default-image

গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলায় তিন বছরে মাতৃমৃত্যু শূন্যে নেমে এসেছে। মাতৃমৃত্যু কমাতে কাপাসিয়া মডেলকে আদর্শ ধরে ১০০টি উপজেলায় তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বিশ্বমঞ্চেও গুরুত্ব পাচ্ছে এই মডেল। জনসংখ্যা ও প্রজননস্বাস্থ্য বিষয়ে সর্বোত্তম অনুশীলন (বেস্ট প্র্যাকটিস) হিসেবে এই মডেল জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) মাধ্যমে বিশ্বের ২৭টি দেশে প্রদর্শনের জন্য নির্বাচিত হয়েছে।

মাতৃমৃত্যু কমাতে কাপাসিয়া মডেল বাস্তবায়নে গর্ভবতী মায়েদের ঝুঁকি, বয়সসহ ২৭ ধরনের তথ্য নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে তথ্যভান্ডার (ডেটাবেইস সফটওয়্যার), যা ‘গর্ভবতীর আয়না’ নামে পরিচিত। এর পাশাপাশি আছে ‘গর্ভবতীর গয়না’ নামের একটি স্বাস্থ্যনির্দেশিকা। ‘গর্ভবতীর আয়না’ ও ‘গর্ভবতীর গয়না’র সমন্বয়ে চলছে পুরো কার্যক্রম।

২০১৭ সালের ৪ ডিসেম্বর থেকে মাতৃমৃত্যুমুক্ত কাপাসিয়া গড়ার কার্যক্রম চালাচ্ছে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। তাদের তথ্য বলছে, এই কার্যক্রম শুরুর আগের বছর ২০১৭ সালে কাপাসিয়ায় ৮ জন গর্ভবতী মায়ের মৃত্যু হয়েছিল। ওই বছর গর্ভবতী মা ছিলেন ৬ হাজার ৭০০। কর্মসূচি চালুর বছর ২০১৮ সালে মাতৃমৃত্যু নেমে আসে ৪ জনে। ওই বছর গর্ভবতী ছিলেন ৬ হাজার ৩০০ জন। ২০১৯ সালে একজন গর্ভবতী মা মারা যান। সে বছর গর্ভবতী মা ছিলেন ৬ হাজার ৩৫০ জন। আর ২০২০ সাল থেকে এখন পর্যন্ত কোনো গর্ভবতী মায়ের মৃত্যু হয়নি। গত বছর গর্ভবতী ছিলেন সাড়ে ৬ হাজার।

মাতৃমৃত্যুমুক্ত কাপাসিয়া কার্যক্রমে পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছেন স্থানীয় সাংসদ সিমিন হোসেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, সাংসদ নির্বাচিত হওয়ার আগে থেকে প্রতিটি গ্রামে গিয়ে গর্ভবতী মায়েদের সঙ্গে কথা বলতাম। গর্ভবতী মায়েরা অনেক কিছুই জানত না, স্বাস্থ্যসেবাও ঠিকমতো পেত না। সফটওয়্যার তৈরি ও অন্যান্য কার্যক্রম শুরুর পর পরিস্থিতির অনেক পরিবর্তন হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

পুরো কার্যক্রম সমন্বয় করছেন কাপাসিয়া উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. আবদুর রহিম। ১৪ মার্চ তাঁর কার্যালয়ে বসে কথা হয়। তাঁর সামনের কম্পিউটারে একটি ডেটাবেইসের ড্যাশ বোর্ড (সংক্ষিপ্তসার) খোলা। একে বলা হচ্ছে ‘গর্ভবতীর আয়না’। তাতে দেখা যায়, বর্তমানে কাপাসিয়া উপজেলায় ১ হাজার ১৬৯ জন গর্ভবতী নারী রয়েছেন। এর মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ ৬৩৬ জন। ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে ১৪ মার্চ পর্যন্ত মোট ৯ হাজার ২২৭ জন প্রসূতিকে সেবা দেওয়া হয়েছে।

আবদুর রহিম বললেন, বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে সফটওয়্যার স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভবতী নির্ধারণ করে। ২০ বছরের নিচে, ৩৫ বছরের ওপরে, ৪ ফুট ১০ ইঞ্চির কম উচ্চতা, প্রথম গর্ভধারণ এবং চতুর্থ গর্ভধারণ, নেগেটিভ ব্লাড গ্রুপ ইত্যাদি মানদণ্ডের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ প্রসূতিদের চিহ্নিত করা হচ্ছে।

