৯৭৫ থেকে ২,০৬০ টাকা: সাড়ে ৫ বছরে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম দ্বিগুণের বেশি
দেশে ২০২৬ সালের মার্চে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ছিল ১ হাজার ৩৪১ টাকা। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর আট মাসে এই দাম বেড়ে হয়েছে ২ হাজার ৬০ টাকা।
তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ২২৩ টাকা বেড়ে ২ হাজার ৬০ টাকা হয়েছে ২ নভেম্বর। দেশে এখন পর্যন্ত এই সিলিন্ডারের সর্বোচ্চ দাম এটা। প্রতি মাসেই বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) এলপিজির দাম সমন্বয় করে। এর আগে অক্টোবরেও দাম বেড়েছিল ২৫২ টাকা।
দেশের বাজারে দেড় মাসের বেশি সময় ধরে এলপিজি সরবরাহে ঘাটতি চলছে, সরকার-নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না।
এখানে বেশ কয়েকটি প্রশ্ন চলে আসে, যেমন দাম এত বাড়ছে কেন? দামের এই বৃদ্ধি কি কোনো আকস্মিক ঘটনা, নাকি ধারাবাহিকভাবেই এলপিজির দাম বারবার বাড়ছে? দাম একবার বাড়লে কি আর কখনো কমে?
এ রকম নানা বিষয় পর্যালোচনা করার জন্য ২০২১ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের নভেম্বর পর্যন্ত এলপিজির দাম খতিয়ে দেখেছে প্রথম আলো।
২০২১ সালের এপ্রিলে হাইকোর্টের নির্দেশে বিইআরসি প্রথমবারের মতো বেসরকারি এলপিজির দাম ঠিক করে দেয়। ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করা হয় ৯৭৫ টাকা। এরপর প্রতি মাসে দাম বেড়েছে বা কমেছে। যে ৬৩ বার দাম সমন্বয়ের তথ্য পাওয়া গেছে, তার মধ্যে ৩২ বারই দাম বেড়েছে, কমেছে ২৬ বার এবং ৫ বার অপরিবর্তিত ছিল।
২০২৬ সালের মার্চে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ছিল ১ হাজার ৩৪১ টাকা। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর আট মাসে এই দাম বেড়ে হয়েছে ২ হাজার ৬০ টাকা। ২০২১-২২ সালের চার মাসের দামের তথ্য নিশ্চিতভাবে পাওয়া যায়নি, তাই গ্রাফের ওই অংশটুকু ফাঁকা রাখা হয়েছে।
এই গ্রাফ থেকেই বোঝা যাচ্ছে, চলতি বছর এলপিজির দাম একটু বেশিই বাড়ছে। এর পেছনে কি শুধুই মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ দায়ী? এটা সবিস্তারে দেখানো হয়েছে নিচের ছবিতে।
সামগ্রিক চিত্র থেকে দেখা যাচ্ছে, ২০২৬ সালে এলপিজি সিলিন্ডার নিয়ে সংকট দেখা দিয়েছে দুবার—একবার জানুয়ারিতে, আরেকবার এই সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে। দুবারই দোকানে পর্যাপ্ত সিলিন্ডার পাননি ক্রেতারা, যখন পেয়েছেন, তখন কিনতে হয়েছে সরকার-নির্ধারিত দামের চেয়ে কয়েক শ টাকা বেশি দিয়ে। তবে এই দুই সংকটের কারণ এক নয়। বিষয়টা খুলে বলা যাক।
জানুয়ারি সংকট: এলপিজি দেশে আসেনি, কারণ ঋণপত্র খোলা যায়নি
বিদেশ থেকে এলপিজি কিনতে আমদানিকারককে ব্যাংকে ঋণপত্র বা এলসি খুলতে হয়। এলসি হলো ব্যাংকের দেওয়া নিশ্চয়তা যে বিদেশি বিক্রেতা টাকা পাবেন। এলসি খুলতে না পারলে এলপিজি নিয়ে জাহাজ আসে না।
