হাউস ওভারসাইট কমিটির রুদ্ধদ্বার শুনানিতে অংশ নিতে পৌঁছান মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস (মাঝে)। ক্যাপিটল হিল, ওয়াশিংটন ডিসি, ১০ জুন
হাউস ওভারসাইট কমিটির রুদ্ধদ্বার শুনানিতে অংশ নিতে পৌঁছান মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস (মাঝে)। ক্যাপিটল হিল, ওয়াশিংটন ডিসি, ১০ জুন

এপস্টিনের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে কংগ্রেসের তদন্তকারীদের মুখোমুখি বিল গেটস

যুক্তরাষ্ট্রের কুখ্যাত যৌন নিপীড়ক জেফরি এপস্টিনের নথিপত্র প্রকাশের পর তাঁর সঙ্গে মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটসের সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন ওঠেছে। এর জেরে আজ বুধবার ক্যাপিটল হিলে রুদ্ধদ্বার কক্ষে সাক্ষ্য দিচ্ছেন এই ধনকুবের। কংগ্রেসের তদন্তকারীদের সামনে এখন পর্যন্ত হওয়া সবচেয়ে উচ্চপর্যায়ের (হাইপ্রোফাইল) শুনানির মধ্যে এটি অন্যতম।

যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ চলতি বছর বেশ কিছু নথি প্রকাশ করেছে। সেখানে বিল গেটসের বিরুদ্ধে আপত্তিকর ও বেশ কিছু অভিযোগ ওঠে। পাশাপাশি গেটস ও এপস্টিনের মধ্যে দাতব্য কাজের বেশ কিছু সমন্বয়ের খবরও উঠে আসে, যা আগের চেয়ে অনেক বেশি বিস্তারিত। এরপরই হাউস ওভারসাইট কমিটি গেটসকে স্বেচ্ছায় সহযোগিতা করার আহ্বান জানায়।

এটি এই কমিটির ১৫তম জেরা। প্রয়াত ওই ধনকুবেরের সঙ্গে গেটসের ঠিক কতটা ঘনিষ্ঠতা ছিল, তা নিয়ে রিপাবলিকান ও ডেমোক্রেটিক উভয় পার্টির আইনপ্রণেতারাই তাঁকে প্রশ্ন করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিচার বিভাগের মামলাসংক্রান্ত নথিপত্র থেকে বেশ কিছু ভিডিও ও ছবি প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে এপস্টিনের বলয়ে থাকা হাওয়ার্ড লুটনিক থেকে শুরু করে বিল ক্লিনটনের মতো অনেক ক্ষমতাধর ব্যক্তির উপস্থিতি দেখা গেছে। বিল গেটসও তাঁদেরই একজন।

ক্যাপিটল হিলে পৌঁছানোর পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন বিল গেটস। তিনি বলেন, ‘কমিটির কাজে সাহায্য করতে স্বেচ্ছায় এখানে সাক্ষ্য দিতে পেরে আমি আনন্দিত।’ তিনি আরও জানান, একটি সূচনা বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি তাঁর কথা শুরু করবেন।

বিল গেটস বলেন, ‘ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিতে কমিটি যে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছে, আশা করি আমার সাক্ষ্য তাতে সহায়ক হবে।’

সিএনএনের আগের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এর আগে প্রকাশিত নথির সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর অংশটি ছিল ২০১৩ সালের জুলাইয়ের দুটি ড্রাফট বা খসড়া ই–মেইল। ধারণা করা হচ্ছে, এপস্টিন নিজেই নিজের ঠিকানায় ই–মেইল দুটি লিখেছিলেন।

বানান ভুল ও ক্ষোভে ভরা অগোছালো ওই ই–মেইলগুলোতে এপস্টিন দাবি করেন, তিনি গেটসকে বিভিন্ন তরুণীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনে সাহায্য করেছিলেন। এমনকি স্ত্রীর কাছে যৌনবাহিত রোগ (এসটিডি) লুকানোর জন্য তিনি গেটসকে ওষুধের ব্যবস্থাও করে দিয়েছিলেন।

২০১৩ সালের ওই খসড়া বার্তাগুলো আসলে কে লিখেছিলেন বা সেগুলো আদৌ কখনো পাঠানো হয়েছিল কি না, তা স্পষ্ট নয়। বার্তাগুলো এপস্টিনের ই–মেইল অ্যাকাউন্টে সেভ করা ছিল এবং সেগুলো তাঁর নিজের ঠিকানাতেই লেখা।

ই–মেইলগুলো পড়লে মনে হয়, সে সময় তাঁদের বন্ধুত্বে কিছুটা ফাটল ধরেছিল। তবে ওই সময়েও তাঁদের মধ্যে দেখা-সাক্ষাৎ এবং ই–মেইল আদান-প্রদান চলছিল।

