
হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে মার্কিন-ইসরায়েলি জোটের আগ্রাসন রুখে দিয়েছে ইরান। তিন মাসের যুদ্ধে সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনিকে হারিয়েও তেহরান ভাঙেনি; বরং ট্রাম্পকে নিজের শর্তে আলোচনার টেবিলে এনেছে। ইরানের দুঃসাহসিক প্রতিরোধ প্রমাণ করেছে, বলপ্রয়োগে কোনো পরাশক্তি দেশটিকে দমাতে পারবে না। এদিকে, দুই দেশের মধ্যে শান্তিচুক্তি সইয়ের ঐতিহাসিক ঘটনা উপলক্ষে আগামীকাল শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে আয়োজিত হচ্ছে এক বিশেষ অনুষ্ঠান।
১৫ জুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন আকস্মিকভাবে ইরানের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক সইয়ের ঘোষণা দিলেন, তখন আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তেহরানের এক বিশাল কূটনৈতিক ও কৌশলগত বিজয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
এই চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর থেকে দীর্ঘদিনের নৌ-অবরোধ তুলে নিতে বাধ্য হচ্ছে এবং বিশ্বের অন্যতম প্রধান সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি আবার বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য উন্মুক্ত করা হচ্ছে। এ ছাড়া তেহরান পাবে বিরাট আর্থিক সুবিধা, সঙ্গে ছাড় করা হবে তার জব্দকৃত সম্পদ।
সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় আগামীকাল শুক্রবার (১৯ জুন) আনুষ্ঠানিকভাবে এ সমঝোতা চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার কথা ছিল। তবে একদিন আগেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান চুক্তিতে সই করেছেন। ঐতিহাসিক ঘটনাটি স্মরণীয় করে রাখতে আগামীকাল সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠান আয়োজন করা হবে। চুক্তির ফলে দুই দেশের মধ্যে তিন মাসের বেশি সময় ধরে চলা সরাসরি সংঘাতের অবসান ঘটবে।
কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এ চুক্তির পর বিশ্বরাজনীতিতেও এক নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। ইরানের রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যম, দেশের শীর্ষ কূটনীতিক এবং নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা আলী খামেনি এ চুক্তিকে কোনো সাধারণ আপস হিসেবে দেখছেন না; বরং তাঁরা এটিকে পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইরানের দীর্ঘদিনের ‘ঐতিহাসিক প্রতিরোধের একটি বড় জয়’ হিসেবে দেখছেন।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের চুলচেরা বিশ্লেষণের আলোকে এই প্রতিবেদনে দেখা যাক, কীভাবে তেহরান নিজের সার্বভৌমত্ব ও সামরিক শক্তি বজায় রেখে এই চুক্তিতে পৌঁছাল এবং এর পেছনে তাদের বাস্তব অর্জনগুলো কী—
তিন মাসের যুদ্ধ
ইরানের ইস্পাতকঠিন প্রতিরোধের মুখে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের আগ্রাসন ও রক্তক্ষয়ী এ সংঘাতের অবসান ঘটাতে যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, তার সূচনা হয়েছিল অত্যন্ত বিধ্বংসী উপায়ে। যুক্তরাজ্যের ‘হাউস অব কমন্স লাইব্রেরি রিসার্চ ব্রিফিং’-এর তথ্য অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে একযোগে বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করে। ওয়াশিংটন এ অভিযানের নাম দিয়েছিল ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ (মহাকাব্যিক তাণ্ডব)। এর মূল লক্ষ্য ছিল, ইরানের বর্তমান ধর্মীয় শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন এবং তাদের প্রতিরক্ষামূলক পারমাণবিক ও দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংস করা। যুদ্ধের এই প্রাথমিক ধাক্কা তেহরানের জন্য কঠিন ছিল।
এই চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর থেকে দীর্ঘদিনের নৌ-অবরোধ তুলে নিতে বাধ্য হচ্ছে এবং বিশ্বের অন্যতম প্রধান সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি আবার বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য উন্মুক্ত করা হচ্ছে। এ ছাড়া তেহরান পাবে বিরাট অঙ্কের যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ, সঙ্গে ছাড় করা হবে তার জব্দকৃত সম্পদ।
