
জেফরি এপস্টেইন-সংক্রান্ত সর্বশেষ প্রকাশিত নথিপত্রে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের কর্মীদের সঙ্গে এপস্টেইন ও তাঁর দীর্ঘদিনের সঙ্গী গিলেন ম্যাক্সওয়েলের যোগাযোগের নতুন সব তথ্য উঠে এসেছে। মার্কিন বিচার বিভাগের প্রকাশ করা এসব নথিতে কিছু কিছু ক্ষেত্রে কুরুচিপূর্ণ ই–মেইল আদান-প্রদানের প্রমাণও পাওয়া গেছে।
এমন এক সময়ে এসব নথি প্রকাশ করা হলো, যখন এপস্টেইন–সংক্রান্ত এক দ্বিপক্ষীয় তদন্তে সাক্ষ্য দিতে অস্বীকার করায় বিল ও হিলারি ক্লিনটনের বিরুদ্ধে কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদে ‘অবমাননার প্রস্তাব’ আনার প্রস্তুতি চলছে। রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত হাউসে চলতি সপ্তাহেই এই ভোটাভুটি হওয়ার কথা রয়েছে।
গত শুক্রবার এপস্টেইন ফাইল থেকে ৩০ লাখের বেশি নথি প্রকাশ করা হয়। এর আগে ডিসেম্বরে প্রকাশিত নথিতে বিল ক্লিনটন ও এপস্টেইনের কিছু ছবি প্রকাশ্যে আসে। একটি ছবিতে বিল ক্লিনটনকে বাথটাবে খালি গায়ে একজন নারীর সঙ্গে দেখা যায়। মার্কিন বিচার বিভাগ ওই নারীকে এপস্টেইনের যৌন নিপীড়নের শিকার বলে বর্ণনা করেছে। বিচার বিভাগের প্রকাশিত এসব ছবি আগে কখনো দেখা যায়নি।
সর্বশেষ প্রকাশিত নথিতে ২০০১ থেকে ২০০৪ সালের মধ্যে যৌনকর্মের জন্য পাচারের দায়ে বর্তমানে কারাগারে থাকা গিলেন ম্যাক্সওয়েল এবং ক্লিনটনের কর্মীদের মধ্যে ঘন ঘন যোগাযোগের তথ্য পাওয়া গেছে। সিএনএনের এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এ সময়ের মধ্যেই বিল ক্লিনটন তাঁর কর্মীদের নিয়ে এপস্টেইনের ব্যক্তিগত উড়োজাহাজে অন্তত ১৬ বার ভ্রমণ করেছিলেন।
নতুন নথিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগের একটি তালিকাও রয়েছে। মার্কিন বিচার বিভাগ গত গ্রীষ্মে যাচাই না করা কিছু তথ্যের ভিত্তিতে তালিকাটি সংকলন করেছে। এতে বিল ক্লিনটনের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগেরও উল্লেখ রয়েছে।
তবে উভয়েই এপস্টেইনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অপকর্মের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ট্রাম্পের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়ে হোয়াইট হাউস বিচার বিভাগের একটি বিবৃতির বরাত দিয়ে বলেছে, এই নথিতে কিছু নকল ছবি, তথ্য ও ভিডিও থাকতে পারে।
বিল ক্লিনটনের একজন মুখপাত্র বারবার দাবি করেছেন, ২০০৬ সালে এপস্টেইনের বিরুদ্ধে যৌনকর্মে প্ররোচনার অভিযোগ ওঠার আগেই তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছিলেন বিল ক্লিনটন। এপস্টেইনের অপরাধ সম্পর্কে তিনি কিছুই জানতেন না। এ ছাড়া এপস্টেইনের দ্বীপে যাওয়ার বিষয়টিও ক্লিনটন অস্বীকার করেছেন।
মার্কিন বিচার বিভাগের প্রকাশিত এপস্টেইন ফাইলে ক্লিনটন ও ট্রাম্পসহ আরও অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম রয়েছে। ট্রাম্পের বিচার বিভাগ নথিগুলো প্রকাশে গড়িমসি করছিল। কিন্তু গত বছর কংগ্রেস একটি আইন পাস করার পর এগুলো প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক হয়ে যায়।
