সাক্ষাৎকার: হামিদা হোসেন

আসলে গণতন্ত্রের অর্থটা বুঝতে হবে, আমরা শুধু চিন্তা করি নির্বাচন নিয়ে

মানবাধিকারকর্মী হামিদা হোসেন। বিশেষ করে নারী ইস্যুতে সোচ্চার এই মানুষটি বই লিখেছেন, তাঁতশিল্প নিয়ে কাজ করছেন। ক্রাউন সিমেন্ট অভিজ্ঞতার আলোর এবারের আয়োজনে অতিথি তিনি। কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক আনিসুল হককে দেওয়া দীর্ঘ এই সাক্ষাৎকারে নিজের শৈশব, কৈশোরসহ জীবনের নানা বাঁকের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন তিনি।

আনিসুল হক:

প্রথম আলোর বিশেষ আয়োজন ক্রাউন সিমেন্ট অভিজ্ঞতার আলোয় আপনাদের সবাইকে স্বাগত জানাচ্ছি। আজ আমরা এসেছি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মানবাধিকার নেত্রী এবং অনেকগুলো খুবই মূল্যবান গ্রন্থের লেখক এবং বাংলাদেশের তাঁত, তাঁতশিল্প ইত্যাদি নিয়েও যাঁর কাজ আছে; বেশ বৈচিত্র্যময় যাঁর কাজের ক্ষেত্র, আমাদের সবার শ্রদ্ধেয় হামিদা হোসেনের কাছে, ডক্টর হামিদা হোসেন। আপা, আপনাকে প্রথম আলোর এই বিশেষ অনুষ্ঠানে স্বাগত জানাই।

হামিদা হোসেন: ধন্যবাদ।

প্রথম আলো:

এই অনুষ্ঠানে আমরা আপনার শৈশব থেকেই শুরু করি। তো আমি যা দেখলাম, ১৯৩৬ সালের ২৮ ডিসেম্বর হায়দরাবাদে আপনার জন্ম। এই হায়দরাবাদ, এটা কি পাকিস্তানের মধ্যে পড়েছে?

হামিদা হোসেন: হায়দরাবাদ সিন্ধ হচ্ছে পাকিস্তান, হায়দরাবাদ দাক্ষিণাত্য হচ্ছে ভারতে। তো আমার জন্ম হলো হায়দরাবাদ সিন্ধে। আমার নানা-নানি ওখানে থাকতেন, তখন দাদা-দাদিও ওখানে ছিলেন।

প্রথম আলো:

এটা হচ্ছে ব্রিটিশ ভারতে। তখন তো অখণ্ড সবকিছু ছিল। আপনার আব্বার নাম কী, আব্বা কী করতেন?

হামিদা হোসেন: আমার আব্বার নাম আবদুল্লাহ শফি মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আখুন্দ। আখুন্দ নাম এসেছে ফারসি শব্দ আখোন্দ থেকে। কারণ, ওনার অনেক ভাই–বোন কোরআন শরিফ শেখাতেন পাশের ছেলেমেয়েদের। কিন্তু উনি নিজে জজ ছিলেন। উনি ব্রিটিশ আমলে জজ পাস করলেন। পরীক্ষা দিয়েছেন ওখান থেকে, আবার জজ হলেন। কিন্তু সিন্ধের ছোট ছোট শহরের জজ হিসেবে চাকরি করেছেন। উনি ….খুব ভয় পেতেন। ওনাকে কোথাও বাইরে যাওয়ার জন্য… তো একসময় ওনার একটা অফার এল বোম্বে যাওয়ার জন্য। কিন্তু উনি ট্রেন পর্যন্ত গেলেন। তারপর বললেন, না আমি এত দূরে যাব না, এখানেই থাকব। ওখানে সাক্কার শহরে চাকরি পেয়ে জজ হিসেবে কাজ করলেন।

প্রথম আলো:

আর আপনার আম্মা?

হামিদা হোসেন: মা আর আমার নানা আর নানি দুজনেই আসলে হিন্দু ছিলেন। একজন ছিল কৃপালানি পরিবার থেকে আর একজনের পরিবার ছিল আদভানি পরিবারের বিখ্যাত কংগ্রেস নেতা ছিলেন যিনি। তো ওঁদের সঙ্গে ছিল, তারপর ওরা মুসলমান হয়ে গেল। মুসলমান হয়ে যাওয়ার পরে ওদেরকে হিন্দু আত্মীয়স্বজন বের করে দিল ওখান থেকে। যখন ওই জমিনটমিন দখল করে ওদেরকে বের করে দিল, ওরা বলল আমরা তাহলে এখানে থাকতে পারব না। আমরা যাই কোথায়, তো আমাদের নানা কোথায় থেকে কিছু টাকা জোগাড় করে চলে গেলেন সৌদি আরব। সৌদি আরব থেকে আমার নানিকে ডাকলেন, ওঁরা সবাই চলে গেলেন সৌদি আরবে। তারপর ওখান থেকে গেলেন টার্কি। টার্কিতে কিছুদিন বসবাস করে তারপর পাকিস্তানে এসেছেন, তখন তো সিন্ধ হয়ে গেছে।

প্রথম আলো:

আপা, তারপর আপনার প্রাইমারি স্কুল, হাইস্কুল এগুলো কোথায় হলো?

হামিদা হোসেন: আমরা যেখানে যেতাম, আমার বাবার যখন পোস্টিং থাকত, সেখানেই পড়তাম। উনি তো ছোট ছোট শহরের জজ ছিলেন। তারপর একসময় আমরা হায়দরাবাদে ছিলাম। তো হায়দরাবাদ, তারপর হায়দরাবাদ থেকে করাচি এলাম। দুই জায়গায় মিশনারি স্কুল ছিল। কনভেন্ট ওখানে পড়াশোনা করেছিলাম। সেন্ট মেরিস কনভেন্ট ছিল হায়দরাবাদে আর করাচিতে ছিল সেন্ট জোসেফস কনভেন্ট। তো ওখানে আমি দাখিল হলাম।

প্রথম আলো:

তারপর আপনি ওই যে বোস্টনের কাছে ওয়েলেসলি কলেজে গেলেন।

হামিদা হোসেন: ওয়েলেসলি কলেজ। এটার লম্বা ইতিহাস আছে। প্রথম আমি যখন ছিলাম হায়দরাবাদ সিন্ধের কলেজে, তখন আমার প্রফেসরের নাম ছিল ডক্টর ডুয়ার্ট। উনি হঠাৎ করে এসে আমাকে বললেন যে তুমি এসো, একটা কম্পিটিশন হচ্ছে, একটা এসে লিখতে হয়। এসে কী বলে বাংলায়?

প্রথম আলো:

রচনা লেখো।

হামিদা হোসেন: রচনা লেখো। তো আমি গেলাম, আমার সঙ্গে আরও দুজন ছাত্র ছিল। একজন ছিল আমার ভাই, আমার চেয়ে দুই বছর বড় আর একজন ছিল কলেজের ছাত্র। আমাদের তিনজনকে বলল এসে লিখতে। আমি লিখলাম ‘দ্য ওয়ার্ল্ড উই ওয়ান্ট’— কী ধরনের পৃথিবী চাচ্ছি আমি। তো এটা লেখার পরে ভুলেই গিয়েছিলাম কেন লিখতে হয়, কী করতে হয়। কেউ আমাকে কিছু বলেনি, হঠাৎ করে একটা ইনভাইটেশন এল আমার নামে যে আমাকে আমেরিকায় ডেকেছে, নিমন্ত্রণ দিয়েছে নিউইয়র্ক সিটিতে যেতে হবে। ওখানে তিন মাস থাকতে হবে। তিন মাসে বিভিন্ন পরিবারের সঙ্গে থাকতে হয় ওদের সঙ্গে স্কুল টুল যেতে হয়। তো ওখানে আমি চলে গেলাম। আমার মা অবশ্য বলেছিলেন—না, এত দূরে যেয়ো না। নারীরা বাইরে গেলে নষ্ট হয়ে যায়। অ্যানি ওয়ে, আমি গেলাম ওখান থেকে, তিন মাস থাকলাম। তারপর তিন মাস পরে আবার বাংলাদেশে এলাম। তখন পাকিস্তান। তখন কিন্তু আমার যে সুপারভাইজার ছিল হেরাল্ড ট্রিবিউন ফোরামের সুপারভাইজার, ওনার নাম ছিল হেলেন হাইট ওয়ালার। উনি আমাকে খুব পছন্দ করলেন। উনি বললেন যে দেখো তুমি তো ভালো লেখালেখি করো আর আগেও একটা প্রাইজ পেয়েছ, এবারও প্রাইজের জন্য এখানে এসেছ। এখন তুমি চেষ্টা করো একটা স্কলারশিপ পেলে তুমি আবার এখানে পড়াশোনা করতে পারো। তো আমি তাই করলাম। কয়েক জায়গা কয়েকটা ইউনিভার্সিটিতে লিখলাম র্যাডক্লিফ, বার্নার্ড আর দু–একটা আমেরিকান নাম, যেটা আমি চিনি; বেশি তো চিনতাম না। তো তখন ওয়েলেসলি থেকে ফুল স্কলারশিপ পেয়েছি। তখন ওখানে গেলাম। এক বছর তো আমি পড়াশোনা করেছিলাম হায়দরাবাদে। ওটা ক্রেডিট দিয়েছে আমাকে তিন বছর ওয়েলেসলি থাকতে হলো। ওখান থেকে আমি ইতিহাস আর ইংলিশ লিটারেচারের ওপরে করলাম।

আরও পড়ুন
প্রথম আলো:

তাহলে আপনি ঢাকায় এলেন প্রথম কবে?

হামিদা হোসেন: ঢাকায় এলাম ফেরার পরে ’৪৭–এর পরে ’৬৩ সালে। তখন আমার বোন থাকতেন এখানে।

প্রথম আলো:

আপনারা কয় ভাইবোন?

হামিদা হোসেন: আমার আর পাঁচজন আছে, তিনজন ভাই আর দুজন বোন। আমার বোন এখানে থাকতেন, ওনার স্বামী ছিল বাঙালি কিন্তু উনি এখানে নৌবাহিনীর কাজ করতেন। কিছু ঠিক আমার মনে পড়ছে না, হয়তো ভুল করতে পারি।

প্রথম আলো:

ঠিক আছে। আর তারপর অক্সফোর্ডে গেলেন।

হামিদা হোসেন: ’৬৩–তে আমি এক বছর ছুটিতে থাকলাম। এখানে কামালের সঙ্গে দেখা হলো।

আনিসুল হক:

আপনার বিয়ে হয়েছিল কত সালে?

