জেফরি এপস্টিন প্রভাবশালী ও ধনকুবেরদের ভোগবিলাসের সুযোগ দিয়ে গোপনে সেই সবের প্রমাণ সংগ্রহ করে তা নিজের কাছে রেখে দিতেন
জেফরি এপস্টিন প্রভাবশালী ও ধনকুবেরদের ভোগবিলাসের সুযোগ দিয়ে গোপনে সেই সবের প্রমাণ সংগ্রহ করে তা নিজের কাছে রেখে দিতেন

দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের অনুসন্ধান

এপস্টিনের কাছে কেন তরুণীদের পাঠাতেন মডেলিং এজেন্ট, এখন কী বলছেন তিনি

২০০৯ সাল। যুক্তরাষ্ট্রের সাজাপ্রাপ্ত যৌন নিপীড়নকারী জেফরি এপস্টিন তখন কারাগার থেকে সদ্য মুক্তি পেয়েছেন। তখন তাঁর এক বন্ধু একটি সম্ভাব্য ‘জেলমুক্তির উপহার’–এর (কামিং আউট গিফট) প্রস্তাব করেছিলেন—৫ ফুট ১১ ইঞ্চি উচ্চতার ও ‘অসাধারণ’ গড়নের এক মডেল।

‘প্রথমবার ওই মডেলকে যখন আমি সামনাসামনি দেখি, আমার হুঁশ উড়ে গিয়েছিল। তখনই তাঁর পোশাক ছিঁড়ে ফেলতে ইচ্ছে করছিল,’ ই–মেইলে এপস্টিনকে বলেন ওই বন্ধু। এপস্টিন তখনো গৃহবন্দী।

ওই বন্ধু লিখেছেন, ‘আমি সত্যিই চাই তুমি তাঁর (ওই মডেল) সঙ্গে দেখা করো। এখন তিনি-ও বলছেন, তিনি তোমার সঙ্গে দেখা করতে চান। তাই তিনি দেশ ছাড়ার আগে তুমি যদি তাঁর সঙ্গে দেখা না করো, তবে তা হবে অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়।’

এপস্টিনকে এই ই–মেইল পাঠিয়েছিলেন রামসে এল্কহোলি। তিনি তখন ছিলেন নিউইয়র্ক শহরের একজন মডেল এজেন্ট। এর আগে তিনি ইন্দোনেশিয়ার এক দুর্গম উপজাতির সঙ্গে থেকে সামাজিক নৃবিজ্ঞানে পিএইচডি করছিলেন।

মার্কিন বিচার বিভাগ সম্প্রতি এপস্টিনের বিশাল নথিপত্র প্রকাশ করেছে। নথিতে বড় বড় ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে এই ধনকুবেরের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা ফাঁস হয়ে যায়। এর জেরে অনেকেই পদত্যাগ করতে বাধ্য হন এবং জনসমক্ষে বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়েন।

তবে দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট এই নথিপত্র ঘেঁটে আরও একটি বিষয় জানতে পেরেছে। কারাগার থেকে ছাড়া পাওয়ার পর এপস্টিন এজেন্ট এল্কহোলির মতো কম পরিচিত মডেলিং সহযোগীদের নিয়ে একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিলেন। তাঁরা বিভিন্ন নারীকে এপস্টিনের কাছে আনার প্রস্তাব দিতেন।

ই–মেইলগুলো প্রায়শই ছিল অশালীন ও যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ। যদিও এই পরিচয় করিয়ে দেওয়ার মূল উদ্দেশ্যটি স্পষ্ট করে বলা হয়নি।

উদাহরণস্বরূপ, একজন সুইডিশ মডেলিং স্কাউট (নতুন মডেল সন্ধানকারী) এপস্টিনের জন্য কিশোরী মেয়েদের খুঁজে বের করার চেষ্টার কথা জানিয়ে খুদে বার্তা দিয়েছিলেন।

একজন রুশ মডেল এপস্টিনকে ই–মেইলে জানান, আরেকজন নারীকে পটিয়ে ফেলা ‘খুবই সহজ’ হবে। এ জন্য শুধু তাঁকে বলতে হবে, তাঁরও মডেল হওয়ার সম্ভাবনা আছে। অন্যরা এপস্টিনকে বিভিন্ন মডেলের বিবরণ দিয়ে খুদে বার্তা পাঠাতেন, যাঁদের সঙ্গে তিনি (এপস্টিন) দেখা করতে পারেন। সেই সঙ্গে তাঁদের ছবি পাঠানোর প্রতিশ্রুতিও দিতেন।

২০০৯ সাল থেকে পরবর্তী এক দশক ধরে এপস্টিনকে শতাধিক ই–মেইল পাঠিয়েছিলেন এল্কহোলি। দ্য ওয়াশিংটন পোস্টকে দেওয়া এক ঘণ্টার সাক্ষাৎকারে তিনি এ নিয়ে কথা বলেন। কেন এল্কহোলি এবং অন্যরা বারবার এই ধনকুবেরের সঙ্গে তরুণীদের পরিচয় করিয়ে দিতেন, তার পেছনের কারণগুলো এখান থেকে স্পষ্ট হয়। এল্কহোলি ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেন, তিনি ফ্যাশনজগতে এপস্টিনের পরিচিতিকে নিজের স্বার্থে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছিলেন।

জেফরি এপস্টিন

এল্কহোলি আরও বলেন, ‘সবাই এপস্টিনের সঙ্গে থাকতে চাইতেন।...বিষয়টা এমন ছিল যে সবাই এটার কোনো না কোনো সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করতেন।’

এল্কহোলি এখন ক্যালিফোর্নিয়ায় থাকেন এবং সংগীত নিয়ে ব্যস্ত। তিনি জানান, এপস্টিনের সঙ্গে দেখা করার পেছনে তাঁর ও তাঁর মডেলদের আর্থিক স্বার্থ ছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন, এপস্টিন নিজের প্রভাব খাটিয়ে মডেলদের কাজ পাইয়ে দিতে পারবেন। আর সেখান থেকে এল্কহোলি ১০ শতাংশ কমিশন পাবেন।

