নেদারল্যান্ডসের মালিকানাধীন এমভি হন্ডিয়াস নামের একটি প্রমোদতরিতে সম্প্রতি হান্টাভাইরাস হানা দেয়
নেদারল্যান্ডসের মালিকানাধীন এমভি হন্ডিয়াস নামের একটি প্রমোদতরিতে সম্প্রতি হান্টাভাইরাস হানা দেয়

হান্টাভাইরাসে আক্রান্ত প্রমোদতরির এক মার্কিন যাত্রীকে উদ্ধারে খরচ সোয়া ৯ কোটি টাকা

প্রাণঘাতী হান্টাভাইরাস ছড়িয়ে পড়া একটি প্রমোদতরি থেকে একজন মার্কিন যাত্রীকে দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের একটি দুর্গম দ্বীপ থেকে উদ্ধার করতে সাড়ে ৭ লাখ ডলার (প্রায় ৯ কোটি ২২ লাখ টাকা) খরচ করেছে মার্কিন প্রশাসন। ওই মার্কিন নাগরিককে সরিয়ে নিতে ভাড়া করা হয় আরেকটি বেসরকারি প্রমোদতরি। এত টাকা খরচ করায় মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জরুরি তহবিলের ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে।

এ বিষয়ে জানাশোনা আছে, যুক্তরাষ্ট্রের এমন দুজন কর্মকর্তা জানান, ওই মার্কিন নাগরিক একজন নারী। তিনি গত এপ্রিলে ডাচ মালিকানাধীন এমভি হন্ডিয়াস নামের একটি প্রমোদতরিতে ছিলেন। এতে হান্টাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। তখন তাঁকে আক্রান্ত প্রমোদতরি থেকে নামিয়ে প্রথমে উড়োজাহাজে করে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার সান ফ্রান্সিসকো শহরে নেওয়া। এরপর দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের তাহিতি দ্বীপ হয়ে যুক্তরাজ্যশাসিত দুর্গম পিটকেয়ার্ন দ্বীপে পৌঁছান তিনি। এ–সংক্রান্ত মার্কিন সরকারের একটি অভ্যন্তরীণ নথিও বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) হাতে এসেছে।

ওই মার্কিন নারী প্রমোদতরি থেকে নেমে যাওয়ার পর জাহাজটি দক্ষিণ আটলান্টিকের অন্যান্য গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। পথিমধ্যে জাহাজের বেশ কয়েকজন যাত্রী অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং অন্তত তিনজনের মৃত্যু হয়। অন্যদিকে নাম প্রকাশ না করা ওই মার্কিন নারী পিটকেয়ার্ন দ্বীপে আটকা পড়েন। মাত্র ৫০ জন বাসিন্দার এই দ্বীপে কোনো বিমানবন্দর নেই, এমনকি যাতায়াতের জন্য নিয়মিত নৌযানও পাওয়া যায় না। হেডিং: হান্টাভাইরাসে আক্রান্ত প্রমোদতরির এক মার্কিন যাত্রীকে উদ্ধারে খরচ সোয়া ৯ কোটি টাকা

উদ্ধারপ্রক্রিয়াটি এখনো চলমান থাকায় এতে শেষ পর্যন্ত মোট কত খরচ হবে, তা এখনই চূড়ান্তভাবে বলা যাচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রের চিকিৎসাসংক্রান্ত গোপনীয়তা আইনের কারণে নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুজন কর্মকর্তা বিষয়টি নিয়ে এপির সঙ্গে কথা বলেছেন।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ইরান যুদ্ধের শুরু থেকে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন কূটনীতিক ও সাধারণ নাগরিকদের দ্রুত সরিয়ে নেওয়া এবং ইবোলা-আক্রান্ত দেশগুলো থেকে সম্ভাব্য ফিরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতির কারণে মার্কিন সরকারের খরচ এমনিতে অনেক বেড়ে গেছে। এর ওপর এই নারীর পেছনে বিপুল অঙ্কের এই ব্যয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জরুরি তহবিলের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। ‘কে ফান্ড’ নামে পরিচিত এই জরুরি তহবিলের অর্থের পরিমাণ বর্তমানে গত সাত বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জরুরি তহবিলে টান

আরেকটি অভ্যন্তরীণ নথিতে দেখা গেছে, জরুরি তহবিল সচল রাখতে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অন্য খাত থেকে প্রায় ৫ কোটি ডলার এই তহবিলে স্থানান্তরের কথা ভাবছে। এর মধ্যে দূতাবাসের নিরাপত্তা, নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ বাজেট থেকে ৩ কোটি ৫০ লাখ ডলার এবং বৃহত্তর কূটনৈতিক কর্মসূচির বাজেট থেকে আরও ১ কোটি ৫০ লাখ ডলার স্থানান্তরের প্রস্তাব রয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সামনে আরেকটি বিকল্প রয়েছে, তা হলো তহবিলের ঘাটতি পূরণে কংগ্রেসের কাছে বাড়তি অর্থ চাওয়া। তবে ওই কর্মকর্তার মতে, চলমান এবং ‘জরুরি যেকোনো পরিস্থিতি’ সামাল দেওয়ার সক্ষমতা এই মন্ত্রণালয়ের রয়েছে।

সম্ভাব্য ঘাটতির সুনির্দিষ্ট পরিমাণ না জানালেও জোর দিয়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, ইরান সংকটের কারণে মধ্যপ্রাচ্য ছাড়তে বাধ্য হওয়া মার্কিন কূটনীতিক, সরকারি কর্মচারী ও সাধারণ নাগরিকদের পাশে দাঁড়াতে এবং আফ্রিকায় ইবোলা প্রাদুর্ভাবের মতো পরিস্থিতিতে নিজ দেশের নাগরিকদের সহায়তা করতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ‘পুরোপুরি প্রস্তুত’ রয়েছে।

