মেক্সিকোর শীর্ষ মাদক সম্রাট নেমেসিও ওসেগুয়ারা সার্ভান্তেসকে হত্যা করায় বিশেষ বাহিনীর প্রশংসা করেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ক্লদিয়া শেনবাউম পার্দো।
ওসেগুয়ারা ‘এল মেনচো’ নামেই বেশি পরিচিত। গত রোববার মেক্সিকোর মধ্য–পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য হালিস্কোয় এক রক্তক্ষয়ী বন্দুকযুদ্ধে আটক হওয়ার কিছুক্ষণ পরই হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যান তিনি।
তবে বিবিসির প্রতিনিধি কোয়েন্টিন সমারভিল মেক্সিকোর মাদক চক্রের আরেকটি কেন্দ্র খুঁজে পান। এটি হলো কুলিয়াকান শহর, যা দেশটির উত্তরাঞ্চলীয় সিনালোয়া রাজ্যে অবস্থিত। শক্তিশালী এক মাদক চক্রের নেতার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সেখানে একটি শূন্যতা তৈরি হয়েছে। আর এই শূন্যতা পূরণকে কেন্দ্র করে বিবদমান গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সহিংসতা তুঙ্গে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
কুলিয়াকান শহরে একটি অ্যাম্বুলেন্সের সামনের আসনে বসা ৫৩ বছর বয়সী চিকিৎসাকর্মী হেক্টর তোরেস বলেন, ‘সব জায়গায় আতঙ্ক বিরাজ করছে। প্রতি মুহূর্ত আতঙ্কে কাটছে।’
এর কিছুক্ষণ আগেই বিবিসির ওই প্রতিনিধি ও হেক্টর শহরের কেন্দ্রে একটি গ্যারেজের ভেতরে গোলাগুলির স্থল থেকে ফিরেছেন। তাঁরা সেখানে গিয়ে দেখেন, গ্যারেজের মালিকের অফিসের ফ্লোরে তাঁরই নিথর দেহ পড়ে আছে। চারদিকে মেঝে রক্তে ভিজে আছে।
হেক্টর ও তাঁর সহকর্মী হুলিও সিজার ভেগা সেখানে কাজ করার সময় এক নারী আহাজারি করতে করতে ছুটে আসেন। তিনি নিহত ব্যক্তির স্ত্রী। কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ। হেক্টর নিহত ব্যক্তির নাড়ি পরীক্ষা করে তাঁর মরদেহের ওপর একটি কাগজের চাদর টেনে দেন।
দেড় বছর ধরে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ও দুর্ধর্ষ মাদক চক্র ‘সিনালোয়া কার্টেল’ অভ্যন্তরীণ সংঘাতে লিপ্ত। চক্রের এক নেতার ছেলে অন্য এক নেতার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করার পর এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত শুরু হয়।
দেড় বছর ধরে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ও দুর্ধর্ষ মাদক চক্র ‘সিনালোয়া কার্টেল’ অভ্যন্তরীণ সংঘাতে লিপ্ত। চক্রের এক নেতার ছেলে অন্য এক নেতার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করায় এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত শুরু হয়।
সিনালোয়া কার্টেলের প্রভাবশালী নেতা ইসমাইল ‘এল মায়ো’ জাম্বাদা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের কারাগারে বন্দী। তাঁর অনুপস্থিতিতে পুরো সিনালোয়া রাজ্যজুড়ে চরম অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা তৈরি করেছে। এই পরিস্থিতি পুরো মেক্সিকোর নিরাপত্তার জন্যই এখন বড় এক সতর্কবার্তা।
হেক্টর বলেন, কুলিয়াকানে আগে কখনো সহিংসতা এতটা ভয়াবহ রূপ নেয়নি বা এত দীর্ঘ সময় ধরে চলেনি। গত এক বছরে তাঁদের কাছে আসা জরুরি সাহায্যের আবেদনের সংখ্যা ৭০ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
বিবিসির প্রতিনিধি কোয়েন্টিন সমারভিল বলেন, চিকিৎসাকর্মী হেক্টর ও হুলিওর সঙ্গে তিনি এক সপ্তাহ সময় কাটিয়েছেন। এ সময় তাঁরা যতগুলো সাহায্যের আবেদন পেয়ে ছুটে গেছেন, ঘটনাস্থলে গিয়ে সব কটির পরিণতি একই দেখেছেন—ভবনের ভেতরে কিংবা রাস্তার পাশে মরদেহ পড়ে আছে। আর পাশে দাঁড়িয়ে শোকাতুর স্বজনেরা প্রিয়জন হত্যার বিচার চাচ্ছেন।