জেফরি এপস্টেইন ২০১৯ সালে কারাগারে আত্মহত্যা করেন। সে সময় তাঁর বিরুদ্ধে যৌনকর্মের জন্য নারীদের পাচারের অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলার বিচার চলছিল।
ই–মেইলে বিল ক্লিনটনের কর্মীদের নাম প্রায়ই মুছে দেওয়া হয়েছে। সেখানে প্রাপক বা প্রেরকের জায়গায় কেবল ডব্লিউজেসি লেখা রয়েছে, যা দিয়ে মূলত প্রেসিডেন্সি–পরবর্তী উইলিয়াম জে ক্লিনটনের অফিসকে বোঝায়।
ক্লিনটনের মুখপাত্র অ্যাঞ্জেল উরেনা সিএনএনকে বলেছেন, এপস্টেইন ফাইলের এসব ই–মেইলের কোনোটিই বিল ক্লিনটন পাঠাননি। আমি নিশ্চিত করে বলতে পারব না, কে পাঠিয়েছে। আমি শুধু এটুকু বলতে পারি, তিনি পাঠাননি। তিনি তাঁর পুরো জীবনে এবং প্রেসিডেন্ট থাকাকালে মাত্র দুবার ই–মেইল করেছেন—একবার মহাকাশচারী জন গ্লেনকে এবং অন্যবার অ্যাড্রিয়াটিক সাগরে নিয়োজিত মার্কিন সেনাদের।
উরেনা আরও বলেন, ক্লিনটনের নিজের কোনো (ইলেকট্রনিক) ডিভাইস, অ্যাকাউন্ট বা ই–মেইল অ্যাকাউন্ট ছিল না এবং তিনি অন্য কারওটা ব্যবহার করতেন না।
সিএনএন পর্যালোচনা করে দেখেছে, গিলেন ম্যাক্সওয়েল ও বিল ক্লিনটনের কর্মীদের মধ্যে হওয়া যোগাযোগের বেশির ভাগই ছিল ভ্রমণ এবং খাবারের ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত। এমনকি মাঝেমধ্যে সাবেক প্রেসিডেন্টকে শেষ মুহূর্তে দাওয়াত দেওয়ার বিষয়ও সেখানে ছিল।
তবে এসব যোগাযোগ ক্লিনটন ফাউন্ডেশনের দাপ্তরিক কাজের জন্য নাকি ক্লিনটন বা তাঁর কর্মীদের ব্যক্তিগত প্রয়োজনে করা হয়েছিল, তা স্পষ্ট নয়।
২০০৩ সালের এপ্রিলে পাঠানো একটি ই–মেইলে গিলেন ম্যাক্সওয়েল বিল ক্লিনটন অফিসের একটি ঠিকানায় (যার নাম মুছে দেওয়া হয়েছে) লিখেছিলেন: ‘শুনে খুশি হলাম, আপনি নৈশভোজে আসছেন। জে ই (জেফরি এপস্টেইন) জানতে চেয়েছে, ক্লিনটনও কি আসবেন বলে আপনার মনে হয়? আমাকে জানাবেন।’
২০০১ সালের ডিসেম্বরের আরেকটি ই–মেইলে ক্লিনটনের একজন কর্মী গিলেনের কাছে যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রিন্স অ্যান্ড্রুর ফোন নম্বর চেয়েছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল বিল ক্লিনটনের স্কটল্যান্ড সফরের সময় গলফ খেলার আয়োজন করা।
উত্তরে গিলেন লিখেছিলেন, ‘অ্যান্ড্রুর সঙ্গে মাত্রই কথা হলো। সে এই মুহূর্তে স্কটল্যান্ডে নেই, তবে এম-এ যাচ্ছে। অ্যান্ড্রু বলল, আমি যদি তাঁকে একটি নম্বর দিই, তবে তিনি নিজেই ক্লিনটনকে ফোন করবেন। ডাগ, আপনি কি চান, তিনি তোমাকে ফোন করুন?’
ডাগ বলতে কাকে বোঝানো হয়েছে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে ওই সময়ে বিল ক্লিনটনের একজন শীর্ষ উপদেষ্টার নাম ছিল ডাগ ব্যান্ড। এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য সিএনএন তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।
গিলেন মাঝেমধ্যে ক্লিনটনের অফিসের কর্মীদের ই–মেইলে বেশ চটুল কথাবার্তা লিখতেন। তেমনই একটি ই–মেইলে তিনি এক কর্মীকে লিখেছিলেন, তিনি একটি ট্যাবলয়েডকে বলেছেন, ওই কর্মী অনেক ‘সুপুরুষ’, তাঁর প্রতি গিলেনের বিশেষ ভালো লাগা কাজ করে। তিনি শারীরিকভাবে অনেক ‘বলিষ্ঠ’ (এখানে একটি অশোভন ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে)। এরপর তিনি লেখেন, ‘আশা করি তুমি কিছু মনে করোনি!’