২০২৫ সালের শেষ দিকে কয়েকটি বড় আমদানিকারক এ জায়গায় আটকে যায়। প্রথম আলোর ২৫ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কিছু কোম্পানি প্রায় দুই বছর ধরে এলসি খুলতে পারছে না। শতভাগ টাকা জমা না দিলে ব্যাংক এলসি দিচ্ছে না, আবার কারও ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে। দ্য ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদনে বিইআরসির তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ঋণসীমা শেষ হওয়ার পর ব্যাংক ১০ শতাংশের বদলে শতভাগ নগদ জামানত চেয়েছে। তাতে ইউনিটেক্সের আমদানি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের ১ লাখ ৫৫ হাজার টন থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শূন্যে নেমেছে। একই সময়ে বসুন্ধরার আমদানি ১ লাখ ৩৮ হাজার টন থেকে কমে হয়েছে ১০ হাজার টন।
এর প্রভাব পড়ে পুরো বাজারে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের নভেম্বরে এলপিজি আমদানি আগের বছরের একই মাসের চেয়ে ৪৪ শতাংশ কম ছিল। পুরো ২০২৫ সালে আমদানি কমেছে প্রায় দেড় লাখ টন।
জানুয়ারির মাঝামাঝি সরকারি দাম ছিল ১ হাজার ৩০৬ টাকা, অথচ ঢাকার মোহাম্মদপুরে সিলিন্ডার কিনতে হয়েছে ২ হাজার ৩০০ টাকায়, চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে প্রায় ২ হাজার টাকায়। ৮ জানুয়ারি কয়েকটি জেলায় ব্যবসায়ীরা সিলিন্ডার বিক্রিই বন্ধ রাখেন।
এরপর সরকার কয়েকটি পদক্ষেপ নেয়। জ্বালানি বিভাগ বাংলাদেশ ব্যাংককে এলসি দ্রুত খোলার ব্যবস্থা করতে বলে। এনবিআরকে আমদানি পর্যায়ের ভ্যাট কমাতে বলা হয়। পাঁচটি কোম্পানির আমদানি বাড়ানোর আবেদনে অনাপত্তি দেওয়া হয়। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে (বিপিসি) সরকার থেকে সরকার পর্যায়ে আমদানির অনুমতি দেওয়া হয় এবং মার্চে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এলপিজি আমদানিতে একক গ্রাহকের ঋণসীমা তুলে নেয়।
এরপর ফেব্রুয়ারিতে আমদানি আগের বছরের একই মাসের চেয়ে ২১ শতাংশ বেড়েছিল, মার্চে বেড়েছিল ৩৮ শতাংশ। এভাবে জানুয়ারির সংকট কেটে যায়।
সেপ্টেম্বর সংকট: গ্যাস আমদানি করা হয়েছে, কিন্তু দোকানে পর্যাপ্ত পরিমাণে নেই
এ সময় এলপিজি অপারেটরদের সংগঠন লোয়াবের হিসাবে চলতি বছরের আগস্ট মাসে এলপিজি আমদানি হয়েছিল ১ লাখ ৫৮ হাজার টন এবং সেপ্টেম্বরে ১ লাখ ৫৬ হাজার টন, প্রায় সমান। তবু ২০ সেপ্টেম্বর থেকে কোম্পানিগুলো ডিলারদের কাছে সরবরাহ কমাতে শুরু করে। প্রথমে প্রায় ৩০ শতাংশ, পরে ৫০ শতাংশের বেশি কমে যায় সরবরাহ। ডিপোর সামনে ডিলারদের ট্রাক সপ্তাহখানেক লাইন ধরে দাঁড়িয়ে ছিল। সরকারি দাম তখন ছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা, কিন্তু বাজারে ১২ কেজির সিলিন্ডার কিনতে হয়েছে এর চেয়ে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা বেশি দিয়ে।
অর্থাৎ গ্যাস দেশে এসেছিল, কিন্তু বাজারে পৌঁছাচ্ছিল না। প্রশ্ন হলো, কেন? এর উত্তরে কোম্পানিগুলো জানিয়েছিল, সরকারি দামে বিক্রি করলে তাদের লোকসান হচ্ছে। আবারও একই প্রশ্ন, কেন?