গর্ভধারণের সময় থেকে শুরু করে সন্তান প্রসবের ৪২ দিন পর্যন্ত অন্য কোনো দুর্ঘটনা ছাড়া কোনো নারীর মৃত্যুকে মাতৃমৃত্যু হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। ২০১৭ সালে প্রকাশিত জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের (নিপোর্ট) সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে মাতৃমৃত্যুর হার লাখে ১৯৬। অর্থাৎ ১ লাখ জীবিত শিশুর জন্ম দিতে গিয়ে ১৯৬ জন মায়ের মৃত্যু হচ্ছে। তবে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মতে, বাংলাদেশে মাতৃমৃত্যুর হার ১৭৬।

জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে মাতৃমৃত্যু হার ৭০-এর নিচে নামিয়ে আনতে হবে। মাতৃমৃত্যুর প্রধান দুটি কারণ প্রসবকালে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ও খিঁচুনি। যদিও কমপক্ষে চারবার প্রসবপূর্ব চেকআপ, সন্তান প্রসবের সময়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দক্ষ ধাই (স্কিলড বার্থ অ্যাটেনডেন্ট বা মিডওয়াইফারি) দ্বারা সন্তান প্রসব এবং প্রসব-পরবর্তী সময়ে সঠিক পরিচর্যা মাতৃমৃত্যু রোধ করতে পারে। মাতৃমৃত্যুমুক্ত কাপাসিয়া মডেলে মূলত এই বিষয়গুলোকেই অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

গর্ভবতীর আয়নায় ৩৭ তথ্য

উপজেলার ১১টি ইউনিয়নে কার্যক্রম চলমান। এর অধীনে উপজেলার প্রসূতিদের ৩৭টি প্রশ্নসংবলিত ‘গর্ভবতীর তথ্য ফরম’ নামের একটি ফরম পূরণ করতে হয়। ইউনিয়ন পর্যায় থেকে স্বাস্থ্যকর্মীরা এই তথ্যগুলো গর্ভবতীর আয়না সফটওয়্যারে সংযোজন করেন। প্রত্যেক গর্ভবতী নারীর নিজস্ব শনাক্তকরণ নম্বর দেওয়া হয়। সর্বশেষ মাসিকের তারিখ যুক্ত করার পর গর্ভবতীর চতুর্থ, ষষ্ঠ, অষ্টম ও নবম মাসের চারটি পরিদর্শনের তারিখ সফটওয়্যারে দেখানো হয়।

পরিদর্শনের তারিখের তিন দিন আগে গর্ভবতী নারীর মুঠোফোন নম্বরে বাংলায় খুদে বার্তা (এসএমএস) চলে যায়। বার্তায় সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের স্বাস্থ্যকর্মীর মুঠোফোন নম্বর দেওয়া থাকে। যেকোনো বিষয়ে স্বাস্থ্যকর্মীর সঙ্গে পরামর্শ করা যায়। পরিদর্শনের দিন সকালে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাওয়ার অনুরোধসহ মুঠোফোনে ‘ভয়েস কল’ যায়। ভয়েস কলের কণ্ঠটি সাংসদ সিমিন হোসেনের।

নাছরিন আকতার গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার সিংহশ্রী ইউনিয়নের কুড়িয়াদী গ্রামের বাসিন্দা। মার্চের শেষ সপ্তাহে তাঁর দ্বিতীয় সন্তানের জন্ম হয়েছে। গর্ভবতী হওয়ার পর থেকে চারবার স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গেছেন স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একবার আনুষঙ্গিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন বিনা মূল্যে।
নাছরিন আকতারের স্বামী সাদিকুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাচ্চা পেটে আসার পরেই স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে একটা বই দিসিল। কবে কবে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে পরীক্ষা করাতে যেতে হবে, তা লেখা ছিল। ইউনিয়নের স্বাস্থ্যকর্মী নিয়মিত খোঁজ নিচ্ছেন। আলট্রাসনোগ্রাফিসহ কয়েকটা পরীক্ষা ফ্রিতে করে দিসে।’

বিজ্ঞাপন

গর্ভবতীর গয়নায় স্বাস্থ্যনির্দেশনা

উপজেলার প্রত্যেক গর্ভবতী নারীকে গর্ভবতীর গয়না: মা ও শিশু স্বাস্থ্য সহায়িকা নামের বই দেওয়া হচ্ছে। এতে প্রসব-পরবর্তী ও প্রসব-পূর্ববর্তী করণীয় সম্পর্কে সহজ ভাষায় ও চিত্রের মাধ্যমে তথ্য দেওয়া রয়েছে। প্রসবের আগে চারবার পরিদর্শনে আসা মায়েদের স্বাস্থ্যবিষয়ক তথ্য, ব্যবস্থাপত্র (প্রেসক্রিপশন) বইয়ে লিপিবদ্ধ করা হয়।
সিংহশ্রী ইউনিয়নের হাড়িয়াদী গ্রামের ফাতেমা খাতুন সন্তানসম্ভবা। তাঁর বয়স ৪১ বছর। তাঁকে ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভবতী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ফাতেমার স্বামী সামছুদ্দীন প্রথম আলোকে বলেন, ‘তিনবার স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়া গেসি। অনেকগুলা টেস্ট করাইসে কোনো টাকা নেয় নাই। আমরা গরিব মানুষ, এতটুকু সেবা পাইসি তাতে খুশি।’