একটি ই–মেইলে এপস্টিনের দাবি ছিল, তিনি গেটসকে ওষুধ জোগাড় করে দিয়েছিলেন। ‘রাশিয়ার মেয়েদের সঙ্গে যৌন সম্পর্কের পরিণতি’ সামাল দিতে এবং ‘বিবাহিত নারীদের সঙ্গে অবৈধ মেলামেশার’ কারণে এই ওষুধের প্রয়োজন হয়েছিল।

ব্রিজ টুর্নামেন্ট খেলার জন্য গেটস যে এপস্টিনের কাছে ‘অ্যাডেরল’ (মস্তিষ্ক উদ্দীপ্ত করার ওষুধ) চেয়েছিলেন, সে কথাও ওই ই–মেইলে উল্লেখ আছে।

অন্য খসড়া ই–মেইলে অভিযোগ করা হয়, যৌনবাহিত রোগসংক্রান্ত বার্তাগুলো মুছে ফেলার জন্য গেটস কেঁদে কেঁদে এপস্টিনকে অনুরোধ করেছিলেন। সেখানে আরও বলা হয়, ‘তুমি আমাকে অ্যান্টিবায়োটিক জোগাড় করে দেওয়ার অনুরোধ করেছিলে, যাতে তুমি গোপনে সেটি মেলিন্ডাকে খাওয়াতে পারো।’ এ ছাড়া তাঁর (গেটস) পুরুষাঙ্গ নিয়ে লেখা অত্যন্ত ব্যক্তিগত ও খোলামেলা তথ্যগুলোও মুছে ফেলার অনুরোধ ছিল।

খসড়া ই–মেইলের এসব অভিযোগের কোনো সত্যতা যাচাই করা যায়নি বা প্রমাণও মেলেনি।

বার্তাগুলো কখনো গেটস বা অন্য কারও সঙ্গে শেয়ার করা হয়েছিল, এমন কোনো ইঙ্গিতও পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া এপস্টিন-সংশ্লিষ্ট কোনো ফৌজদারি অপরাধের দায়ে মাইক্রোসফটের এই সহপ্রতিষ্ঠাতাকে কখনো অভিযুক্ত করা হয়নি।

বিল গেটস এসব দাবি দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছেন। তাঁর একজন মুখপাত্র এর আগে সিএনএনকে বলেছিলেন, ‘এসব দাবি একেবারেই অযৌক্তিক ও সম্পূর্ণ মিথ্যা।’

বিল গেটসের মুখপাত্র বলেন, ‘এসব নথি শুধু এপস্টিনের হতাশাই প্রমাণ করে। গেটসের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার ক্ষোভ থেকে তাঁকে ফাঁসাতে ও মানহানি করতে তিনি কত দূর যেতে পারেন, এটি তারই প্রমাণ। এপস্টিনের সঙ্গে দেখা করাটা বড় ধরনের ভুল সিদ্ধান্ত ছিল বলে গেটস স্বীকার করেন। তবে এপস্টিন বা তাঁর জঘন্য কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যেকোনো ধরনের অসদাচরণের কথা তিনি সুস্পষ্টভাবে অস্বীকার করেছেন। গেটস কখনোই এপস্টিনের আইল্যান্ডে যাননি, তাঁর সঙ্গে কোনো পার্টিতে অংশ নেননি এবং এপস্টিনের কোনো অবৈধ কাজের সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না।’

গত ফেব্রুয়ারিতে অস্ট্রেলিয়ায় সিএনএনের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ‘নাইন নিউজ’কে একটি সাক্ষাৎকার দেন গেটস। সেখানে তাঁকে সদ্য প্রকাশিত এই নথিগুলো সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল।

জবাবে গেটস বলেছিলেন, ‘বোঝা যাচ্ছে জেফরি নিজেই নিজেকে একটি ই–মেইল লিখেছিলেন। ই–মেইলটি কখনোই পাঠানো হয়নি এবং আপনারা জানেন, ই–মেইলটি মিথ্যা। সেখানে তাঁর চিন্তাভাবনা কী ছিল, তা আমার জানা নেই। তবে এটি আমাকে মনে করিয়ে দেয়, তাঁর সঙ্গে কাটানো প্রতিটি মুহূর্তের জন্য আমি অনুতপ্ত। আমি এর জন্য ক্ষমা চাইছি।’

গেটসের সাক্ষ্য দেওয়ার আগে হাউস ওভারসাইট কমিটির চেয়ারম্যান জেমস কমার সিএনএনকে বলেন, বুধবারের এই রুদ্ধদ্বার জেরায় প্রশ্ন করার ক্ষেত্রে কোনো ধরাবাঁধা সীমা রাখা হয়নি।