হামিদা হোসেন: বিয়ে হলো ’৬৪-৬৫–এ।

আনিসুল হক:

আর অক্সফোর্ড থাকলেন কত সালে?

হামিদা হোসেন: অক্সফোর্ড গেলাম সেই সময় বোধ হয় ’৬৪-’৬৫ এর দিকে গেলাম।

আনিসুল হক:

আপা, আপনি তারপর পিএইচডিটা করলেন কত সালে?

হামিদা হোসেন: পিএইচডি করতে কয়েক বছর লেগেছে। শুরু করলাম অনেক আগে, যখন আমরা এমনি তো অনেক বাংলাদেশে ঘুরেছি, অনেক তথ্য বের করলাম, যখন আমি তোফায়েল আহমেদ এঁদের সঙ্গে যেতাম শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন; আমাকে সোনারগাঁ পর্যন্ত নিয়ে যেত। আর তারপর যখন আমরা অক্সফোর্ডে এলাম, আর তো কোনো কাজ ছিল না।’৭৫–এ এক্সাইলে ছিলাম। আমার মনে হয় বঙ্গবন্ধু হত্যার পরে। এরপর দেশে এলাম। তখন আমি ভাবলাম যে যেহেতু আমি এত তথ্য সংগ্রহ করেছি, দেখি এখানে কী পাওয়া যায়। তো ওখানে আমার সুপারভাইজার ছিলেন তপন রায় চৌধুরী। ওনার সঙ্গে কনসাল্ট করলাম যে এখন কী করা যায়। তো এসে বললেন যে বেশি সময় নষ্ট না করে তুমি দু–একটা বই নাও। আমাদের লাইব্রেরিতে যাও, বই দেখো টেক্সটাইলের ওপরে কী বই আছে। তো আগে জিজ্ঞেস করলেন তুমি কী ধরনের কাজ করেছ। বাংলাদেশে তো আমি বললাম এই ঘুরে ঘুরে দেখলাম কোন তাঁতের কাজ কোথায়, কোন তাঁতিরা কোথায় বসে এটাই। তো সে বলল তো তুমি যাও লাইব্রেরিতে দেখো এটার ওপরে দু–একজন বিখ্যাত লেখক আছে, তাদের কাজ আছে। তাদের বই দেখে তারপর পুরোনো বইগুলো যেটা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রেকর্ডগুলো আছে সেটা দেখতে শুরু করো, ওখানে কী লেখা আছে। তো সেভাবে আমি খুঁজতে খুঁজতে যেহেতু আমরা তখন অক্সফোর্ডে থাকতাম, এক্সাইলের সময় কারণ ওখানে বঙ্গবন্ধু হত্যার পরে চলে গেলাম। তো আমি তারপর লাইব্রেরিতে যেতাম ডেইলি বইটা ছাপা দেখতে। ওখানে অনেক কিছু লেখা ছিল আর আমি এটা কাজ শুরু ওইভাবে করলাম কিছু কাজ তো আগেই এখানে বাংলাদেশে করেছিলাম, মানে ওটা ফিল্ড রিসার্চ বলা যাবে। তারপর কিছু বইয়ের কাজ ওখানে অক্সফোর্ডে করলাম, লাইব্রেরিতে ছিল অক্সফোর্ড থেকে আমি পুরো সময়ে পুরো সকালে চলে যেতাম লন্ডন লাইব্রেরিতে দেখতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রেকর্ডগুলো ওখানে অনেক পুরোনো রেকর্ডগুলো ছিল যেটার ওপরে আমাকে সাহায্য করেছেন ডক্টর আনিসুজ্জামান। কারণ, এই রেকর্ডগুলো আর কোনো জায়গায় পাবে না। এটা বাংলায় রেকর্ড লেখা ছিল। ওখানে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির যে গোমস্তারা ছিল, তারা এটা ডাইরেক্টলি কোম্পানি ডিরেক্টরের সঙ্গে লেখালেখি করতেন। তো আর কোথায় আমরা পাব না। এটা আমি নিয়ে নোট করতাম এটাই নিয়ে শুরু হলো আমার পিএইচডির কাজ থিসিস। তো ওটা শেষ হলো আই থিঙ্ক ’৮১ কি ’৮২ সালে। ইন দ্য মিন টাইম সালমা আর আমি চিন্তা করতাম যে আমরা দেশে কী করব। ওখানে আমার কথা ছিল যে আমরা কিছুটা তো আন্দোলনের সময় অনেকেই সাহায্য করেছি কীভাবে নিজের মধ্যে বিভেদ থাকলে কীভাবে সংগ্রহ করা যায়, কীভাবে পিসফুলি সেটেল করা যায়, এটা নিয়ে আমরা সালিসের কাজ করব, ওইভাবে শুরু হলো আইন সালিশ কেন্দ্র।

হামিদা হোসেন। জন্ম অখণ্ড ভারতে হায়দরাবাদ সিন্ধে ১৯৩৬ সালে
ফাইল ছবি
আনিসুল হক:

সালমা সোবহানের সঙ্গে আপনার…

হামিদা হোসেন: সালমা সোবহান ছিল, আমিরুল ইসলাম ছিল, জাস্টিস সোবহান ছিলেন তখন আর আবেদ ভাই ছিলেন—ব্র্যাকের আবেদ ভাই। আমাদের কথা ছিল যে আমরা শুধু কোর্টের কাজ করব না, আমরা সালিসের মাধ্যমে কাজ করব। এভাবে শুরু হলো আইন ও সালিশ কেন্দ্র।

আনিসুল হক:

ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে মিলে বাংলাদেশে পূর্ব পাকিস্তানে আর আপনি ফোরাম পত্রিকাটার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, এটা মনে আছে?

