
এক মাস ধরে ইরানের আকাশে নিজেদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ও অপরাজেয় থাকার দাবি করে আসছে ট্রাম্প প্রশাসন।
সাধারণ মার্কিন নাগরিকেরা মনে করছেন, এই যুদ্ধের পেছনে যে খরচ হচ্ছে, তা যুক্তিযুক্ত নয়।
ইরান যুদ্ধ এমনিতেই অপ্রিয় হয়ে উঠেছে মার্কিন নাগরিকদের কাছে, এবার তা এক নতুন ও সংকটাপন্ন ধাপে প্রবেশ করল। ইরানের আকাশসীমায় যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার খবরটিই জটিল এই পরিস্থিতি তৈরি করেছে। ঘটনাটি সম্পর্কে এখনো অনেক তথ্য অজানা, বিশেষ করে এফ-১৫ই যুদ্ধবিমানের দুই বৈমানিকের ভাগ্যে কী ঘটেছে, তা স্পষ্ট নয়। তাঁদের একজনকে উদ্ধার করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে বলে খবর মিলেছে, তবে অন্যজনের অবস্থান নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এরই মধ্যে গত শুক্রবার ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি যুদ্ধবিমানে আঘাত হানার খবরটি আসে। মার্কিন এক কর্মকর্তা বলেন, বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার আগেই পাইলট সেটিকে ইরানের সীমানার বাইরে আনতে সক্ষম হন এবং পরে নিরাপদে প্যারাসুটের মাধ্যমে নিচে নামলে তাঁকে উদ্ধার করা হয়।
এই দুই ঘটনার মানে এই নয় যে ইরান হঠাৎ করেই সামরিক শক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের সমান হয়ে গেছে। এখন পর্যন্ত মার্কিন হতাহতের সংখ্যাও সীমিত, এমনকি গত তিন সপ্তাহে কোনো নিহতের খবর পাওয়া যায়নি। তবে এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান শক্তিই হলো তাদের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব। এক মাস ধরে ইরানের আকাশে নিজেদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ও অপরাজেয় থাকার যে দাবি ট্রাম্প প্রশাসন করে আসছিল, সাম্প্রতিক এই ঘটনাগুলো তাতে বড় ধরনের চিড় ধরিয়েছে।
প্রশ্নবিদ্ধ দাবি
প্রকৃতপক্ষে এই দাবি আগে থেকেই বিভিন্ন ঘটনায় প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। তবে এবারের ঘটনাটি সেই অসারতাকেই স্পষ্ট করে তুলল। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ দাবি করেছিলেন, ইরান ও ইসরায়েলের আকাশসীমায় যুক্তরাষ্ট্রের অবাধ বিচরণ রয়েছে এবং তেহরানের তা ঠেকানোর কোনো সামর্থ্যই নেই।
গত ৪ মার্চ এক ব্রিফিংয়ে হেগসেথ বলেছিলেন, ইরানের আকাশে খুব শিগগির পূর্ণ আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। তিনি দাবি করেছিলেন, বিশ্বের দুই শক্তিশালী বিমানবাহিনী কয়েক দিনের মধ্যেই ইরানের আকাশসীমা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নেবে এবং ইরান কিছুই করতে পারবে না। দুই সপ্তাহ ধরে ট্রাম্প নিজেও ইরানের আকাশে এই কথিত আধিপত্যের কথা বেশ ঢাকঢোল পিটিয়ে প্রচার করে আসছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের অনেক যুদ্ধবিমানের মধ্যে মাত্র দুটি ভূপাতিত করার বিষয়টি মার্কিন প্রশাসন এড়ানোর চেষ্টা করলেও তা সহজে এড়াতে পারবে না। কারণ, আকাশপথে সামরিক আধিপত্য নিয়ে প্রশাসনের দাবিগুলো ছিল একেবারেই নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণের। তারা ‘পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ এবং ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন আকাশসীমা’র মতো শব্দ ব্যবহার করেছে, এমনকি ইরানের পাল্টা জবাব দেওয়ার মতো কোনো অস্ত্রশস্ত্র নেই বলেও দাবি করেছিল।
সামরিক সাফল্য নিয়ে ট্রাম্প ও তাঁর ঘনিষ্ঠদের বাড়িয়ে বলার এটিই সর্বশেষ উদাহরণ নয়। গত জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার পর ট্রাম্প বারবার বলেছিলেন, দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি ‘পুরোপুরি ধ্বংস’ হয়ে গেছে এবং এটি আর পুনরুদ্ধার করা সম্ভব নয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের প্রাথমিক গোয়েন্দা প্রতিবেদনে এমন কোনো তথ্য ছিল না। এর ঠিক ৯ মাস পর প্রশাসন আবারও হঠাৎ করে ইরানকে একটি আসন্ন পারমাণবিক হুমকি হিসেবে উপস্থাপন করতে শুরু করে।
আস্থাহীন প্রশাসন
মার্কিন জনগণের এই অভিযানের ওপর খুব একটা আস্থা নেই। তাঁদের মতে, যুদ্ধের উদ্দেশ্যগুলো স্পষ্ট করা হয়নি এবং চারটি প্রধান লক্ষ্যের তালিকাও বারবার পরিবর্তন করা হয়েছে। সম্ভবত সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং এর ফলে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় সৃষ্ট অর্থনৈতিক মন্দা। সাধারণ মার্কিন নাগরিকেরা মনে করছেন, এই যুদ্ধের পেছনে যে খরচ হচ্ছে, তা যুক্তিযুক্ত নয়।
এত কিছুর পরও হেগসেথ দাবি করে আসছেন, গণমাধ্যম এই অভিযানের সামরিক সাফল্যগুলোকে ঠিকঠাক প্রচার করছে না। গত ৪ মার্চের ব্রিফিংয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘ভুয়া সংবাদমাধ্যমগুলো যা বুঝতে ব্যর্থ হচ্ছে তা হলো, কোনো স্থলসেনা পাঠানো ছাড়াই আমরা ইরানের আকাশ ও জলপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছি।’
এর এক মাস পর দেখা যাচ্ছে, গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি এখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে। এমনকি ইরানের আকাশসীমা নিয়ন্ত্রণ এবং তাদের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কর্মসূচি ধ্বংসের যে ঢাকঢোল পেটানো হয়েছিল, বাস্তবে তার ছিটেফোঁটাও দেখা যাচ্ছে না।