বিইআরসি প্রতি মাসে একবার এলপিজির দাম সমন্বয় করে সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোর ঘোষিত মাসিক দাম ধরে। এই দামকে বলা হয় সৌদি সিপি। এর সঙ্গে যোগ হয় জাহাজভাড়া ও প্রিমিয়াম। প্রিমিয়াম মানে সৌদি আরবের দামের ওপর গ্যাস বিক্রেতা বা ট্রেডার যে বাড়তি দাম নেন।
সমস্যা হলো, দাম মাসে একবার ঠিক করা হলেও যুদ্ধের সময় খরচ বদলাচ্ছিল প্রায় প্রতিদিন। চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে হরমুজ প্রণালি প্রায় বন্ধ। পারস্য উপসাগর থেকে গ্যাসবাহী জাহাজ এই পথ দিয়েই আসে। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে যুদ্ধ সৌদি আরবে ছড়িয়ে পড়লে আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির দাম ও জাহাজভাড়া আরও বেড়ে যায়।
সেপ্টেম্বরের দামে বিইআরসি জাহাজভাড়া ও প্রিমিয়াম ধরেছিল টনপ্রতি ১৬০ ডলার। অথচ প্রথম আলোর ২৪ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, সে সময় আন্তর্জাতিক বাজারে এই খরচ ছিল ২৬০ থেকে ৪০০ ডলার। একই প্রতিবেদন আরও বলছে, জাহাজভাড়া কয়েক গুণ বেড়েছে, কিছু আমদানিকারক আমদানি বন্ধ রেখেছেন। চুক্তিবদ্ধ আমদানিকারকেরা চুক্তির চেয়ে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কম গ্যাস পাচ্ছেন, আর চাহিদার চেয়ে সরবরাহ প্রায় ৩০ শতাংশ কম।
কোম্পানিগুলোর যুক্তি ছিল, এ অবস্থায় সরকারি দামে বিক্রি করলে লোকসান হয়।
প্রথম আলোর ২৫ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২২ সেপ্টেম্বর থেকে আমদানিকারক, পরিবেশক ও খুচরা পর্যায়ে এলপিজি মজুত করা শুরু হয়। ফলে সংকট তৈরি হয়ে দাম আগেই বেড়ে যায়। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলমের অভিযোগ, কয়েকটি কোম্পানি মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে এবং এক মাসে ৬০০ কোটি টাকার বেশি বাড়তি আয় করেছে। তিনি এ জন্য বিচার বিভাগীয় তদন্ত চেয়েছেন।
বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ প্রথম আলোকে বলেছেন, কেউ মজুত করেছে কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে। আমদানিকারক ১২টি কোম্পানির কাছে এক মাসের দৈনিক আমদানি ও সরবরাহের তথ্য চাওয়া হয়েছে। এই যাচাইয়ের ফল এখনো প্রকাশিত হয়নি।
পরে ৪ অক্টোবর বিইআরসি অক্টোবর মাসের দাম ঘোষণা করে। কমিশনের কারিগরি কমিটি সুপারিশ করেছিল জাহাজভাড়া ও প্রিমিয়াম আগের মতোই ১৬০ ডলার রাখতে। ওদিকে কোম্পানিগুলো চেয়েছিল ৩০০ ডলার। কমিশন সব দেখেশুনে জাহাজভাড়া ও প্রিমিয়াম ধরে ২৫০ ডলার। ফলে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বেড়ে হয় ১ হাজার ৮৩৭ টাকা। প্রথম আলোর ৫ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সিদ্ধান্তের পর কোম্পানিগুলো আবার বাড়তি সরবরাহ শুরু করে।
এ থেকে সরাসরি সিদ্ধান্তে আসা যায় না যে আসলে কী হয়েছিল। কারণ, আগের সরকারি দামে বিক্রি করার ফলে যদি লোকসান হয়ে থাকে, তবে দাম বাড়ার পর সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ারই কথা। আবার মূল্যবৃদ্ধির জন্য চাপ দেওয়ায় দাম যেহেতু বেড়েই গেছে, ফলে সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়ার কারণ নেই। আসলে কী হয়েছে, তা বোঝা যাবে কেবল কোম্পানিগুলোর দৈনিক মজুত ও সরবরাহের তথ্য প্রকাশ পেলে।