দুর্গম দ্বীপ থেকে যেভাবে উদ্ধার করা হচ্ছে সেই মার্কিন নাগরিককে
পিটকেয়ার্ন দ্বীপের এ ঘটনা নিয়ে সুনির্দিষ্টভাবে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তবে তারা বলেছে, ‘বিদেশে কোনো মার্কিন নাগরিক ঝুঁকিতে পড়লে এবং বাণিজ্যিক কোনো যানবাহন ব্যবহারের সুযোগ না থাকলে, তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রে বা অন্য কোনো নিরাপদ স্থানে ফিরিয়ে আনতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় সহায়তা দিয়ে থাকে।’

ওই মার্কিন নারী প্রমোদতরি থেকে নেমে যাওয়ার পর জাহাজটি দক্ষিণ আটলান্টিকের অন্যান্য গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। পথিমধ্যে জাহাজের বেশ কয়েকজন যাত্রী অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং অন্তত তিনজনের মৃত্যু হয়। অন্যদিকে নাম প্রকাশ না করা ওই মার্কিন নারী পিটকেয়ার্ন দ্বীপে আটকা পড়েন। মাত্র ৫০ জন বাসিন্দার এই দ্বীপে কোনো বিমানবন্দর নেই, এমনকি যাতায়াতের জন্য নিয়মিত নৌযানও পাওয়া যায় না।
ইতিহাসে পিটকেয়ার্ন দ্বীপের আলাদা পরিচিতি রয়েছে। ১৭৮৯ সালে প্রশান্ত মহাসাগরের জলসীমায় ব্রিটিশ জাহাজ এইচএমএস বাউন্টিতে ক্যাপ্টেন উইলিয়াম ব্লাইয়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছিল, যা মিউটিনি অন বাউন্টি জাহাজের বিদ্রোহ নামে পরিচিত। এরপর ফ্লেচার ক্রিশ্চিয়ান ও অন্যান্য ব্রিটিশ বিদ্রোহীরা এই দ্বীপে আশ্রয় নিয়েছিলেন। দ্বীপের বর্তমান বাসিন্দাদের বেশির ভাগই সেই বিদ্রোহীদের বংশধর।

ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ তাদের শাসনাধীন ওই দ্বীপ থেকে ওই মার্কিন নারীকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে জরুরি সহায়তা চায়। তখন পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। মার্কিন সরকারি নথি ও দ্বিতীয় একজন কর্মকর্তার সূত্রে এ তথ্যটি জানা গেছে।

পিটকেয়ার্ন থেকে প্রায় ১ হাজার ৩৫০ মাইল (২ হাজার ১৬০ কিলোমিটার) দূরে ফরাসি উপনিবেশ তাহিতিতে (সমুদ্রপথে ৩০ ঘণ্টার দূরত্ব) ওই নারীকে পাঠানোর প্রাথমিক চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু ফরাসি পলিনেশিয়ার কর্তৃপক্ষ সেই আবেদন প্রত্যাখ্যান করে। তাদের অভিযোগ, তাহিতি হয়ে পিটকেয়ার্ন দ্বীপে যাওয়ার সময় ওই নারী তাঁর ভাইরাসের সংস্পর্শে আসার বিষয়টি গোপন করেছিলেন।

উদ্ধার হতে যাওয়া ওই মার্কিন নারীর শরীরে অবশ্য এ পর্যন্ত হান্টাভাইরাসের কোনো উপসর্গ দেখা যায়নি। ফরাসি কর্তৃপক্ষ রাজি না হওয়ায় এখন তাঁকে পিটকেয়ার্ন থেকে প্রশান্ত মহাসাগরের আরেকটি দুর্গম দ্বীপ ইস্টার আইল্যান্ডে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। চিলির মালিকানাধীন ১ হাজার ৪০০ মাইল দূরের এই দ্বীপ থেকে চিলির রাজধানী সান্তিয়াগোতে সরাসরি উড়োজাহাজ চলাচলের সুবিধা রয়েছে। সেখান থেকে তাঁকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো যাবে।

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এসব কারণে পিটকেয়ার্ন দ্বীপ থেকে তাঁকে ইস্টার দ্বীপে স্থানান্তরের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে কয়েক সপ্তাহ সময় লেগেছে।

দুই কর্মকর্তার নিশ্চিত করা মার্কিন সরকারি নথি অনুযায়ী, ওই নারীকে পিটকেয়ার্ন থেকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য শেষ পর্যন্ত ‘টাইটাইনা এক্সপ্লোরার’ নামের একটি প্রমোদতরি ব্যবহার করা হচ্ছে। বিলাসবহুল এই প্রমোদতরির মালিক একজন ধনী ফরাসি নাগরিক। তিনি দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরে নিজের ভ্রমণের জন্য এটি ব্যবহার করেন। পিটকেয়ার্নে বিমানবন্দর না থাকায় ও নৌ চলাচলের সীমাবদ্ধতার কারণে এ ব্যবস্থা করতে হয়েছে।

কর্মকর্তারা স্পষ্ট করে বলেন, ওই নারীর কোনো রাজনৈতিক বা তারকা পরিচয় নেই। তিনি ঠিক কবে নাগাদ যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছাবেন, তা–ও সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায়নি।

তবে সমুদ্রযান ট্র্যাকিং সাইটগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ৫ জুন ‘টাইটাইনা এক্সপ্লোরার’ পিটকেয়ার্ন দ্বীপ ত্যাগ করেছে। আবহাওয়া ও নৌযানের গতির ওপর ভিত্তি করে ইস্টার আইল্যান্ডে পৌঁছাতে এই নৌকার সর্বোচ্চ ১০ দিন সময় লাগতে পারে।