এল্কহোলি আরও বলেন, ‘যদি কোনো মডেল ভিক্টোরিয়াস সিক্রেটে (নারীদের অন্তর্বাস, পোশাক ও প্রসাধনসামগ্রী প্রস্তুতকারী এবং বিপণনকারী বিশ্ব বিখ্যাত মার্কিন ব্র্যান্ড) কাজের সুযোগ পান, তবে আমি শুধু ১০ শতাংশ কমিশনই (যা আসলে বিশাল অঙ্কের) পেতাম না; বরং সেই মডেলের ক্যারিয়ারও গড়া হয়ে যেত।’

এপস্টিন দীর্ঘদিন ভিক্টোরিয়াস সিক্রেটের নির্বাহী লেস ওয়েক্সনারের আর্থিক দিকগুলো সামলেছেন। সুপারমডেল নাওমি ক্যাম্পবেলের সঙ্গেও তাঁর ওঠাবসা ছিল। এ ছাড়া বিখ্যাত ডিজাইনার ভেরা ওয়াংয়ের সঙ্গে তিনি এতটাই ঘনিষ্ঠ ছিলেন যে ২০১০ সালে ওয়াংয়ের সহকারী তাঁকে ‘পরিবারের সদস্যের মতো’ বলে উল্লেখ করেছিলেন।

এল্কহোলি বলেন, তিনি পাঁচ বা ছয়জন মডেলের সঙ্গে এপস্টিনের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। ম্যানহাটানে এপস্টিনের বিলাসবহুল বাড়িতে যাওয়ার সময় তিনি সব সময় মডেলদের সঙ্গে থাকতেন। ওয়াশিংটন পোস্টের দেখা ই–মেইলগুলোয় দেখা যায়, তাঁরা অন্তত দুই ডজন নারীর সঙ্গে সাক্ষাতের বিষয়ে আলোচনা করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে ১৮ বছরের এক তরুণীও ছিলেন। তবে সত্যিই তাঁদের কতজনের সঙ্গে দেখা হয়েছিল, তা ওই নথিপত্র থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। কিছু ই–মেইলের সঙ্গে এল্কহোলি সেসব নারীর ছবিও যুক্ত করে দিয়েছিলেন।

ওই সব ই–মেইলের তথ্য সামনে আনা হলে এল্কহোলি বলেন, ‘দেখা করার কথা বলে ই–মেইল করলেই যে দেখা হয়েছে, তা প্রমাণিত হয় না।’ তিনি আরও জানান, বেশির ভাগ সাক্ষাৎই হয়নি।

এল্কহোলি বলেন, তিনি ‘এক হাজার ভাগ নিশ্চিত’, তিনি কোনো বেআইনি কাজ করেননি। আর এপস্টিন তাঁকে কখনো কোনো টাকা দেননি।

এল্কহোলি বলেন, তিনি যা লিখেছিলেন তার জন্য তিনি ‘লজ্জিত’। তিনি ব্যাখ্যা করেন, অশালীন ই–মেইলগুলো তিনি কেবল এপস্টিনকে খুশি করতে বা তাঁর সুনজরে থাকার জন্যই লিখেছিলেন।

এল্কহোলির নাম এপস্টিনের নথিতে আসার পর ডিজিটাল মিউজিক নিউজ এবং বিবিসি তাঁকে নিয়ে খবর প্রকাশ করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও শুরু হয় তুমুল আলোচনা। এই প্রসঙ্গে এল্কহোলি বলেন, ‘এ সবকিছু আমার জন্য এতটা খারাপ ইঙ্গিত দিচ্ছে, তার কারণ হলো আমার মুখের ভাষা খারাপ।’

এল্কহোলি আরও বলেন, ‘আসলে আমি বোকামি করছিলাম। কারণ, ওই সব কথার কোনো ভিত্তি ছিল না বা এমন কিছুই ঘটছিল না।’

এল্কহোলি যোগ করেন, ‘আপনারা জানেন, ওই লোকটির হাজারখানেক ভুক্তভোগী আছেন। কিন্তু তাঁদের কারও সঙ্গেই আমার কোনো সম্পর্ক নেই।’

২০২৩ সালে একজন পোলিশ মডেল ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে বলেছিলেন, এল্কহোলিই তাঁকে এপস্টিনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। এরপর আট মাস ধরে এপস্টিন তাঁকে যৌন নির্যাতন করেছিলেন।

তবে ওই প্রতিবেদনে সেই মডেলের নাম প্রকাশ করা হয়নি। তাই তাঁর পরিচয় এবং তাঁর দেওয়া বিবরণের সত্যতাও যাচাই করা যায়নি। এল্কহোলি বলেন, ওই মডেল কে, তা তিনিও নিশ্চিতভাবে জানেন না।

জেফরি এপস্টিন ও তাঁর সাবেক বান্ধবী গিলেন ম্যাক্সওয়েল

ওই মডেলের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে এল্কহোলি বলেন, মেয়েটি যদি নিজের ইচ্ছায় এপস্টিনের সঙ্গে কোনো ‘সম্পর্কে’ জড়ায়, তবে সে জন্য তাঁকে (এল্কহোলি) দোষারোপ করা উচিত নয়।

এল্কহোলি বলেন, ‘আমি যেসব মডেলকে তাঁর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলাম, তাঁরা কেউ-ই কোনো দিন ফিরে এসে আমাকে বলেনি, তাঁদের কোনো সমস্যা হয়েছে।’

এল্কহোলি দাবি করেন, এপস্টিনকে লেখা ওই আপত্তিকর ই–মেইলগুলো থেকে আসল সত্যটা বোঝা যায় না। অনেক সময় মডেলরাই এপস্টিনের সঙ্গে দেখা করতে তাঁর (এল্কহোলি) পেছনে ‘ছুটে বেড়াত’। তিনি আরও জানান, তিনি যেসব মডেলকে এপস্টিনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন, তাঁরা সবাই প্রাপ্তবয়স্ক ছিলেন।

২০০৯ সালে এপস্টিনকে পাঠানো একটি ই–মেইলে এল্কহোলি ‘অত্যন্ত আকর্ষণীয় এক স্বর্ণকেশী’র কথা বলেন। তিনি পরামর্শ দেন, তাঁরা একধরনের ‘কাস্টিংয়ের’ (যাচাইপ্রক্রিয়া) আয়োজন করতে পারেন। তবে তিনি সতর্ক করে লিখেছিলেন, ‘আমি জানি তোমার কাছে ২৩ বছর বয়সটা একটু বেশিই মনে হবে।’ এপস্টিনের বয়স তখন পঞ্চাশের কোঠায়।

‘কাস্টিং’ শব্দটিকে এল্কহোলি কেন উদ্ধৃতি চিহ্নের ভেতর রেখেছিলেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এপস্টিনের সঙ্গে দেখা করার মুহূর্তগুলো প্রায়ই অস্বস্তিকর হতো। কারণ, তিনি হয়তো ‘বন্ধুদের সঙ্গে আধা ঘণ্টা ধরে গল্প করতেন, তারপর মডেলের দিকে ঘুরে বলতেন, “ওহ, আমি তোমার জন্য কী করতে পারি?”’

এল্কহোলি আরও বলেন, ‘মাঝেমধ্যে আমি তাঁকে খুব নম্রভাবে অভিযোগ করে বলতাম, “দেখো, এই কাজটা কিন্তু আইনসম্মত হতে হবে।”’

এপস্টিনের কাছে মেয়ে পাচারের অভিযোগে কেবল একজনকেই অভিযুক্ত করা হয়েছে। তিনি হলেন এপস্টিনের দীর্ঘদিনের প্রেমিকা ৬৪ বছর বয়সী গিলেন ম্যাক্সওয়েল। শিশু যৌন পাচারের দায়ে ২০২১ সালে তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

গত মার্চ মাসে, বেশ কয়েকজন মডেল একটি চিঠিতে সই করেন। চিঠিটি ক্যালিফোর্নিয়ার ডেমোক্র্যাট কংগ্রেসম্যান রো খান্না, কেন্টাকির রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান টমাস ম্যাসি এবং নিউইয়র্কের অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিসিয়া জেমসের কাছে পাঠানো হয়। চিঠিতে দাবি করা হয়, কীভাবে মডেলিংয়ের জগৎ এপস্টিনের ‘কর্মী নিয়োগের (মেয়ে সংগ্রহ) মাধ্যম’ হয়ে উঠেছিল, তার যেন তদন্ত করা হয়।

অলাভজনক সংস্থা মডেল অ্যালায়েন্সের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক সারা জিফ এই চিঠি দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ওই চিঠিতে কয়েকজন মডেলিং এজেন্ট এবং নির্বাহীর নাম ছিল, যাঁরা এপস্টিনের ঘনিষ্ঠ বলে অভিযোগ রয়েছে। চিঠিতে এল্কহোলির নামও ছিল। সেখানে দাবি করা হয়, তিনি মডেলিংয়ের ‘অজুহাত’ দিয়ে নারীদের এপস্টিনের বাড়িতে ‘প্রলোভন’ দেখিয়ে নিয়ে যেতেন।

এক সাক্ষাৎকারে সারা জিফ বলেন, ‘এত বেশি ভুক্তভোগী কেন উঠতি বা পেশাদার মডেল ছিলেন, তার পেছনে নিশ্চয়ই একটা কারণ আছে। আশা করছি, মানুষ এখন বুঝতে পারছে, এই জগতের বাইরের চাকচিক্যের আড়ালে আমাদের অনেকের জন্যই একটা ভীষণ অন্ধকার বাস্তব লুকিয়ে আছে।’

এল্কহোলি তাঁর ই–মেইলে যেসব মডেলের কথা উল্লেখ করেছিলেন। ওয়াশিংটন পোস্ট এমন প্রায় ডজনখানেক মডেলের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। তারা এপস্টিনের সঙ্গে মডেলদের সম্ভাব্য সাক্ষাতের বিষয়ে আরও জানতে চেয়েছিল। মডেলদের সঙ্গে যোগাযোগ করার বিষয়টি এল্কহোলি জানতে পারেন।

এল্কহোলি দ্য পোস্টের শীর্ষ সম্পাদকদের কাছে চিঠি লিখে এই অভিযোগ জানান। এল্কহোলিকে যখন জিজ্ঞাসা করা হয়, তিনি তাঁর পরিচিত মডেলদের সঙ্গে কোনো সাংবাদিকের কথা বলিয়ে দেবেন কি না? তখন তিনি রাজি হননি। তিনি বলেন, এপস্টিনকে নিয়ে লেখা কোনো খবরে ওই মডেলরা জড়াতে চাইবেন না।

পোস্টের সঙ্গে আলোচনার সময় এল্কহোলি জোর দিয়ে বলেন, এপস্টিনের নথিতে থাকা সবকিছু সাধারণ মানুষের বিশ্বাস করা উচিত নয়।

উদাহরণস্বরূপ, ২০১২ সালে এপস্টিনের সঙ্গে আদান-প্রদান করা বেশ কয়েকটি ই–মেইলে এল্কহোলি একজন রুশ সুপারমডেলের কথা বলেছিলেন। ওই মডেলের বয়স তখন ছিল বিশের কোঠায়।

এল্কহোলি দাবি করেছিলেন, তিনি ওই তারকা মডেলকে একটি প্রতিযোগী কোম্পানি থেকে নিজের এজেন্সি আই-ম্যানেজমেন্টে ‘ভাগিয়ে এনেছেন’। তিনি এপস্টিনকে জানান, ওই সুপারমডেল তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসতে পারেন।

