সারা দিন বাঁধের মানুষদের সঙ্গে কথা বলে বিকেলে জোয়ার এলে ফিরে আসব বলে ঘাটের কাছে এসেছি। বৃত্ত পূরণের মতো আবার সেই ঘাটেই দেখা হলো হিরার সঙ্গে। টানা জাল নিয়ে নামবে নদীতে। আমাদের সে একটু বসতে বলেছিল বেড়িবাঁধের ওপর তাঁর ত্রিপল খাটানো চার ফুট বাই ছয় ফুট ঘরে। সময় ছিল না তাই শুধু ফোন নম্বর আদান-প্রদান হলো।

ঢাকায় ফিরে ‘প্রথম আলো’ অনলাইনে ‘নদীকূলে নিঃস্ব, তবু রাজ উৎসবের জীবন’ শিরোনামে একটি মানবিক প্রতিবেদন করেছিলাম। কিছুদিন পর হলো ‘নুনের বিষে নীল উপকূল কন্যারা’ নামে দ্বিতীয় প্রতিবেদন। সেখানে লবণাক্ত পানিতে নারীদের দুর্ভোগের কথা ছিল। এবার শুরু হলো পাঠকদের আগ্রহ। হিরাদের পাশে দাঁড়াতে চান তাঁরা। সেই সূত্রে পরিচিত-অপরিচিত অনেক পাঠক সহযোগিতা পাঠালেন হিরা আর পূজার জন্য। এখন প্রতি মাসে দেড় হাজার টাকা করে পাওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে পরিবারটির।

সুন্দরবনঘেঁষা এক উপকূলে হিরা নামের নারীর সঙ্গে দেখা হওয়ার দুই বছর পেরিয়ে গেছে প্রায়।

এ বছরের জুলাই মাসে এক দুপুরে হঠাৎ মুঠোফোনে এল ছোট্ট পূজার ফোন। ওর মন ভালো নেই। ষাণ্মাসিক পরীক্ষার ফলাফলে সব বিষয়ে নব্বইয়ের বেশি নম্বর পেয়েছে। ইংরেজিতে আশির কম। পূজা এখন দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী। সম্প্রতি সে মায়ের কাছে আবদার করেছে , ছবি আঁকা আর নাচ শিখবে। ওকে ভর্তি করা হয়েছে উপকূলেরই এক সাংস্কৃতিক শিক্ষাকেন্দ্রে। নুনের মাটির ওপর ছোট ছোট পা রেখে সে এখন নাচের মুদ্রা শিখছে। আঁকার রং মুছে নিচ্ছে জামায়। পোশাক নষ্ট হলো বলে বকছে মা।

সন্তানের হাসির চেয়ে মায়ের মন নরম করার শক্তিশালী অস্ত্র তো আবিষ্কার হয়নি। তবে পূজা ভুলে যায় এখন হাসলে ওর ফোকলা মুখটা দেখা যায়। মায়ের মন গলাতে হেসে ওঠে ও। সবটুকুই সম্ভব হয়েছে ‘প্রথম আলো’র পাঠকের জন্য। আর একজন প্রতিবেদক হিসেবে আমার কাছে ‘প্রথম আলো’ মানে উপকূলের এক শিশুর হেসে ওঠা।

লেখক: জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক, প্রথম আলো