মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প

ভ্যান্সের পাকিস্তান সফর নিয়েও মিথ্যা, ট্রাম্পের কোনো কথাই বিশ্বাস করা যাচ্ছে না

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গতকাল সোমবার সকালে দ্য নিউইয়র্ক পোস্টকে বলেছিলেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনার জন্য ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইতিমধ্যেই পাকিস্তানের পথে রয়েছেন। নিউইয়র্ক পোস্ট ট্রাম্পের উদ্ধৃতি দিয়ে জানায়, তাঁরা এখন রওনা দিচ্ছেন। আজ (সোমবার) রাতে (ইসলামাবাদ) সময় তাঁরা সেখানে পৌঁছে যাবেন।

কিন্তু ট্রাম্পের এই তথ্য সত্য ছিল না। গতকাল সকালেই ভ্যান্সের পরিকল্পনার সঙ্গে পরিচিত ব্যক্তিরা সিএনএন-এর অ্যালায়না ট্রিনকে জানান, বুধবার শুরু হতে যাওয়া আলোচনার জন্য ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্সের মঙ্গলবার (আজ) পাকিস্তানে যাওয়ার কথা। এর কিছুক্ষণ পরই তাঁর গাড়িবহর হোয়াইট হাউসে দেখা যায়।

ট্রাম্পের এই ভুয়া মন্তব্য হয়তো এড়িয়ে যাওয়া যেত—একজন ব্যস্ত প্রেসিডেন্টের পক্ষে এমন ছোটখাটো ভুল হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু গত এক সপ্তাহে এটি তাঁর অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এই প্রেসিডেন্ট ইরান যুদ্ধসংক্রান্ত অত্যন্ত সাধারণ বিষয়গুলো নিয়েও বারবার ভুল তথ্য দিচ্ছেন।

জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সাবেক কর্মকর্তা এরিক ব্রুয়ার গত শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র-ইরান বর্তমান কূটনীতির সঙ্গে আগের দফার একটি বড় পার্থক্য হলো—এই প্রশাসন বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট নিজে একজন “অবিশ্বাসী বক্তা” হয়ে উঠেছেন। ইরানবিষয়ক পর্যবেক্ষকেরা বছরের পর বছর ধরে উভয় পক্ষের বক্তব্য বিশ্লেষণ করতে বেশ দক্ষ হয়ে উঠেছেন। কিন্তু আমাদের এমন একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টের মুখোমুখি হতে হয়নি, যিনি এত বেশি বাচাল এবং অতিরঞ্জিত, বানানো কথা ও ডাহা মিথ্যা বলতে অভ্যস্ত।’

ভ্যান্সের ভ্রমণ নিয়ে ট্রাম্পের গতকালের দাবিটি ছিল যুদ্ধ নিয়ে তাঁর ধারাবাহিক মিথ্যা, সন্দেহজনক বা অপ্রমাণিত মন্তব্যের সর্বশেষ উদাহরণমাত্র। এসব বক্তব্যের মধ্যে অনেকগুলোই ছিল বেশ গুরুত্বপূর্ণ।

গত শুক্রবার ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ঘোষণা দেন, যুদ্ধবিরতি চলাকালে বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য হরমুজ প্রণালি ‘সম্পূর্ণ খোলা’ থাকবে। এরপরই ট্রাম্প পোস্ট করেন, হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতির সমাধান হয়ে গেছে এবং ‘ইরান আর কখনোই হরমুজ প্রণালি বন্ধ না করতে রাজি হয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স

কিন্তু পরিস্থিতি স্পষ্টতই মিটে যায়নি। ট্রাম্প নিজে ওই দিন সকালেই পোস্ট করেছিলেন, ইরানি বন্দরে যাতায়াতকারী জাহাজের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ অব্যাহত থাকবে।

আরাগচি বলেছিলেন, প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়টি কেবল তাদের উপকূলের কাছের একটি নির্দিষ্ট পথের জন্য প্রযোজ্য, সাধারণ জাহাজ চলাচলের পথের জন্য নয়।

এ ছাড়া এক ইরানি কর্মকর্তা জানান, জাহাজগুলোকে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) নৌবাহিনী শাখার অনুমতি নিতে হবে এবং টোল দিতে হবে।

আর কখনোই প্রণালি বন্ধ না করার তথাকথিত চুক্তির কী হলো? ইরান পরদিনই ঘোষণা দেয়, তারা আবার প্রণালিটি বন্ধ করে দিচ্ছে।

ট্রাম্পের একের পর এক ভুয়া দাবি

গত বৃহস্পতিবার ট্রাম্প সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেন, ‘পোপ একটি বিবৃতি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ইরানের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র থাকতে পারে।’

কিন্তু পারমাণবিক অস্ত্রের ঘোরবিরোধী পোপ লিও চতুর্দশ এমন কিছু বলেননি। বুধবার ফক্স বিজনেসে এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প দাবি করেন, পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোতে ইরান হামলা করবে, এমন ‘আশা করা হয়নি’। বাস্তবে, ওই সব দেশে ইরানের পাল্টা হামলার আশঙ্কা ব্যাপকভাবে করা হচ্ছিল।

এর আগের রোববার ফক্স নিউজের এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ইরানের বিষয়ে দাবি করেন, ‘ওদের সামরিক বাহিনী শেষ, সব শেষ।’ কিন্তু ইরান স্পষ্টতই ধ্বংসাত্মক ক্ষমতার অধিকারী সামরিক বাহিনী তখনো ধরে রেখেছে। অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হামলা চালিয়ে তাদের সামরিক বাহিনীর বেশ ক্ষতি করেছিল।