এপস্টিনের দীর্ঘদিনের সহকারীর রাখা প্রতিদিনের রুটিনে ওই সুপারমডেলের সঙ্গে দেখা করার একটি সাম্ভাব্য সময়সূচি লেখা ছিল। সেখানে তাঁকে ‘রামসের বন্ধু’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।

ওই সুপারমডেলের আইনজীবী পোস্টকে বলেন, তাঁর মক্কেল কখনোই এল্কহোলি বা এপস্টিনের সঙ্গে দেখা করেননি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে এল্কহোলি স্বীকার করেন, তিনি পুরো গল্পটাই বানিয়ে বলেছিলেন।

এল্কহোলি আরও বলেন, ‘এখানে এমন অনেক কিছুই আছে, যা আক্ষরিক অর্থে বিশ্বাস করা ঠিক হবে না। আমি মিথ্যা বলেছিলাম। এজেন্টরা মিথ্যা বলেই থাকে। সব মডেলিং এজেন্টই যেকোনো কারণে যা বলার দরকার, তা-ই বলে।...এটা অনেকটা পুরোনো গাড়ি বিক্রির সেলসম্যানদের মতো।’

এপস্টিন কেলেঙ্কারির প্রতিবাদে যুক্তরাষ্ট্রে বিক্ষোভ

এপস্টিনের সঙ্গে পরিচয়

এল্কহোলি বড় হয়েছেন নিউ জার্সিতে। হাইস্কুলে পড়ার সময় তিনি কুস্তি খেলতেন এবং পরে অরেগন ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করেন।

শুরুতে এল্কহোলি বলেছিলেন, তাঁর বয়স ৪৬ বছর। কিন্তু অরেগনের দুটি ট্রাফিক জরিমানা এবং নিউ জার্সির কর ফাঁকির সরকারি রেকর্ড থেকে দেখা যায়, তাঁর জন্ম ১৯৬৮ সালে। সেই অনুযায়ী তাঁর বর্তমান বয়স ৫৭ বছর।

বয়সের এই গরমিল সম্পর্কে জানতে চাইলে এল্কহোলি বলেন, দ্য পোস্ট যদি তাঁর বয়স প্রকাশ না করার প্রতিশ্রুতি দেয়, তবেই তিনি তাঁর আসল বয়স জানাবেন।

এল্কহোলি বলেন, তাঁর কখনোই (মডেলদের) এজেন্ট হওয়ার পরিকল্পনা ছিল না। বরং তিনি বলেন, তিনি ‘একপ্রকার হুট করেই এই পেশায় চলে আসেন।’ সে সময় তিনি এক মডেলের সঙ্গে প্রেম করতেন এবং ওই মডেলের বন্ধুদের এই জগতের ব্যবসায়িক দিকগুলো বুঝতে সাহায্য করতে গিয়েই তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়।

এল্কহোলি পোস্টকে বলেন, ‘এসব কাজের অনেকটাই মূলত নেটওয়ার্কিং (ভালো জানাশোনা) এবং গাল ভরা কথার ওপর নির্ভর করে।’

২০০০ সালের শুরুর দিকে এল্কহোলি নিউইয়র্ক শহরে আই-ম্যানেজমেন্ট নামে একটি এজেন্সি চালানো শুরু করেন। এর পুরোনো ওয়েবসাইটে লেখা ছিল, এটি এমন একটি স্কাউটিং এবং ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি, যা মডেলদের প্রতি ব্যক্তিগত যত্ন নেয়, যাতে তাঁরা প্রতিযোগিতার ‘ভিড়ে হারিয়ে না যান’।

এল্কহোলি বলেন, তিনি ফিফথ অ্যাভিনিউতে তাঁর প্রেমিকার সঙ্গে যে অ্যাপার্টমেন্টে থাকতেন, সেখানে মডেলদের বিনা ভাড়ায় থাকার সুযোগ দিতেন। বিভিন্ন বাছাইপ্রক্রিয়ার ফাঁকে মডেলরা সেখানে বিশ্রাম নিতেন। কেউ কেউ কয়েক সপ্তাহ বা এমনকি কয়েক মাসও সেখানে থেকেছেন। তিনি জানান, আয় বৃদ্ধির জন্য তিনি অনেককে শেয়ারবাজারে কীভাবে বিনিয়োগ করতে হয়, সেটাও শিখিয়েছেন।

প্রায় দুই দশকের এই ব্যবসায় এল্কহোলি অন্তত ৮০ জন মডেলের কাজ সামলেছেন বলে ধারণা দেন। তিনি বলেন, মডেলদের কাজের কমিশন থেকে তিনি বছরে গড়ে আড়াই থেকে তিন লাখ ডলার আয় করতেন।

এল্কহোলি বলেন, ২০০৬ সালে ম্যানহাটানে এক নারী মডেল বন্ধুর মাধ্যমেই এপস্টিনের সঙ্গে তাঁর প্রথম পরিচয় হয়।

ওই মডেলের নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি এল্কহোলি। তবে তিনি বলেন, ‘তিনি আমাকে বলেছিলেন, “এই, তুমি কি আমার বন্ধু জেফরির বাসায় একটু ঘুরে আসবে?”এরপর আমরা সেখানে যাই।’

ওই সময় এল্কহোলি ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটির হয়ে তাঁর ডক্টরাল থিসিস নিয়ে কাজ করছিলেন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল ইন্দোনেশিয়ার একটি বিশেষ উপজাতি, যারা বর্শা দিয়ে শূকর শিকার করত। তিনি বলেন, এপস্টিনের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর মনে হয়েছিল, তিনি ওরাং রিম্বা নামের ওই উপজাতির ভাষা সম্পর্কে আগে থেকেই জানেন।

