হামলায় উড়োজাহাজটির পেছনের দিকের রাডারের অংশ পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়
হামলায় উড়োজাহাজটির পেছনের দিকের রাডারের অংশ পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়

ইরানের হামলায় ধ্বংস হওয়া মার্কিন ‘ই-৩জি সেন্ট্রি’ উড়োজাহাজের ছবি সামাজিক মাধ্যমে

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় সৌদি আরবের একটি বিমানঘাঁটিতে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীর একটি অত্যাধুনিক নজরদারি উড়োজাহাজ ধ্বংস হয়ে গেছে। শুক্রবারের ওই হামলার ঘটনায় বেশ কয়েকজন মার্কিন সেনাও আহত হন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালসহ মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলো জানায়, সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে ইরানের ওই হামলায় মার্কিন বিমানবাহিনীর কয়েকটি রিফুয়েলিং উড়োজাহাজের পাশাপাশি ‘উড়ন্ত রাডার’ হিসেবে পরিচিত একটি ‘ই-৩জি সেন্ট্রি’ উড়োজাহাজও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

‘ই-৩জি সেন্ট্রি’ উড়োজাহাজটির একাধিক ছবি গতকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ‘সেন্ট ডিফেন্ডার’ নামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সের একটি অ্যাকাউন্টে পোস্ট করা তিনটি ছবি ইতিমধ্যে ভাইরাল হয়েছে। ওই ছবি নিয়ে যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম ডেইলি মেইলসহ একাধিক সংবাদমাধ্যম প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ছবিগুলো নিজেদের এক্স অ্যাকাউন্টে প্রকাশ করেছে তুরস্কের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আনাদলু এজেন্সি।

ধ্বংস হয়ে যাওয়া উড়োজাহাজটিতে যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা এবং ইউএস এয়ারফোর্স লেখা দেখা যাচ্ছে

মার্কিন কর্মকর্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা জানালেও একটি ছবিতে দেখা গেছে, ‘ই-৩জি সেন্ট্রি’ উড়োজাহাজটির মধ্যভাগ বিস্ফোরণে ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে এবং অভ্যন্তরীণ যন্ত্রাংশগুলো ধ্বংসস্তূপের মতো বেরিয়ে আছে। অন্য একটি ছবিতে দেখা যায়, উড়োজাহাজের লেজের অংশটি মূল কাঠামো থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে রানওয়ের ওপর ধ্বংসাবশেষের মধ্যে পড়ে আছে।

তৃতীয় ছবিটিতে দেখা গেছে, সুরক্ষামূলক পোশাক পরা কর্মীরা বিধ্বস্ত উড়োজাহাজটির ডানার নিচ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন, যেখানে ধ্বংসযজ্ঞের বিশালতার তুলনায় তাঁদের বেশ ছোট দেখাচ্ছে।

ছবির দৃশ্য অনুযায়ী, উড়োজাহাজটির পেছনের অংশে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। উড়োজাহাজের এই অংশেই রাডার ডোম (গম্বুজাকৃতির রাডার) এবং নজরদারি ব্যবস্থার সংবেদনশীল ইলেকট্রনিক সরঞ্জামগুলো থাকে।

ছবিগুলো আরও নির্ভুলভাবে যাচাই করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) শনাক্তকরণ টুল ‘হাইভ মডারেশন’ ব্যবহার করা হয়। এতে জানা যায়, ছবিগুলো এআই দিয়ে তৈরি নয়; বরং বাস্তব ঘটনারই প্রতিফলন।

সুরক্ষামূলক পোশাক পরিহিত কয়েকজন কর্মী ধ্বংসাবশেষ পরীক্ষা করে দেখছেন

‘এয়ার অ্যান্ড স্পেস ফোর্সেস’ সাময়িকীর তথ্যমতে, এটি মার্কিন বিমানবাহিনীর ‘ই-৩জি সেন্ট্রি’ মডেলের একটি এয়ারবর্ন ওয়ার্নিং অ্যান্ড কন্ট্রোল সিস্টেম (আওয়াকস) উড়োজাহাজ। যুদ্ধে আগাম সতর্কতা ও নির্দেশনা প্রদানে এ উড়োজাহাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।

এক্স অ্যাকাউন্টে ছবিগুলো পোস্ট করে আনাদলু এজেন্সি লিখেছে, ৮১-০০০৫ নম্বর সংবলিত এই উড়োজাহাজ যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহোমার টিঙ্কার বিমানঘাঁটির ৫৫২তম এয়ার কন্ট্রোল উইংয়ের অধীনে পরিচালিত একটি আওয়াকস প্ল্যাটফর্ম।

শুক্রবারের ওই হামলায় ১২ মার্কিন সেনাসদস্যও আহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে দুজনের অবস্থা গুরুতর। অবশ্য আহত সেনার সংখ্যা ১৫ বলে জানিয়েছে আল-জাজিরা।

প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে ইরানের ওই হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর কমপক্ষে দুটি ‘কেসি-১৩৫’ রিফুয়েলিং উড়োজাহাজও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মাঝ আকাশে যুদ্ধবিমান, বোমারু বিমান ও নজরদারি উড়োজাহাজে জ্বালানি সরবরাহে এসব উড়োজাহাজ ব্যবহার করা হয়।

‘উড়ন্ত রাডার’

যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ন্যাটোর ওয়েবসাইট অনুযায়ী, বর্তমানে ‘আওয়াকস’ প্রযুক্তিসম্পন্ন একই মডেলের একঝাঁক ‘ই-৩এ’ উড়োজাহাজ পরিচালনা করছে ন্যাটো।

বোয়িং-৭০৭ উড়োজাহাজের পরিবর্তিত এই সংস্করণগুলো সহজেই চেনা যায়। কারণ, এগুলোর মূল কাঠামোর ওপর একটি স্বতন্ত্র রাডার ডোম বসানো থাকে। এই উড়োজাহাজগুলোতে রয়েছে দূরপাল্লার রাডার এবং প্যাসিভ সেন্সর, যা অনেক দূর থেকেই আকাশ ও ভূপৃষ্ঠের যেকোনো লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করতে সক্ষম।

‘উড়ন্ত রাডার’ হিসেবে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীর একটি ‘ই-৩ সেন্ট্রি’ উড়োজাহাজ

ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আওয়াকস উড়োজাহাজগুলো নিচু উচ্চতায় উড়ে আসা সম্ভাব্য শত্রুবিমান শনাক্ত করা, সেগুলোর গতিপথ অনুসরণ, পরিচয় নিশ্চিত এবং এ-সংক্রান্ত তথ্য প্রদানে সক্ষম। এর পাশাপাশি মিত্রদেশগুলোর যুদ্ধবিমানকে কমান্ড ও কন্ট্রোল বা নির্দেশনা দেওয়ার কাজও করে এই উড়োজাহাজ। এগুলো সমুদ্রের জাহাজ শনাক্ত ও সেগুলোর গতিবিধি নজরদারি করতে পারে এবং মিত্রদেশগুলোর নৌবাহিনীকে সমন্বিত সহায়তা প্রদান করে থাকে।

আওয়াকস উড়োজাহাজের সংগৃহীত তথ্যগুলো সরাসরি যোগাযোগব্যবস্থার মাধ্যমে প্রায় তাৎক্ষণিক স্থল, জল বা আকাশপথে থাকা অন্য ব্যবহারকারীদের কাছে পাঠানো সম্ভব।