প্রকল্পে কুড়িগ্রাম ও জামালপুর জেলায় সমান ভাগ করে ২৫ হাজার সুবিধাভোগীকে গরু দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী, চিলমারী, উলিপুর ও রাজারহাট—এই ৪টি উপজেলার ৪০টি ইউনিয়ন ও ২টি পৌরসভার ১২ হাজার ৫০০ পরিবারের গরু পাওয়ার কথা। কিন্তু রাজারহাট উপজেলার ৭টি ইউনিয়নের ১ হাজার ৯৬০ পরিবার এবং উলিপুর পৌরসভা ও ১১টি ইউনিয়নের ৩ হাজার ১৬০ পরিবারের কেউ গরু পায়নি। অথচ জামালপুরের ৪টি উপজেলায় ১২ হাজার ৫০০টি পরিবারের মধ্যে ১০ হাজার ৭১৫ পরিবার গরু পেয়েছে।

প্রকল্প পরিচালক জাহিদুল হক চৌধুরী প্রথম আলোর কাছে দাবি করেন, প্রথমে ইউপি চেয়ারম্যান ও সদস্যদের করা তালিকায় অনেক সচ্ছল ব্যক্তির নাম আসে। পরে সেই তালিকা বাদ দিয়ে আরডিএর কর্মীরা বিবিএসের দারিদ্র্যের তালিকা ধরে নিজেরাই একটি তালিকা করেন। তবে জনপ্রতিনিধিদের বিরোধিতার কারণে তাঁরা শেষ পর্যন্ত রাজারহাট উপজেলা, উলিপুর পৌরসভা ও অবশিষ্ট ইউনিয়নে গরু দিতে পারেননি।

সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রকল্পের শুরু থেকেই নানা অনিয়মের অভিযোগ ছিল। ২০২০ সালে উলিপুরের থেতরাই ইউনিয়নে একই পরিবারের একাধিক সদস্য ও সচ্ছল ব্যক্তিদের গরু দেওয়া হয়। যেমন ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সচ্ছল পরিবারের দুই ভাই শামসুল আলম ও সাইদুল ইসলাম গরু পেয়েছেন।

অভিযোগ উঠেছে, প্রতিটি পরিবারকে ৪০ হাজার টাকা দামের গরু দেওয়ার কথা থাকলেও শুরুর দিকে ২২ থেকে ২৮ হাজার টাকার মধ্যে ছোট ও রোগাক্রান্ত গরু দেওয়া হয়। বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর বেরোলে, পরে তুলনামূলক ভালো গরু দেওয়া হয়।

ইউনিয়নের কিশোরপুর গ্রামের সুবিধাভোগী আলেয়া বেগম অভিযোগ করেন, তাঁকে ২৫ হাজার টাকার গরু কিনে দিয়ে তাঁরা ৩ হাজার টাকা হাতে ধরিয়ে দিয়েছিলেন।

প্রকল্প পরিচালক দাবি করেন, গত মে মাসে তিনি এই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। আগের বিষয়ে বলতে পারবেন না।

তৎকালীন প্রকল্প উপপরিচালক ও আরডিএর বর্তমান পরিচালক শেখ মেহেদী মোহাম্মদ দাবি করেন, প্রকল্পের কর্মীরা নতুন হওয়ায় কিছু নিয়ম বুঝতে পারেননি। দু–একটি অনিয়মের ঘটনা ঘটেছিল।

থেতরাই ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ফাঁসিদাহ মাঝিপাড়ায় ঢুকতেই লালু চন্দ্র দাসের বাড়িতে প্রকল্পের সুবিধাভোগীর সাইনবোর্ড দেখা যায়। কিন্তু তাঁর বাড়িতে গরু নেই। লালুর স্ত্রী রংমালা বলেন, গরুটির কয়েকবার অসুখ হয়েছিল। ওষুধ বাবদ তিনি কোনো টাকা পাননি। এর মধ্যে মেয়ের বিয়ের সময় অভাবে পড়ে তিনি গরুটি বিক্রি করে দেন।

৯ নম্বর ওয়ার্ডে ৩৫টি পরিবার গরু পেয়েছে। তাঁদের মধ্যে ফুলবাবু বর্মণ ও মাইদুল ইসলামের গরু অসুখে মারা গেছে। সুবিধাভোগী উজ্জ্বল চন্দ্র সরকার প্রথম আলোকে বলেন, কিছু বকনা অসুস্থ ছিল। কিছু বকনা গর্ভবতী হয় না। এসব কারণে কয়েকজন গরু বিক্রি করেছেন।

সুবিধাভোগী মেনেকা রানী ও তাপসী রানী বলেন, গরু দেওয়ার পর তাঁদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা থাকলেও এখনো প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়নি।

উলিপুরের ১১টি ইউনিয়ন ও পৌরসভার প্রায় ৩ হাজার ৮০০ সুবিধাভোগীর গরু না পাওয়ার বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বিপুল কুমার প্রথম আলোকে বলেন, আরডিএ শুধু তাঁদের হাট বসানোর বিষয়টি জানায়। প্রকল্পের অন্যসব বিষয় তাঁর জানা নেই।

চিলমারী উপজেলার রমনা ইউনিয়নের ফাতেমা বেগম ও তাঁর ছেলে ফরিদুল ইসলাম চার মাস আগে দুটি হাড্ডিসার গরু পেয়েছেন। তাই গরু দুটি বিক্রি করে বাছুরসহ তাঁরা গাভি কেনেন। এখনো গরুর খাবারের কোনো টাকা তাঁরা পাননি।

অবশ্য প্রকল্প পরিচালক বলেন, দেরিতে হলেও সুবিধাভোগীরা গরুর খাবারের টাকা পাবেন।

রাজারহাট উপজেলার ৭টি ইউনিয়নের ২ হাজার ২০০ পরিবারের কেউ গরু পায়নি। সদর ইউপি চেয়ারম্যান এনামুল হক অভিযোগ করেন, আরডিএর তালিকায় অনেক সচ্ছল ব্যক্তির নাম ছিল। এ নিয়ে ইউএনও, উপজেলা চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়াম্যান, ইউপি চেয়ারম্যানরা আরডিএ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক করেন। কিন্তু তাঁরা তালিকা পরিবর্তন করতে রাজি হননি। এ কারণে প্রকল্পের টাকা ফেরত গেছে।

রাজারহাটের ইউএনও নূরে তাসনিম প্রথম আলোকে বলেন, আরডিএ কর্তৃপক্ষ ও জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে আস্থাহীনতার কারণে উপজেলায় গরু বিতরণ করা সম্ভব হয়নি। (শেষ কিস্তি)

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন