বিজ্ঞাপন

ধোলাইখালের মানুষের কথা

সালেহ আহমেদ ১৯৬৭ সালে ধোলাইখালে শ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন। তখন তাঁর বয়স ছিল ১৩ বা ১৪ বছর। এখন তিনি এসবি ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপের মালিক। তাঁর দুই কক্ষের কারখানায় যন্ত্রাংশ তৈরির জন্য রয়েছে আটটি যন্ত্র। সালেহ আহমেদের এক ছেলেও এখন এ ব্যবসায় যুক্ত হয়েছেন। শ্রমিক থেকে মালিক, বাবার কারখানায় ছেলের যুক্ত হওয়া—এমন গল্প অনেক আছে ধোলাইখালে।

টিপু সুলতান রোডে এশিয়ান টুলসের মালিক হায়দার আলীর বাবা ভারত থেকে পুরান ঢাকায় এসে কারখানা চালু করেন। বিজ্ঞানে স্নাতক হায়দার আলী ৪৫ বছর ধরে ব্যবসা করছেন। যুগের সঙ্গে তাল মেলাতে একটি আধুনিক কম্পিউটার নিউমেরিক্যাল কন্ট্রোল (সিএনসি) যন্ত্র যুক্ত হয়েছে তাঁর কারখানায়। এ যন্ত্র দিয়ে নিখুঁতভাবে যন্ত্রাংশের ছাঁচ তৈরি করা যায়। কম্পিউটারে নির্দেশনা দিয়ে সাবানের ছাঁচ তৈরির পদ্ধতি দেখাতে দেখাতে হায়দার আলী বললেন, ‘এই যে পিঠ চুলকে দেওয়ার হাতল দেখছেন, এটার ছাঁচ তৈরির জন্য বড় বড় কোম্পানিকে আমাদের কাছে আসতে হচ্ছে। একইভাবে রেলওয়ে, ওষুধ শিল্পসহ বড় শিল্পকারখানাগুলোও আমাদের ওপর কোনো না কোনোভাবে নির্ভরশীল।’

default-image

মোহাম্মদ আলীর বয়স প্রায় ৭০ বছর। ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে তিনি ধোলাইখাল এলাকায় এ কে এম এস ইঞ্জিনিয়ার্স ওয়ার্কসে রেলওয়ের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ তৈরি করেন। মেসার্স ফাতেমা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মালিক ইব্রাহিম খলিল জানালেন, তিনি ওষুধ কোম্পানির চাহিদা অনুযায়ী ওষুধের পাতার ছাঁচ তৈরি করেন।

ধোলাইখালের আলমগীর ব্রাদার্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স ওয়ার্কসের মালিক আলমগীর খোকন বলেন, দোকানের শাটার তৈরির যন্ত্র বিদেশ থেকে আমদানি করতে আট লাখ টাকার বেশি খরচ হয়। সেই যন্ত্র তাঁরা তৈরি করে ১ লাখ ৭০ হাজার টাকায় বিক্রি করেন।

ঘুরে দেখা জিনজিরা

বুড়িগঙ্গার ও পারে জিনজিরা, তাওয়াপট্টি, লোহাপট্টি ও আগানগর এলাকায় রয়েছে ছোট, বড় ও মাঝারি ৩০০টির বেশি কারখানা। এসব কার‌খানায় নাটবল্টু, ওয়াশার, তৈজসপত্র, ওয়েল্ডিং মেশিনের ছোট–বড় যন্ত্রাংশ, দা-বটিসহ হরেক রকমের পণ্য তৈরি হয়। তাওয়াপট্টিতে দেখা গেল বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকের কানে হেডফোন। কারখানার ভেতরে বিকট শব্দ। সে শব্দে কান পাতা দায়। চেঁচিয়ে না বললে কাছের মানুষও কিছু কথা শুনতে পান না। শব্দ থেকে বাঁচতে হেডফোনে গান শোনার বন্দোবস্ত।

তাওয়াপট্টির বাহার ইলেকট্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডে প্রায় ৪০০ শ্রমিক সরকারের পল্লী বিদ্যুতের সরঞ্জাম তৈরি করেন। কারখানার উপপরিচালক মিজানুর রহমান জানালেন, দেশে পাঁচটি প্রতিষ্ঠান পল্লী বিদ্যুতের সরঞ্জাম ও উপকরণ তৈরির কাজ করে। তার মধ্যে তাঁদেরটি একটি। আগে পল্লী বিদ্যুতের অনেক উপকরণ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হতো, এখন দেশেই তা তৈরি হচ্ছে।

default-image

তাওয়াপট্টি ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প বণিক মালিক সমিতির সভাপতি মো. আকতার জেলানী বললেন, জিনজিরা ও আশপাশের এলাকায় আমদানি বিকল্প বিভিন্ন যন্ত্রাংশ তৈরি হয়। এতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হচ্ছে। আবার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। এখানে পুরোনো জাহাজ, শিল্পকারখানা, ভবন নির্মাণকালে বেঁচে যাওয়া লোহার টুকরা ও পাত সংগ্রহ করেই নানা যন্ত্রপাতি তৈরি হয়।

বুড়িগঙ্গার ও পারে আরেকটি হালকা প্রকৌশল কারখানার নাম শরীফ আয়রন স্টোর। তাঁরা রিপিট (ছিদ্র বন্ধ করার ইস্পাতের রিং, পাত বা দণ্ড) তৈরির যন্ত্র তৈরি করেন। এর মালিক শরীফুল ইসলাম বলেন, ‘রিপিট তৈরির একটি স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র জাপান থেকে আমদানি করতে খরচ হয় ১৬ থেকে ১৭ লাখ টাকা। চীন থেকে আনলে খরচ পড়বে ১২ লাখ টাকার মতো। অথচ এ যন্ত্র আমরা তৈরি করি আড়াই থেকে তিন লাখ টাকায়।’

তৈরি হয় জাহাজও

কেরানীগঞ্জে বুড়িগঙ্গার তীর ঘেঁষে প্রায় দেড় শ ডকইয়ার্ড রয়েছে, যেগুলোতে ছোট-বড় যাত্রীবাহী ও পণ্যবাহী নৌযান তৈরি হয়। উপজেলার কালীগঞ্জ, কোন্ডাসহ এলাকার ডকইয়ার্ডের মালিক-শ্রমিকেরা বেশ গর্ব করেই বললেন, হাতুড়ি-বাটালি দিয়ে তাঁরা জাহাজ বানিয়ে ফেলছেন, এমন দৃশ্য দেখে বিদেশিদেরও চোখ কপালে ওঠে। এখানে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা হয়।

স্থানীয় মেসার্স ওয়াক্কিয়া মেরিন শিপবিল্ডার্স ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানির স্বত্বাধিকারী আবদুল আলিম নৌযান তৈরির ঠিকাদার হিসেবে কাজ করেন। তিনি বলেন, ডকইয়ার্ডগুলোতে মূলত জাহাজের কাঠামো তৈরি হয়। এ ছাড়া পাখা বা প্রপেলার, অ্যাংকরের মতো বিভিন্ন যন্ত্রাংশ তৈরি করতে হয়। তাঁদের তৈরি নৌযানের গুণগত মানও ভালো বলে দাবি তাঁর।

default-image

দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের নেয়ামত উল্লাহ চৌধুরীর জাহাজ নির্মাণ ও মেরামতকারী ডকইয়ার্ডের দায়িত্ব পালন করছেন তাঁর ছেলে সায়মন চৌধুরী। তিনি মনে করেন, শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করা জরুরি।

কারিগরি দক্ষতা উন্নয়নে কাজ করছে ইউটিলিটি প্রফেশনালস। এই প্রতিষ্ঠানের সিইও মো. হাসমতুজ্জামান প্রথম আলোকে বললেন, পণ্য তৈরির সময় রপ্তানির বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। পণ্যকে আন্তর্জাতিক মানের করার জন্য সংশ্লিষ্ট সরকারি–বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

দরকার সমর্থন, সহায়তা

উদ্ভাবন, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক অবদানের তুলনায় ধোলাইখাল ও কেরানীগঞ্জের উদ্যোক্তারা সরকারি সমর্থন ও সহায়তা কম পাচ্ছেন বলে অভিযোগ মালিক ও কারিগরদের। নথিপত্র ঘেঁটে ও উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১৯৮০–এর দশকে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) ধোলাইখাল-জিনজিরার হালকা প্রকৌশলশিল্পের উন্নয়ন ও সক্ষমতা বাড়াতে পাঁচ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছিল। মূলত তখনই এসব উদ্যোগের বিকাশ ঘটে। এর পরপরই ধোলাইখাল-জিনজিরা মডেল সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে ১৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখে আরও একটি প্রকল্প হাতে নেয় বিসিক। যদিও সরকার পরিবর্তনসহ নানা কারণে সেই প্রকল্প আর আলোর মুখ দেখেনি।

default-image

বাংলাদেশ শিল্প কারিগরি সহায়তা কেন্দ্র (বিটাক) হালকা প্রকৌশলশিল্পের উন্নয়নে টুল ইনস্টিটিউট স্থাপনের প্রকল্প নেয় ২০১৬ সালে। টুল ইনস্টিটিউট প্রকল্পের পরিচালক সৈয়দ মো. ইহসানুল করিম প্রথম আলোকে বলেন, জিনজিরা-ধোলাইখালের পণ্যের মান নিয়ে যেসব অপবাদ আছে, ইনস্টিটিউট পুরোদমে কাজ শুরু করলে, তা দূর করা সম্ভব হবে। ইনস্টিটিউটে গবেষণা, উদ্ভাবন, নকশা তৈরির পাশাপাশি প্রশিক্ষণের ওপর জোর দেওয়া হবে।

১৯৮০–এর দশকে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) ধোলাইখাল-জিনজিরার হালকা প্রকৌশলশিল্পের উন্নয়ন ও সক্ষমতা বাড়াতে পাঁচ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছিল। মূলত তখনই এসব উদ্যোগের বিকাশ ঘটে

তেজগাঁওয়ে টুল ইনস্টিটিউটের ১০ তলা ভবন তৈরি হচ্ছে। ইতিমধ্যে কয়েকটি তলা নিয়ে কাজ শুরু হয়েছে, যেখানে পণ্যের গুণগত মান পরীক্ষার সুযোগ পাবেন উদ্যোক্তারা। এ ছাড়া সিএনসি যন্ত্র বসানো হয়েছে, যা ফি দিয়ে ব্যবহার করতে পারে হালকা প্রকৌশল কারখানাগুলো।

বাংলাদেশ ব্র্যান্ড ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক শফিকুল ইসলাম বলেন, জিনজিরা-ধোলাইখালের সম্ভাবনা নিয়ে বিশ্বব্যাংকও কাজ করেছে। এখন দরকার এসব এলাকা কেন্দ্র বা হাব তৈরি করে বিজনেস মডেল প্রতিষ্ঠা করা। তারপর আস্তে আস্তে কেউ চাইলে নিজস্ব চিন্তাভাবনা নিয়ে পণ্যের ব্র্যান্ড তৈরি করতে পারেন।


[প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন কেরানীগঞ্জ প্রতিনিধি ইকবাল হোসেন]

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন