
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে গত শুক্রবার সম্ভবত তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি দিয়েছেন দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। প্রেসিডেন্টের নিয়োগ দেওয়া দুজনসহ সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা তাঁর বৈশ্বিক শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত বাতিল করে দিয়েছেন। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে আদালতের এ রায় ট্রাম্পকে রাজনৈতিকভাবে বাঁচিয়ে দিয়েছে। কিছু রিপাবলিকান প্রকাশ্যেই এই রায়ের প্রশংসা করছেন। পর্দার আড়ালে আরও অনেকেই এতে খুশি হয়েছেন।
আদালতের সিদ্ধান্তটি ট্রাম্পের এজেন্ডার জন্য বড় ধাক্কা হলেও এটি তাঁর হাত থেকে এমন কিছু হাতিয়ার কেড়ে নিয়েছে, যা দেশের জন্য স্বল্পমেয়াদি অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। একই সঙ্গে ট্রাম্পের দলের জন্যও তা স্পষ্ট রাজনৈতিক ক্ষতির কারণ হচ্ছিল।
শুল্ক নিয়ে এই গল্পের এখানেই শেষ নয়। ট্রাম্প দ্রুতই ইঙ্গিত দিয়েছেন যে তিনি ভিন্ন একটি ক্ষমতার অধীনে ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করছেন। এমনকি শুক্রবার তিনি দাবি করেন, সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ে তাঁর ক্ষমতা আরও ‘শক্তিশালী’ হয়েছে; কিন্তু বিষয়টি আসলে সত্য নয়। ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে সংকুচিত হয়েছে।
সংবিধানে কংগ্রেসকে দেওয়া ক্ষমতাগুলো যখন ট্রাম্প নিজের হাতে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন, তখনো রিপাবলিকানরা তাঁকে তা করতে দিয়ে খুশিই ছিলেন। তবে আদালতের রায়ের ধাক্কাটি রিপাবলিকান শিবিরে একটি আত্মোপলব্ধির জন্ম দিতে পারে। তারা ট্রাম্পের বাণিজ্যিক চালগুলো আর মেনে নেবে কি না, সে প্রশ্ন উঠতে পারে।
ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিযোগ
সুপ্রিম কোর্টের রায় ঘোষণার আগে ব্যুরো অব ইকোনমিক অ্যানালাইসিস জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে গেছে। ২০১৬ সালের পর ২০২৫ সালটি জিডিপি প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন খারাপ বছরে পরিণত হয়েছে। এ ছাড়া গত বছরটি গত কয়েক দশকের মধ্যে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও অন্যতম দুর্বল বছর ছিল। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মূল্যস্ফীতি। সহজ কথায়, পুঁজিবাজারের হিসাব বাদ দিলে মার্কিন অর্থনীতি খুব একটা ভালো যাচ্ছে না।
এই স্থবিরতার পেছনে সুনির্দিষ্টভাবে শুল্কের দায় কতটুকু, তা পরিষ্কার নয়। তবে শুল্ক নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং এর ফলে তৈরি হওয়া অতিরিক্ত খরচ স্পষ্টতই অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে, যে অর্থনীতি আগে থেকেই নড়বড়ে ছিল। এই শুল্ক আমেরিকানদের কাছে অর্থনৈতিক দুর্দশার জন্য ট্রাম্পকে সরাসরি অভিযুক্ত করার একটি সুযোগ করে দিয়েছে।
ট্রাম্পকে মূল্য দিতে হচ্ছে
ট্রাম্প ও রিপাবলিকানদের শুল্ক নিয়ে বাড়াবাড়ির মূল্য তাঁদের দিতেও হয়েছে। গত ২ এপ্রিল ট্রাম্প বৈশ্বিক শুল্কের ঘোষণা দেওয়ার পর থেকে নেট সিলভারের গড় সমীক্ষায় অর্থনীতিতে তাঁর জনপ্রিয়তার রেটিং ‘প্লাস-৬’ থেকে ‘মাইনাস-১২’-তে নেমে এসেছে। গত মাসে সিএনএনের এক জনমত জরিপে দেখা গেছে, ৬২ শতাংশ আমেরিকান শুল্কনীতিতে ট্রাম্পের ওপর অসন্তুষ্ট, বিপরীতে সমর্থন জানিয়েছেন মাত্র ৩৭ শতাংশ। এমনকি রিপাবলিকানপন্থী ভোটারদেরও ২৫ শতাংশ এটি পছন্দ করেননি।
রিপাবলিকানদের দিকে চোখ
যেসব রিপাবলিকান সমর্থক শুল্কনীতি নিয়ে সন্দিহান হওয়া সত্ত্বেও এত দিন চুপ ছিলেন এবং এখন এই অধ্যায়ের ইতি টানতে চান, তাঁদের দিকে এখন চোখ থাকবে। এক বছর ধরে অনেক রিপাবলিকান নেতা ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের বিষয়টি অনেকটা ‘নাক ও মুখ বুজে’ সহ্য করেছেন। কারণ, এই শুল্কনীতি রিপাবলিকানদের দীর্ঘদিনের মুক্তবাজার অর্থনীতি ও মুক্ত বাণিজ্যের আদর্শের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক ছিল।
কিন্তু ট্রাম্পের এই ‘একলা চলো’ নীতির জন্য আদালতের রায়টি একটি বড় ধাক্কা, যা তাঁর অন্যান্য প্রচেষ্টাকেও ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। বিচারপতি নিল গোরসাচ তাঁর সহমত পোষণকারী বক্তব্যে অনেকটা অনুরোধের সুরেই কংগ্রেসকে বলেন, যেন তাঁরা এই বিষয়গুলো এখন থেকে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমাধান করা শুরু করেন।
এ বছর যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন। এই শুল্কনীতির সম্ভাব্য রাজনৈতিক ক্ষতির বিষয়টি এখন বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে। সুপ্রিম কোর্ট প্রথম দফার শুল্ক বাতিল করার আগেই ট্রাম্পের এই এজেন্ডার প্রতি অনেকের ধৈর্যচ্যুতির লক্ষণ দেখা গিয়েছিল। এই রিপাবলিকানদের কেউ কেউ হয়তো ভাবছেন, তাঁরা ট্রাম্পকে কাজ করার যথেষ্ট সুযোগ দিয়েছিলেন, কিন্তু এখন সময় এসেছে সামনে এগিয়ে যাওয়ার।
প্রকৃতপক্ষে শুক্রবার ট্রাম্পের মতো খুব কম রিপাবলিকানকেই আদালতের সমালোচনা করতে দেখা গেছে। এর মানে এই নয় যে তাঁরা হঠাৎ করেই এ ইস্যুতে দলবদ্ধভাবে ট্রাম্পের সঙ্গ ত্যাগ করবেন। আর ট্রাম্পও সুপ্রিম কোর্ট বা নিজের দলের চাপের কাছে নতি স্বীকার করছেন—এমনটা দেখাতে চাইবেন না। তবে ট্রাম্প যদি বড় আকারে শুল্ক আরোপের চেষ্টা চালিয়ে যান, তবে তিনি সম্ভবত রাজনৈতিক ক্ষেত্রে একটি সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করবেন।