মাদক চক্রের এই লড়াইয়ে খুব কম মানুষই প্রাণে বাঁচতে পারেন। এখানে কোনো জায়গাই এখন আর নিরাপদ নয়। স্কুল ও হাসপাতাল, এমনকি শেষকৃত্য অনুষ্ঠানেও হামলা চালানো হচ্ছে।
চিকিৎসাকর্মী হেক্টর তোরেস বলেন, ‘সিনালোয়া কার্টেল আগে একটি পরিবারের মতো ছিল। সবাই মিলে একটি একক চক্র হিসেবে ঐক্যবদ্ধ ছিল। তারা একে অপরের বন্ধু ছিল, একই টেবিলে বসে খাবার খেত। তারা ছিল ভাই–বোনের মতো, কিংবা চাচা বা বাবার মতো। কিন্তু হঠাৎ তারা নিজেদের মধ্যে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ল এবং এক রক্তক্ষয়ী দ্বন্দ্বে লিপ্ত হলো।’
মূলত এই পারিবারিক ব্যবসাই একটা সময় কোটি কোটি ডলারের এক বিশাল সাম্রাজ্যে পরিণত হয়। এই সাম্রাজ্যই ভয়াবহ মাদক ফেন্টানিল উৎপাদন শুরু করে। এই মাদক যুক্তরাষ্ট্রের অলিগলিতে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, যা সেবন করে সেখানে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই সিনালোয়া কার্টেলসহ অন্যান্য মাদক চক্রকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করেছেন এবং ফেন্টানিলকে ‘গণবিধ্বংসী অস্ত্র’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। মাদক ও পাচারকারীদের নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারলে মেক্সিকোর বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ারও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।
হেক্টর ও হুলিওকে দেখা গেল, দুজনই ১৪ কেজি ওজনের ভারী বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরে আছেন। কারণ, প্রতিটি ঘটনাস্থলে তাঁদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চিকিৎসাসেবা দিতে হয়। তাই নিরাপত্তার জন্য এই জ্যাকেট অপরিহার্য।
মেক্সিকোর সরকার সিনালোয়ায় হাজার হাজার সৈন্য পাঠিয়েছে। শহরের প্রায় সব কটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কে তারা তল্লাশিচৌকি বসিয়েছে।
মাদক চক্রের এই লড়াইয়ে খুব কম মানুষই প্রাণে বাঁচতে পারেন। এখানে কোনো জায়গাই এখন আর নিরাপদ নয়। স্কুল ও হাসপাতাল, এমনকি শেষকৃত্য অনুষ্ঠানেও হামলা চালানো হচ্ছে।
পরে জানা গেল, গ্যারেজের মালিক যখন নিহত হন, ঠিক একই সময়ে সেখান থেকে তিনজনকে অপহরণ করা হয়েছে। ভারী অস্ত্রে সজ্জিত সেনা ও নৌবাহিনীর সদস্যরা প্রতিটি গাড়ি তল্লাশি করছেন, যদি অপহৃত ব্যক্তিদের কোনো হদিস মেলে।
কুলিয়াকানে অপহরণের শিকার হওয়ার অর্থ—মৃত্যুর চেয়ে ভয়াবহ কোনো পরিণতিকে বরণ করে নেওয়া।
সপ্তাহের শুরুতে শহরের প্রধান শপিং মলের সামনে এমনই একজনের মরদেহ পাওয়া যায়। মরদেহের ক্ষত চিহ্ন দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল, অপহরণের পর তাঁর ওপর চরম নির্যাতন করা হয়েছে।
মরদেহের পাশে একটি বড় বার্তা লিখে রাখা হয়েছিল, যা ছিল একটি মাদক চক্র থেকে আরেকটি চক্রের প্রতি হুঁশিয়ারি। সেখানে ওই মৃত ব্যক্তিকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ হিসেবে উল্লেখ করে লেখা ছিল, ‘আমরা তোমাদের বাকিদের ধরতে আসছি।’
কুলিয়াকান বেশ সমৃদ্ধ একটি শহর। কিন্তু সহিংসতার কারণে এখন শহরের মানুষ আতঙ্কে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারছেন না। প্রায় প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও মরদেহ পাওয়া যাচ্ছে।
শহরের সান রাফায়েল এলাকায় ১৬ বছর বয়সী ইমানুয়েল আলেকজান্ডারকে গুলি করে হত্যা করা হয়। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেখে, রাস্তার পাশে কিশোরটির নিথর দেহ পড়ে আছে। তাকে খুব কাছ থেকে গুলি করা হয়েছিল।
স্থানীয় সাংবাদিক আর্নেস্তো মার্তিনেজ বলেন, আগে এখানে অনেক পুলিশ ও সেনা ছিল, নিরাপত্তাও ছিল অনেক বেশি। প্রতিটি মোড়ে তল্লাশিচৌকি থাকলেও হত্যাকাণ্ড থামেনি। আগে প্রতিদিন গড়ে পাঁচ থেকে ছয়টি খুনের ঘটনা ঘটত, এখনো সেই ধারা অব্যাহত আছে।
এই সহিংসতার শেষ কোথায়? এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সিনালোয়া কার্টেলের একটি উপদলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা দাবি করে, লড়াইয়ে একটি পক্ষ থাকবে, অন্য সবাই খতম হয়ে যাবে, নইলে এই অস্থিরতা থামবে না। তাদের মতে, সংঘাতের ফলে নিরপরাধ মানুষ ও শিশুরা প্রাণ হারাচ্ছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
কার্টেলের এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ফলে যেমন নিহত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, তেমনি পাল্লা দিয়ে বাড়ছে নিখোঁজের সংখ্যা। রেনাল্দা পুলিদো নামের এক নারী তাঁর ছেলে হাভিয়ের আর্নেস্তোকে হারিয়েছেন ২০২০ সালে। ছেলের সন্ধানে তিনি এখন ‘মাদারস ফাইটিং ব্যাক’ নামক একটি সংগঠনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
কুলিয়াকানের একটি পেট্রলপাম্পে সমবেত হওয়া একদল মা তাঁদের নিখোঁজ সন্তানদের ছবিসংবলিত সাদা টি–শার্ট পরে তল্লাশিতে নামেন। তাঁদের সঙ্গে ছিল সামরিক নিরাপত্তা। একটি নির্জন প্রান্তরে তাঁরা বেলচা ও অন্যান্য সরঞ্জাম নিয়ে মাটির নিচে প্রিয়জনদের মরদেহের সন্ধান করছিলেন।
মেক্সিকোর এই মানবিক সংকট ও নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানে মায়েদের এই লড়াই বিশ্বজুড়ে শোক ও উদ্বেগের ছায়া ফেলেছে।
কুলিয়াকানের এসব দুর্দশার মূলে রয়েছে ফেন্টানিলের কারবার। রোমান (ছদ্মনাম) নামের এক মাদক প্রস্তুতকারক বলেন, তাঁরা আগে যুক্তরাষ্ট্রে বড়ি আকারে ফেন্টানিল পাঠালেও এখন পাউডার আকারে পাঠাচ্ছেন। পাউডার পাঠালে দেশটির শুল্ক বিভাগের চোখ ফাঁকি দেওয়া সহজ বলে তাঁদের বিশ্বাস।
প্রতিটি এক কেজির প্যাকেটের দাম প্রায় ২০ হাজার ডলার। তবে রোমান জানান, শহরভেদে এর মূল্য বৃদ্ধি পায়। তিনি বলেন, ‘নিউইয়র্কে পাঠাতে পারলে এর দাম ২৮ থেকে ২৯ হাজার ডলার পর্যন্ত ওঠে। যত দূরে যাবে, দাম তত বাড়বে এবং আমাদের মুনাফাও বাড়বে।’
নিজের এই কারবার নিয়ে রোমানের কোনো অনুশোচনা বা লজ্জা নেই। তাঁর সাফ কথা, মেক্সিকো বা মার্কিন সরকার যা–ই ভাবুক, ফেন্টানিলের জোগান চলতেই থাকবে। তিনি বলেন, ‘সরকার আমাদের ধরার জন্য তৎপরতা বাড়িয়েছে ঠিকই, কিন্তু আমাদের উৎপাদন থামেনি। মাঝেমধ্যে কড়াকড়ি বাড়লে আমরা কয়েক দিন গা ঢাকা দিয়ে থাকি, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবারও কাজ শুরু করি।’
কার্টেলের এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ফলে যেমন নিহত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, তেমনি পাল্লা দিয়ে বাড়ছে নিখোঁজের সংখ্যা।
যুক্তরাষ্ট্র আপনাদের ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, এমন প্রশ্নের জবাবে নির্লিপ্তভাবে রোমান বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আমাদের সন্ত্রাসী বললেও আমি মনে করিয়ে দিতে চাই, যতক্ষণ এই জিনিসের গ্রাহক থাকবে, ততক্ষণ আমরা এটা বানিয়ে যাব। এর অর্থ এই নয়, আমরা সন্ত্রাসী। মানুষ নিজের ইচ্ছাতেই এই নেশা করছে, কেউ তাদের বাধ্য করছে না।’
অবশ্য মেক্সিকো সরকার দাবি করেছে, মাদক পাচারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তারা অগ্রগতি করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রে ফেন্টানিলের জোগান ৫০ শতাংশ কমিয়ে এনেছে।