গর্ভবতী মায়েদের পূর্ণাঙ্গ শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৫৪০ টাকা লাগে। এটা বিনা মূল্যে করা হয়। উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আবদুর রহিম বলেন, প্রতিটি ইউনিয়নে ১৮ জন করে পুরো উপজেলায় মোট ১৯৮ জন ধাইকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। সফটওয়্যারে ইউনিয়নভিত্তিক স্বেচ্ছায় রক্তদাতাদের একটি তালিকাও যুক্ত করা হয়েছে। গর্ভবতীদের অগ্রাধিকার দিতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ‘সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীন মা ও শিশু স্বাস্থ্য কর্নার’ খোলা হয়েছে।


সচেতনতা বেড়েছে

ইনোভেশন ফর পোভার্টি অ্যাকশন নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ২০১৭ ও ২০১৯ সালে কাপাসিয়া উপজেলার গর্ভবতী নারীদের সচেতনতা বিষয়ে জরিপ চালায়। তাতে দেখা যায়, মাতৃমৃত্যুমুক্ত কাপাসিয়া কার্যক্রমের ফলে গর্ভবতী নারীদের মধ্যে সচেতনতা বেড়েছে। যেমন ২০১৭ সালে কেউ চিকিৎসাপত্র সংরক্ষণ করতেন না। ২০১৯ সালে দেখা যায়, ৯৭ শতাংশ গর্ভবতী মা চিকিৎসাপত্র সংরক্ষণ করেন। ২০১৭ সালে প্রসব–পূর্ববতী সেবা সম্পর্কে জানতেন ২৬ শতাংশ, দুই বছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৫ শতাংশে।

উপজেলায় এই কার্যক্রম চালাতে প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করতে ‘মানবিক সহায়তা’ নামে একটি তহবিল গঠন করা হয়েছে। কাপাসিয়া উপজেলায় কর্মরত ১ হাজার ৭০০ জন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন থেকে দৈনিক ১ টাকা করে এই তহবিলে জমা হয়। তহবিল থেকে মুঠোফোনের এসএমএস, ভয়েস কল, গর্ভবতীর পরীক্ষা-নিরীক্ষা, কিছু ক্ষেত্রে সিজারের (অস্ত্রোপচারে সন্তান জন্ম) খরচ মেটানো হয়। বর্তমানে তহবিলে ১১ লাখ টাকা জমা রয়েছে।

স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় থেকে এই কাপাসিয়া মডেলকে জাতীয় পর্যায়ে আরও বিস্তৃত করতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের পরিচালক (এমসিএইচ সার্ভিসেস) মোহাম্মদ শরীফ প্রথম আলোকে বলেন, মাতৃমৃত্যু কমাতে কাপাসিয়া উপজেলার উদ্যোগ প্রশংসনীয়। ধারাবাহিকভাবে ১০০টি উপজেলায় কাপাসিয়া মডেল বাস্তবায়ন করা হবে। ইতিমধ্যে ১২টি উপজেলা নির্ধারণ করা হয়েছে।

বিশ্বমঞ্চে কাপাসিয়া মডেল

জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) অর্থায়নে মাতৃমৃত্যু কমাতে জনসংখ্যা ও প্রজননস্বাস্থ্যবিষয়ক একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে জনসংখ্যা বেশি এমন ২৭টি দেশের মোর্চা পার্টনার্স ইন পপুলেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (পিপিডি)। জনসংখ্যা, পরিবার পরিকল্পনা ও প্রজননস্বাস্থ্য বিষয়ে ২০২০ সালে বাংলাদেশের সর্বোত্তম অনুশীলনের (বেস্ট প্র্যাকটিস) মনোনয়ন চায় পিপিডি। সরকার মাতৃমৃত্যুমুক্ত কাপাসিয়া মডেলটি বেস্ট প্র্যাকটিস হিসেবে মনোনয়ন দিয়েছে।

পিপিডির পরামর্শক শাহরিয়ার নাফিস প্রথম আলোকে বলেন, কাপাসিয়া মডেলকে বেস্ট প্র্যাকটিস হিসেবে নথিভুক্ত (ডকুমেন্টেড) করা হয়েছে। এটি পিপিডির ওয়েবসাইটে এবং আলাদা বই আকারে প্রকাশ করা হবে। অন্য সদস্যদেশগুলো যেন মডেলটি গ্রহণ করে সে বিষয়ে পিপিডি জোরালো সুপারিশ করবে।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন