পোল্যান্ডের একটি সামরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ন্যাটো সেনাদের সঙ্গে পোলিশ বাহিনীর ‘আয়রন ডিফেন্ডার’ সামরিক মহড়া চলছে। মহড়াকালে একটি বিস্ফোরণের পর পোলিশ আব্রামস ট্যাংকের পাশ থেকে ধোঁয়া উড়তে দেখা যাচ্ছে। ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
পোল্যান্ডের একটি সামরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ন্যাটো সেনাদের সঙ্গে পোলিশ বাহিনীর ‘আয়রন ডিফেন্ডার’ সামরিক মহড়া চলছে। মহড়াকালে একটি বিস্ফোরণের পর পোলিশ আব্রামস ট্যাংকের পাশ থেকে ধোঁয়া উড়তে দেখা যাচ্ছে। ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

ট্রাম্প চাইলেই কি ন্যাটো থেকে বেরিয়ে যেতে পারবেন

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রায়ই ন্যাটোর সদস্যপদ ত্যাগের হুমকি দিয়ে থাকেন। এখন আবারও তিনি একই পথে হাঁটছেন। যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ তাঁর কাছে জানতে চেয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটোর সদস্যপদ পুনর্বিবেচনা করছে কি না। জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘ওহ হ্যাঁ, আমি বলব, বিষয়টি পুনর্বিবেচনার ঊর্ধ্বে।’

ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক আগ্রাসনে ইউরোপের মিত্রদেশগুলো অংশ না নেওয়ায় আবারও ক্ষোভ ঝাড়েন ট্রাম্প।

পত্রিকাটিকে ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেন, ‘আমি মনে করি এই সহযোগিতা বিনা দ্বিধায় আসা উচিত ছিল।’ ট্রাম্পের এই আক্রমণাত্মক কথাবার্তা আবারও বুঝিয়ে দিল, ৩২ সদস্যের এই জোটের কাজের ধরন নিয়ে তাঁর স্পষ্ট কোনো ধারণা নেই।

ন্যাটোর ৫ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সদস্যদেশগুলো সম্মিলিত প্রতিরক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কোনো এক সদস্যদেশ আক্রান্ত হলে তা সবার ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য হয়। তবে এই নীতি কার্যকরের জন্য সব সদস্যের ঐকমত্য প্রয়োজন। এ ছাড়া ১৯৪৯ সালের সেই চুক্তিতে কেবল ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার সংকটের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।

ট্রাম্প প্রশাসনের অস্পষ্ট ও পরস্পরবিরোধী বার্তার কারণে মিত্রদেশগুলো এখনো যুদ্ধের লক্ষ্য বুঝে উঠতে পারছে না। এমনকি এই লড়াইয়ের বিষয়ে তাদের সঙ্গে কোনো পরামর্শও করা হয়নি। ফলে একের পর এক মিত্রদেশ এই যুদ্ধে জড়ানো থেকে পিছিয়ে যাচ্ছে।

ন্যাটোর সাবেক মহাসচিব স্টলটেনবার্গের মতো মার্ক রুতেও ‘ট্রাম্প হুইস্পারার’ (বশে রাখার কারিগর) হিসেবে পরিচিত। খামখেয়ালি এই প্রেসিডেন্টকে বাগে রাখতে তিনি গোপনে ও প্রকাশ্যে নানা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

ন্যাটোর এই ৫ নম্বর অনুচ্ছেদ ইতিহাসে মাত্র একবারই কার্যকর করা হয়েছিল। ২০০১ সালে ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলার পর এই নীতি ব্যবহার করা হয়।

ওই সংবাদপত্রের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ইউক্রেন প্রসঙ্গও টেনে আনেন। তিনি বলেন, ‘ইউক্রেনসহ অন্য সব ক্ষেত্রেই আমরা নিজ থেকে পাশে দাঁড়িয়েছি।’

২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পর তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন পশ্চিমা দেশগুলোর পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, পুতিনের এই পদক্ষেপ সবার জন্যই হুমকি। জোট হিসেবে ন্যাটো ইউক্রেনকে সহায়তা দিলেও সরাসরি এই যুদ্ধে জড়ানোর ঝুঁকি এড়িয়ে গেছে।

ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক

২০১৭ সালে প্রথম মেয়াদে হোয়াইট হাউসে যাওয়ার আগেই ট্রাম্প ন্যাটোর কঠোর সমালোচনা শুরু করেন। তিনি বারবার এই জোটকে ‘কাগুজে বাঘ’ ও ‘অপ্রাসঙ্গিক’ বলে অভিহিত করেন। তাঁর মতে, এই জোটের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হচ্ছে। এ বছর তিনি ন্যাটোকে উপহাস করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি এই জোটের রক্ষক হিসেবে না থাকত, তবে রাশিয়া এত দিনে পুরো ইউক্রেন দখল করে নিত।

২০১৯ সালের শুরুর দিকে ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদে এই জোট ছেড়ে প্রায় বেরিয়েই যাচ্ছিলেন। ন্যাটোর সাবেক মহাসচিব জেনস স্টলটেনবার্গ তাঁর সাম্প্রতিক স্মৃতিকথামূলক গ্রন্থ ‘অন মাই ওয়াচ’-এ লিখেছেন, ‘আমরা স্পষ্ট ইঙ্গিত পেয়েছিলাম, ট্রাম্প তাঁর হুমকি কার্যকর করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।’

স্টলটেনবার্গ বর্ণনা করেছেন কীভাবে তিনি ফক্স নিউজে গিয়ে ট্রাম্পের প্রশংসা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ট্রাম্পের চাপের কারণেই ন্যাটোর মিত্ররা সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি করতে বাধ্য হয়েছে।

স্টলটেনবার্গের মতে, ট্রাম্প তাৎক্ষণিকভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই প্রশংসার জবাব দেন। এরপর ন্যাটো থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বেরিয়ে যাওয়ার বিষয়ে হোয়াইট হাউসের তৈরি করা সেই সম্ভাব্য ভাষণটি তিনি আর দেননি।

ট্রাম্পের আপত্তির মূল কারণ ছিল ২০১৪ সালের একটি চুক্তি। সেই চুক্তিতে সদস্যদেশগুলোর জিডিপির ২ শতাংশ সামরিক খাতে ব্যয়ের কথা বলা হয়েছিল; যদিও তখন এটি ছিল কেবল একটি ‘নির্দেশনা’।

ন্যাটোর প্রায় সব সদস্যদেশ এখন তাদের সামরিক ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। এর পেছনে একদিকে যেমন ট্রাম্পের হুমকি কাজ করেছে, অন্যদিকে রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান হুমকিও একটি বড় কারণ হয়ে উঠেছে।

ন্যাটো সম্মেলনে নেতারা

এই নতুন সংকট ইউরোপীয় দেশগুলো ও কানাডাকে নিজেদের প্রতিরক্ষা জোরদার এবং নিজেদের নিরাপত্তায় নিজেদের ওপর নির্ভরশীল হতে আরও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ করবে। তবে কঠোর বাস্তবতা হলো, মার্কিন সামরিক বাহিনীর শক্তি এখনো অপরিসীম গুরুত্ব বহন করে।

ন্যাটোর মোট প্রতিরক্ষা ব্যয়ের প্রায় ৬২ শতাংশই আসে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাজেট থেকে। পেন্টাগনের যে সম্পদ ও গোয়েন্দা সক্ষমতা রয়েছে, অন্য কোনো দেশের পক্ষে তার সমকক্ষ হওয়া এখনো সম্ভব নয়।

ফক্স নিউজকে ট্রাম্প বলেছেন, ‘আমি মনে করি এতে কোনো সন্দেহ নেই, এই যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর আমাদের এই সম্পর্ক (ন্যাটোর সঙ্গে) পর্যালোচনা করতে হবে।’