২০০২ সালে ক্লিনটনের অফিসের একটি ই–মেইল অ্যাকাউন্ড থেকে একজন (যার নাম প্রকাশ করা হয়নি) গিলেনকে লিখেছিলেন: ‘বিশ্বাস করুন আর না-ই করুন, আমি এমন একজনকে বাড়ি নিয়ে গিয়েছি, যাঁর সঙ্গে আগেও রাত কাটিয়েছি। তিনি ৪০ বছর বয়সী একজন বিধবা। আমার আসলে মদ্যপান ছেড়ে দেওয়া উচিত।’
নথিপত্রগুলোতে এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি যে ম্যাক্সওয়েল সরাসরি বিল ক্লিনটনকে ই–মেইল করেছেন কিংবা ক্লিনটন তাঁকে করেছেন।
প্রায় এক দশক পর গিলেন যখন এপস্টেইনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অভিযোগে প্রকাশ্যে অভিযুক্ত হন, তখনো ক্লিনটন পরিবার বা তাদের ঘনিষ্ঠ মহলে তাঁর অবাধ যাতায়াত ছিল।
বিচার বিভাগ যখন জেফরি এপস্টেইনের সঙ্গে বিল ক্লিনটনের মেলামেশার চাঞ্চল্যকর সব নথি প্রকাশ করছে, তখন প্রতিনিধি পরিষদে ক্লিনটন দম্পতিকে নিয়ে উত্তেজনা তুঙ্গে। এপস্টেইন মামলার তদন্তের অংশ হিসেবে সাক্ষ্য দিতে রাজি না হওয়ায় ক্লিনটনদের সঙ্গে রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাদের কয়েক মাস ধরে ব্যাপক বিরোধ চলছে।
চলমান তদন্তের অংশ হিসেবে যাঁদের তলব করা হয়েছিল, তাঁদের মধ্যে সাতজনকে সশরীর উপস্থিত হওয়া থেকে অব্যাহতি দেয় তদন্ত কমিটি। কিন্তু হাউস ওভারসাইট কমিটির চেয়ারম্যান জেমস কোমার নাছোড়বান্দা। তিনি দাবি করেন, ক্লিনটন দম্পতিকে অবশ্যই সশরীর উপস্থিত হয়ে রুদ্ধদ্বার সাক্ষাৎকারে অংশ নিতে হবে।
জেমস কোমার মনে করেন, বিল ক্লিনটন ও জেফরি এপস্টেইনের মধ্যে যেহেতু ব্যক্তিগত যোগাযোগ ছিল, তাই এপস্টেইনের অপরাধজগৎ সম্পর্কে ক্লিনটন অনেক গোপন তথ্য জানতে পারেন, যা তদন্তের জন্য জরুরি।
আইনজীবীদের যুক্তি ছিল, যেহেতু অন্য অনেককে সশরীর হাজির হওয়া থেকে ছাড় দেওয়া হয়েছে, তাই শুধু ক্লিনটন পরিবারকে তলব করাটা পক্ষপাতমূলক আচরণ। তাঁরা এই নির্দেশকে আইনিভাবে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
ক্লিনটনদের আইনজীবীরা এই পরিস্থিতি এড়াতে শেষ মুহূর্তে একটি আপসের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তাঁরা জানিয়েছিলেন, সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন নিউইয়র্কে গিয়ে তদন্ত কমিটির চেয়ারম্যান জেমস কোমার, শীর্ষ ডেমোক্র্যাট সদস্য রবার্ট গার্সিয়া এবং কমিটির কর্মীদের সঙ্গে দেখা করে এপস্টেইন তদন্তের নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে কথা বলতে রাজি আছেন।
চেয়ারম্যান জেমস কোমার এই প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করে দেন। তিনি দাবি করেন, ক্লিনটনরা সাধারণ নিয়মের বাইরে গিয়ে বিশেষ সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা করছেন। কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে না পারায় বিল বা হিলারি ক্লিনটন—কেউই নির্ধারিত সময়ে সশরীরে হাজির হয়ে বয়ান দেননি।
ক্লিনটনদের বিরুদ্ধে কংগ্রেসের অবমাননার প্রস্তাবটি যখন কমিটিতে তোলা হয়, তখন কেবল রিপাবলিকানরাই নন, কমিটির প্রায় অর্ধেক ডেমোক্র্যাট সদস্যও এর পক্ষে ভোট দেন।
ডেমোক্র্যাটদের যুক্তি ছিল, ক্লিনটনদের বিরুদ্ধে এই ভোট দেওয়ার উদ্দেশ্য হলো কংগ্রেসের তলব করার ক্ষমতার মর্যাদা রক্ষা করা। তাঁরা মনে করেন, কেউ যত প্রভাবশালীই হোক না কেন, কংগ্রেসের নির্দেশ অমান্য করা উচিত নয়।