কিন্তু কেন বারবার এমন সংকট হচ্ছে? এর পেছনে কয়েকটি কারণ লক্ষ করা যায়। দেখা যায়, এলপিজি সরবরাহের ৯৯ শতাংশ বেসরকারি খাতের হাতে। বিইআরসি লাইসেন্স দিয়েছে মোট ৫২টি কোম্পানিকে, এর মধ্যে আমদানির অবকাঠামো রয়েছে ২৩টি কোম্পানির, কিন্তু নিয়মিত আমদানি করে মাত্র ৮ থেকে ১০টি কোম্পানি। আগস্টে আমদানি করেছিল ১৩টি কোম্পানি, সেপ্টেম্বরে ১০টি। এদের কয়েকটি সরবরাহ কমালেই পুরো বাজারে টান পড়ে।
আরেকটি সমস্যা সিলিন্ডার নিয়ে। প্রতিটি কোম্পানি নিজের সিলিন্ডারে শুধু নিজের গ্যাস ভরে। তাই কোনো কোম্পানি আমদানি বন্ধ করে দিলে তার গ্রাহকের সিলিন্ডার অচল হয়ে পড়ে। নিয়ম অনুযায়ী সব কোম্পানি যেকোনো সিলিন্ডার ফেরত নিতে বাধ্য, কিন্তু খুচরা বিক্রেতারা বন্ধ কোম্পানির সিলিন্ডার নিতে চান না। ফলে অনেক গ্রাহককে নতুন সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে। প্রথম আলোর হিসাবে বাজারে প্রায় ৫ কোটি ৩০ লাখ সিলিন্ডার আছে, যার প্রায় আড়াই কোটি অলস পড়ে আছে। দেশের মোট ১ লাখ ৮০ হাজার টন মজুত সক্ষমতার প্রায় ৪৭ শতাংশও ব্যবহৃত হচ্ছে না। কারণ, যাদের ট্যাংক আছে, তাদের অনেকে আমদানি করছে না।
সরকারের হাতে কোনো বিকল্প মজুত নেই। কারণ, সরকারি এলপিজি বাজারে ১ শতাংশের মতো। বিপিসির নিজের এলপিজি আমদানি বা মজুতের অবকাঠামো নেই। জানুয়ারিতে আমদানির অনুমতি পাওয়ার পর ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত পাঁচ দফা সরবরাহকারী খুঁজেও সাড়া পায়নি তারা। ৪ আগস্ট একটি প্রতিষ্ঠানকে ৫ হাজার টন সরাসরি কেনার কাজ দেওয়া হলেও সেপ্টেম্বরের শেষ পর্যন্ত তা কবে আসবে, নিশ্চিত ছিল না। ফলে সংকটের সময় সরকার নিজে গ্যাস ছেড়ে দাম সামলাতে পারে না।
দেশে এলপিজির চাহিদা বাড়ছে। বর্তমানে প্রায় এক কোটি গ্রাহক এলপিজি ব্যবহার করেন, আর ব্যবহৃত এলপিজির ৮০ শতাংশ যায় রান্নায়। ২০১৫ সাল থেকে বাসাবাড়িতে নতুন পাইপলাইনের গ্যাস-সংযোগ বন্ধ রয়েছে। আগস্টে পাইপলাইনের গ্যাসে সংকট দেখা দিলে আরও অনেক পরিবার সিলিন্ডারের দিকে ঝুঁকে পড়ে।
আর দাম যে মাসে একবার সমন্বয় করা হয়, সেটা তো আগেই বলেছি। মোটা দাগে চক্রটা এমন: যুদ্ধে খরচ বাড়ে, সরকারি দাম সে তুলনায় কম নির্ধারিত থাকে। এতে কয়েকটি কোম্পানি সরবরাহ কমিয়ে দেয়, তখন বাজারে সংকট দেখা দেয় এবং দাম বেড়ে যায়। পরের মাসে বিইআরসি দাম বাড়ায়, তারপর সরবরাহ আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরে। সরকারের হাতে নিজস্ব মজুত না থাকায় এই চক্রটা ভাঙছে না। আর কোম্পানিগুলোর দৈনিক মজুত ও সরবরাহের তথ্য প্রকাশ না হওয়ায় এর কতটা সত্যিকারের খরচ, কতটা কৃত্রিম, তা এখনো বলা যাচ্ছে না।
বর্তমান মূল্যবৃদ্ধির পেছনের কারণ
ওপরের ছবিতে দেখা যাচ্ছে, সেপ্টেম্বরের ১ হাজার ৫৮৫ টাকা থেকে নভেম্বরে দাম কেন ২ হাজার ৬০ টাকা হলো। দুই মাসে বাড়তি ৪৭৫ টাকার মধ্যে বিশ্ববাজারে দাম বাড়ার কারণে এসেছে ১৭৭ টাকা, আর বিইআরসির দুটি সিদ্ধান্ত থেকে এসেছে ২৮৪ টাকা; বাকি ১৪ টাকা ডলারের দর ও অন্যান্য খরচের।
