
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গত বুধবার জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। মাত্র এক সপ্তাহ আগে মার্কিন হামলায় বাণিজ্যিক জাহাজে থাকা তিনজন ভারতীয় নাবিক নিহত হয়েছেন। এ ঘটনা দুই দেশের সম্পর্কের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।
মোদি হয়তো এ সম্পর্ক স্থিতিশীল করতে চাইবেন। তবে তাঁর কাজটা বেশ কঠিন। ইরান যুদ্ধের কারণে ভারত এখন বেশ দুর্বল। অথচ এই যুদ্ধ শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ভারতের ওপর যুদ্ধের প্রভাব নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন অনেকটাই উদাসীন।
গত আগস্টে রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনার জন্য ভারতের ওপর শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপ করেন ট্রাম্প। তখন থেকেই ভারত বিকল্প তেলের উৎস খুঁজতে হিমশিম খাচ্ছে। এর ওপর উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল সরবরাহে নতুন কড়াকড়ি আসায় ভারত এখন বড় জ্বালানিসংকটের মুখে। বহু প্রতীক্ষিত বাণিজ্যচুক্তি এখনো ঝুলে আছে।
ওমান উপসাগরে ভারতীয় নাবিকদের মৃত্যু দুই দেশের সম্পর্ক মেরামতের আশায় বড় ধাক্কা দিয়েছে।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির পর দুই নেতার এটাই প্রথম মুখোমুখি সাক্ষাৎ। তবে দুই নেতাকে এবার মোলাকাত করতে দেখা গেল না। বৈঠকের আগে সম্মেলনে মোদি একবার হাত বাড়িয়ে দিলেও ট্রাম্প হাত মেলাননি। ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর মোদি তাঁকে অভিনন্দন জানাতে ওয়াশিংটনে গিয়েছিলেন। তখন তাঁদের মধ্যে বেশ হৃদ্যতা দেখা গিয়েছিল।
গত ১৬ মাসে পরিস্থিতি বদলে গেছে। ট্রাম্পের অস্থির ও কখনো কখনো আক্রমণাত্মক আচরণের কারণে দুই দেশের সম্পর্কে বড় পরিবর্তন এসেছে। ট্রাম্প প্রশাসন ভারতের বাজার খুলতে চাপ দিচ্ছে; পাশাপাশি এমন অভিবাসননীতি নিয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রে থাকা ভারতীয় শিক্ষার্থী ও কর্মীদের ওপর বড় প্রভাব ফেলেছে।
ভারতের স্বার্থবিরোধী এসব পদক্ষেপে দেশটির অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ভারতের জাতীয় মর্যাদাও ক্ষুণ্ন হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে দুই নেতার ব্যক্তিগত সখ্যের সুফল নিয়ে।
ইউএস-ইন্ডিয়া বিজনেস কাউন্সিলের সভাপতি এবং ভারতের সাবেক মার্কিন কূটনীতিক অতুল কেশাপ বলেন, ‘গত ২৫ বছরে দিল্লি ও ওয়াশিংটনের মধ্যে যে ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠেছিল, তা এখন নড়বড়ে অবস্থায় আছে। এমনকি দুই দেশের পথ দুদিকে বেঁকেও যেতে পারে।’
অতুল কেশাপ আরও বলেন, দুই সরকারের উচিত বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে অন্তহীন আলোচনা না করে ডিজিটাল অর্থনীতি ও পারমাণবিক জ্বালানির মতো অভিন্ন স্বার্থের জায়গাগুলো শক্তিশালী করা।
গত বছর ট্রাম্প বিভিন্ন দেশের ওপর শুল্ক আরোপ করার পর ভারত বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে বেশ কঠোর অবস্থান নিয়েছিল। দীর্ঘ আলোচনার কারণে মার্কিন কর্মকর্তারাও বিরক্ত।
তবে সম্প্রতি পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর ভারত সফরের সময় একটি খনিজ সম্পদ চুক্তি সই হয়েছে। এতে সম্পর্ক পুনর্গঠনের কিছু চেষ্টা চোখে পড়ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, বুধবার সকালে ট্রাম্প ও মোদি বৈঠকে বসেন। সেখানে এক বছর ধরে ঝুলে থাকা বাণিজ্যচুক্তিসহ নানা বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
