অস্ট্রেলিয়ার সিডনির বাসিন্দা লিয়া স্টুয়ার্ট। জুনের এক আলোঝলমলে সকালে ৩৪ বছর বয়সী এই নারী শহরের বিখ্যাত কুজি বিচে সাঁতার কাটতে গিয়েছিলেন। দিনটি ছিল শনিবার।
তখনো তিনি জানতেন না, সৈকতে কোন বিপদের মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন তিনি। পরে এক সাক্ষাৎকারে নিজের সেই ভয়ংকর অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন স্টুয়ার্ট। গত রোববার দেশটির টেলিভিশন চ্যানেল নাইন নেটওয়ার্ক তাঁর সাক্ষাৎকারটি সম্প্রচার করে।
সেদিনের ঘটনার বর্ণনায় স্টুয়ার্ট বলেন, তিনি দিনের সাঁতার শেষে সৈকতের দিকে ফিরছিলেন। হঠাৎ একটি মেয়ের চিৎকার শুনতে পান।
স্টুয়ার্ট বলেন, ‘সেই চিৎকার ছিল তীক্ষ্ণ ও কর্কশ। আমি ঘুরে তাকাতেই দেখি, পেছনে বিশাল এক পাখনা। সেটি ছিল ভীষণ বড়। আমি সেটির আকার দেখেই বুঝতে পারি, ওটা ডলফিন নয়।’
বিশাল পাখনাটি দ্রুত তাঁর দিকে এগিয়ে আসছিল। একপর্যায়ে স্টুয়ার্ট ও হাঙরটির মাঝে দূরত্ব মাত্র ৩০ সেন্টিমিটারে নেমে আসে।
এক সন্তানের মা স্টুয়ার্ট বলেন, ‘আমরা মুখোমুখি তাকালাম। আমি ডানহাতি—তাই ভাবলাম, বাঁ হাত দিয়ে একটা ঘুষি মারা যাক। আমি বাঁ হাত দিয়ে সজোরে ঘুষি মারার চেষ্টা করি। তখন হাঙরটা আমার হাতের নিচের অংশ কামড়ে ধরে টানতে থাকে। এতে আমার চামড়া, পেশি—সব ছিঁড়ে যায়...আমার হাতের নিচের অংশ আর কনুইয়ের মাঝখানে বড় একটা ক্ষত তৈরি হয়।’
এরপর স্টুয়ার্টের পা কামড়ে ধরে হাঙরটি তাঁকে পানির নিচে টেনে নিতে থাকে।
যন্ত্রণায় স্টুয়ার্টের চোখে পানি চলে আসে। তাঁর মনে হয়েছিল, এটাই শেষ, এভাবেই তাঁর মৃত্যু হবে। কিন্তু তখনই তাঁর নিজের ছোট্ট মেয়েটির কথা মনে পড়ে যায়।
স্টুয়ার্ট বলেন, ‘আমার মনে হলো, ওর আর মা থাকবে না, মাকে ছাড়াই ওকে বড় হতে হবে। তারপরই ভাবলাম, আমি ওকে ছেড়ে যেতে পারি না... জানি, কথাটা অদ্ভুত শোনাতে পারে, কিন্তু আমি একরকম নিজের মনোবল দিয়েই নিজেকে আবার ফিরে আসতে বাধ্য করেছিলাম।’
নিজের ঘুরে দাঁড়িয়ে লড়াই করার কথা বলতে গিয়ে এ নারী আরও বলেন, ‘মনে মনে বললাম, তুমি আমাকে আমার মেয়ের কাছ থেকে কেড়ে নিতে পারবে না। এরপর আমি ঘুরে গিয়ে হাঙরটাকে বারবার, একের পর এক ঘুষি মারতে শুরু করি—মনে হচ্ছিল যেন একটা ডাইনোসরের সঙ্গে লড়াই করছি। আমি নিশ্চয়ই হাঙরটাকে বেশ জোরে একটা ঘুষি মেরেছিলাম, তাই সেটি আমাকে ছেড়ে দেয়। এটা ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন লড়াই, কিন্তু আমি লড়াই করেই সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছি।’
অন্য সাঁতারুরা পরে স্টুয়ার্টকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান। তিনি কোমায় চলে গিয়েছিলেন। বেশ কয়েকবার তাঁকে অস্ত্রোপচারের টেবিলে যেতে হয়। চিকিৎসকেরা তাঁর বাঁ হাত কবজির ওপর থেকে কেটে বাদ দিয়েছেন।
ভয়াবহ এই অভিজ্ঞতার পরও স্টুয়ার্ট চান, মানুষ তাঁকে সৈকতে হাঙরের হামলার শিকার মেয়ে হিসেবে নয় বরং হাঙরের মুখে ঘুষি মেরে বেঁচে ফেরা মেয়ে হিসেবে মনে রাখুক।