচ্ছে।