‘পুলিশ যে লাশটা কই গুম করল’, ৫ আগস্ট গুলিবিদ্ধ হৃদয়কে এখনো খুঁজছে পরিবার
৫ আগস্ট, ২০২৪। বেলা ৩টা ২৫ মিনিট। শেখ হাসিনার দেশ ছেড়ে পালানোর খবরে গাজীপুরে কোনাবাড়ির কাশিমপুর সড়কে শরীফ জেনারেল হাসপাতাল–সংলগ্ন এলাকায় উল্লসিত মানুষের ঢল। কাছেই কোনাবাড়ি থানা। সড়কজুড়ে হাজারো মানুষের আনন্দমিছিল। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়। মিছিল–উল্লাস তখনো চলছে।
বিকেল ৫টা ২২ মিনিট। দাঙ্গা পুলিশের পোশাক পরা কয়েকজন পুলিশ সদস্য এক তরুণকে আটক করেন। তাঁরা ওই তরুণকে ঘিরে ধরে শরীফ জেনারেল হাসপাতালের সামনের সড়কে নিয়ে যান। আরও কয়েকজন পুলিশ সদস্য সেখানে এসে জটলা করেন। শটগান হাতে ছিলেন এক পুলিশ সদস্য। তিনি ওই তরুণের পেছনে গিয়ে দাঁড়ান। হঠাৎ জটলায় থাকা এক পুলিশ সদস্য ওই তরুণকে চড় মারেন। এরপর পেছনে থাকা শটগান হাতের ওই পুলিশ সদস্য তরুণটিকে গুলি করেন। একটি গুলির শব্দ, একঝলক ধোঁয়া। তরুণটি হাত-পা ছড়িয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। শরীর তখনো অল্প অল্প নড়ছিল। পুলিশ সদস্যরা গুলিবিদ্ধ তরুণকে ওখানেই ফেলে রেখে এগিয়ে যান।
একটাই পুলা আছিল। আমি আর কী কমু। লাশটা যেন পাই। পুলাটারে কবর দিমু। হাড্ডি পাইলেও চলব।
যিনি গুলি করেছিলেন, চলে যাওয়ার আগে ওই পুলিশ সদস্য গুলিবিদ্ধ তরুণের দিকে একবার ফিরে তাকান। আরও কয়েকজন পুলিশ সদস্য সেখানে এসে তরুণটিকে চ্যাংদোলা করে নিয়ে চলেন। কয়েক মিনিট পরই চার পুলিশ সদস্যকে হাসপাতালের সামনে দিয়ে ওই তরুণকে নিয়ে যেতে দেখা যায়। সড়কে রক্তের টানা রেখা তখনো স্পষ্ট। তখনো তরুণের হাত-পা অল্প নড়ছে। তাঁকে টেনেহিঁচড়ে হাসপাতাল পেরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় আরেক দল পুলিশের দিকে। ওই দলে তিনজন ছিলেন। দুজন ইউনিফর্ম পরা ও একজন সাদাপোশাকে। তাঁরা গুলিবিদ্ধ তরুণকে নিয়ে একটি গলির দিকে যান। ওই গলি সোজা চলে গেছে কোনাবাড়ি থানার দিকে। এ সময় আবার গোলাগুলির শব্দ শোনা যায়। গুলিবিদ্ধ তরুণকে গলির মুখে ফেলে রেখেই ওই তিনজন চলে যান। পরে ফিরে এসে তরুণটিকে ছেঁচড়ে টেনে নিয়ে গলিতে ঢুকে পড়েন।
এটি কোনো কল্পকাহিনির দৃশ্য নয়। এটি একটি প্রামাণ্যচিত্রের দৃশ্য। এতে একজন তরুণের জীবনের শেষ কয়েকটি মর্মান্তিক মুহূর্ত তুলে ধরা হয়েছে। মুঠোফোনে ধারণ করা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে সংগ্রহ করা বিভিন্ন ফুটেজ যাচাই শেষে সেগুলোর ফরেনসিক বিশ্লেষণ করে এ প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল ট্রুথ অ্যান্ড জাস্টিস প্রজেক্ট (আইটিজেপি)। সহায়তায় ছিল টেকগ্লোবাল ইনস্টিটিউট। এই প্রামাণ্যচিত্র প্রযোজনা ও পরিচালনা করেছে দ্য আউটসাইডার মুভি কোম্পানি।
২০২৫ সালের ২৪ জুলাই। হৃদয়ের মরদেহ খুঁজতে ব্যাপক তল্লাশি অভিযান শুরু করে পুলিশ। আইসিটির তদন্ত দলের নেতৃত্বে গাজীপুর নগরের কড্ডা এলাকায় তুরাগ নদে এ অভিযানে অংশ নেয় গাজীপুর, টঙ্গী ও ঢাকার ডুবুরি দল। কিন্তু কিছুই পাওয়া যায়নি।
ভুক্তভোগী ওই তরুণের নাম মো. হৃদয় (২১)। টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার আলমনগর গ্রামের লাল মিয়া ও রেহেনা বেগমের একমাত্র ছেলে হৃদয়ের দুজন বোন আছেন। থাকতেন কোনাবাড়ি এলাকায়। পড়তেন টাঙ্গাইলের হেমনগর ডিগ্রি কলেজে দ্বাদশ শ্রেণিতে। পাশাপাশি অটোরিকশা চালাতেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পালানোর খবর শুনে বাসা থেকে বেরিয়েছিলেন হৃদয়।
হদিস মেলেনি হৃদয়ের
কোনাবাড়ি থানার দিকে যাওয়া গলিতে টানা কয়েকটি শাটারওয়ালা দোকান, নাম আবেদ আলী মার্কেট। হৃদয়কে এই গলি দিয়েই টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। এরপর তাঁর সঙ্গে কী ঘটেছিল, সেটার কোনো ফুটেজ প্রামাণ্যচিত্রের গবেষক ও নির্মাতারা পাননি। মাস ঘুরেছে, বছর পেরিয়েছে—পরিবারও এখন পর্যন্ত হৃদয়ের কোনো হদিস পায়নি। দুই বছর ধরে হৃদয়কে হন্যে হয়ে খুঁজছে পরিবারটি। প্রিয়জনকে ফিরে পাবেন—সেই প্রত্যাশাও এখন আর পরিবারের সদস্যদের অবশিষ্ট নেই। হৃদয়ের বোন জেসমিন আক্তার ১ আগস্ট শনিবার মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘ভাইকে তো আর পাইলাম না। একবার নদীতে লাশ খুঁজল, পাইল না। তারপর তো আর কিছুই হয় নাই।’
জেসমিন আক্ষেপ করে বলছিলেন, ‘গেজেটে ভাইয়ের নাম নাই। শহীদের তালিকায়ও নাম নাই। সরকারি সহায়তা পাই নাই। জামায়াত বিভিন্ন সময় হেল্প (সহায়তা) করছে। ঢাকার এক ছাত্র আইসা বাবারে একটা অটোরিকশা দিয়া গেছে।’ এখন হৃদয়ের হাড়গোড় খুঁজে কবর দিতে পারলে অন্তত এতটুকু সান্ত্বনা পেতে চায় পরিবার। জেসমিন বলেন, ‘ভাইরে যে কোন জায়গায় নিল। ভাইরে তো আর পাই না।’
হৃদয়ের বাবা লাল মিয়া ২০২৪ সালে টাঙ্গাইল জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে একটি আবেদন করেছিলেন। তাতে তিনি ছেলের দেহাবশেষ খুঁজে দেওয়া ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবি জানান। গুলিবিদ্ধ হৃদয়ের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা নিয়ে বোন জেসমিন ২০২৪ সালের ২১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) অভিযোগ করেন। জেসমিন বলেন, ‘ভাইয়ের হাড্ডিগুলান পাইলেও চলব। ভাইরে যারা মারছে, হ্যাগোর ফাঁসি চাই।’
ভাইকে তো আর পাইলাম না। একবার নদীতে লাশ খুঁজল, পাইল না। তারপর তো আর কিছুই হয় নাই।
সেদিন কী ঘটেছিল
হৃদয়ের বোন জেসমিনের স্বামী মো. ইব্রাহিম ২০২৪ সালের ২৬ আগস্ট কোনাবাড়ি থানায় একটি মামলা করেন। মামলায় অভিযোগ করা হয়, হৃদয়কে পুলিশ গুলি করে লাশ গুম করেছে। হৃদয় ও ইব্রাহিম দুজনই কোনাবাড়িতে অটোরিকশা চালাতেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দুপুরে একসঙ্গেই বাসা থেকে বের হয়েছিলেন।
স্মৃতি হাতড়ে ইব্রাহিম বলেন, শেখ হাসিনার পালানোর খবরে মিছিল বের হলে পুলিশ ধাওয়া দেয় ও টিয়ার গ্যাস মারে। তখন হৃদয়কে বাসায় চলে যেতে বলেন তিনি। পরে থানার দিকে একটি বাসায় তিনি নিজেও আশ্রয় নেন। বিকেলে ওই বাড়ির একজন ভাড়াটিয়া নারী বাসায় এসে জানান, ‘পুলিশ একজনরে গুলি মারছে। কোন মায়ের বুক জানি খালি হইল।’ ইব্রাহিম এ কথা শুনে হৃদয়ের মুঠোফোনে ফোন করেন। ধরেন অপরিচিত একজন। জানান, তিনি রাস্তায় পড়ে থাকা অবস্থায় মুঠোফোনটি পেয়েছেন। পরবর্তী সময়ে ওই ব্যক্তি দেখা করে হৃদয়ের মুঠোফোনটি দিয়ে গেছেন।
ইব্রাহিম জানান, জেসমিন তখন বাড়িতে ছিলেন। তিনি জেসমিনকে ফোন করে তাড়াতাড়ি ভাইয়ের খোঁজ নিতে বলেন। জেসমিন তখন হৃদয়ের মুঠোফোনে কল দেন। তিনিও অপরিচিত গলার উত্তর শুনেছিলেন। এর আগে দুপুরে হৃদয়ের সঙ্গে জেসমিনের সর্বশেষ কথা হয়েছিল। হৃদয় বোনকে জানিয়েছিলেন, মোবাইলের ব্যালান্স শেষ। রাতে টাকা ভরে ফোন করবেন। ভাই–বোনের সেই কথা আর হয়নি।
খুঁজতে বের হন ইব্রাহিম
গোলাগুলি আর উত্তেজনার মধ্যেই সাহস করে শ্যালক হৃদয়কে খুঁজতে বের হন ইব্রাহিম। যেখানে গুলি করা হয়েছিল, তার কাছাকাছি জায়গায় নীল রঙের একটি লুঙ্গি পড়ে থাকতে দেখে সেটা কুড়িয়ে নেন তিনি। ইব্রাহিম জানান, সেটা হৃদয়ের লুঙ্গি। প্রামাণ্যচিত্রে দেখা যায়, গুলিবিদ্ধ তরুণের পরনে একটি লাল রঙের ছোট প্যান্ট। ইব্রাহিমের দাবি, হৃদয় লুঙ্গির নিচে ছোট লাল প্যান্ট পরেছিলেন। টানাহেঁচড়ার সময় হয়তো তাঁর পরনের লুঙ্গিটি খুলে সড়কে পড়ে যায়। পরে সেটাই কুড়িয়ে এনেছিলেন তিনি।
৫ আগস্ট সন্ধ্যার পর কোনাবাড়ি থানার পুলিশ পালিয়ে যায়। পরের কয়েক দিন থানা বলতে ছিল কেবল চেয়ার, টেবিল আর ভবন। তাই তখন থানায় গিয়ে হৃদয়ের খোঁজ নিতে কিংবা অভিযোগ জানাতে পারেননি ভগ্নিপতি ইব্রাহিম।
ওই রাতে ইব্রাহিম কোনাবাড়ি থানা আর আশপাশের হাসপাতালের মর্গে গিয়ে হৃদয়ের মরদেহ খোঁজেন। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গেও যান। হঠাৎ খবর আসে, টঙ্গীতে একটি বস্তাবন্দী মরদেহ পাওয়া গেছে। সেখানেও ছুটে যান ইব্রাহিম। কিন্তু ওই মরদেহ হৃদয়ের ছিল না। ইব্রাহিম বলেন, ‘পুলিশ যে লাশটা কই গুম করল, কে জানে।’
৫ আগস্ট সন্ধ্যার পর কোনাবাড়ি থানার পুলিশ পালিয়ে যায়। পরের কয়েক দিন থানা বলতে ছিল কেবল চেয়ার, টেবিল আর ভবন। তাই তখন থানায় গিয়ে হৃদয়ের খোঁজ নিতে কিংবা অভিযোগ জানাতে পারেননি ইব্রাহিম।
‘পুলাটারে কবর দিমু, হাড্ডি পাইলেও চলব’
২০২৫ সালের ২৯ জানুয়ারি ‘ছেলের লাশ চাই, হাড্ডি হলেও বাড়িত নিয়ামু’ শিরোনামে হৃদয়কে নিয়ে প্রথম আলোয় একটি ভিডিও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। হৃদয়ের ভ্যানচালক বাবা লাল মিয়া ভিডিওতে বলেন, ‘একটাই পুলা আছিল। আমি আর কী কমু। লাশটা যেন পাই। পুলাটারে কবর দিমু। হাড্ডি পাইলেও চলব।’
ঘটনার পরদিন (২০২৪ সালের ৬ আগস্ট) টাঙ্গাইলের বাড়িতে ফেরার কথা ছিল হৃদয়ের। বোন জেসমিন বলেন, হৃদয় শেষবার বাড়ি থেকে কোনাবাড়ি যাওয়ার সময় তাড়াহুড়োয় ভাত খেয়ে যাননি। মা রেহেনা বেগম এখন সেই আক্ষেপ নিয়ে বেঁচে আছেন। মুঠোফোনে জেসমিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘ভিডিও ফুটেজ যেটুকু পাওয়া গেছে, তা দেখে আশা করার উপায় নাই যে ভাইটা বেঁচে আছে। সেই বিকেলে পুলিশের আক্রমণ শুরু হলে হৃদয় এক দোকানে লুকিয়েছিল। পরে সেখানকার একটি গ্যারেজের সামনে থেকে হৃদয়কে টেনে নিয়ে যায় পুলিশ।’
হৃদয়কে নিয়ে করা প্রামাণ্যচিত্রের ধারাভাষ্যে বলা হয়েছে, তাঁকে পেছন থেকে শটগানের নল ঠেকিয়ে গুলি করে মারা হয়েছিল। গত বছরের ১৫ জানুয়ারি রাজধানীর বাংলা একাডেমিতে এক অনুষ্ঠানে প্রামাণ্যচিত্রটি প্রদর্শন করা হয়। বিভিন্ন গণমাধ্যমেও এটি দেখানো হয়। এসব কারণে হৃদয়ের ঘটনাটি আবারও আলোচনায় উঠে আসে।
মরদেহ খুঁজতে তুরাগে
২০২৫ সালের ২৪ জুলাই। হৃদয়ের মরদেহ খুঁজতে ব্যাপক তল্লাশি অভিযান শুরু করে পুলিশ। আইসিটির তদন্ত দলের নেতৃত্বে গাজীপুর নগরের কড্ডা এলাকায় তুরাগ নদে এ অভিযানে অংশ নেয় গাজীপুর, টঙ্গী ও ঢাকার ডুবুরি দল। কিছুই পাওয়া যায়নি।
ভিডিও ফুটেজে যে পুলিশ সদস্যকে হৃদয়কে গুলি করতে দেখা যায়, তাঁর নাম মো. আকরাম হোসেন। গ্রেপ্তারের পর কনস্টেবল আকরামের দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি অনুযায়ী, হৃদয়ের মরদেহ খুঁজতে তুরাগ নদে এ অভিযান চালানো হয়।
গত বছরের ১৩ অক্টোবর আইসিটির তখনকার চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম ট্রাইব্যুনালকে জানান, গুলি করে হত্যার পর হৃদয়ের মরদেহ কড্ডা নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। ট্রাইব্যুনাল গত ১২ জুলাই তদন্ত প্রতিবেদন জমার দিন ধার্য করেছিলেন। এখনো প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়নি।
জেসমিন জানান, এ বছরের জুলাইয়ে তাঁদের ঢাকায় ডাকা হয়েছিল। জানানো হয়, হৃদয়কে যাঁরা মেরেছেন, তাঁদের ধরা হয়েছে। তবে হৃদয়ের হাত-পা ধরে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের এখনো ধরা সম্ভব হয়নি। তদন্ত প্রতিবেদন দ্রুত ট্রাইব্যুনালে জমা দেওয়া হবে বলেও জানানো হয়েছিল। পরে আর কোনো অগ্রগতির কথা জানানো হয়নি। তাই অপেক্ষা ফুরোয়নি পরিবারটির।