ইরানকে অশ্লীল ভাষায় হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরানের ভূখণ্ডে স্থল অভিযানের কথা বিবেচনা করছেন তিনি। এ পরিস্থিতিতে ইরানের পাহাড়ি এলাকা থেকে আহত এক মার্কিন কর্নেলকে উদ্ধার করেছে মার্কিন বিমানবাহিনী। এ ঘটনার পর তিনি শিক্ষা নিতে পারেন। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা ও বিশেষ বাহিনীর সদস্যরা বিধ্বস্ত যুদ্ধবিমানের কর্নেলকে খুঁজে বের করার আগেই যদি ইরানি বাহিনী তাঁকে ধরে ফেলত, তবে ট্রাম্প এমন এক জিম্মি সংকটে পড়তেন, যে কারণে জিম কার্টারের প্রেসিডেন্ট পদ হারাতে হয়েছিল। ট্রাম্প প্রায়ই এ ঘটনা উল্লেখ করে থাকেন।
গত রোববার নিখোঁজ সেনা উদ্ধারের ঘটনায় ট্রাম্প উল্টো আরও উৎসাহিত হয়েছেন বলেই মনে হচ্ছে। অন্তত তাঁর পাঠানো অশ্লীল বার্তার ধরন দেখে তা–ই মনে হচ্ছে। ইরানের নেতৃত্ব, যাঁরা ট্রাম্পের শর্তে আলোচনায় বসতে অস্বীকার করেছেন, তাঁদের উদ্দেশেই এই বার্তা। ক্ষুব্ধ ও হতাশ ট্রাম্প এখন উত্তেজনার পারদ আরও চড়াতে প্রস্তুত। এবার তাঁর লক্ষ্য হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করা, যেখানে মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলা শুরুর আগে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক ছিল। ইরান বুঝতে পেরেছে, এটিই তাদের সবচেয়ে বড় দর–কষাকষির হাতিয়ার।
ট্রাম্প এখন ইরান ও এর টিকে থাকা নেতাদের বাগে আনতে দেশটিতে বোমা হামলার হুমকি দিচ্ছেন। তিনি সেখানকার সেতু ও বিদ্যুৎ গ্রিড ধ্বংস করতে চান। এ হামলা জেনেভা কনভেনশনের লঙ্ঘন হলেও তাতেও তিনি পরোয়া করছেন না।
‘নিয়ন্ত্রণহীন প্রেসিডেন্ট’
ট্রাম্পের বার্তায় মরিয়া সুর লক্ষণীয়। কানেটিকাটের ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস মার্ফি বলেছেন, ‘ট্রাম্পের মন্তব্য ছিল চরম উন্মাদনা ভরা। তিনি ইতিমধ্যে হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করেছেন। তিনি আরও হাজার হাজার মানুষকে মারতে চলেছেন।’
নেব্রাস্কার রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য ডন বেকন এক বার্তায় বলেন, ‘আমেরিকানরা তাদের প্রেসিডেন্টকে অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ হতে দেখতে চায় না।’ তিনি আরও বলেন, ‘নেতৃত্বের অন্যতম অংশ হলো আত্মনিয়ন্ত্রণ।’
অশ্লীলতা ও হুঁশিয়ারি বাদ দিলেও, ট্রাম্পের সাম্প্রতিক আচরণে দোদুল্যমান অবস্থা দেখা যাচ্ছে। তিনি মার্কিন সামরিক শক্তির বড়াই করে ইরানকে ‘একতরফা আত্মসমর্পণ’ করতে বাধ্য করা থেকে শুরু করে বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে নতুন হামলার হুমকি দিয়ে দোদুল্যমান অবস্থায় আছেন।
ট্রাম্পের চাপের কৌশল
ট্রাম্প ইরানকে চাপে রাখতে চান। ইরান চাপের মুখে টিকে থাকার কৌশল নিলেও ট্রাম্প চাপ আরও বৃদ্ধির চেষ্টা করে যাচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক সামরিক কর্মকর্তারা মনে করেন, ট্রাম্পের কৌশল কাজে দিলেও দিতে পারে। ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান জেনারেল কেনেথ এফ ম্যাকেঞ্জি জুনিয়র রোববার সিবিএসের ‘ফেস দ্য নেশন’-এ বলেন, ‘ইতিহাস থেকে আমরা জানি, শাসনের ওপর অস্তিত্ব রক্ষার চাপ তৈরি হলে ইরানের নেতৃত্ব সাড়া দেয়।’
অবশ্যই এ ধরনের চাপ তৈরি করতে সময় লাগে। ট্রাম্প তাই সময় বাড়িয়ে চলছেন। ইরান ট্রাম্পের এ কৌশল জানে। তারা বুঝতে পারছে, তাদের জেতার দরকার নেই; তাদের কেবল টিকে থাকতে হবে এবং প্রক্রিয়াটিকে দীর্ঘায়িত করতে হবে। এতে ট্রাম্পের জন্য ঝুঁকি বাড়বে।
