মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগনের লোগো
মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগনের লোগো

ইরান যুদ্ধে হতাহতের সংখ্যা লুকানোর অভিযোগের মধ্যে ওয়েবসাইটে তথ্য বদলাল পেন্টাগন

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে হতাহত মার্কিন সেনাসদস্যের সংখ্যা কমিয়ে দেখানোর অভিযোগের মুখে গতকাল রোববার হতাহতের তথ্য প্রকাশের পদ্ধতিতে পরিবর্তন এনেছে পেন্টাগন। একই সঙ্গে তারা বলেছে, চলতি মাসে আহত সেনাসদস্যের সংখ্যা আগের হিসাবে যা বলা হয়েছিল, তার চেয়ে বেশি।

৭ জুলাই থেকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার যুদ্ধবিরতি ভাঙতে শুরু করে এবং লড়াই আবার তীব্র হয়। মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগনের নতুন পদ্ধতির আওতায় ৭ জুলাই–পরবর্তী হতাহতের তথ্য আর ইরান যুদ্ধের মূল তালিকায় রাখা হচ্ছে না। এর বদলে সেগুলো ‘বিদেশে পরিচালিত সামরিক অভিযানে হতাহতের তথ্য’ শিরোনামে আলাদা একটি ওয়েবপেজে প্রকাশ করা হচ্ছে। এতে যুদ্ধে মোট কতজন মার্কিন সেনা হতাহত হয়েছেন, তা জানতে এখন দুটি আলাদা ওয়েবপেজের তথ্য যোগ করতে হচ্ছে।

নতুন ব্যবস্থার আওতায় পেন্টাগনের তথ্যভান্ডার ডিফেন্স ক্যাজুয়ালটি অ্যানালাইসিস সিস্টেমে (ডিসিএএস) গত সপ্তাহান্তে ইরান যুদ্ধে নিহত চার মার্কিন সেনার তথ্য আবারও যুক্ত করেছে। সম্প্রতি ওয়েবসাইট থেকে এ চার সেনা নিহত হওয়ার তথ্য বাদ দেওয়া হয়েছিল। তবে এবার এই চার সেনার মৃত্যুর তথ্য মূল তালিকায় নয়, আলাদা একটি বিভাগে রাখা হয়েছে। এই বিষয়ে পেন্টাগন কোনো ব্যাখ্যাও দেয়নি। এই পরিবর্তনের কারণে ৭ জুলাইয়ের পর আহত সেনাসদস্যের সংখ্যা পেন্টাগনের আগের প্রকাশিত হিসাবের তুলনায় ১৪২ জন বেড়েছে।

হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, ৭ জুলাই থেকে আহত মার্কিন সেনাসদস্যের সরকারি সংখ্যা এখন ২০৭। আর ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে মোট আহত হওয়ার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬২৪–এ। এদিকে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে নিহত মার্কিন সেনাসদস্যের মোট সংখ্যা ১৮ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

গত সপ্তাহে পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পারনেল দাবি করেছিলেন, ৭ জুলাইয়ের পর থেকে আহত মার্কিন সেনাসদস্যের সংখ্যা ১০০–এর কম। তবে এর আগে মধ্যপ্রাচ্যের যেসব সামরিক ঘাঁটিতে মার্কিন সেনারা অবস্থান করছিলেন, সেগুলোতে ইরানের একাধিক হামলায় কতজন আহত হয়েছেন, সে বিষয়ে পেন্টাগন কোনো সংখ্যা প্রকাশ করেনি।

সে সময় এক বিবৃতিতে পারনেল বলেন, তথ্য গোপনের অভিযোগ সম্পূর্ণ মনগড়া। যুদ্ধক্ষেত্রে তিনজন সেনাসদস্য নিহত হওয়ার পর মার্কিন জনগণকে আরও উদ্বিগ্ন করে তুলতেই এসব অভিযোগ তোলা হচ্ছে।

গতকাল পেন্টাগনের একজন মুখপাত্রের কাছে হতাহতের নতুন সংখ্যা এবং তথ্য প্রকাশের নতুন পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়েছিল। তিনি তখন এই প্রশ্ন হোয়াইট হাউসকে করার পরামর্শ দেন। নিউইয়র্ক টাইমস হোয়াইট হাউস কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানার চেষ্টা করেছে, তবে তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া পাওয়া যায়নি।