‘এবং এটি আমাকে একপ্রকার হতবাক করে দিয়েছিল,’ স্মৃতি হাতড়ে বলেন এল্কহোলি।

তবে এখন পেছন ফিরে দেখলে তাঁর মনে হয়, পরিচয়ের আগেই এপস্টিন তাঁর বিষয়ে খোঁজখবর নিয়েছিলেন। নিজেকে জ্ঞানী প্রমাণ করতেই এপস্টিন এমনটা করেছিলেন বলে তাঁর বিশ্বাস।

এল্কহোলি বলেন, ‘নিজেকে এখন নির্বোধ মনে হচ্ছে।’

২০০৮ সালটি দুই ব্যক্তির জন্যই অত্যন্ত বিপর্যয়কর প্রমাণিত হতে যাচ্ছিল। অপ্রপাপ্তবয়স্ক কিশোরীসক তরুণীদের পতিতাবৃত্তিতে প্ররোচিত করার দুটি অভিযোগে এপস্টিন দোষ স্বীকার করেন। এর মধ্যে একজন ১৬ বছরের কিশোরীও ছিল। এর জেরে ফ্লোরিডার পাম বিচ কাউন্টির আদালত তাঁকে ১৩ মাসের সাজা দেন।

এল্কহোলিকে এপস্টেইন বলেছিলেন, এক মেয়ে মালিশ করার সময় নিজের বয়স লুকিয়ে মিথ্যা বলেছিল এবং কিছু বাবা-মা তাঁর কাছ থেকে ‘টাকা হাতানোর’ চেষ্টা করেছিল বলেই তিনি আইনি ঝামেলায় পড়েছেন। এল্কহোলি বলেন, এপস্টিন যে একজন যৌন নিপীড়নকারী ছিলেন, তা তিনি জানতেন না।

ওই গ্রীষ্মে এল্কহোলির অন্যতম শীর্ষ তারকা (মডেল) রুসলানা করশুনোভা মারা যান। ২০ বছর বয়সী এই কাজাখস্তানি মডেল ম্যানহাটানে তাঁর নিজের অ্যাপার্টমেন্টের ব্যালকনি থেকে পড়ে মারা গিয়েছিলেন। আদালত একে আত্মহত্যা বলে রায় দেন। ফ্লাইটের রেকর্ড থেকে দেখা যায়, এল্কহোলির এজেন্সিতে যোগ দেওয়ার প্রায় সাত মাস আগে, মাত্র ১৮ বছর বয়সে করশুনোভা এপস্টিনের ব্যক্তিগত বিমানে চড়ে ইউএস ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জের লিটল সেন্ট জেমসে গিয়েছিলেন।

এল্কহোলি জানান, করশুনোভা মারা যাওয়ার পর তিনি জানতে পারেন, তিনি (করশুনোভা) ও এপস্টিন একসময় ‘মেলামেশা’ করতেন। তিনি আরও বলেন, এপস্টিনের সঙ্গে পরিচয়ের সময় মেয়েটির বয়স কত ছিল, তা তিনি জানতেন না। তিনি বলেন, করশুনোভার মৃত্যুর পর এপস্টিন একেবারেই ‘ভেঙে পড়েছিলেন’।

এল্কহোলি বলেন, তাঁদের দুজনের মধ্যে তিনি পরিচয় করিয়ে দেননি। এ ঘটনার সঙ্গে তাঁর ‘বিন্দু পরিমাণ কোনো সম্পৃক্ততা নেই’ বলেও দাবি করেন।

করশুনোভার মৃত্যুর পর এই দুজন ই–মেইলে তাঁকে নিয়ে বেশ কয়েকবার কথা বলেন। একটি নোটে তাঁরা সম্ভবত মেয়েটির জন্মদিন নিয়েও কথা বলেছিলেন।

জেফরি এপস্টিন

করশুনোভা মারা যাওয়ার দুই বছর পর এপস্টিন লিখেছিলেন, ‘বেঁচে থাকলে গতকাল তার বয়স ২৩ হতো।’

এল্কহোলি উত্তরে লেখেন, ‘হ্যাঁ, আমি জানি। এখনো কতই–না কম বয়স তার...’

ঠিক ওই দিনই এল্কহোলি ১৮ বছর বয়সী এক রুশ কলেজছাত্রীর বিষয়ে এপস্টিনকে ই–মেইল করেন। মেয়েটির সঙ্গে তাঁর একটি অ্যাপল স্টোরে দেখা হয়েছিল।

মেয়েটির বর্ণনা দিয়ে এল্কহোলি লেখেন, ‘উচ্চতা কেবল ৫ ফুট ৮ ইঞ্চি হলেও মেয়েটি সুন্দরী, ছিপছিপে এবং ঢেউখেলানো গড়নের।’ মেয়েটি সিক্স ফ্ল্যাগসের (বিনোদন পার্ক) গ্রীষ্মকালীন কর্মী এবং নতুন সুযোগের খোঁজ করছে। এল্কহোলি লেখেন, ‘আমার মনে হয় তোমার তাঁকে পছন্দ হবে।’

তবে এল্কহোলি পোস্টকে বলেন, ওই মেয়েটির কথা তিনি মনে করতে পারছেন না।

এল্কহোলির ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানটি যখন বড় হতে শুরু করে, তখন তিনি নতুন মডেল খুঁজতে স্লোভাকিয়া, চেক প্রজাতন্ত্র ও লাটভিয়ার মতো দেশগুলোয় যেতেন। সে সময়ও তিনি নিয়মিত এপস্টিনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন।

২০১০ সালে এল্কহোলি লিখেছিলেন, ‘জুন/জুলাই মাসে রাশিয়ায় মডেল খুঁজতে যাব। তখন তোমার কথা অবশ্যই মাথায় রাখব।’ এই সফরের বিষয়ে জানতে চাইলে এল্কহোলি পোস্টকে বলেন, ‘এমন কোনো সফর কখনোই হয়নি।’