প্রথম দফার হামলাতেই ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। পাশাপাশি নিহত হন দেশটির শীর্ষস্থানীয় আরও কয়েকজন বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তা।
তবে এ চরম সংকটের মুহূর্তেও ইরানি শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়েনি, বরং খামেনির ছেলে মোজতবা আলী খামেনিকে দ্রুত নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নিযুক্ত করে ইরানিরা জাতি হিসেবে দৃঢ় ঐক্য প্রদর্শন করেন।
মার্কিন–ইসরায়েলি আগ্রাসনের জবাবে ইরান যে পাল্টা আঘাত গড়ে তোলে, তা পশ্চিমাদের হিসাব-নিকাশ ওলটপালট করে দেয়। ইরান ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত বিভিন্ন মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে, এমন কয়েকটি আরব রাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনায় ব্যাপক পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। তবে ইরানের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গাটি ছিল, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা।
ইরান সফলভাবে এ প্রণালি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়।
বিশ্বের মোট তেলের প্রায় ২০ শতাংশ যে প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো, তা ইরান বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্বজুড়ে তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের শত শত জাহাজ সাগরে আটকে পড়ে। বিশ্ব অর্থনীতিতে তৈরি হয় তীব্র সংকট। ওয়াশিংটন বুঝতে পারে যে সামরিক শক্তি দিয়ে ইরানকে দমন করা অসম্ভব।
এরপর পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় গত ৮ এপ্রিল একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি ঘোষিত হওয়ার পর দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়। ইরান অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে নিজেদের শর্তে অটল থেকে দীর্ঘ আলোচনার পর অবশেষে এই সমঝোতা চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রকে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করে।
২৫ বিলিয়ন ডলার উদ্ধার ও পারমাণবিক সক্ষমতা রক্ষা
ইরানের বিজয়ের দাবির পেছনে অত্যন্ত শক্তিশালী অর্থনৈতিক ও কৌশলগত ভিত্তি রয়েছে। এ চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের ওপর থেকে সম্পূর্ণ নৌ অবরোধ তুলে নিতে হচ্ছে। একই সঙ্গে ওয়াশিংটন মার্কিন ব্যাংকে আটকে থাকা ইরানের ২৫ বিলিয়ন (২ ডলার ৫০০ কোটি) ডলারের জব্দকৃত তহবিল অবিলম্বে অবমুক্ত করতে সম্মত হয়েছে।
দীর্ঘদিনের অন্যায় নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা ইরানের অর্থনীতির জন্য এই বিপুল পরিমাণ অর্থ এক বিশাল বড় শক্তি হিসেবে কাজ করবে।
ইরানি জাতি শুধু সাম্প্রতিক চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধেই নয়, কৌশলগত নানা ক্ষেত্রেও এমন গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য অর্জন করেছে, যা আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সমীকরণ বদলে দিয়েছে।আব্বাস আরাগচি, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী
আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাবিষয়ক গবেষণা সংস্থা ‘স্টিমসন সেন্টার’ তাদের জুনের মূল্যায়নে জানিয়েছে, এ চুক্তির ফলে ইরান তাৎক্ষণিকভাবে ২৫ বিলিয়ন ডলারের তহবিল ফিরে পাওয়ার পাশাপাশি যুদ্ধোত্তর দেশ পুনর্গঠনে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্র থেকে আরও ৩০০ বিলিয়ন (৩০ হাজার কোটি) ডলার পাওয়ার পথ তৈরি করেছে। এটি তেহরানের একটি বিশাল কৌশলগত জয়।
আবার ইরানের তেল বিক্রির ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার শর্তও এ চুক্তিতে রয়েছে। চুক্তির অনুলিপি অনুযায়ী, ইরান এখন থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বাধীনভাবে তেল বিক্রি করে সরাসরি রাজস্ব আদায় করতে পারবে। সেই অর্থ ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করবে।