গত ফেব্রুয়ারিতে দুই দেশ একটি অন্তর্বর্তীকালীন বাণিজ্যচুক্তির খসড়া চূড়ান্ত করেছিল। তবে শর্তাবলি নিয়ে এখনো দর–কষাকষি চলছে। এই চুক্তি কবে সই হবে, তা স্পষ্ট নয়। ওই কর্মকর্তার মতে, জি-৭ বৈঠকে এই চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কমই ছিল।
এমনকি ট্রাম্পকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীতও করেননি নরেন্দ্র মোদি। এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে টানাপোড়েন চলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের উচিত অহংকার গিলে নমনীয় হওয়া। কারণ, বিশ্ব অর্থনীতিতে চীন বা যুক্তরাষ্ট্রের মতো শক্তিশালী প্রভাব ভারতের নেই।
ওয়াশিংটনভিত্তিক হাডসন ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো অপর্ণা পান্ডে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেই ভারতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক।’
গত সপ্তাহে ওমান উপসাগরে তিনটি তেলবাহী জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় মার্কিন বাহিনী। এতে তিনজন ভারতীয় নাবিক নিহত হন এবং আরও কয়েকজনকে উদ্ধার করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, জাহাজগুলো ইরানের ওপর জারি করা নৌ অবরোধ অমান্য করেছিল।
এ হামলার ঘটনায় ভারতে ব্যাপক ক্ষোভ দেখা দেয়। জাহাজে থাকা অন্য ভারতীয় নাবিকদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলায় মার্কিন বাহিনীর সমালোচনা চলছে। ভারত সরকার দিল্লিতে নিযুক্ত মার্কিন কূটনীতিকের কাছে ‘কড়া প্রতিবাদ’ জানিয়েছে। তবে বিরোধীদের অভিযোগ, সরকার যথেষ্ট পদক্ষেপ নিচ্ছে না।
লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী মোদির নীরবতার সমালোচনা করেছেন। তিনি মোদিকে ট্রাম্পের ‘অনুগত ভৃত্য’ বলে আখ্যা দেন।
বাণিজ্য ও রাজনীতি নিয়ে তিক্ততা বাড়লেও দুই নেতার মধ্যে নাটকীয় সখ্য এখনো অটুট। দুজনেই ‘শক্তিশালী নেতা’ হিসেবে পরিচিতি চান। গত সপ্তাহে ট্রাম্প মোদিকে ভারতের দীর্ঘতম সময় দায়িত্ব পালনকারী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য অভিনন্দন জানান। ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লেখেন, ‘এবং তিনি সত্যিই একজন মহান নেতা।’
জি–৭ শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে অনুষ্ঠিত বৈঠকেও ট্রাম্প ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রশংসা করে তাঁকে একাধারে একজন ‘দেবদূত’, তবে ‘খুনি’ (বাণিজ্যিক আলোচনায় কঠোর বা রূপক অর্থে দক্ষ খেলোয়াড়) হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘ এক বছর ধরে চলা কঠিন আলোচনা এবং এখনো কোনো চূড়ান্ত বাণিজ্যচুক্তি না হওয়াকে ইঙ্গিত করেই ট্রাম্প এ মন্তব্য করেছিলেন।
মোদিও ট্রাম্পের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। তবে তাঁদের আড়ালের সম্পর্ক ছিল উত্তেজনাময়। গত জুনে কানাডায় জি-৭ সম্মেলনের সময় ট্রাম্প আগেভাগে চলে যান। ফলে দুই নেতার সরাসরি দেখা হয়নি, কেবল ফোনে কথা হয়। পরে ওয়াশিংটন যাওয়ার আমন্ত্রণও মোদি গ্রহণ করেননি। ভারত জি-৭–এর সদস্য নয়, তবে আমন্ত্রিত দেশ হিসেবে নিয়মিত সম্মেলনে অংশ নেয়।