গত সপ্তাহে দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরান যুদ্ধে নিহত মার্কিন সেনাসদস্যের সংখ্যা ১৮ থেকে কমিয়ে ১৪ দেখিয়েছে পেন্টাগন। এই পরিবর্তনের পর অনেক সাবেক সেনাসদস্য, সামরিক পরিবারের সদস্য এবং আইনপ্রণেতাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দেয়।

ওই সময় কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, সম্প্রতি জর্ডান ও ইরাকে চার মার্কিন সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন। এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর তাঁরা নিহত হওয়ায় পেন্টাগন নিহত হওয়ার সংখ্যায় পরিবর্তন আনে।

পেন্টাগনের ভারপ্রাপ্ত প্রেস সেক্রেটারি জোয়েল ভালদেজ গত বৃহস্পতিবার বলেন, ওয়েবসাইটে এই পরিবর্তন ‘অস্থায়ী তথ্যগত ত্রুটি’-এর কারণে হয়েছে। তিনি বলেন, দ্রুত সমস্যাটির সমাধান করা হবে।

তবে গত শনিবার সকাল পর্যন্ত পেন্টাগনের ওয়েবসাইটে ইরান যুদ্ধে নিহত মার্কিন সেনাসদস্যের সংখ্যা ১৪ দেখানো হচ্ছিল। গতকাল ওয়েবসাইটে ‘বিদেশে পরিচালিত অভিযানে’ নামে নতুন একটি বিভাগ যুক্ত করা হয়। সেখানে অতিরিক্ত চার সেনাসদস্যের মৃত্যুর তথ্য ‘৭ জুলাই, ২০২৬ থেকে বিদেশে পরিচালিত সামরিক অভিযানে হতাহত’ শিরোনামে আলাদাভাবে প্রকাশ করা হয়েছে।

হতাহতের তথ্য প্রকাশ নিয়ে সমালোচনা বাড়তে থাকায় ডেমোক্র্যাট দলের একদল সিনেট সদস্য বৃহস্পতিবার প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের কাছে চিঠি পাঠান। এতে তাঁরা যুদ্ধে নিহত ও আহত মার্কিন সেনাসদস্যের সংখ্যা সম্পর্কে ‘পূর্ণাঙ্গ ও বিস্তারিত’ তথ্য প্রকাশের দাবি জানান।

সম্প্রতি জর্ডানে হামলায় তিন মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার আগের সপ্তাহে ইরানের আরও তিনটি হামলায় কয়েক ডজন সেনা আহত হয়েছিলেন। তবে এসব হতাহতের তথ্য পেন্টাগন তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ করেনি। এমন অবস্থায় যুদ্ধে হতাহত সেনাসদস্যদের সংখ্যা সম্পর্কে দেশকে অবহিত করার দায়িত্ব সরকার যথাযথভাবে পালন করেছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

চিঠিতে সিনেট সদস্যরা লিখেছেন, ‘যুদ্ধে কত মানুষকে জীবন দিতে হয়েছে, সে সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ও সঠিক তথ্য জানার অধিকার মার্কিন জনগণ, কংগ্রেস, সেনাসদস্য এবং তাঁদের পরিবারের আছে। জনসাধারণের জন্য যে তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে, তা থেকে মনে হচ্ছে সংঘাত চলাকালে প্রতিরক্ষা দপ্তর সময়মতো এবং পূর্ণাঙ্গভাবে হতাহতের তথ্য ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করেনি।’

১৯৭৩ সালের ওয়ার পাওয়ারস অ্যাক্ট অনুযায়ী, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া প্রেসিডেন্ট ৬০ দিনের বেশি সামরিক অভিযান চালিয়ে যেতে পারেন না। এ কারণে বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদ দ্বিতীয়বারের মতো একটি প্রস্তাব পাস করে ট্রাম্পকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বন্ধ করতে অথবা তা চালিয়ে যাওয়ার জন্য কংগ্রেসের অনুমোদন নিতে আহ্বান জানায়। একে ইরান যুদ্ধ নিয়ে উভয় দলের আইনপ্রণেতাদের মধ্যে বাড়তে থাকা অসন্তোষের আরেকটি ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।