‘উপকারের বিনিময়ে উপকার’

একটি ই–মেইলে এপস্টিনকে এল্কহোলি বুঝিয়ে বলেন, তাঁদের বন্ধুত্বের মূল ভিত্তি হলো (একে অপরের) উপকার করা।

এপস্টিন জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার কয়েক মাস পর এল্কহোলি তাঁকে লিখেছিলেন, ‘মডেলদের সঙ্গে তোমার পরিচয় করিয়ে দেওয়ার বিনিময়ে আমি কখনো তোমার কাছে কিছু চাইনি। কারণ, এটাকে আমি একটা সাহায্য হিসেবেই দেখি। আর আমি এটাও জানি, তুমিও উপকার করতে পিছপা হও না।’

এল্কহোলি এপস্টিনকে অনুরোধ করেছিলেন, তিনি যেন তাঁর প্রভাব খাটিয়ে মডেলদের কাজের ব্যবস্থা করে দেন। বিশেষ করে ফ্যাশন ডিজাইনার ভেরা ওয়াংয়ের সঙ্গে কাজের বিষয়ে তিনি জোর দেন। ওই নথিপত্রের একটি ই–মেইল থেকে জানা যায়, এপস্টিন ডিজাইনার ওয়াংকে কয়েক দশক ধরে চিনতেন এবং তাঁকে নিজের একজন ‘দারুণ বন্ধু’ মনে করতেন।

২০১০ সালে ২৬ বছর বয়সী এক মডেলের বর্ণনা দিয়ে এল্কহোলি লেখেন, ‘জেফরি, তোমার কাছে একটা বড় আবদার করতে পারি? ভাবছিলাম, তুমি কি তাঁকে ভেরা ওয়াংয়ের লোকদের সঙ্গে দেখা করার ব্যবস্থা করে দিতে পারো? তাঁরা তাঁকে তাঁদের শোরুমের কাজে লাগাতে পারে কি না?’

শোরুম মডেলিং হলো নতুন ডিজাইনের পোশাক পরে দেখানো। যাতে বড় বড় ডিপার্টমেন্ট স্টোরসহ অন্য ক্রেতারা বুঝতে পারেন, (ফ্যাশন শোর) ক্যাটওয়াকের বাইরে এই পোশাকগুলো দেখতে কেমন লাগবে।

জবাবে এপস্টিন লেখেন, ‘আমি ভেরাকে কল করব।’

ভেরা ওয়াংয়ের এক মুখপাত্র নির্দিষ্ট কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে রাজি হননি, যার মধ্যে ওয়াং কখনো এপস্টিনের সুপারিশ করা কোনো মডেলকে চাকরি বা কাজে নিয়োগ দিয়েছিলেন কি না, এই প্রশ্নও ছিল। তবে সেই মুখপাত্র ২০২৩ সালে ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’-কে এপস্টিন সম্পর্কে ওয়াংয়ের দেওয়া একটি মন্তব্যের সূত্র উল্লেখ করেন, ‘আমি ঘুণাক্ষরেও জানতাম না, তিনি কোনোভাবে আমার নাম ব্যবহার করছিলেন, এবং তিনি যে এমনটা করেছিলেন, তা এখন শুনে আমি স্তব্ধ এবং চরমভাবে ঘৃণাবোধ করছি।’

ওই দুজন ভিক্টোরিয়াস সিক্রেটে মডেলদের কাজ পাওয়ার সম্ভাবনার বিষয়েও আলোচনা করতেন। ই–মেইলে তাঁরা এই ব্র্যান্ডটিকে ‘ভিএস’ বলে উল্লেখ করতেন। ২০০০ সালের দিকে ভিক্টোরিয়াস সিক্রেটের অ্যাঞ্জেল বা এই ব্র্যান্ডের শীর্ষ ক্যাটওয়াক মডেল হওয়াটা যেকোনো মডেলের ক্যারিয়ার গড়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল।

২০১০ সালে এল্কহোলি এপস্টিনকে লেখেন, ‘তিনি গাড়িতে বসে আমাকে ভিএস সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছিলেন। তোমার আসলে “উদ্দেশ্য” কী, সেটাও তিনি জানতে চেয়েছেন।’

‘আমি অবশ্যই তাঁকে ভালো ভালো কথাই বলেছি, তুমি তাঁর সঙ্গে কেবল বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করছো ইত্যাদি ইত্যাদি।’

মাত্র এক ঘণ্টা পরই এল্কহোলি আবার একটি ই–মেইল করেন, ‘আমি যদি তাঁকে কোনো সুযোগ করে দিতে পারি, যেমন ধরো ভিএসের কোনো কর্তার সঙ্গে তাঁর দেখা করিয়ে দেওয়া, তাহলে সে বিশ্বাস করবে, গত রাতের ওই সাক্ষাতের পেছনে কোনো অসৎ উদ্দেশ্য ছিল না।’

২০১১ সালে পাঠানো অন্য এক ই–মেইলে এক মডেলকে আরও খোলামেলা পোশাকে রাজি করানোর বুদ্ধি দেন এল্কহোলি।

এক মডেলের ব্যাপারে এল্কহোলি এপস্টিনকে লেখেন, ‘তিনি আমাকে বলেছেন, আপনি যদি তাঁকে অন্তর্বাস পরে মডেলিং করতে বলেন, তবে তিনি রাজি আছেন...তিনি নিজে থেকে এই প্রস্তাব দিতে খুব লজ্জা পাচ্ছেন। তবে তাঁকে এমন অন্তর্বাসে দেখার হাজারটা উপায় আছে, ভেরা ওয়াং, ভিএস ইত্যাদি...। তুমি যদি তাঁর এই অতিরিক্ত ভালো মানুষ সাজার ভান ধরাটা ভাঙতে পারো, তবে তা আমার জন্য অনেক বড় ব্যাপার হবে।’

পোস্টের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে এল্কহোলি জানান, তাঁর এজেন্সির দুজন মডেল এপস্টিনের সঙ্গে দেখা করার পর ভিক্টোরিয়াস সিক্রেটের কাজ পেয়েছিলেন। তবে তিনি ওই মডেলদের নাম বলতে রাজি হননি।

এই প্রতিবেদনের জন্য মন্তব্য জানতে চাইলে ওই অন্তর্বাস ব্র্যান্ডের মূল কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা এবং ধনকুবের লেস ওয়েক্সনারের মুখপাত্র সরাসরি উত্তর দেননি। তিনি পোস্টের সাংবাদিককে চলতি বছরের শুরুতে (মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের) হাউস ওভারসাইট কমিটিতে দেওয়া ওয়েক্সনারের সাক্ষ্যটি দেখতে বলেন।

সেখানে ওয়েক্সনার সাক্ষ্য দিয়েছিলেন, এপস্টিন তাঁর সঙ্গে প্রতারণা করেছেন। তিনি জানান, তহবিল তছরুপের কারণে ২০০৭ সালে তিনি এই ‘প্রতারকের’ সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করেছিলেন। ওয়েক্সনার আরও বলেন, তিনি একটি অভিযোগের কথা জেনেছিলেন, এপস্টিন নিজেকে ভিক্টোরিয়াস সিক্রেটের ট্যালেন্ট স্কাউট (প্রতিভা অন্বেষণকারী) হিসেবে পরিচয় দিতেন। তবে জীবিত থাকতে এপস্টিন এ কথা অস্বীকার করেছিলেন।

ওয়েক্সনার সাক্ষ্য দেন, তিনি এপস্টিনের সঙ্গে ভিক্টোরিয়াস সিক্রেটের মডেলদের নিয়ে কখনোই কোনো আলোচনা করেননি।

ভিক্টোরিয়াস সিক্রেটের একজন মুখপাত্রও পোস্টের নির্দিষ্ট কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে অস্বীকার করেন। এর বদলে তিনি একটি বিবৃতি দিয়ে জানান, ২০২১ সাল থেকে ওয়েক্সনার ‘ভিক্টোরিয়াস সিক্রেটে কর্মরত নন বা কোনোভাবেই সেখানে যুক্ত নন’।

ই–মেইলগুলোয় দেখা যায়, এল্কহোলি মাঝেমধ্যে এপস্টিনকে এই পরিচয়ের সুযোগ নেওয়ারও পরামর্শ দিতেন।

২০১১ সালে এপস্টিনকে পাঠানো এক ই–মেইলে এল্কহোলি লিখেছেন, ‘আমি চাই তিনি তোমাকে অন্তর্বাস পরে দেখাক, তুমি তাঁর প্রতি বড্ড বেশি ধৈর্য দেখিয়েছ। আমাকে এটা নিয়ে কাজ করতে দাও...।’

ওই বছরই আলাদা আরেকটি ই–মেইলে এল্কহোলি লিখেছেন, ‘জেফরি, দয়া করে অন্তত একবার তাঁকে বিছানায় নিয়ে দেখো।’

এল্কহোলি পোস্টকে বলেন, যে মডেলকে নিয়ে তিনি এই ই–মেইলটি করেছিলেন, তখন তাঁর বয়স বিশের কোঠার শেষের দিকে। ই–মেইলটি লেখার সময় ওই মডেল তাঁর সঙ্গেই ছিলেন এবং মজা করেই তিনি কথাগুলো লিখেছিলেন। পোস্ট এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য ওই মডেলের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছিল, কিন্তু তাঁর কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

ই–মেইল থেকে জানা যায়, এপস্টিন একবার এল্কহোলির কাছে এমন কিছু মডেলের নাম চেয়েছিলেন, যাঁরা ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে প্যারিসে তাঁর ও জাদুকর ডেভিড ব্লেইনের সঙ্গে ডিনারে যোগ দিতে পারেন।

এপস্টিনকে এল্কহোলি লিখেছিলেন, ‘সম্ভবত প্রথমে তোমার বাসাতেই দেখা করা সবচেয়ে ভালো হবে। তাহলে তাঁরা তোমার বাড়ি দেখতে পারবেন এবং বুঝতে পারবেন, ডেভিড তোমার চামচা, তুমি তার নও।’

ই–মেইলে এল্কহোলি আরও লেখেন, ‘ডেভিডকে শুধু আমার নামটা বলতে হবে। তিনি শুধু বলবেন, তিনি আমাকে চেনেন, যাতে মেয়েগুলো না ভাবেন যে আমি তাদের মিথ্যা বলেছি। তিনি বলতে পারেন, নিউইয়র্ক থেকে তিনি আমাকে চেনেন।’

ই–মেইল থেকে দেখা যায়, অসুস্থতার কারণে এপস্টিন তাঁর প্যারিস সফর স্থগিত করেছিলেন। আর ওই রাতের খাবারের আয়োজন যে সত্যিই হয়েছিল, তারও কোনো প্রমাণ নেই।

ডেভিড ব্লেইনের এক মুখপাত্র জানান, তিনি এমন কোনো রাতের খাবারের আয়োজন করেননি বা সেখানে উপস্থিতও ছিলেন না।

ব্লেইনের মুখপাত্র এক ই–মেইল বিবৃতিতে বলেন, ‘আপনারা যে ই–মেইলের কথা বলছেন, তা থেকে বোঝা যায়, দুজন ব্যক্তি নিজেদের মধ্যে দেখা করার সুবিধা পাওয়ার জন্য ব্লেইনের নাম ব্যবহারের আলোচনা করছিলেন। এই বিষয়ে ব্লেইনের কোনো ধারণা ছিল না এবং এর সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পৃক্ততাও নেই।’

‘এটি অদ্ভুত ও অস্বস্তিকর’