হামিদা হোসেন: জি, হ্যাঁ। এখন আমরা বের করছি… ফাইনাল একটা ইউপিএলকে পাঠিয়েছি। ফাইনাল এডিশন পুরোনো পেপারগুলো সিলেকশন করে সেটা তারা পাবলিশ করবে।

আনিসুল হক:

ও পুরোনোগুলো আবার একটা সংকলন করা হচ্ছে।

হামিদা হোসেন: এটা আমরা শুরু করলাম। কারণ, তখন আমরা দেখলাম যে রেহমান, কামাল আর আমি একসঙ্গে সব সময় কাজ করতাম। তো তখন অন্য পত্রিকার জন্য লেখালেখি করতাম কিন্তু ইংরেজি পত্রিকা খুব কম ছিল বাংলাদেশে আর পাকিস্তানে। আমরা ভাবলাম যে একটা ইংরেজি পত্রিকা করা উচিত, সেভাবে এটা শুরু হলো। তো ঠিক ’৬৯–এর প্রথম ইস্যু বের হলো নভেম্বর মাসে।

আনিসুল হক:

বাংলাদেশের স্বাধীনতা, বাংলাদেশ রাষ্ট্র গড়ার পেছনে অনেক অনেক ফ্যাক্টর তো কিন্তু ফোরামের একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে।

হামিদা হোসেন: ফ্যাক্টর ছিল। আমাদের লাস্ট এডিটোরিয়াল ছিল ওটার টাইটেল ছিল ‘অপশনস ফর আ সেন ম্যান’। এটা আমরা লিখেছিলাম ইয়াহিয়া খানের জন্য, যখন উনি আক্রমণ শুরু করলেন মার্চ মাসে, তখন আমাদের ‘অপশনস ফর আ সেন ম্যান’ ছিল যে অন্য পথ আছে, শুধু যুদ্ধ একটা পথ না। সেটা উনি মানলেন না।

হামিদা হোসেন। কাজ করেছেন তাঁতশিল্প নিয়েও
ছবি: খালেদ সরকার
আনিসুল হক:

তারপর ড. কামাল হোসেনকে ধরে নিয়ে গেল মার্চে। তারপর ওনাকে পাকিস্তানের জেলে রাখল আবার বঙ্গবন্ধুকেও ধরে নিয়ে গেল, পাকিস্তানের অন্য জেলে রাখল। সেই সব আমরা ইতিহাসের মধ্যে জানি। আপনি কিছুদিন ঢাকা থেকে, তারপর করাচিতে দুই মেয়েকে নিয়ে চলে গেলেন।

হামিদা হোসেন: হ্যাঁ। কারণ, এখানে থাকাটা নিরাপদ মনে করিনি। কারণ, ওরা বাড়িতে আসত খুঁজতে আর নিয়ে যেতে চাচ্ছে অনেক সময়।

আনিসুল হক:

তারপর ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর এখানে সারেন্ডার হলো, পাকিস্তানি সৈন্যরা আত্মসমর্পণ করল। তারপর জানুয়ারিতে আমাদের এখানে বঙ্গবন্ধু ফিরে এলেন ১০ জানুয়ারি কিন্তু তার আগে হয়তো ৭-৮ জানুয়ারির দিকে তাঁকে প্লেনে তোলা হলো। ওই সময় একই প্লেনে আপনিও ছিলেন।

হামিদা হোসেন: একই প্লেনে ছিলাম আমি। আমি যখন এখান থেকে করাচিতে যাই, তখন ওরা আমার পাসপোর্ট নিয়ে রেখে দিয়েছিল যে এটা তোমাদের লাগবে না, আমরা রাখি। ওরা ইন্টেলিজেন্সের লোক ছিল। …তখন আমি ওখানে থেকে গেলাম। করাচিতে কিছু মাস দুই–এক মাস ছিলাম বোধ হয়। তারপর যখন এদেরকে নিয়ে আসতে হয়, তখন তারা আমাকে তুলল করাচি থেকে। আমাকে জিজ্ঞেস করল যে পাসপোর্ট কোথায়? পাসপোর্ট তো আপনারা নিয়ে গেছেন, আমার কাছে আর কোনো কাগজপত্র নেই। ওরা নতুন করে আবার পাসপোর্ট করেছে আমার জন্য, আমার মেয়েদের জন্য। ইন দ্য মিন টাইম অফকোর্স আমার বড় মেয়ে তো বাংলা জানত ভালো করে। কারণ, আমরা বাসায় তখন ওর সঙ্গে বাংলায় বলতাম কিন্তু ছোট মেয়ে অনেক কিছু ঢাকায় শিখে এসেছে তো ওখান থেকে স্লোগানগুলো ওর মনে ছিল যে—ভুট্টোর মুখে লাথি মারো, ইয়াহিয়া খানের মুখে লাথি মারো—এটাই।

আনিসুল হক:

ভুট্টোর মুখে লাথি মারো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো।

হামিদা হোসেন: স্বাধীন করো হ্যাঁ। তো আমাকে খুব সতর্ক করতে হলো যে তুমি কোনো কথা বলবে না চুপ করে থাকবে। এ নিয়ে তারা আমাদের পাসপোর্ট তৈরি করে দিল আর পরে বলল যে আমাদের সঙ্গে যাও। তো আমি বললাম কোথায় যাব? বলছে, কিছু বলতে পারব না; কিন্তু তোমার জন্য ভালো হবে। তো ভয় ভয় ছিল আর কী করব।

আনিসুল হক:

আপনার সঙ্গে ড. কামালের এত বছর পরে দেখা হলো কি এয়ারপোর্টে? নাকি তার আগে?

হামিদা হোসেন: না, দেখা হলো জেলে। না জেলে হলো কি কোথায় হলো।

আনিসুল হক:

ওনাদের বোধ হয় একটা রেস্টহাউস–গেস্টহাউসেও রাখতে পারে বের করে নিয়ে এসে।

হামিদা হোসেন: আহা, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গেছিল সেহালা রেস্টহাউসে, ওটা মারির দিকে ছিল না, তক্ষশীলা মারির দিকে ছিল। তো আমাকে বলা হলো যে ভয় করো না, তোমার জন্য ভালোই হবে। তো আমাকে যখন প্লেনে বসাল, প্লেন নিয়ে গেল পিন্ডিতে, রাওয়ালপিন্ডিতে। রাওয়ালপিন্ডিতে আমি বসে আছি বসে আছি, দেখি নিচে থেকে দেখি যে চলে আসছেন বঙ্গবন্ধু; আগে ভুট্টো তারপর বঙ্গবন্ধু তারপর কামাল—ওরা সবাই এল। তো সারা ওদেরকে দেখার পরে পরেই বলছে যে আব্বা আর ইলেকশন করবেন না।
তো ওখানে শেষ, ওখান থেকে আমরা চলে এলাম ঢাকায়।

আনিসুল হক:

প্রথমে তো লন্ডন নিল।

হামিদা হোসেন: প্রথম লন্ডন গেল, হ্যাঁ। লন্ডন থেকে দিল্লি হয়ে ঢাকায়।

প্রথম আলো:

১৯৭১ সালের পরে আপনি তো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন, একটা হচ্ছে বই আছে, আপনার ১৯৭১ সালে আমাদের নারীদের যে নির্যাতিত নারীদের ওপরে আপনার মনে আছে যে একটা বই আছে?

হামিদা হোসেন: এটাতে আমার একার কাজ নেই। অনেকেই আমরা ছিলাম, মেঘনা ছিল, সুরাইয়া বেগম ছিল আর কয়েকজন ছিল। আমরা বললাম যে আমরা অনেক কথা শুনি আর ওখানে আমি কাজ করেছি মহিলা পরিষদের সঙ্গে মহিলা সমিতিতে যে কীভাবে মেয়েদেরকে হত্যা করা হলো, কীভাবে ওদেরকে হসপিটালে আমরা নিয়ে যেতাম আবার দেখাশোনা করতাম। ইস্কাটন রোডের নূরুল আমিন সাহেবের বাসায় ওদের জায়গা ছিল, যেখানে মেয়েদের থাকতে দিত। আর আমাদের আমাদের চেষ্টা ছিল যে ওদেরকে সরকারের মাধ্যমে ট্রেনিং দেওয়া যায় কি না, তো তারা চাকরি পেতে পারে; কারণ কেউ তো ওদেরকে রাখবে না। আর যখন নীলিমা ইব্রাহিম আপা যখন কাজটা শুরু করলেন, খুঁজে খুঁজে বের করা যে নির্যাতিত মেয়েরা কোথায় আছেন, তাঁদের জন্য কী করা যায়, তখন কিন্তু কেউ রাজি হয়নি বাবা–মায়েরা রাজি হয়নি তাদেরকে রাখতে। তো আমরা একটা দায়িত্ব নিলাম যে ওদেরকে বাসায় খুঁজে বের করব, তো ওখানে বেগম সুফিয়া কামালের একটা জায়গা ছিল ইস্কাটন রোডে, ওখানে রাখা হতো। ওখানে আমি যেতাম ওদের কাছে, নীলিমা ইব্রাহিম, সুফিয়া কামাল, কিছুটা মালেকা খান হয়তো যুক্ত ছিলেন। মালেকা বেগমও ছিলেন, কিছু মহিলা পরিষদের মেয়ে ছিল।

আরও পড়ুন
আনিসুল হক:

নীলিমা ইব্রাহিমের দুটো বই আছে, ‘আমি বীরাঙ্গনা বলছি’ ওগুলো এখন ইংরেজিতেও অনুবাদ হচ্ছে। আপনি আইন ও সালিশ কেন্দ্র করলেন মনে আছে?