ইউরোপে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোর প্রসঙ্গ টেনে ট্রাম্প বলেন, এগুলো যদি ‘আমেরিকার স্বার্থ রক্ষায়’ ব্যবহার করা না যায়, তবে বুঝতে হবে ন্যাটো কেবল ‘একতরফা সুবিধার’ জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের অস্পষ্ট ও পরস্পরবিরোধী বার্তার কারণে মিত্রদেশগুলো এখনো যুদ্ধের লক্ষ্য বুঝে উঠতে পারছে না। এমনকি এই লড়াইয়ের বিষয়ে তাদের সঙ্গে কোনো পরামর্শও করা হয়নি। ফলে একের পর এক মিত্রদেশ এই যুদ্ধে জড়ানো থেকে পিছিয়ে যাচ্ছে।

যুক্তরাজ্য শুরুতে মার্কিন যুদ্ধবিমান চলাচলের অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানালেও পরে সুর বদলায়। তারা জানায়, ‘প্রতিরক্ষামূলক অভিযানের’ জন্য এসব ঘাঁটি ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে এই বিলম্ব নিয়ে ব্যঙ্গ চালিয়ে যাচ্ছেন ট্রাম্প ও তাঁর প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। তাঁরা বারবার প্রধানমন্ত্রী স্টারমারকে ‘তিনি চার্চিল নন’ বলে বিদ্রূপ করছেন।

পূর্ব ভূমধ্যসাগরে মার্কিন রণতরি ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ডে অবতরণ করছে একটি যুদ্ধবিমান

গত মঙ্গলবার ইতালি তাদের ভূখণ্ডে মার্কিন যুদ্ধবিমান অবতরণের অনুমতি দেয়নি। বিমানগুলো মধ্যপ্রাচ্যে অভিযানের উদ্দেশ্যে যাচ্ছিল। ন্যাটোর সদস্যভুক্ত আরেক দেশ স্পেনও ইরানের বিরুদ্ধে অভিযানে থাকা মার্কিন বিমানের জন্য তাদের আকাশসীমা বন্ধ করে দিয়েছে।

মার্কো রুবিও আরও বলেন, এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়টি ‘শেষ পর্যন্ত’ প্রেসিডেন্টের ওপরই নির্ভর করছে। তবে সিদ্ধান্তটি কেবল তাঁর একার নয়।

২০২৩ সালের শেষে মার্কিন কংগ্রেস এক ভোটাভুটির মাধ্যমে প্রেসিডেন্টকে ন্যাটো থেকে একতরফাভাবে বেরিয়ে যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এখন এই জোট ছাড়তে হলে সিনেটের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন বা কংগ্রেসের অনুমোদনের প্রয়োজন হবে।

ন্যাটোর নেতারা ও বিশেষ করে বর্তমান মহাসচিব মার্ক রুতে আবারও ট্রাম্পকে এটা বোঝাতে সময় ব্যয় করবেন, এই জোটে থাকা ট্রাম্প ও যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব স্বার্থেই প্রয়োজন।

স্টলটেনবার্গের মতো মার্ক রুতেও ‘ট্রাম্প হুইস্পারার’ (বশে রাখার কারিগর) হিসেবে পরিচিত। খামখেয়ালি এই প্রেসিডেন্টকে বাগে রাখতে তিনি গোপনে ও প্রকাশ্যে নানা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ডাচ এই নেতা ট্রাম্পকে প্রশংসায় ভাসিয়ে নানা কাজে রাজি করাতে দক্ষ বলে পরিচিত।

এক মহড়ায় মার্কিন ১০১তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের সেনারা। ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৪

চলতি বছরের শুরুতে ন্যাটোর সদস্য ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড ‘দখলে’ নেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। তখন তাঁকে সেই অবস্থান থেকে ফিরিয়ে আনতে রুতে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন বলে মনে করা হয়।

তবে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ট্রাম্পকে কট্টর সমর্থন দেওয়ায় অন্য ন্যাটো সদস্যদের তোপের মুখে পড়েছেন রুতে। তিনি দাবি করেছিলেন, ট্রাম্প পুরো বিশ্বকে নিরাপদ রাখতেই এই যুদ্ধ করছেন।

বর্তমানে ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান হুমকির পাশাপাশি হোয়াইট হাউস থেকেও চাপের মুখে রয়েছে ন্যাটো। তবে ৭৭ বছরের পুরোনো এই সামরিক জোটকে টিকিয়ে রাখাই এখন রুতের প্রধান লক্ষ্য।