এক দশক ধরে এল্কহোলি তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের নানা বিষয়ে এপস্টিনের কাছে পরামর্শ নিতেন। পরিবারের এক সদস্যের ক্যানসারের বিকল্প চিকিৎসা থেকে শুরু করে একটি ফ্যাশন ম্যাগাজিনে বিনিয়োগ করার মতো বিষয়েও তিনি এপস্টিনের মতামত চাইতেন। ম্যাগাজিনে বিনিয়োগের বিষয়ে এপস্টেইন তাঁকে নিরুৎসাহিত করে বলেছিলেন, ‘ছাপা পত্রিকার যুগ শেষ।’

মাঝেমধ্যে এল্কহোলি নারীদের বিষয়েও সাহায্য চাইতেন।

২০১৫ সালের এক ঘটনায় দেখা গেছে, এল্কহোলি একজন রুশ নারী চিত্রশিল্পীকে পটাতে চাইছিলেন। তিনি এপস্টিনকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, শিল্পজগতে তাঁর কোনো পরিচিতি আছে কি না।

এপস্টিন পরে এল্কহোলিকে আবার জিজ্ঞেস করেন, ‘তোমার সেই শিল্পী শিকারের কী হলো।’

পরের বছর এক ই–মেইল আদান-প্রদানে এল্কহোলি ইউক্রেনীয় মডেল আন্না ইয়ারিনের প্রতি তাঁর প্রেমের অনুভূতির কথা জানান। ইয়ারিনের বয়স তখন বিশের কোঠার শেষের দিকে। তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে দেওয়ার জন্য এপস্টিনের সাহায্য চান এল্কহোলি।

এল্কহোলি লিখেছেন, ‘তুমি যদি এ কাজে আমাকে সাহায্য করো, তবে আমি সুদে-আসলে তোমার এই ঋণ শোধ করব।’

এল্কহোলি আরও লিখেছেন, ‘সম্ভাব্য প্রস্তাব হিসেবে আমি বলতে পারি, তোমার জন্য আমি ইউরোপে মডেল খুঁজতে যেতে রাজি আছি। অথবা এ ধরনের অন্য কোনো কাজও করতে পারি। ...এককথায় বলা যায়, আমি আমার অনেক সময় ও শ্রম দিয়ে এর প্রতিদান দেব।’

এই স্কাউটিং (মডেল খোঁজার) সফরের প্রস্তাব নিয়ে জানতে চাইলে এল্কহোলি পোস্টকে বলেন, তিনি এপস্টিনের হয়ে কোনো কাজ করতেন না। তিনি কেবল সেসব কথাই বলতেন, যা এপস্টিন শুনতে চাইতেন।

ফোনে যোগাযোগ করা হলে ইয়ারিন বলেন, তিনি সভেতলানা পজিদায়েভার মাধ্যমে এপস্টিনকে চিনতেন। সভেতলানা সাবেক রুশ মডেল ও এপস্টিনের সহকারী। এপস্টিনকে বডি ম্যাসাজ করে দেওয়ার জন্য সভেতলানা তাঁকে দুবার কাজে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।

পজিদায়েভা সম্প্রতি ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে বলেন, তিনিও এপস্টিনের নির্যাতনের শিকার। এ ঘটনার পর তিনি নিজের নামও বদলে ফেলেছেন। তিনি নিজের ব্যক্তিগত ওয়েবসাইটে জানিয়েছেন, তিনি আর গণমাধ্যমের সঙ্গে কোনো কথা বলতে চান না।

ইয়ারিন বলেন, তিনি আলাদাভাবে এল্কহোলির সঙ্গে কয়েকবার দেখা করেছিলেন। এল্কহোলিকে তিনি একজন ‘দয়ালু বন্ধু’ বলেই ভাবতেন। তিনি জানান, এল্কহোলি যে তাঁর প্রতি দুর্বল ছিলেন, তা তিনি জানতেন না। এল্কহোলির ব্যাপারে এপস্টিন তাঁর সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করেছিলেন বলেও তাঁর মনে নেই।

এল্কহোলি ও এপস্টিনের আদান-প্রদান করা ওই ই–মেইলগুলো পড়ার পর ইয়ারিন বলেন, ‘এটা খুবই অদ্ভুত ও অস্বস্তিকর একটা ব্যাপার।’

এপস্টিনের জীবনের শেষ কয়েক বছরে এই দুই ব্যক্তির মধ্যে যোগাযোগ কমে গিয়েছিল। ২০১৯ সালে ফেডারেল যৌন পাচার মামলায় এপস্টিনকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং ফেডারেল হেফাজতে থাকা অবস্থায়ই তিনি মারা যান। তাঁর মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলে ঘোষণা করেছিল কৃর্তপক্ষ।

এল্কহোলি বলেন, তত দিনে তিনি মডেলিংয়ের জগৎ ছেড়ে দিয়েছেন এবং গানের জগতে পা রেখেছেন। তিনি ‘মোনোট্রনিক’ নামে একটি ব্যান্ডের প্রতিষ্ঠাতা, গিটারিস্ট ও প্রযোজক হিসেবে কাজ শুরু করেন।

এল্কহোলি বলেন, এপস্টিনের নথিপত্র প্রকাশের পর থেকে তাঁর ই–মেইলগুলো নিয়ে রেডিট এবং অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনগণের যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, তা উল্টো তাঁর ব্যান্ডের গানের স্ট্রিমিংয়ের (প্রচার) সংখ্যা বাড়াতে সাহায্য করেছে।

‘কোনো এক অজানা কারণে আমার ভক্তের সংখ্যা বাড়ছে,’ বলেন এল্কহোলি। তিনি আরও বলেন, ‘তার মানে কি এই যে, আমি মঞ্চে গিয়ে পারফর্ম করব এবং গুলি খাওয়ার ঝুঁকি নেব? না, তাই এটি আসলে একটি মিশ্র অনুভূতি। তাই, আমি শুধু এটাই চাই, যেন এ সবকিছু দ্রুত শেষ হয়ে যায়।’