পারমাণবিক কর্মসূচির ক্ষেত্রেও ইরান তার মূল নীতি ধরে রাখতে পারছে। ইরান আরও ৬০ দিনের আলোচনার মেয়াদে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের ক্ষেত্রে বর্তমান স্তর বা স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে সম্মত হয়েছে।
কিন্তু ইরানের সবচেয়ে বড় বিজয়—তার মাটির নিচে সুরক্ষিত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের শক্তিশালী মজুত ধ্বংস বা দেশ থেকে সরিয়ে নেওয়ার মতো কোনো শর্ত এ পর্যন্ত তেহরানের ওপর চাপাতে পারেনি।
বিখ্যাত মার্কিন সাময়িকী নিউজউইক একটি অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ সংস্থার বরাতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি তথ্যও দিয়েছে। তারা জানিয়েছে, গত তিন মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি শত চেষ্টা এবং বিমান হামলার পরও ইরানের সম্ভাব্য পারমাণবিক বোমা তৈরির মূল সক্ষমতা (মাটির নিচের সুরক্ষিত ও দুর্ভেদ্য ঘাঁটিতে থাকা ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত) সম্পূর্ণ অক্ষত ও নিরাপদ রয়েছে; অর্থাৎ বিপুল ক্ষয়ক্ষতির চেষ্টা করেও মার্কিন-ইসরায়েলি জোট ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতার মূল ভিত্তি স্পর্শ করতে পারেনি।
তেহরানের কূটনৈতিক সাফল্য ও জাতীয় সংহতির জয়
সমঝোতা চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব ও গণমাধ্যম একে প্রতিরোধের এক ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে দেশবাসীর সামনে তুলে ধরছে।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্যটি এসেছে ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদির কাছ থেকে। তিনি ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘ইরান এ চুক্তিকে নিজেদের বড় বিজয় হিসেবে দেখছে।’
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের ১৪ জুনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘারিবাবাদি আরও স্পষ্ট করেন, ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর পক্ষ থেকে দেওয়া জোরাল প্রতিরোধ ও পাল্টা সামরিক জবাবই মূলত মার্কিন প্রশাসনকে আলোচনার টেবিলে আসতে এবং তেহরানের দাবিগুলো মেনে নিতে বাধ্য করেছে।
গত তিন মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি শত চেষ্টা এবং বিমান হামলার পরও ইরানের সম্ভাব্য পারমাণবিক বোমা তৈরির মূল সক্ষমতা (মাটির নিচের সুরক্ষিত ও দুর্ভেদ্য ঘাঁটিতে থাকা ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত) সম্পূর্ণ অক্ষত ও নিরাপদ রয়েছে। অর্থাৎ, বিপুল ক্ষয়ক্ষতির চেষ্টা করেও মার্কিন-ইসরায়েলি জোট ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতার মূল ভিত্তি স্পর্শ করতে পারেনি।
একই সুর শোনা গেছে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ও দেশটির সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সমান্তরাল বিবৃতিতে। ফক্স নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের শীর্ষ কূটনীতিক দাবি করেছেন, ‘ইরানি জাতি শুধু সাম্প্রতিক চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধেই নয়, কৌশলগত নানা ক্ষেত্রেও এমন গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য অর্জন করেছে, যা আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সমীকরণ বদলে দিয়েছে।’
সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ ঘোষণা করেছে, চুক্তির আওতায় লেবাননসহ সব যুদ্ধক্ষেত্রে মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক তৎপরতা বন্ধ হবে। এটি মূলত ইরানের একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম সিদ্ধান্ত, কোনো বিদেশি শক্তির চাপে নেওয়া পদক্ষেপ নয়।
উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ঘারিবাবাদি আরও বলেন, ‘এ অর্জন শুধু সামরিক শক্তির নয়; বরং এটি ইরানিদের জাতীয় সংহতি, স্থিতিস্থাপকতা ও সক্রিয় অংশগ্রহণেরই ফসল।’
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে এ চুক্তিকে পশ্চিমা আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এক সফল প্রতিরক্ষামূলক জয় হিসেবে দেখানো হচ্ছে। ফক্স নিউজ ইরানি সংবাদমাধ্যমের বরাতে জানায়, তেহরানের রাস্তাঘাটে বড় বড় প্রচারপত্র বা বিলবোর্ড টানানো হয়েছে। সেখানে লেখা: ‘হরমুজ প্রণালি চিরকাল ইরানের নিয়ন্ত্রণেই থাকবে’ এবং ‘ট্রাম্প আসলে ইরানের কোনো ক্ষতি করতে পারেননি।’