হামিদা হোসেন: করেছি, কিন্তু কেন–বা করলাম, কোনো ঘটনা ছিল, সেটা আমার মনে পড়ছে না; আমি জানি না, আপনার জানা আছে কি না। এটা আসলে কি, একটা ঘটনা ঘটল যাদের জন্য আমরা কিছু করতে পারিনি, তাদের জন্য তারপরে আমরা বললাম যে হ্যাঁ বিশেষ করে এটা তখন এরশাদ আমলের আন্দোলন ছিল। আর অনেকে আমরা প্রেসক্লাবে যেতাম, আন্দোলন করতে, মিছিল–টিছিল করতে। তো ওখানে আমিরুল ইসলামের সঙ্গে দেখা হতো, জাস্টিস সোবহান ছিলেন আর দু–একজন ছিলেন। আবেদ ভাই ছিলেন আর কে কে ছিল জানি না। তো ওখানে আমরা ভাবলাম যে আমরা শুধু কেস করে আসছি, এটা আমিরুল ইসলামের কথা, শুধু কেস করব আর শাস্তি পাবে কি পাবে না, অপেক্ষা করব আমরা অন্য কিছু করি না, কেন সালিসের কাজ কেন করি না, তাহলে নারীরা যখন নির্যাতিত হচ্ছে তাদের একটা সাহায্য করা যায়। তো এভাবে আইন সালিশ শুরু হলো।

আনিসুল হক:

আচ্ছা আপা, আপনার জামদানি বিষয়ে উৎসাহ হলো, আপনার গবেষণা বই আছে যে ব্রিটিশ আমলে বা তারও আগে আমাদের যারা তাঁতি ছিলেন, তাঁদের কী অবস্থা এখন, যাঁরা কাজ করছেন তাঁদের কি অবস্থা, আপনার মনে আছে এ বিষয়ে আপনার গবেষণা আছে?

হামিদা হোসেন: এটা খুব বেশি মনে পড়ছে না, আমি জানি আমি কাজ শুরু করেছিলাম এভাবে যে কোথায় থেকে শুরু হলো আমি ঠিক জানি না। কিন্তু শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, প্রফেসর রাজ্জাক এঁদের সঙ্গে ঘুরতাম অনেক। আর প্রফেসর তোফায়েল আহমেদ উনি তো একটা বইও লিখেছেন এটার ওপরে। আর মোহাম্মদ সাইদুর বাংলা একাডেমিতে যিনি ছিলেন, উনি অনেক গবেষণা করেছিলেন তাঁতের ওপরে। বাংলা একাডেমিতে করেছেন রিসার্চ গবেষণার কাজ। তো আমি ওঁদের সঙ্গে অনেক ঘুরেছি; বাংলাদেশের পুরো বাংলাদেশে অনেক গ্রামে গ্রামে গেছি কোন এলাকায় কী হয়, তার আগে কিন্তু মানুষ জানত না যে যেমন জামদানি আছে কি টাঙ্গাইল আছে, তারা বুঝতে পারত না টাঙ্গাইল এখানে কি ইন্ডিয়াতে এমনি পুরোনো কথা ছিল; ওদের জন্য নতুন কথা ছিল বুঝতে পারল না যে কোথায় টাঙ্গাইল আর জামদানি কাপড় কোথায় হয়। সে তো ফাইনালি আমরা ঘুরে ঘুরে ম্যাপে মানচিত্রে দেখালাম যে কোথায় কী হচ্ছে সেটা। এখান থেকে আমার শুরু হলো কাজটা, আর ইন্টারেস্ট হলো জামদানি দেখার জন্য যে কোথায় হয়। তো আমরা ওই নৌকাতে চলে যেতাম, নৌকাতে নদীতে যেতাম ওই ডেমরার দিকে ওখানে একটা গ্রাম ছিল, যেখানে অনেক তাঁতি থাকতেন ওঁদের সঙ্গে কথাবার্তা বলতাম যে কীভাবে এটাতে এসেছেন তাঁরা, নিজের গল্পের মাধ্যমে নিজের কাহিনি বলেছেন।

আনিসুল হক:

খুব সুন্দর, খুব ভালো কাজ হয়েছে।

হামিদা হোসেন: তারপরে তো ওটা নিয়ে তো অনেক কাজ হলো, অনেকেই কাজ করেছে।

আনিসুল হক:

এমনিতে আপা দেখলাম আপনি ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন, এটার মধ্যে একটা সেক্যুলারিজম নিয়েও একটা অর্গানাইজেশনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সারা পৃথিবীতে গণতন্ত্র আমি দেখি নেমে যাচ্ছে, দ্য স্ট্যান্ডার্ড অব ডেমোক্রেসি ইজ ফলিং। তারপর সেক্যুলারিজমও তো মনে হয়, আমাদের আশা ছিল অনেক সুন্দর পৃথিবী হবে। আপনার কী মনে হয়?

হামিদা হোসেন: আশা করি টিকে থাকবে, দেখার চেষ্টা করে যেতে হয়, আন্দোলন তো কোনো দিন শেষ হয় না, চলতে থাকে।

আনিসুল হক:

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কী দেখেন?

