
স্থানীয় সময় গতকাল সোমবার সকাল ৯টা ৪২ মিনিট। সান ডিয়েগো পুলিশের কাছে হন্তদন্ত হওয়া এক মায়ের ফোনকল আসে। আতঙ্কিত কণ্ঠে তিনি জানান, তাঁর ছেলে নিখোঁজ।
এই মা পুলিশকে আরও জানান, শুধু ছেলেই নিখোঁজ নয়, তাঁর বেশ কয়েকটি আগ্নেয়াস্ত্র ও গাড়িটিও পাওয়া যাচ্ছে না। ১৭ বছর বয়সী তাঁর ছেলের সঙ্গে একজন বন্ধুও থাকতে পারে।
সব শুনে পুলিশ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে এবং দুই কিশোরকে হন্যে হয়ে খুঁজতে শুরু করে। ক্যালিফোর্নিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম ও ১৪ লাখ মানুষের ওই শহরের কোথাও না কোথাও তারা লুকিয়ে ছিল।
গাড়ির নম্বর প্লেট শনাক্তকারী যন্ত্রে দেখা যায়, ওই দুই কিশোর একটি শপিং মলের কাছে রয়েছে। পুলিশ দ্রুত সেখানে ছুটে যায়। এরপর পুলিশ দুই কিশোরের একজনের হাইস্কুলে অভিযান চালায়। তবে কোনো জায়গাতেই তাদের পাওয়া যায়নি।
পুলিশের মতে, ওই প্রহরীর সাহসী পদক্ষেপের কারণে অনেক মানুষের প্রাণ বেঁচে গেছে। এরপর ওই দুই কিশোর নিজেরাও আত্মহত্যা করে। সান ডিয়েগো কাউন্টির সবচেয়ে বড় এ মসজিদের নাম ইসলামিক সেন্টার অব সান ডিয়েগো। এর চত্বরে একটি স্কুলও রয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, ওই কিশোরদের লক্ষ্য ছিল একটি মসজিদ। সেখানে তারা গুলি চালিয়ে তিনজনকে হত্যা করে। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে একজন মসজিদের নিরাপত্তা প্রহরীও ছিলেন।
পুলিশের মতে, ওই প্রহরীর সাহসী পদক্ষেপের কারণে অনেক মানুষের প্রাণ বেঁচে গেছে। এরপর ওই দুই কিশোর নিজেরাও আত্মহত্যা করে। সান ডিয়েগো কাউন্টির সবচেয়ে বড় এ মসজিদের নাম ইসলামিক সেন্টার অব সান ডিয়েগো। এর চত্বরে একটি স্কুলও রয়েছে।
সান ডিয়েগো পুলিশ বিভাগের প্রধান স্কট ওয়াহল এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘একটি দৃশ্য আমাকে সবচেয়ে বেশি নাড়া দিয়েছে। তা হলো, স্কুলের শিশুরা জীবন বাঁচাতে দৌড়ে পালাচ্ছিল, আর বেঁচে যাওয়ার জন্য সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছিল।’
ইরান যুদ্ধের জেরে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে হুমকি ও সহিংসতার ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এ হামলার ঘটনাটিও তেমনই এক পরিস্থিতির মধ্যে ঘটল।
একটি দৃশ্য আমাকে সবচেয়ে বেশি নাড়া দিয়েছে। তা হলো, স্কুলের শিশুরা জীবন বাঁচাতে দৌড়ে পালাচ্ছিল, আর বেঁচে যাওয়ার জন্য সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছিল।স্কট ওয়াহল, সান ডিয়েগো পুলিশ বিভাগের প্রধান
এর আগে গত মার্চ মাসে ডেট্রয়েটের বাইরে একটি সিনাগগে (ইহুদিদের উপাসনালয়) ট্রাক নিয়ে হামলা চালিয়েছিলেন এক ব্যক্তি। পরে নিরাপত্তারক্ষীদের সঙ্গে সংঘর্ষে ওই হামলাকারী নিহত হয়।
যুক্তরাষ্ট্রে এই ক্রমবর্ধমান হুমকির কারণে দেশজুড়ে মসজিদ, সিনাগগ ও গির্জাগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রে সচরাচর যা ঘটে, সেই চেনা চিত্রই দেখা গেল। রাজনৈতিক ও অন্যান্য নেতা গতকালের সহিংসতার তীব্র নিন্দা জানান। পাশাপাশি লস অ্যাঞ্জেলেসসহ যুক্তরাষ্ট্রের অন্য বড় শহরগুলোর কর্মকর্তারা জানান, উপাসনালয়গুলোতে পুলিশের টহল বাড়ানো হবে।
কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস (সিএআইআর)-এর সান ডিয়েগো শাখার নির্বাহী পরিচালক তাজহিন নিজাম বলেন, ‘প্রার্থনা করার সময় বা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করার সময় কারও মনেই নিরাপত্তার এমন ভয় থাকা উচিত নয়।’
সংস্থাটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৬ সালের পর ২০২৫ সালেই সবচেয়ে বেশি মুসলমান নাগরিক অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ করেছেন।
গতকাল সোমবার ঠিক দুপুর হওয়ার আগমুহূর্তে (জোহরের নামাজের আগে) সান ডিয়েগোর ওই মসজিদে পুলিশ সদস্যদের পাঠানো হয়। দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, হাতে থাকা সব কাজ ফেলে ঘটনাস্থলে ছুটে যেতে। কারণ, তখন চারপাশ থেকে আসছিল গুলির খবর।
ঘটনাস্থলে প্রথম পৌঁছানো পুলিশ সদস্যরা মসজিদটির প্রবেশদ্বারের ঠিক বাইরেই তিন ব্যক্তির মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন। এরপর বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য দরজা ভেঙে ইসলামিক সেন্টারের ভেতরে ঢোকেন এবং একের পর এক কক্ষে তল্লাশি চালাতে থাকেন। ঠিক তখনই কয়েক ব্লক দূরে আবারও গুলির খবর আসে।
ঘটনাস্থলে প্রথম পৌঁছানো পুলিশ সদস্যরা মসজিদটির প্রবেশদ্বারের ঠিক বাইরেই তিন ব্যক্তির মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন। এরপর বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য দরজা ভেঙে ইসলামিক সেন্টারের ভেতরে ঢোকেন এবং একের পর এক কক্ষে তল্লাশি চালাতে থাকেন। ঠিক তখনই কয়েক ব্লক দূরে আবারও গুলির খবর আসে। পুলিশ দ্রুত সেখানে গিয়ে এক কর্মীকে (বাগান বা মাঠ পরিচর্যাকারী) দেখতে পায়। তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়েছিল। পুলিশ জানায়, ওই কর্মী অক্ষত আছেন। একটি গুলি সম্ভবত তাঁর হেলমেটে লেগে ছিটকে যায়।
এ ঘটনার কয়েক মিনিট পরই পুলিশ ঘটনাস্থলের কাছের এক রাস্তায় একটি গাড়ি দেখতে পায়। গাড়ির ভেতর পড়ে ছিল দুজনের মরদেহ। পুলিশের ধারণা, মরদেহগুলো সন্দেহভাজন দুই কিশোর বন্দুকধারীর। তাদের একজনের বয়স ১৭ ও অন্যজনের ১৮। পুলিশ জানায়, মসজিদে গুলি চালানোর পর দুই কিশোর গুলি করে আত্মহত্যা করে।
প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা
তখন সকাল শেষের দিকে। দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার মে মাসের চেনা কুয়াশা কেটে রোদের দেখা মিলছিল কেবল। ভ্যানিসা চাভেজ নামের এক নারী যখন নিজের দুপুরের খাবার তৈরি করছিলেন, ঠিক তখন পাশের মসজিদ থেকে একে একে চারটি গুলির শব্দ তাঁর কানে আসে।
ভ্যানিসা জানান, গুলির শব্দ শুনে তিনি ভালো করে দেখার জন্য দ্রুত অন্য একটি কক্ষে ছুটে যান। সেখান থেকে একজন নিরাপত্তা প্রহরীকে (ইসলামিক সেন্টারের) অন্তত দুটি গুলিবিদ্ধ অবস্থায় দেখেন। এ সময় বাইরে খেলাধুলা করা শিশুদের দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।
ইউক্যালিপটাস আর প্রস্ফুটিত জ্যাকারান্ডা গাছে ঘেরা শান্ত ও সবুজ এলাকাটি কিছুক্ষণের মধ্যেই ভিন্ন রূপ নেয়। পুরো এলাকা ছেয়ে যায় অসংখ্য পুলিশ ও বিশেষায়িত সোয়াত টিমের সদস্যে। মাথার ওপর চক্কর দিতে শুরু করে হেলিকপ্টার। মসজিদ থেকে এক ব্লক দূরের একটি পার্কে যখন সাংবাদিক ও কর্মকর্তারা জড়ো হচ্ছিলেন, তখন মসজিদের প্রবেশদ্বারটি হলুদ ফিতা দিয়ে ঘিরে রেখেছিল পুলিশ। চারপাশটা ছিল একদম নিশ্চুপ, তবে ফটকের ভেতর দিয়ে মাটিতে কাপড়ে ঢাকা একটি মরদেহ পড়ে থাকতে দেখা যাচ্ছিল।
নিরাপত্তা প্রহরীর বিষয়ে ৪৬ বছর বয়সী ভ্যানিসা চাভেজ এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘এখন যখন দেখছি, তিনি নিজের জীবনটাই বিলিয়ে দিয়েছেন, তখন বুঝতে পারছি, তিনি কতটা সাহসী ছিলেন।’
গাড়িতে ‘ইসলামবিদ্বেষী’ লেখা
সান ডিয়েগোর এক অভিবাসী অধিকারকর্মী আর্তুরো গঞ্জালেজ গুলির ঘটনা শুরু হওয়ার সময় মসজিদের কাছাকাছিই ছিলেন। ঘটনার পরপরই তিনি আতঙ্কিত মা–বাবাকে তাঁদের সন্তানদের খুঁজতে উন্মুখ হয়ে থাকতে দেখেন।
২৩ বছর বয়সী আর্তুরো গঞ্জালেজ বলেন, ‘প্রথম দিকে পুলিশ তাঁদের ভেতরে ঢুকতে দিচ্ছিল না। মা–বাবারা কাঁদছিলেন। দৃশ্যটি সত্যিই খুব ভয়ংকর ছিল। আমি নিজেই এক পুলিশ কর্মকর্তাকে চিৎকার করে বলি, যেন এক মাকে ভেতরে যেতে দেওয়া হয়। এরপর তাঁরা অবশেষে তাঁকে ঢুকতে দেন।’
পুলিশপ্রধান স্কট ওয়াহল নিহত নিরাপত্তা প্রহরীকে বীর হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেন, ‘নিঃসন্দেহে বলা যায়, তাঁর পদক্ষেপগুলো বীরত্বপূর্ণ ছিল এবং আজ তা অনেকের প্রাণ বাঁচাতে সহায়তা করেছে।’
প্রার্থনা করার সময় বা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করার সময় কারও মনেই নিরাপত্তার এমন ভয় থাকা উচিত নয়।তাজহিন নিজাম, কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস (সিএআইআর)-এর সান ডিয়েগো শাখার নির্বাহী পরিচালক
স্থানীয় পুলিশকে সহায়তা করতে গতকাল বিকেলে মার্কিন কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআই এবং ব্যুরো অব অ্যালকোহল, টোব্যাকো, ফায়ারআর্মস অ্যান্ড এক্সপ্লোসিভস (এটিএফ)-এর কর্মকর্তারা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান। এরপর ঘটনার কিছু সূত্র সামনে আসতে শুরু করে। বিকেল থেকেই তদন্তকারীরা তল্লাশি পরোয়ানা নিয়ে অভিযান শুরু করেন।
পুলিশপ্রধান ওয়াহল জানান, তদন্তকারীরা মসজিদের চারপাশে থাকা অনেকগুলো ক্লোজড সার্কিট (সিসি) ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করছেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের সামনে প্রচুর তথ্য ও বিবরণ আসছে। এই রহস্যের জট খুলতে আমরা সেগুলো খতিয়ে দেখে সব তথ্য একসঙ্গে মেলানোর চেষ্টা করছি।’
তদন্তের বিষয়ে অবগত ও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুজন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্মকর্তা জানান, যে গাড়ি থেকে সন্দেহভাজন হামলাকারীদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, সেখানে ইসলামবিদ্বেষী কিছু লেখা খুঁজে পেয়েছেন তদন্তকারীরা।
গণমাধ্যমে এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কথা বলার অনুমতি না থাকায় এই কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ করতে চাননি। এ ছাড়া হামলায় ব্যবহৃত একটি আগ্নেয়াস্ত্রের ওপর ‘হেট স্পিচ’ বা ‘বিদ্বেষমূলক বক্তব্য’ কথাটি লেখা ছিল।
পুলিশপ্রধান স্কট ওয়াহল বলেন, তদন্তকারীরা এ পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কোনো স্থানের ওপর হামলার হুমকির তথ্য পাননি। তবে তিনি বলেন, ‘এ ঘটনার সঙ্গে নিশ্চিতভাবেই চরম ঘৃণ্য ও উগ্র বক্তব্য জড়িত ছিল।’
ব্রুকলিনভিত্তিক সমাজকর্মী ও মুসলিম অধিকারকর্মী লিন্ডা সারসুরের এ ইসলামিক সেন্টারে বহুবার আসার অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি জানান, কেন্দ্রটি শুধু একটি উপাসনালয়ই নয়। এটি একটি সামাজিক মিলনমেলা ও মানুষের সমবেত হওয়ার জায়গা। এখানে একটি পাঠাগার রয়েছে ও ধর্মীয় বিষয়ের বাইরেও নানা ধরনের ক্লাসের ব্যস্ত সূচি থাকে।
মসজিদের ইমাম তাহা হাসানের সঙ্গে লিন্ডা সারসুরের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। লিন্ডা সারসুর বলেন, ‘আপনি আপনার সন্তানদের এখানে স্কুলে নামিয়ে দিয়ে ইসলামিক সেন্টারের লাউঞ্জে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে পারেন। সেখানে কফি শপের মতো চমৎকার বসার জায়গা আছে। এটি এমন একটি জায়গা, যেখানে মানুষ শুধু নামাজ পড়েই চলে যায় না; বরং দীর্ঘ সময় কাটায়।’
গতকাল শেষ বিকেলে এক পার্কে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ইমাম তাহা হাসান বলেন, ‘আমার কমিউনিটির মানুষ এখন গভীরভাবে শোকাহত। আমরা কখনোই ভাবিনি এখানে এমন কোনো ঘটনা ঘটতে পারে। তবে একই সঙ্গে আমাদের দেশে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা আর ঘৃণা এখন নজিরবিহীন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। আমাদের সবার দায়িত্ব হলো সমাজে পারস্পরিক সহনশীলতা ও ভালোবাসার সংস্কৃতি ছড়িয়ে দেওয়া।’