ইরান প্রকৃতপক্ষে এ চুক্তিকে একটি ‘কৌশলগত বিরতি’ হিসেবে ব্যবহার করছে এবং তারা তাদের কোনো মৌলিক সক্ষমতাই ত্যাগ করেনি।লিসা দফতরি, পশ্চিমা বিশেষজ্ঞ
ইরানের প্রধান আলোচক ও পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মাদ বাঘের গালিবাফ এ অবস্থানকে এভাবে ব্যাখ্যা করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সামরিক দিক থেকে বড় শক্তির আস্ফালন দেখালেও, যুদ্ধক্ষেত্রে ইরানি বীরদের অসীম সাহসের কারণেই তাদের কাছ থেকে নিজেদের অনুকূলে চুক্তি আদায় করা সম্ভব হয়েছে; অর্থাৎ, ইরান কোনো চাপের মুখে আত্মসমর্পণ করেনি, বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে।
ওয়াশিংটনের প্রচার বনাম বাস্তব চিত্র
স্বভাবতই, পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের জনগণের ক্ষোভ প্রশমিত করতে এই চুক্তিকে ভিন্নভাবে রং দেওয়ার চেষ্টা করছে। হোয়াইট হাউসের একটি অভ্যন্তরীণ নথি অনুযায়ী, ওয়াশিংটন দাবি করছে, ইরানকে পরমাণু অস্ত্র তৈরি না করার প্রতিশ্রুতিতে আবদ্ধ করেছে তারা।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এই চুক্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বড় মুহূর্ত হিসেবে দাবি করেন। তবে পশ্চিমা বিশ্লেষকেরাও স্বীকার করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এ দাবি মূলত একটি রাজনৈতিক অপপ্রচার।
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) সঙ্গে যুক্ত ‘ফার্স নিউজ এজেন্সি’ স্পষ্ট করে দিয়েছে, নৌ অবরোধ প্রত্যাহারের পর ইরান নিজস্ব নিয়ম ও সার্বভৌম ক্ষমতায় শুল্ক আদায়ের মাধ্যমেই হরমুজ প্রণালি পরিচালনা করবে। যুক্তরাষ্ট্র এখানে কোনো শর্ত চাপাতে পারেনি।
পশ্চিমা মদদপুষ্ট কিছু নির্বাসিত ইরানিবিরোধী গোষ্ঠীও ক্ষোভ ঝেড়ে বলেছে, এ চুক্তির মাধ্যমে ইসলামিক রিপাবলিক আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির বিশ্লেষণেও উঠে এসেছে যে প্রচণ্ড নিষেধাজ্ঞা এবং বোমাবর্ষণের মুখেও ইরানের সমাজ ও প্রতিরক্ষাব্যবস্থা যেভাবে ঐক্যবদ্ধ থেকেছে, তা পশ্চিমা নীতিনির্ধারকদের বাধ্য করেছে যুদ্ধ থামিয়ে আলোচনার টেবিলে বসতে।
পশ্চিমা বিশেষজ্ঞ লিসা দফতরি ফক্স নিউজে গভীর হতাশার সঙ্গে স্বীকার করেছেন, ইরান প্রকৃতপক্ষে এ চুক্তিকে একটি ‘কৌশলগত বিরতি’ হিসেবে ব্যবহার করছে এবং তারা তাদের কোনো মৌলিক সক্ষমতাই ত্যাগ করেনি।
অন্যদিকে পশ্চিমা মদদপুষ্ট কিছু নির্বাসিত ইরানি বিরোধী গোষ্ঠীও ক্ষোভ ঝেড়ে বলেছে, এ চুক্তির মাধ্যমে ইসলামিক রিপাবলিক আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে।
এক নতুন মধ্যপ্রাচ্যের উদয়
সামগ্রিকভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এ সমঝোতা চুক্তি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরানের এক বিশাল কূটনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিজয়। বিশ্বের পরাশক্তি এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সামরিক জোটের যৌথ আক্রমণ সহ্য করেও ইরান তার পারমাণবিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পেরেছে। একই সঙ্গে দেশের অর্থনীতিকে সচল করার জন্য বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের তহবিল পুনরুদ্ধার করছে এবং হরমুজ প্রণালির ওপর নিজের একক নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে।
তাই এ চুক্তি স্বাক্ষর হয়তো একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে। গত তিন মাসের যুদ্ধ প্রমাণ করেছে, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে ইরানকে বাদ দিয়ে বা বলপ্রয়োগ করে কোনো সমীকরণ মেলানো সম্ভব নয়।
দৃঢ়তা, সঠিক কৌশল ও ঐক্যবদ্ধ জাতিতে ভর করে একটি দেশ যেকোনো পরাশক্তির চাপ মোকাবিলা করেও তার অধিকার আদায় করে নিতে সক্ষম—এটিও প্রমাণ করেছে তেহরান।
{তথ্যসূত্র: বিবিসি, ফক্স নিউজ, আল–জাজিরা, এবিসি নিউজ, আউটলুক ইন্ডিয়া, কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস ও অ্যাক্সিওস}