হামিদা হোসেন: মানে এখন তো সরকার শুধু চেঞ্জ হয়, একটা সরকার যায় একটা সরকার আসে; কিন্তু আমরা যদি ওইভাবে চিন্তা করি যে মানুষ কীভাবে পরিবর্তন হচ্ছে কি না, তাদের কীভাবে জীবনের মধ্যে কত পার্থক্য আসছে, সেটা বুঝতে হবে। কীভাবে একসঙ্গে কাজ করতে পারে, তারপর নারী–পুরুষের প্রশ্নগুলো থেকে যাচ্ছে; কারণ নারী–পুরুষের অনেক কথা হয় যে এখন নারীরা স্বাধীন আছে, কিন্তু আসলে আমরা কি স্বাধীনতা দেখছি, বাইরে যাওয়ার সময় আমরা তাদের একা যেতে দিতে পারছি কি?
আনিসুল হক: আপনি তো ব্রিটিশ আমল দেখেছেন, অল্প কয়েক দিনের জন্য হলেও ’৩৬ থেকে ’৪৭ বেশি না, সাত আট নয় বছর। তারপর পাকিস্তান আমল দেখেছেন, তারপরে ’৭১ দেখলেন, বাংলাদেশ হলো। ধীরে ধীরে একটা অগ্রসর তো হয় নাকি?
হামিদা হোসেন: অগ্রসর তো নিশ্চয়ই হবে; কিন্তু কোন দিকে হচ্ছে এটা বুঝতে হবে, কারণ অনেক ওপর থেকে চাপ আসে। এখন আমরা যখন গণতন্ত্রের কথা বলি, আমরা শুধু চিন্তা করি যে নির্বাচন হবে, নির্বাচনের একটা দল আসবে আরেকটা দলের চাপিয়ে দেব। … আসলে গণতন্ত্রের অর্থটা বুঝতে হবে অথবা কতটুকু মানুষ স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে, কতটুকু মানুষ কথা বলতে পারবে, কী কথা বললেই জেলে ঢুকে যাবে, সেটা বুঝতে হবে আমাদের। কারণ, না হলে ভয়ে ভয়ে কাজ হবে না।

আরও পড়ুন
আনিসুল হক:

আমি তো বলি যে গণতন্ত্রের একটা লিটমাস টেস্ট হচ্ছে, একজন মানুষও যদি থাকে মাইনরিটি, একা ওনাকে আমরা কতখানি কথা বলতে দিচ্ছি।

হামিদা হোসেন: এক্সাক্টলি, তো সেটা আমরা দিচ্ছি কি দিচ্ছি না আপনি বলেন।

আনিসুল হক:

সেই তো। আবার আপনি বলছিলেন আপনি তো নারী অধিকার নিয়ে নারীর মর্যাদা নিয়ে অনেক কাজ করেছেন যে সভা–সমিতিগুলো দেখছি, ঐকমত্য কমিটি, অমুক কমিশন যখন ছবিটা ছাপা হয় পত্রিকায় দেখা যায় যে ৪০ জন পুরুষ হয়তো একজন মাত্র নারী দাঁড়িয়ে আছেন।

হামিদা হোসেন: পার্লামেন্টে।

আনিসুল হক:

এটা ওই যে ইন্টেরিম গভর্নমেন্টের সময় যে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন হয়েছিল, তারা মিটিং–টিটিং শেষে শেষ দিনে একটা ছবি তুলল। সেই ছবিতে দেখি সবাই পুরুষ ৪০ জনের মতো পুরুষ একজন শুধু নারী। এটা শুধু যে মানে এটা একটা উদাহরণ মাত্র, অন্য যেকোনোখানে আমরা এমনকি আমাদের পত্রিকা অফিসেও যখন আমরা একটা মিটিং করি, আমরা দেখি যে ১০ জন হয়তো ছেলে ২ জন হয়তো নারী। আসলে তো এখনো নারীদের আরও অনেক দূর যেতে হবে।

হামিদা হোসেন: অনেক দূরে কোথায় যাবে, চাপে রাখা হচ্ছে তো, নারীরা তো রেডি আছে যেতে; কিন্তু তাদের ওপরে অনেক চাপ পড়ে যে তোমরা এটা করবে না এটা নারীদের কাজ না, সব সময় পুরুষেরা সামনে থাকছে। আর সংখ্যার ব্যাপারে আছে যে দুইজন নারী থাকলেও, বেশি নারীরা থাকলেও কথা বলে না, কথা বলে পুরুষেরা। … তো এত বেশি চাপ আসছে নারীদের ওপরে যে তারা মুখ খুলতে পারছে না। তো সেটা নিয়ে আমাদের এটা তো নারীদের আন্দোলনের মাধ্যমে এটাকে কিছু করতে হবে। আমি এমনি কাজ খুব কম করেছি; কিন্তু অনেক কিছু দেখেছি বিশেষ করে বাইরের আন্দোলনের মাধ্যমে নারীরা কেমন করে বেরিয়ে আসছে বিভিন্ন সংগঠনের মাধ্যমে কীভাবে কাজ করে এসেছে। তো যেমন আমার মনে পড়ছে স্বাধীনতার পরে মহিলা সমিতির একটা অফিস ছিল না, এখানে বেইলি রোডে সেখানে মেয়েদের ট্রেনিংয়ের কোর্স হতো। তো তারা টাইপিং শিখত আর বিভিন্ন ধরনের কাজ শিখত, ওখান থেকে বেরিয়ে কিন্তু তারা ভালো অফিসের কাজ চাকরিবাকরি পেয়েছে তারপর কথা বলতে পেরেছে; কিন্তু কথা বলার সময় একটু সব সময় একটু ভয়ে ভয়ে থাকে যে পুরুষেরা চাপিয়ে দেবে, তারপরও আমাদের চ্যালেঞ্জ নিতে হবে, গ্রহণ করতে হবে।

আরও পড়ুন
আনিসুল হক:

আমি মাত্র আর দুটি প্রশ্ন করব। বা ঠিক আছে তিনটা করি। একটা হচ্ছে এত সুন্দর বাংলা আপনি কেমন করে শিখলেন?

হামিদা হোসেন: অনেক আগে আমাদের এটা আমার আমার ক্রেডিট বলব না, আমার শিক্ষকের ক্রেডিট, আমার টিচাররা ছিলেন আমি আপনাকে যদি বলি এত বিখ্যাত টিচাররা ছিলেন, ড. মোজাফফর আহমেদ চৌধুরী না আর একজন ছিলেন; সরি, নাম ভুলে যাচ্ছি, আনিসুজ্জামান ছিলেন একজন। আর মইনুদ্দিন কি ছিলেন নাম মনে করতে পারছি না, এখন আসাদ মুনীরের বাবা।

আরও পড়ুন
আনিসুল হক:

মুনীর চৌধুরী।

হামিদা হোসেন: মুনীর চৌধুরী। আর একজন ছিলেন তো তিন–চারজন খুব ভালো শিক্ষক ছিলেন।

আনিসুল হক:

মোজাফফর স্যার, আনিসুজ্জামান স্যার, মুনীর চৌধুরী—এ রকম শিক্ষক পেয়েছিলেন।

হামিদা হোসেন: সেই জন্য শিখেছি।

আনিসুল হক:

সেই জন্য সুন্দর বাংলা শিখলেন, খুব সুন্দর বাংলা।

হামিদা হোসেন: সুন্দর জানি না, লেখালেখি করতে পারি না এখন।

আনিসুল হক:

আচ্ছা, দুই নম্বর প্রশ্নটা হচ্ছে নতুন প্রজন্ম নিউ জেনারেশন এদের উদ্দেশে যদি আপনি কোনো একটা পরামর্শ হোক, উপদেশ হোক কথা হোক বলতে চান বলেন।

হামিদা হোসেন: এটা সব সময় প্রশ্ন করে যে আমি কিছু বলব অন্যদের জন্য বলব, কিন্তু কথা হচ্ছে যে আমার জীবনের আর বর্তমান জীবনের অনেক পার্থক্য আছে; একসঙ্গে তো তুলনা করা যায় না। কারণ, আমরা একটু বোধ হয় একটু আগে একটু শান্তিতে বেশি ছিলাম; এখন নিজের মধ্যে অনেক যুদ্ধ লাগছে, এখন কোন দল ওপরে আসে, কোন দল ওপরে এসে অন্যদের ওপরে চাপ দেবে, এটাই বেশি মনে হচ্ছে। তো, আমার এখানে উপদেশ তো বলব না, আমি বলব যে আমি দেখে যাই নতুন জেনারেশন কোন দিকে নিয়ে যায় আমাদের।

আনিসুল হক:

আপনি কি নিজে ফেসবুক ব্যবহার করেন, মোবাইল ব্যবহার করেন?

হামিদা হোসেন: দেখি মাঝেমধ্যে।

প্রথম আলো:

আচ্ছা, এটা হচ্ছে শেষ প্রশ্ন, বাংলাদেশ সম্পর্কে আপনার আশাটা কী, আপনি কেমন স্বপ্ন দেখেন, কী বাংলাদেশ চান, আপনার স্বপ্নের বাংলাদেশটা কেমন?

হামিদা হোসেন: সত্যি কথা যেটা হবে কি না আমি জানি না, কিন্তু শান্তিতে চাচ্ছি দেশের বিভিন্ন ধরনের মানুষ থাকে, চাকমারাও আছে, বিভিন্ন জাতিকে যেন আমরা ভুলে না যাই।

আনিসুল হক:

হ্যাঁ, বাঙালি যেমন আছে তেমনি আমাদের পাহাড়ি আমাদের চাকমা, মারমা, সাঁওতাল।

হামিদা হোসেন: অনেকেই আছে, তারপর পার্থক্য আছে নারী–পুরুষদের মধ্যে।

আনিসুল হক:

হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান আবার শহর গ্রাম চর সুন্দরবন হ্যাঁ।

হামিদা হোসেন: তো এটাকে স্বীকার করতে হবে, কীভাবে একসঙ্গে আমরা থাকতে পারি, কীভাবে উন্নতির দিকে আমরা যেতে পারি, দেখতে হবে পড়াশোনা কতটুকু করতে পারে ছেলেমেয়েরা, এখন জানি না, কী পরিস্থিতি আছে দেখতে হবে।

আনিসুল হক:

আপা আপনার সঙ্গে কথা বলে আমাদের খুব ভালো লাগল। খুব সুন্দর বলেছেন, আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

হামিদা হোসেন: থ্যাঙ্ক ইউ, জানি না কত ভুল করেছি কি না।

আনিসুল হক:

না না, খুব সুন্দর বলেছেন, খুব সুন্দর বলেছেন, ধন্যবাদ আপনার কষ্ট করে এসেছেন। আমরা এতক্ষণ আমাদের প্রাজ্ঞজন অগ্রজজন হামিদা হোসেনের কথা শুনলাম, তাঁর কথা থেকে তাঁর জীবনের গল্প, বাংলাদেশের গল্প, এই উপমহাদেশের ইতিহাসের অনেক কিছু আমাদের জানা হলো। নিশ্চয়ই এটা আমাদের চলার পথকে ঋদ্ধ করবে এবং ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে সুন্দর করতে সাহায্য করবে। আপনারা সবাই ভালো থাকবেন।