ট্রাম্প দাবি করছেন, ইরান চুক্তির জন্য মরিয়া। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা মিত্রদের গোয়েন্দা বিশ্লেষণ বলছে উল্টো কথা। বেশির ভাগ বিশ্লেষক মনে করেন, ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্রগুলো বিশৃঙ্খল থাকলেও নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি সম্ভবত আলোচনার ক্ষেত্রে আরও কঠোর অবস্থান নেবেন। তাঁরা আরও মনে করেন, দেশের অস্তিত্ব রক্ষার হুমকির মুখে আইআরজিসি ক্ষমতা নেবে এবং পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের পথে হাঁটতে পারে।
ট্রাম্পের ঝুঁকি
ইরান যুদ্ধে সম্প্রতি চারটি যুদ্ধবিমান হারিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এর মধ্যে দুটি গুলি করে নামানো হয়েছে এবং দুটি উদ্ধার অভিযানের সময় মার্কিন বাহিনী নিজেরাই উড়িয়ে দিয়েছে বলে দাবি করেছে। এটা মনে করিয়ে দেয়, ইরানের ভেতরে লড়াই শুরু হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা ট্রাম্পের হাত থেকে ফসকে যেতে পারে। এতে দুর্ঘটনা ঘটে। যন্ত্রপাতি বিকল হয়। ক্রুরা নিখোঁজ হন। বেশি সময়ের সঙ্গে আসে বেশি ঝুঁকি। এখন পর্যন্ত ট্রাম্প সাফল্যের জন্য প্রয়োজনীয় সময়ের সামঞ্জস্য করতে পারেননি।
বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, ট্রাম্প হয়তো শক্তি প্রয়োগ করে হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে পারেন; কিন্তু তা খোলা রাখতে কয়েক মাস বা কয়েক বছরের নিরবচ্ছিন্ন উপস্থিতির প্রয়োজন হবে। ট্রাম্প পরামর্শ দিয়েছেন, এটি একটি আন্তর্জাতিক বাহিনীর দায়িত্ব হওয়া উচিত। কিন্তু চীন বা ইউরোপের মতো শক্তিগুলো এতে যোগ দিতে আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে না।
ইউরোপীয়রাও ক্ষুব্ধ। ট্রাম্প তাঁদের সঙ্গে পরামর্শ না করেই যুদ্ধ শুরু করেছেন এবং এখন তাঁদের সাহায্য চাইছেন। এটা কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়, গত সপ্তাহে প্যারিসে হরমুজ প্রণালি খোলার বিষয়ে ৪০টি দেশের বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রকে বাদ রাখা হয়েছিল।
একই রকম ঝুঁকি রয়েছে উত্তর পারস্য উপসাগরের ইরানি তেল রপ্তানি কেন্দ্র খারগ দ্বীপ দখলের ক্ষেত্রেও। ট্রাম্প গত সপ্তাহে বলেছিলেন, এটি দখল করা সহজ হবে। তিনি কখনোই ব্যাখ্যা করেননি কীভাবে তিনি এই দ্বীপ বা তেল উৎপাদন কেন্দ্রগুলো দখলে রাখবেন। এর চেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ইসফাহানের গভীর ভূগর্ভস্থ সংরক্ষণাগার থেকে ৯৭০ পাউন্ড ইউরেনিয়াম জব্দ করা। সামরিক কর্মকর্তারা বলেছেন, এই অভিযানে হতাহতের ঝুঁকি অনেক বেশি।
ট্রাম্প কি এ ধরনের ঝুঁকি নেবেন? তাঁর প্রথম মেয়াদের জাতীয় নিরাপত্তা সহযোগীরা বলছেন, ‘না’। কিন্তু দ্বিতীয় দফায় কিছু একটা বদলে গেছে। ওভাল অফিসে পাঁচ বছরের বেশি সময় কাটানোর পর, তাঁর নিজের বিচারবুদ্ধির ওপর আত্মবিশ্বাস বেড়েছে। তিনি এমন এক ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা দল গঠন করেছেন, যাঁরা প্রথম মেয়াদের উপদেষ্টাদের তুলনায় তাঁর বিরোধিতা করার সম্ভাবনা অনেক কম।
২০২৫ সালের জুনে তিনটি ইরানি পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলা এবং ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে তুলে আনার সাফল্য ট্রাম্পকে এই ধারণা দিয়েছে, মার্কিন সামরিক বাহিনী তাঁকে বিশ্বকে নিজের ইচ্ছামতো চালাতে সাহায্য করতে পারে। এতটাই যে ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের মতে, ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর সময় ট্রাম্প ‘কৌতূহলী’ ছিলেন, কেন ইরান এখনো নতি স্বীকার করেনি। যুদ্ধের ৩৫তম দিনে এসেও ট্রাম্পের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ইঙ্গিত দিচ্ছে, তিনি এখনো সেই একই প্রশ্ন করে যাচ্ছেন।