গ্রাফের নীল অংশ বিশ্ববাজারের দাম, এটি বাংলাদেশের হাতে নেই। লাল অংশটুকু বিইআরসির সিদ্ধান্ত। প্রথম সিদ্ধান্তটি অক্টোবরের: জাহাজভাড়া ও প্রিমিয়াম টনপ্রতি ১৬০ ডলারের বদলে ২৫০ ডলার ধরা হয়, তাতে সিলিন্ডারে বাড়ে প্রায় ১৪৩ টাকা। প্রিমিয়াম মানে সৌদি আরবের দামের ওপর গ্যাস বিক্রেতা বা ট্রেডার যে বাড়তি দাম নেন; বিইআরসির হিসাবে জাহাজভাড়া আর এই প্রিমিয়াম একসঙ্গে ধরা হয়। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় গ্যাস আনতে হচ্ছে ঘুরপথে, মাঝসমুদ্রে এক জাহাজ থেকে আরেক জাহাজে তুলে, যুদ্ধের ঝুঁকি মাথায় নিয়ে; তাই দুটোই বেড়েছে।
দ্বিতীয় সিদ্ধান্ত নভেম্বরের: কোম্পানি, ডিলার ও দোকানদারের ভাগ বাড়ানো হয় এ সময়। ফলে তিন পক্ষ মিলিয়ে সিলিন্ডারপ্রতি দাম বেড়ে যায় ১৪১ টাকা। বিইআরসি নিজেই বিজ্ঞপ্তিতে লিখেছে, নভেম্বরে শুধু সৌদি আরবের দাম বাড়ায় সিলিন্ডারপ্রতি দাম বেড়েছে ৭৪ টাকার মতো।
এই ২ হাজার ৬০ টাকার মধ্যে কে কত টাকা পাচ্ছে, তা দেখা যাচ্ছে ছবি ৫-এ। বিইআরসির হিসাবে দামের ৫৫ শতাংশ বিশ্ববাজারে গ্যাসের দাম, ১৮ শতাংশ জাহাজভাড়া ও প্রিমিয়াম, আর ৫ শতাংশের মতো ভ্যাট। বাকি ২১ শতাংশ, অর্থাৎ ৪৩৭ টাকা পান দেশি কোম্পানি (২৮২ টাকা), ডিলার (৮৫ টাকা) ও দোকানদার (৭০ টাকা)।
কিন্তু সরকার যে দাম ঠিক করে দেয়, গ্রাহককে কিনতে হয় তার চেয়ে অনেক বেশি টাকায়। যেমন এপ্রিলে সরকার ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৭২৮ টাকা নির্ধারণ করলেও খুলনায় গ্রাহককে কিনতে হয়েছে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ১০০ টাকায়, অর্থাৎ ২৭২ থেকে ৩৭২ টাকা বেশি। অক্টোবরে সরকার-নির্ধারিত ১ হাজার ৮৩৭ টাকার সিলিন্ডার ঢাকায় কিনতে হয়েছে ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায়, অর্থাৎ ৩৬৩ থেকে ৬৬৩ টাকা বেশি।
একটা প্রশ্ন করেন অনেকে। দেশে একবার দাম বাড়লে কি আর কখনো কমে? সরকার-নির্ধারিত দাম কমে। স্বাভাবিক বছরে দাম সাধারণত শীতে বাড়ে, গরমকালে কমে। যেমন ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে ১ হাজার ৪৯৮ টাকা হওয়া দাম জুলাইয়ে কমে হয় ৯৯৯ টাকা। তবে বাজারে দাম কমে কি না, তা মাপার নিয়মিত তথ্য নেই। প্রথম আলোর যে কয়েকটি প্রতিবেদনে বাজারদর এসেছে, তাতে দেখা যায়, যে মৌসুমে সরকারি দাম কম থাকে, তখনো বেশি দাম দিতে হয়েছে: ২০২২ সালের আগস্টে সরকারি দামের চেয়ে ১৫০ থেকে ২৮০ টাকা বেশি দিতে হয়েছে, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে বেশি দিতে হয়েছে ৬৬ থেকে ৩১৬ টাকা।
আর দামের ভেতরের কিছু অংশ একবারও কমেনি (ছবি ৮)। ২০২১ সালের এপ্রিলে সিলিন্ডারপ্রতি কোম্পানির ভাগ ছিল ১৪৩ টাকা, এখন ২৮২ টাকা। ডিলারের ভাগ ২০২৩ সালের আগস্টের আগে ছিল ৩৭ টাকা, এখন ৮৫ টাকা; দোকানদারের ভাগ ৩৮ টাকা থেকে হয়েছে ৭০ টাকা। রাষ্ট্রায়ত্ত এলপি গ্যাস পিএলসির সাড়ে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ২০২১ সালে ছিল ৫৯১ টাকা, এখন ১ হাজার ৮৬০ টাকা; এর মধ্যে ১ হাজার ৪ টাকা যাবে বিপিসির ‘এলপিজি খাত উন্নয়ন তহবিলে’। ফলে যুদ্ধ থেমে বিশ্ববাজারে দাম আগের জায়গায় ফিরলেও নভেম্বরের নতুন ভাগের কারণে সিলিন্ডারপ্রতি অন্তত ১৪১ টাকা বেশি দিতে হবে।