ভ্যান্সকে নিয়ে ট্রাম্পের গতকালের দাবিটি ছিল দুই দিনের মধ্যে তাঁর নিজের ভাইস প্রেসিডেন্ট সম্পর্কে দেওয়া অন্তত দ্বিতীয় ভুল তথ্য। গত রোববার ট্রাম্প এমএস নাউ-কে বলেছিলেন, নিরাপত্তার কারণে ভ্যান্স পাকিস্তানে পাঠানো মার্কিন প্রতিনিধিদলে থাকবেন না। কিন্তু প্রেসিডেন্টের এই বক্তব্যের পর দুজন জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, ভ্যান্সই আসলে ইসলামাবাদে প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন।

হতে পারে ট্রাম্প কথা বলার পর প্রশাসনের পরিকল্পনা বদলে গিয়েছিল। কিন্তু এখানেও সমস্যা হলো, এই সাধারণ বিষয়টি নিয়েও প্রেসিডেন্টের কথাকে ধ্রুব সত্য বলে ধরা যাচ্ছে না।

৬ এপ্রিল এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্পের একটি দাবি ছিল সম্পূর্ণ বাস্তবতাবিবর্জিত। তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা আসলে যে কয়টি বিমান হারিয়েছি, সেগুলো নিজেদের গোলায় ধ্বংস করা হয়েছে।’

ট্রাম্প এমন এক অনুষ্ঠানে এই কথা বলেন, যেখানে তিনি নিজেই ইরানের গোলায় একটি মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার ঘটনা নিয়ে দীর্ঘক্ষণ কথা বলেছিলেন।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে পাকিস্তান। ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ইসলামাবাদ

আলোচনা নিয়ে ট্রাম্পের বিজয়োল্লাসের কতটুকু সত্যি

বহু বছর ধরে বিভিন্ন বিষয়ে ট্রাম্পের মিথ্যা বলার ইতিহাস রয়েছে। তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে ইরান যুদ্ধ নিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করছেন, নাকি তিনি বারবার ভুল তথ্যের শিকার হচ্ছেন—সেটা বড় কথা নয়। তাঁর মিথ্যার পুনরাবৃত্তি এতটাই বেশি যে নেপথ্যে ইরান আসলে কী বলছে, সে বিষয়ে তাঁর বক্তব্যের ওপর নির্ভর করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

গত সপ্তাহে সাংবাদিকদের সঙ্গে ফোনে ট্রাম্প দাবি করেন, ইরান অনেক বড় বড় ছাড় দিতে রাজি হয়েছে। এর মধ্যে ছিল পারমাণবিক কার্যক্রমের ওপর ‘অনির্দিষ্টকালের’ স্থগিতাদেশ; হামাস, হিজবুল্লাহসহ সব প্রক্সি গ্রুপকে সমর্থন দেওয়া বন্ধ করা এবং ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিজের কবজায় নেওয়া।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজের সংবাদদাতা উইজিয়া জিয়াং যখন ট্রাম্পকে জিজ্ঞাসা করেন, ইরান স্থায়ীভাবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করতে রাজি হয়েছে কি না। উত্তরে ট্রাম্প বলেন, ‘তারা সবকিছুতেই রাজি হয়েছে।’

বিশেষজ্ঞরা ট্রাম্পের এই দাবিতে তীব্র সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। ইরানি কর্মকর্তারাও দ্রুত জানিয়ে দেন, ট্রাম্প যা যা বলেছেন, তাঁরা তার সবকিছুতে রাজি হননি।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এক বিবৃতিতে বলেন, ‘সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম আমাদের কাছে ইরানের মাটির মতোই পবিত্র এবং কোনো পরিস্থিতিতেই এটি অন্য কোথাও স্থানান্তর করা হবে না।’

ইরানের পতাকাবাহী জাহাজ তোসকা যুক্তরাষ্ট্র জব্দ করার পর দুই দেশের মধ্যে আলোচনা নিয়ে অচলাবস্থা তৈরি হয়। ১৯ এপ্রিল ২০২৬, উত্তর আরব সাগর

ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার ও অন্যতম আলোচক মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ গত শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট এক ঘণ্টার মধ্যে সাতটি দাবি করেছেন, যার সাতটিই ছিল মিথ্যা।

সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অবশ্যই ইরানের কথাকেও বিশ্বাস করা যায় না। তাদের নেতৃত্বও যুদ্ধ এবং অন্যান্য বিষয়ে বারবার মিথ্যা বলেছে। তাদের সরকারের ভেতরে ক্ষমতার নানা কেন্দ্র থাকার কারণে কোন কর্মকর্তার বক্তব্য সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য, তা বোঝাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

তাই শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান কোনো চুক্তি হলে ট্রাম্পের কিছু দাবি হয়তো সঠিক প্রমাণিত হতে পারে। কিন্তু ট্রাম্পের অতীত রেকর্ড বলছে, যতক্ষণ পর্যন্ত প্রমাণ না পাওয়া যাচ্ছে, ততক্ষণ মার্কিন প্রেসিডেন্টের দাবিগুলো ইরানি নেতাদের দাবির চেয়ে বেশি সঠিক—এমনটি ধরে নেওয়া যাচ্ছে না।